মাল্টিকালচার কী এবং কেন প্রয়োজন? 
jugantor
মাল্টিকালচার কী এবং কেন প্রয়োজন? 

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

১০ জুলাই ২০২০, ০২:৩৩:৩৮  |  অনলাইন সংস্করণ

যদি বলি Netherlands is a tolerant rather than multicultural society, কী ধারণা হবে সবার তা হলে? একটি জাতি যাদের ভাষা, বর্ণ সংস্কৃতি এমনকি ধর্ম এক এবং অভিন্ন, সেই জনগোষ্ঠী একত্রে বাস করে। আবার ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি, ভাষা সব কিছুতেই অমিল সত্ত্বেও একটা জাতি গড়ে উঠতে পারে এবং তারা একসঙ্গে বসবাস করতে পারে।

দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকার সমাজ সত্ত্বেও একত্রে মিলেমিশে বাস করার দক্ষতা অর্জন করতে যে টুলসগুলো ব্যবহার করা হয় কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং যারা এ শিক্ষা গ্রহণ করেন বা করান তারা এ বিষয়টির নাম দিয়েছেন মাল্টিকালচার।

সংজ্ঞানু্যায়ী বর্ণনা দেয়া যত সহজ ততটা সহজ না এর সঠিক তাৎপর্যের ব্যাখ্যা দেয়া। অতীতে আমি লিখেছি মাল্টিকালচারের ওপর। তারপরও আমরা বিষয়টি নিয়ে আবারও আলোচনা করব। তার আগে একটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করবো।

যেমন আমরা অনেক কিছুই পড়ি শিক্ষার শেষ পর্যায় অবধি যা শুধু নেহায়েত পড়ার জন্যই পড়ি। কখনও ভাবি না, আসলে কী দরকার আছে জীবনের অর্ধেক সময় ব্যয় করে নিজে পড়া? আবার অন্যকে পড়িয়ে বাকি সময় পার করা। ইতিহাস, মাল্টিকালচার তার মধ্যে অন্যতম।

আমি মনে করি আমাদের পুঁথিগত শিক্ষাকে নতুন করে শ্রেণিবিভাগ করার সময় এসেছে। মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, গণিত, পদার্থ, বিজ্ঞান, রসায়ন এবং অর্থনীতি ছাড়া বাদ বাকি সব সাবজেক্টকে আলাদা আলাদা ভাবে না রেখে সেগুলোকে ওপরের সাবজেক্টের আওতায় এনে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা প্রয়োজন। তাতে হবে কী জানেন? আমাদের যেমন নৈতিকতা, মানবতা এবং সামাজিকতা বৃদ্ধি পাবে, তেমন করে শিক্ষা গ্রহণে মজা এবং আনন্দ পাওয়া যাবে। সেইসঙ্গে শিক্ষা হবে সু-শিক্ষা।

আসুন আজ ফিরে যাই মাল্টিকালচারের ওপর। ধরুন আমি মস্ত বড় ডাক্তার হব। ডাক্তারি পড়া শেষ করলাম। এখন উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে যেতে হবে, চলে এলাম লন্ডনে। এখানে এসে এদের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট হতে হলে এদের ভাষা, কালচার, খাবার, ইতিহাস থেকে শুরু করে এদের মত করে সুখে হাসতে এবং দুঃখে কাঁদতে শিখতে হবে। তার মানে, হঠাৎ আমাকে আমার ডাক্তারি পেশা বাদ দিয়ে অন্যান্য সাবজেক্ট পড়তে হবে।

কারণ নতুন আরেকটি দেশে খাপ খাইয়ে নিতে হলে তো এসব সম্বন্ধে জানতে হবে। জানতে হলে শিখতে হবে। কিন্তু আমাদের সে সময় ঠিকমতো হয়ে ওঠে না নানা কারণে। যার জন্য ইংল্যান্ডে একটি প্রবাদ বাক্য আছে, যা তারা বলে “once a foreigner always a foreigner.”

একটি নতুন সমাজের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করা বা হারমোনাইজড হতে হলে শুধু ডাক্তার হলে হবে কি? রুগীকে বুঝতে হলে, সে দেশের সবকিছু জানতে হলে অনেক বিষয়ের ওপর ভাল জ্ঞান না থাকলে সে সমাজে কখনও মনপূত জীবন পাওয়া যাবে না।

তাই মনে করি প্রশিক্ষণের ধরণ পাল্টাতে হবে, যদি সত্যিকারের মাল্টিকালচার কেউ পেতে চায়। মাল্টিকালচারের ওপর বহু ডিগ্রিধারী শিক্ষাবিদ রয়েছেন বিশ্বে, তারা এখনও সেই সমাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে উঠতে পারেননি। তাই তারা নিজেরাই পরের দেশে বিদেশি হয়ে আছেন শুধুমাত্র প্রশিক্ষণের গড়মিলের কারণে। অথচ তারা তা জানেন না বরং অভিযোগ করে বলেন, “বিদেশে সবাই রেসিস্ট বা গরিব দেশের মানুষ তাই আমাদেরকে ভালো সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে ইত্যাদি।”

আমরা গ্লোবাল নাগরিক হতে শুরু করেছি। গ্লোবালাইজেশনের ওপর কথা বলছি। কিন্তু পুরোপুরি সেখানে যেতে পারিনি। না পারার কারণ আমাদের শিক্ষার ধরণ। শুধু মাল্টিকালচার পড়লে যেমন এক দেশ থেকে অন্য দেশে খাপ খাইয়ে চলা যাবে না, আবার তাকে বাদ দিয়ে শুধু ডাক্তার হয়ে বিদেশে এসে মনের মতো করে বসবাস করা যাবে না, যাচ্ছে না। যদি শুধু বাংলাদেশিদের নিয়ে ভাবি তবে এতটুকু বলবো, যারা যত বেশি নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে তারা তত বেশি সার্থক।

শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞ হতে দরকার প্রত্যেক বিষয়ের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণের। তাই বলে শুধু শুধু একটি বিষয়ের ওপর নজর দিলে না হবে মঙ্গল নিজের, না হবে উন্নতি সমাজের। আমরা এখন বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী নাগরিক হলেও আমাদের সামাজিকতা, কাজকর্মে আমরা গ্লোবাল নাগরিক। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে গোটা বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা শিখতে হবে। তা না হলে মাল্টিকালচারের সঙ্গে অ্যাডজাষ্ট করতে পারব না। শুধু নামটি গায়ে লাগিয়ে নিজেকে হয়ত দাবি করব আমি “ডক্টর অলি।”

তবে শিক্ষার সফলতা কখনও পাব না। যেমন কালো একটি চশমা পরে বাইরের জগতকে কালার করে দেখা শুধুমাত্র সীমিত বিনোদনের একটি মুহূর্ত। তাকে সর্বক্ষণের জন্য ধরে রাখতে এবং তার বাস্তবায়ন ঘটাতে দরকার বহুবিধ শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো। এই মাল্টিকালচার পেতে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয় বরং “walk as you talk and learn from learners and learn by doing.” একইসঙ্গে জটিলতা দূর করে make a simple life for you and help others to do that.

রহমান মৃধা, দূরপরবাস সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

মাল্টিকালচার কী এবং কেন প্রয়োজন? 

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
১০ জুলাই ২০২০, ০২:৩৩ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

যদি বলি Netherlands is a tolerant rather than multicultural society, কী ধারণা হবে সবার তা হলে? একটি জাতি যাদের ভাষা, বর্ণ সংস্কৃতি এমনকি ধর্ম এক এবং অভিন্ন, সেই জনগোষ্ঠী একত্রে বাস করে। আবার ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি, ভাষা সব কিছুতেই অমিল সত্ত্বেও একটা জাতি গড়ে উঠতে পারে এবং তারা একসঙ্গে বসবাস করতে পারে। 

দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকার সমাজ সত্ত্বেও একত্রে মিলেমিশে বাস করার দক্ষতা অর্জন করতে যে টুলসগুলো ব্যবহার করা হয় কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং যারা এ শিক্ষা গ্রহণ করেন বা করান তারা এ বিষয়টির নাম দিয়েছেন মাল্টিকালচার। 

সংজ্ঞানু্যায়ী বর্ণনা দেয়া যত সহজ ততটা সহজ না এর সঠিক তাৎপর্যের ব্যাখ্যা দেয়া। অতীতে আমি লিখেছি মাল্টিকালচারের ওপর। তারপরও আমরা বিষয়টি নিয়ে আবারও আলোচনা করব। তার আগে একটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করবো।

যেমন আমরা অনেক কিছুই পড়ি শিক্ষার শেষ পর্যায় অবধি যা শুধু নেহায়েত পড়ার জন্যই পড়ি। কখনও ভাবি না, আসলে কী দরকার আছে জীবনের অর্ধেক সময় ব্যয় করে নিজে পড়া? আবার অন্যকে পড়িয়ে বাকি সময় পার করা। ইতিহাস, মাল্টিকালচার তার মধ্যে অন্যতম। 

আমি মনে করি আমাদের পুঁথিগত শিক্ষাকে নতুন করে শ্রেণিবিভাগ করার সময় এসেছে। মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, গণিত, পদার্থ, বিজ্ঞান, রসায়ন এবং অর্থনীতি ছাড়া বাদ বাকি সব সাবজেক্টকে আলাদা আলাদা ভাবে না রেখে সেগুলোকে ওপরের সাবজেক্টের আওতায় এনে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা প্রয়োজন। তাতে হবে কী জানেন? আমাদের যেমন নৈতিকতা, মানবতা এবং সামাজিকতা বৃদ্ধি পাবে, তেমন করে শিক্ষা গ্রহণে মজা এবং আনন্দ পাওয়া যাবে। সেইসঙ্গে শিক্ষা হবে সু-শিক্ষা।

আসুন আজ ফিরে যাই মাল্টিকালচারের ওপর। ধরুন আমি মস্ত বড় ডাক্তার হব। ডাক্তারি পড়া শেষ করলাম। এখন উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে যেতে হবে, চলে এলাম লন্ডনে। এখানে এসে এদের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট হতে হলে এদের ভাষা, কালচার, খাবার, ইতিহাস থেকে শুরু করে এদের মত করে সুখে হাসতে এবং দুঃখে কাঁদতে শিখতে হবে। তার মানে, হঠাৎ আমাকে আমার ডাক্তারি পেশা বাদ দিয়ে অন্যান্য সাবজেক্ট পড়তে হবে। 

কারণ নতুন আরেকটি দেশে খাপ খাইয়ে নিতে হলে তো এসব সম্বন্ধে জানতে হবে। জানতে হলে শিখতে হবে। কিন্তু আমাদের সে সময় ঠিকমতো হয়ে ওঠে না নানা কারণে। যার জন্য ইংল্যান্ডে একটি প্রবাদ বাক্য আছে, যা তারা বলে “once a foreigner always a foreigner.” 

একটি নতুন সমাজের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করা বা হারমোনাইজড হতে হলে শুধু ডাক্তার হলে হবে কি? রুগীকে বুঝতে হলে, সে দেশের সবকিছু জানতে হলে অনেক বিষয়ের ওপর ভাল জ্ঞান না থাকলে সে সমাজে কখনও মনপূত জীবন পাওয়া যাবে না। 

তাই মনে করি প্রশিক্ষণের ধরণ পাল্টাতে হবে, যদি সত্যিকারের মাল্টিকালচার কেউ পেতে চায়। মাল্টিকালচারের ওপর বহু ডিগ্রিধারী শিক্ষাবিদ রয়েছেন বিশ্বে, তারা এখনও সেই সমাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে উঠতে পারেননি। তাই তারা নিজেরাই পরের দেশে বিদেশি হয়ে আছেন শুধুমাত্র প্রশিক্ষণের গড়মিলের কারণে। অথচ তারা তা জানেন না বরং অভিযোগ করে বলেন, “বিদেশে সবাই রেসিস্ট বা গরিব দেশের মানুষ তাই আমাদেরকে ভালো সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে ইত্যাদি।” 

আমরা গ্লোবাল নাগরিক হতে শুরু করেছি। গ্লোবালাইজেশনের ওপর কথা বলছি। কিন্তু পুরোপুরি সেখানে যেতে পারিনি। না পারার কারণ আমাদের শিক্ষার ধরণ। শুধু মাল্টিকালচার পড়লে যেমন এক দেশ থেকে অন্য দেশে খাপ খাইয়ে চলা যাবে না, আবার তাকে বাদ দিয়ে শুধু ডাক্তার হয়ে বিদেশে এসে মনের মতো করে বসবাস করা যাবে না, যাচ্ছে না। যদি শুধু বাংলাদেশিদের নিয়ে ভাবি তবে এতটুকু বলবো, যারা যত বেশি নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে তারা তত বেশি সার্থক। 

শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞ হতে দরকার প্রত্যেক বিষয়ের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণের। তাই বলে শুধু শুধু একটি বিষয়ের ওপর নজর দিলে না হবে মঙ্গল নিজের, না হবে উন্নতি সমাজের। আমরা এখন বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী নাগরিক হলেও আমাদের সামাজিকতা, কাজকর্মে আমরা গ্লোবাল নাগরিক। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে গোটা বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা শিখতে হবে। তা না হলে মাল্টিকালচারের সঙ্গে অ্যাডজাষ্ট করতে পারব না। শুধু নামটি গায়ে লাগিয়ে নিজেকে হয়ত দাবি করব আমি “ডক্টর অলি।”  

তবে শিক্ষার সফলতা কখনও পাব না। যেমন কালো একটি চশমা পরে বাইরের জগতকে কালার করে দেখা শুধুমাত্র সীমিত বিনোদনের একটি মুহূর্ত। তাকে সর্বক্ষণের জন্য ধরে রাখতে এবং তার বাস্তবায়ন ঘটাতে দরকার বহুবিধ শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো। এই মাল্টিকালচার পেতে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয় বরং “walk as you talk and learn from learners and learn by doing.” একইসঙ্গে জটিলতা দূর করে make a simple life for you and help others to do that.

রহমান মৃধা, দূরপরবাস সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
 

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম