পরিবেশ রক্ষায় আমরা কী করছি?

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৫ জুলাই ২০২০, ১৯:১৩:২৬ | অনলাইন সংস্করণ

যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজনও বদলেছে। সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বেড়েছে বহু গুণে। বেড়েছে সব কিছুর চাহিদাও। এ কথা সবারই জানা যে মানুষের সব প্রয়োজন মেটানোর উৎস প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রকৃতি। কিন্তু শিল্প বিপ্লবের কারণে মানুষের চাহিদার আমূল বদল হয়েছে, যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে পরিবেশের ওপর।

কারখানায় প্রস্তুত হয় মানুষের নিত্যদিনের সামগ্রী। সেই কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশন না করে সর্বত্রই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যা পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে মাটি এবং সাগরে। আবার সেই বর্জ্য পুড়িয়ে ক্ষতিকর ধোঁয়া বাতাসেও ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। খাদ্য উৎপাদন সুবিধার জন্য যে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হচ্ছে তা মাটির ক্ষতি করছে। এভাবে পরিবেশের প্রত্যেকটি উপাদান দূষিত হচ্ছে মানুষের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে।

এমতাবস্থায় গোটা বিশ্বের মানুষ কম বেশি বিষয়টি নিয়ে ভাবছে। সুইডেন অন্যান্য দেশের চেয়ে একটু বেশি সচেতন বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, তার প্রমাণ গ্রেটা তুনবার্গ। কয়েক মাস ধরে সুইডেনের সব দোকানে প্লাস্টিক ব্যাগের দাম দুই ক্রোনার থেকে সাত ক্রোনার হয়েছে। কাগজের ব্যাগের দাম পলিথিনের তুলনায় কিছুটা কম।

বাসা থেকে ব্যাগ না নিয়ে দোকানে গেলেই একটি ব্যাগের জন্য ৭ ক্রোনার দিতে হয়। আজ ব্যাগ নিতে ভুলে গেছি। একটি ব্যাগ কিনতেই অল্প বয়সী ক্যাশিয়ার বললো, “পরিবেশের কথা ভাব, আর কতদিন পৃথিবীর পরিবেশ ধ্বংস করবে?”

বললাম আজ ব্যাগ আনতে ভুলে গেছি, সরি। সে বকবক করে এক গাদা শক্ত কথা শুনিয়ে দিল। এমনকি কোন এক সময় বলে ফেললো, তোমরা যারা অন্যদেশ থেকে এসেছো পরিবেশের ওপর তোমাদের কোন রকম রেসপেক্ট নাই। এতক্ষণ মেজাজটা ঠিক ছিল তবে শেষের কথাগুলো বলতেই একটু চোটে গেলাম। দোকানে ভিড় কম মেয়েটিকে একেক করে বলতে শুরু করলাম।

এই মেয়ে শোন, আমাদের বাড়িতে মা কাঠ দিয়ে রান্না করতেন ছোট বেলায়। সেই রান্না করতে যে কাঠ ব্যবহৃত হতো তার অবশিষ্ট যে কয়লা বা ছাই থাকত তা দিয়ে বাড়িতে কাজের লোক থালা বাসুন পরিষ্কার করেছে। কাঠের কয়লা, গাছের ডাল এসব দিয়ে দাঁত ব্রাশ করছি। কাপড় পরিষ্কার করতে ছাই ব্যবহার করতাম। হেঁটে হেঁটে স্কুলে গিয়েছি, গাড়ি বা মটর চালিয়ে না।

টিভি, কম্পিউটার, কেমিক্যাল জিনিসের ব্যবহার খুব কম করেছি। মাঠে গরু দিয়ে চাষ করেছি, কখনও মেশিন ব্যবহার করিনি। ভেবে দেখো আমি যেভাবে আমার জীবনের কুড়িটি বছর কাটিয়েছি আর তোমার জীবনের কুড়িটি বছর কীভাবে কেটেছে? যেমন তোমার জন্মের শুরুতে তুমি ডায়াপার ব্যবহার করা থেকে শুরু করে সকল ধরনের বিলাসিতায় বড় হয়েছো। যার পেছনে জান কী পরিমাণ কেমিক্যাল ব্যবহার হয়েছে? এখন বলো কে পরিবেশ নষ্ট করেছে, আমি না তুমি?

আমার কথা চলাকালীন বেশ কিছু লোক জড় হয়ে শুনছে। পরে আমাকে অনুরোধ করেছে আমি যেন সুইডিশ নিউজ পেপারে ঘটনাটি তুলে ধরি। তাদের অনুরোধ রাখতে সবে সুইডিশ ভাষায় লিখাটি শেষ করেছি। ভাবলাম বাংলাতেও বিষয়টি তুলে ধরি, তাই এ লিখা। উপরের ঘটনাটির পেছনে যে বিষয়টি জড়িত তা হলো পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশ।

সে আবার কী এবং উপরের ঘটনার সঙ্গে পৃথিবীর পরিবেশেরই বা কী সম্পর্ক? আসুন তাহলে জেনে নেই এ বিষয়ের ওপর কিছু তথ্য। পরিবেশের প্রতিটা উপাদানের সু-সমন্বিত রূপই হলো সুস্থ পরিবেশ। এই সু-সমন্বিত রূপের ব্যত্যয়ই পরিবেশের দূষণ ঘটায়। যার কারণে পরিবেশের স্বাভাবিক মাত্রার অবক্ষয় দেখা দেয়।

পরিবেশ বিভিন্ন কারণে দূষিত হতে পারে। প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কারণও এর জন্য দায়ী। পরিবেশ দূষণের জন্য বিশেষভাবে দায়ী কিছু মারাত্মক রাসায়নিক দ্রব্য যে গুলোকে আমরা “ডার্টি ডজন” বলি।

এই ১২টি রাসায়নিক দ্রব্যের মধ্যে ৮টি কীটনাশক যেমন অলড্রিন (aldrin), ডায়েলড্রিন (dieldrin), ক্লোরডেন (chlordane), এনড্রিন (endrin), হেপ্টাক্লোর (heptachlor), ডিডিটি (DDT), মিরেক্স (mirex), এবং টক্সাফেন (toxaphene)।

দুটি শিল্পজাত রাসায়নিক দ্রব্য যেমন পিসিবি (PCBs), হেক্সাক্লোরোবেনজিন (hexachlorobenzene)। আর অন্য দুটো হলো কারখানায় উৎপাদিত অনাকাঙ্ক্ষিত উপজাত যেমন ডাইওক্সিন (dioxin) এবং ফিউরান (furan)।

খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে পৃথিবীব্যাপী সব পরিবেশের সব ধরনের জীবজন্তুর ওপর তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটায় এই বিষাক্ত পদার্থগুলো। ত্রুটিপূর্ণ শিশুর জন্ম, ক্যান্সার উৎপাদন, ভ্রূণ বিকাশের নানাবিধ সমস্যার মূলেই দায়ী থাকে এই ডার্টি ডজন।

পরিবেশের ভালো মন্দ মানুষের কৃতকর্মের ফল। দিন দিন পরিবেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। মানুষ নিষ্ঠুরভাবে প্রকৃতি পরিবেশকে বিনাশ করছে। প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এই যে নির্বিচারে আমরা সৃষ্টিকর্তার সাজানো প্রকৃতির বিনাশ করছি, এতে চূড়ান্ত ভুক্তভোগী কে হচ্ছে?

বিভিন্ন প্রাণীসহ মানুষ প্রকৃতির রোষানলে পড়ছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য ব্যাহত হচ্ছে। আমরা পরিবেশ দূষণ করছি হরদম। পানি দূষণ, বায়ু দূষণ, মাটি দূষণ, শব্দ দূষণ, চারদিকে দূষণ আর দূষণ।

শুনতে খারাপ লাগলেও বলতে হচ্ছে, পরিবেশ দূষণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের চরিত্রও দূষিত হয়ে যাচ্ছে। সংখ্যায় মানুষ যেভাবে বাড়ছে, ভালো মানুষ সেভাবে বাড়ছে কি? মানুষ মানুষের ক্ষতি করছে। হত্যা, গুম, ধর্ষণ, দুর্নীতি, ঘুষ, অপসংস্কৃতি, মারামারি ইত্যাদি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। মানুষ যেন অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। যতসব অকল্যাণ, অন্যায় কর্ম সৃষ্টি হচ্ছে সবগুলোর জন্য দায়ী মানুষ।

পরিবেশের দূষিত উপাদান আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। সাগরের পানি দূষিত হওয়ায় বিপন্ন অনেক জলজ জীবন। সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে মৌমাছির সংখ্যা কমছে আশঙ্কাজনক হারে। পরাগায়নের মাধ্যমে আমাদের বিপুল পরিমাণ খাদ্য উৎপাদনে মৌমাছির বিকল্প নেই। তাদের এই দুরবস্থা আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।

আমরা যদি আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে সচেতন না হই, তাহলে আমরা বেশি দিন পৃথিবীতে টিকতে পারব না। আমাদের কু-কর্মের কারণে আমাদের ধ্বংস হবে। পরিবেশ বাঁচানোর প্রথম পদক্ষেপ আমাদেরকেই নিতে হবে। জীবনধারায় পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দূষণের মাত্রা আরও কমবে।

যেমন প্লাস্টিকের উৎপাদন বন্ধ করতে হবে এবং সেইসঙ্গে তার ব্যবহারও। নতুন প্রজন্ম বেশ ভাবতে শিখেছে যদিও তারাই কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবেশ নষ্টের জন্য দায়ী যা তারা সরাসরি বুঝতে পারছে না।

পৃথিবীকে সুন্দর পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখতে সবাইকে যার যার জায়গা থেকে কাজ করতে হবে। তাহলেই আমরা আমাদের অস্তিত্ব আরও অনেক বছরের জন্য নিশ্চিত করতে পারব। এখানে আমরা বলতে শুধু সুইডেনকে বুঝলে হবে কি? বাংলাদেশের মানুষ এবং সরকারের কি করণীয় রয়েছে এবং কী প্লান হাতে নেয়া হয়েছে সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে?

প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সামাজিক পরিবেশ আজ মানুষের দিকে তাকিয়ে আছে। দুই পরিবেশকেই সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখতে সচেতন ভালো মানুষের কোন বিকল্প নেই। নিজেদের ভালো রাখার জন্য চলুন প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি করি, পরিবেশ সুরক্ষা করি।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত