পৃথিবীতে আনন্দ বলে কিছু নেই

  রাজুব ভৌমিক, নিউইয়র্ক থেকে ১১ জুলাই ২০২০, ১৫:২৮:০৬ | অনলাইন সংস্করণ

অনেকের ধারণা মানুষের জীবনটা শুধু আনন্দ ও কষ্টের সমষ্টি। প্রকৃতপক্ষে তা কিন্তু নয়। মানুষের জীবন শুধু কষ্টের হয়। মানুষের জীবনে আসলে আনন্দ বলে কিছু নেই। আমরা যাকে আনন্দ বলে জানি আসলে সেটা হচ্ছে কষ্টের আরেক রূপ মাত্র। আনন্দ কষ্টের হয় এবং কষ্টেই আনন্দ নিহিত।

এবার বুঝিয়ে বলছি। এই সংসার বা পৃথিবী একটি কারাগার মাত্র। এই সংসারে মানুষের জন্ম হয় শুধু শাস্তি ভোগ করার জন্য এবং সে শাস্তি ভোগ সম্পন্ন হলে সঙ্গে সঙ্গে মানুষ এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। কোথায় চলে যায় তা নিয়ে আছে বহু বিতর্ক। তাই সেদিকে নাইবা গেলাম।

কিছু মানুষ জন্ম হবার পরেই মারা যায় আবার কিছু মানুষ শত বছর ধরে বাঁচে। কিছু মানুষ দুর্ঘটনা বা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় আবার কিছু মানুষ ঘুমের মধ্যে। যার শাস্তির ধরন যেমন হয় আর কি! তবে এই সংসার থেকে যে যত আগে মুক্তি পাবে ততই তার জন্য মঙ্গলকর। বেশিদিন বেঁচে থাকার মাঝে আহামরি কিছু নেই বরং এতে শুধু তার কষ্ট দীর্ঘায়ত হয়।

আমরা সবাই জানি, এই পৃথিবীতে কেউ অপরাধ করলে তার অপরাধ অনুযায়ী সাজা হয় এবং জেল খাটে। তখন কেউ প্যারোলে মুক্তি পায়, কেউ জামিন নেয়, আবার কেউবা লাশ হয়ে মুক্তি পায়। আমরা যখন কারাভোগ শেষ করি তখন আমাদের নিজস্ব বাড়িতে ফিরে যেতে হয়। কারণ জেলখানাটি আমাদের নিজস্ব স্থান নয়।

তেমনি এই পৃথিবী নামক কারাগার থেকে একদিন সবাই ছাড়া পাবে। এই পৃথিবীর বাইরে বহুদূরে আমাদের একটি বাড়ি আছে, যেখানে আমাদের সবাইকে একদিন ফিরে যেতে হবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু ভ্রমে বশীভূত হয়ে কিছু মানুষ পৃথিবী নামক জেলখানাকে তাদের স্থায়ী গন্তব্য মনে করে। যা আমরা সকলে জানি এটা সত্য নয়। আমাদের আসল বাড়ি বা রাজ্য যেখানে সেখানে সবাই একদিন ফিরে যেতে হবে।

এদিকে পৃথিবীতে মানুষের তৈরি করা জেলখানাতে বহু কয়েদি জেলখানার ভিতরে ইচ্ছে করে অপরাধ করে, যাতে তাদের সাজার মেয়াদ বৃদ্ধি পায়। কারণ তারা যে জেলখানার ভিতরের পরিবেশ ছাড়া আর কিছু জানে না। জেলখানাকে তারা সর্বস্ব মনে করে। তেমনি আমার নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও বহু রক্তারক্তি এবং হিংস্র কাজ করে বিশাল দালান কোঠা গড়ি এবং নিজেদের অমর ভাবতে শুরু করি।

এবার ভাবুন, পৃথিবীটা যদি একটি জেলখানাই হয় তাহলে তাতে আনন্দ মিলে কিভাবে? যেমন হিমালয়ে পর্বতে বসে সূর্যের তাপ অনুভব করা যায় না, তেমনি জেলখানায়ও আনন্দ বোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আপনি যদি নানা ধরনের গরম পোশাক পরে হিমালয় পর্বতে উঠে বসেন, তাহলে গরম পোশাকের কারণে শরীরে একটু গরম অনুভূত হতে পারে। তাই বলে হিমালয় পর্বতের চূড়াতে উষ্মতা আছে বলে ধারণা করাটা উচিত নয়। ঠিক তেমনি জেলখানাতে সাময়িক কষ্ট শিথিল হয়ে এতে আনন্দ আছে বলে ধারণা করাটা উচিত নয়।

কোন অপরাধ করে যদি আপনার যাবজ্জীবন সাজা হয়, তখন জেলখানায় গিয়ে প্রথমে আপনার মন ভীষণ খারাপ হবে। যেমনটি মানুষের পৃথিবীতে জন্ম নেয়ার পরে হয়ে থাকে। সেজন্য প্রত্যেক মানুষ পৃথিবীতে জন্ম নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ কান্না করতে থাকে। এই রকম সে প্রথমদিকে বছরের পর বছর কাঁদতে থাকে। জেলখানার সেন্ট্রির মত তার পিতা-মাতাও অনেক সময় বুঝতে পারে না কেন সে কাঁদছে।

কিন্তু কয়েক বছর পর সে কাঁদা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। কারণ সে ততক্ষণে নিজেকে এই সংসারে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে, যেমনি একজন কয়েদি প্রথমে কয়েক বছর বহু কষ্টে জেল খাটার পর নিজেকে তার জেলখানার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। তার মানে এই নয় যে, জেলখানায় তার কষ্টের লাঘব হয়েছে। কষ্ট চিরন্তন সত্য।

এদিকে জেলখানার খাবার এবং থাকার ভাগ্য জেলখানার প্রধানের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। যেমনটি হয় সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় মানুষের এই সংসারে। একটি জেলখানাতে কোন কয়েদি আনন্দে থাকতে পারে না। তাহলে কিভাবে মানুষ এই সংসারে আনন্দে থাকবে। পৃথিবী যে জেলখানার সমতুল্য। তবে হ্যাঁ, মাঝে মাঝে জেলখানাতে কয়েদির কষ্ট কিছুটা কম হয় যেটা সে ভুলে আনন্দ মনে করে।

যেমন মাঝে মাঝে জেলখানায় ভাল ভাল খাবার দেয়া হয়। এতে কয়েদিরা খুব খুশি হয় এবং প্রচুর আনন্দ পায়। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন, আসলে কি সেটা আনন্দ? কয়েদিরা কিছু মূহুর্ত খাবারের লোভে তাদের কষ্ট কিছুটা শিথিল হয়ে যায়। আর সাময়িক কষ্ট শিথিল হয়ে যাওয়া কিন্তু আনন্দ হয়। সেটা কষ্টের শিথিলরূপ মাত্র।

এই পৃথিবীতে প্রকৃতপক্ষে আমরা সবাই দু:খি। কিন্তু মানুষ প্রতিনিয়ত ইন্দ্রিয় সুখের লোভে তাদের কষ্টগুলোকে সাময়িকভাবে লাঘব করে রাখার চেষ্টা করে। যাকে আমরা ভুলবশত আনন্দ বলে থাকি। কিন্তু তারা জানে না যে জেলখানায় বসে আনন্দ পাওয়া যায় না, শুধু চলে মুক্তির দীর্ঘ অপেক্ষা।

লেখক: ড. রাজুব ভৌমিক, পুলিশ অফিসার, নিউইয়র্ক পুলিশ

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত