করোনা প্রতিরোধে যেভাবে সফলতা পেল জার্মানি
jugantor
করোনা প্রতিরোধে যেভাবে সফলতা পেল জার্মানি

  মিজানুল হক খান, জার্মানি থেকে  

০৩ জুলাই ২০২০, ২০:১১:২৩  |  অনলাইন সংস্করণ

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস ইউরোপের দেশ ইতালি, স্পেন আর ফ্রান্সে তাণ্ডব চালালেও জার্মানিকে কাবু করতে পারেনি। কোনোরকম প্রতিষেধক ছাড়াই শুধু সেবা আর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশটিতে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এ ভাইরাস।

জার্মানি অন্য যে কোনো ইউরোপীয় দেশের তুলনায় বেশি পরিমাণ করোনার টেস্ট করেছে। দেশটি সপ্তাহে ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষের করোনা পরীক্ষা করা হয়। ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে- এমন সন্দেহ হলেই পরীক্ষা করা হয়েছে।

ব্যাপক পরীক্ষা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতির পাশাপাশি জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মার্কেলের সময়োচিত সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব মৃত্যুহার হ্রাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি এ সংকটের শুরু থেকেই নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পদক্ষেপটা খুবই কঠোরভাবে আরোপ করেছিলেন।

তাছাড়া দক্ষিণ কোরিয়াকে অনুসরণ করে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তার সময়োচিত পদক্ষেপ প্রায় সব মহল থেকে প্রশংসা পেয়েছে।

সরকারের সবচেয়ে প্রশংসনীয় উদ্যোগগুলোর একটি ছিল দ্রুত অর্থনৈতিক সহায়তা। ৩ দিনের মধ্যে সহায়তা পেয়েছেন সবাই। ছোট আকারের কোম্পানি থেকে শুরু করে স্বনির্ভর ব্যক্তিরা কমপক্ষে তিন মাসের জন্য ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত সরকারি ভর্তুকি পেয়েছেন। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে আরও বেশি। সাধারণ মানুষের সমস্যা কাটাতেও সরকার কিছু ঘোষণা করেছে। যেমন এক জরুরি আইনের বলে আয়ের অভাবে বাসাভাড়া মেটাতে না পারলেও মালিক ভাড়াটেদের তাড়াতে পারবে না। সব ধরনের সাহায্য এবং অর্থনৈতিক লেনদেন হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।

এমনকি যারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে সাহায্য করেছেন তারাও অ্যাকাউন্ট নম্বর নিয়ে ব্যাংকে টাকা পাঠিয়েছেন। সুতরাং মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে কোথাও যেতে হয়নি। প্রচারের আশায় কেউ সাহায্য দিয়ে ছবি তোলার জন্য শত শত মানুষ জড়ো করেননি। নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাই ছিল প্রধান প্রচেষ্টা।

জার্মানির উল্লেখযোগ্য একটি দিক হল শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা। চীনে করোনা প্রাদুর্ভাবের পর জানুয়ারি থেকেই জার্মানির হাসপাতালগুলো তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করে।

জানুয়ারিতে জার্মানির হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পরীক্ষা কিটসহ চিকিৎসা উপকরণ দিয়ে উপযোগী করা হয়েছে। জানুয়ারিতেই জার্মানিতে ২৮ হাজার ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ বেড ছিল। অর্থাৎ প্রতি ১ লাখ লোকের জন্য ৩৪টি আইসিইউ। যেখানে ইতালিতে সমপরিমাণ লোকের জন্য ১২টি এবং নেদারল্যান্ডসে ৭টি আইসিইউ বেড রয়েছে। বর্তমানে জার্মানিতে মোট ৪০ হাজার আইসিইউ বেড রয়েছে। ইতালি, স্পেন ও ফ্রান্সের রোগীদেরও সেবা দিয়েছে জার্মানি।

দেশটির সরকার ও বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দল ভেদাভেদ ভুলে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

যদিও জার্মানির বিপদ এখনও পুরোপুরি কেটে যায়নি। সামনের দিনগুলোতে মেনে চলতে হবে সাবধানতা। জার্মানির সংক্রমণ রোগ বিষয়ের গবেষণা কেন্দ্র রবার্ট কক ইন্সটিটিউটের সভাপতি লোথার ভীলার জার্মানির জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, সবাইকে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত আচরণবিধি মেনে চলতে হবে, তা না হলে দ্বিতীয় দফায় আসা করোনাভাইরাসের সংকট আবারো বিপদজনক পরিস্থিতিতে চলে যেতে পারে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

করোনা প্রতিরোধে যেভাবে সফলতা পেল জার্মানি

 মিজানুল হক খান, জার্মানি থেকে 
০৩ জুলাই ২০২০, ০৮:১১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস ইউরোপের দেশ ইতালি, স্পেন আর ফ্রান্সে তাণ্ডব চালালেও জার্মানিকে কাবু করতে পারেনি। কোনোরকম প্রতিষেধক ছাড়াই শুধু সেবা আর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশটিতে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এ ভাইরাস।

জার্মানি অন্য যে কোনো ইউরোপীয় দেশের তুলনায় বেশি পরিমাণ করোনার টেস্ট করেছে। দেশটি সপ্তাহে ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষের করোনা পরীক্ষা করা হয়। ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে- এমন সন্দেহ হলেই পরীক্ষা করা হয়েছে।

ব্যাপক পরীক্ষা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতির পাশাপাশি জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মার্কেলের সময়োচিত সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব মৃত্যুহার হ্রাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি এ সংকটের শুরু থেকেই নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পদক্ষেপটা খুবই কঠোরভাবে আরোপ করেছিলেন।

তাছাড়া দক্ষিণ কোরিয়াকে অনুসরণ করে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তার সময়োচিত পদক্ষেপ প্রায় সব মহল থেকে প্রশংসা পেয়েছে।

সরকারের সবচেয়ে প্রশংসনীয় উদ্যোগগুলোর একটি ছিল দ্রুত অর্থনৈতিক সহায়তা। ৩ দিনের মধ্যে সহায়তা পেয়েছেন সবাই। ছোট আকারের কোম্পানি থেকে শুরু করে স্বনির্ভর ব্যক্তিরা কমপক্ষে তিন মাসের জন্য ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত সরকারি ভর্তুকি পেয়েছেন। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে আরও বেশি। সাধারণ মানুষের সমস্যা কাটাতেও সরকার কিছু ঘোষণা করেছে। যেমন এক জরুরি আইনের বলে আয়ের অভাবে বাসাভাড়া মেটাতে না পারলেও মালিক ভাড়াটেদের তাড়াতে পারবে না। সব ধরনের সাহায্য এবং অর্থনৈতিক লেনদেন হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।

এমনকি যারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে সাহায্য করেছেন তারাও অ্যাকাউন্ট নম্বর নিয়ে ব্যাংকে টাকা পাঠিয়েছেন। সুতরাং মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে কোথাও যেতে হয়নি। প্রচারের আশায় কেউ সাহায্য দিয়ে ছবি তোলার জন্য শত শত মানুষ জড়ো করেননি। নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাই ছিল প্রধান প্রচেষ্টা।

জার্মানির উল্লেখযোগ্য একটি দিক হল শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা। চীনে করোনা প্রাদুর্ভাবের পর জানুয়ারি থেকেই জার্মানির হাসপাতালগুলো তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করে।

জানুয়ারিতে জার্মানির হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পরীক্ষা কিটসহ চিকিৎসা উপকরণ দিয়ে উপযোগী করা হয়েছে। জানুয়ারিতেই জার্মানিতে ২৮ হাজার ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ বেড ছিল। অর্থাৎ প্রতি ১ লাখ লোকের জন্য ৩৪টি আইসিইউ। যেখানে ইতালিতে সমপরিমাণ লোকের জন্য ১২টি এবং নেদারল্যান্ডসে ৭টি আইসিইউ বেড রয়েছে। বর্তমানে জার্মানিতে মোট ৪০ হাজার আইসিইউ বেড রয়েছে। ইতালি, স্পেন ও ফ্রান্সের রোগীদেরও সেবা দিয়েছে জার্মানি।

দেশটির সরকার ও বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দল ভেদাভেদ ভুলে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

যদিও জার্মানির বিপদ এখনও পুরোপুরি কেটে যায়নি। সামনের দিনগুলোতে মেনে চলতে হবে সাবধানতা। জার্মানির সংক্রমণ রোগ বিষয়ের গবেষণা কেন্দ্র রবার্ট কক ইন্সটিটিউটের সভাপতি লোথার ভীলার জার্মানির জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, সবাইকে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত আচরণবিধি মেনে চলতে হবে, তা না হলে দ্বিতীয় দফায় আসা করোনাভাইরাসের সংকট আবারো বিপদজনক পরিস্থিতিতে চলে যেতে পারে।
 

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]