সুইডেনের বৃদ্ধাশ্রমে লোমহর্ষক ঘটনার সাক্ষী আমি

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২২ জুলাই ২০২০, ২৩:৫৬:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

সন্তানের অবহেলার কারণে শেষ বয়সে বৃদ্ধাশ্রমে এসেছেন স্বামী-স্ত্রী। প্রতীকী ছবি

আমার সুইডেনে প্রথম বছরে সামার জবের একটি স্মরণীয় ঘটনা হৃদয়ে গেঁথে আছে আজও। সেটি ঘটেছিল সুইডেনের একটি বৃদ্ধাশ্রমে। সাইমোন এবং সারা অবসরপ্রাপ্ত সুইডিশ নাগরিক, থাকতেন সেই বৃদ্ধাশ্রমে। দুইজনেরই বয়স ৭০ প্লাস। আমার বিশ্ববিদ্যালয় সামারে তিন মাস ছুটি। স্টকহোমে এসেছি সামার জব করতে। বৃদ্ধাশ্রমে কাজ পেয়েছি।

এখানে বৃদ্ধদের দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করাই ছিল আমার কাজ। হুইল চেয়ারে করে তাদেরকে নিয়ে পার্কে ঘোরাঘুরি করা ছিল কাজের একটি অংশ। বৃদ্ধদের সঙ্গে নানা বিষয়ের ওপর কথা বলা ছিল আমার সুইডিশ ভাষা শেখার একটি ভালো সুযোগ। এদের সামাজিক এবং মানসিক দিকগুলো জানার এক অপূর্ব সুযোগ পেয়েছি তখন।

সাইমোন এবং সারা প্রায় ৫০ বছর এক সঙ্গে বিবাহিত জীবন পার করে আসছে। তাদের এক ছেলে নাম আন্দেস, চাকরি করে স্টকহোমের বাইরে। বাবা-মার সঙ্গে খুব একটা দেখা হয় না। সাইমোন এবং সারা প্রায়ই তাদের ছেলের ব্যাপারে আমার সঙ্গে আলোচনা করে। সবে বাংলাদেশ থেকে এসেছি, তাই তাদের ছেলের প্রতি দরদ দেখে নিজের পরিবারের কথা মনে পড়ত।

প্রতিদিন ঘুমানোর সময় সাইমোন এবং সারার নানা ধরণের ওষুধ খাওয়ানো ছিল আমার কাজের আরও একটি অংশ। আমি প্রায়ই খেয়াল করেছি তারা আমাকে বলত, রহমান তুমি চলে যাও, আমরা পরে ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব। আমি কখনও তাদের কাজ কর্মে কোন রকম সন্দেহ করিনি, তারপরও আমার বসকে একদিন বিষয়টি বললাম।

বস বলল, ‘ঠিক আছে তারা যদি নিজেরা ওষুধ খেতে ভুলে না যায় তাহলে সমস্যা নেই। কিন্তু তুমি দেখো তারা যদি ভুল করে ওষুধ সেবন না করে তবে অবশ্যই তুমি ওষুধ খাইয়ে তবে বাসায় যাবে।’ আমি কখনও দেখিনি তারা ওষুধ খেতে ভুলেছে বা টেবিলে রেখে দেয়া ওষুধ টেবিলেই রয়ে গেছে।

সাইমোন এবং সারাকে সবাই পছন্দ করে। আমি প্রায় দুইমাসের বেশি কাজ করছি। তাই সবার সঙ্গে একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। হঠাৎ একদিন সকালে এসে সাইমোন এবং সারার রুমে নক করছি কিন্তু তারা দরজা খুলছে না। কী করি? অতিরিক্ত চাবি এনে ঘর খুলে দেখি সাইমোন এবং সারা দুজনে দুজনার হাতে হাত রেখে চিরনিদ্রায় শায়িত।

কী ব্যাপার? কী হয়েছে? কেউ কিছু বলতে পারছে না। ডাক্তার এবং পুলিশ এসে তদন্ত শুরু করল, আমাকেও হাজারটা প্রশ্ন করল। আমি যা জানি তাই বললাম। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেল ওভারডোজ ওষুধ খেয়ে তারা মারা গেছে। কিন্তু এত ওষুধ পেল কী করে? তদন্তে জানা গেল মাসের পর মাস ওষুধ জমা করে এক সঙ্গে সব ওষুধ খেয়ে তারা মারা গেছে।

আমিসহ যারা সাইমোন এবং সারাকে সাহায্য করি, আমাদের কাজ তাদের সেবা করা এবং তাদের আদেশ মেনে চলা। যেহেতু দুজনই সুস্থ্য মস্তিষ্কের অধিকারী তাই আমাদের কারও কোন সন্দেহ ছিল না। তারপরও দুজনের মৃত্যুর কারণে বৃদ্ধাশ্রমে তখন থেকে কিছু নতুন নিয়ম চালু করা হয়। তার মধ্যে একটি হলো ওষুধ সেবনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরাসরি সাহায্য করা। হঠাৎ এত বছর পরে সেদিনের সেই ঘটনা আজ মনে পড়ে গেল।

আজ সুইডিশ টেলিভিশনে একটি খবর তুলে ধরেছে। বিশ্বের অনেক দেশে যদি কেউ কঠিন অসুখে ভোগা অবস্থায় বেঁচে থাকতে না চায়, তবে কিছু পেশাদার ডাক্তার তাদের মরতে সাহায্য করে ওষুধ দিয়ে। সুইজারল্যান্ড তার মধ্যে অন্যতম। এ বছরের প্রথম দিকে সুইডেনের একজন এএলএস রোগী মৃত্যুবরণ করতে সুইজারল্যান্ডের একজন ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

সবকিছু ঠিকঠাক এমন সময় কোভিড-১৯ এসে সব এলোমেলো করে দেয়। এএলএস (অ্যামাইটোট্রপিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস) বা লৌ গেহরিগ রোগ নামেও পরিচিত। এটি একটি নিউরোলজিক্যাল বা স্নায়ুর রোগ। এটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খারাপ হয় এবং আরও বেশি কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। এই রোগটি অক্ষমতা সৃষ্টি করে, কারণ এটি নার্ভের কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়।

সামান্য উপসর্গের সঙ্গে রোগটি শুরু হয়। যেমন হাঁটা চলা এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের অক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে এটি বাড়তে থাকে। সুইডিশ এই রোগী ভুগেভুগে জ্বালা যন্ত্রণার মধ্যে বেঁচে থাকতে চায় না। সুইডেন তাদের মোড়াল ও এথিকসের বিষয়টি মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা কাউকে মরতে সাহায্য করবে না, যার কারণে সুইডেন থেকে এই এএলএস রোগী দেশের বাইরে গিয়ে মরবে বলে প্লান করেছিল।

গত কয়েকদিন আগে সুইডেনের একজন অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার সুইডিশ নিয়ম ভঙ্গ করে সেই এএলএস রোগীকে মরতে সাহায্য করে। অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার মনে করেন, যদি কেউ স্বেচ্ছায় তার নিজ জীবন নিতে চায় তবে কেন তাকে বাঁধা দিতে হবে? কষ্টে বেঁচে থাকার চেয়ে যদি কেউ মরতে চায় তবে পেশাদার ডাক্তারের সে ব্যাপারে সাহায্য করা উচিত।

বিষয়টি নিয়ে সুইডেনে বেশ তোলপাড় হয়েছে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত সুইডিশ পার্লামেন্ট কী সিদ্ধান্তে আসে এবং অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার কী সাজা পায়! ডাক্তারের ডাক্তারি লাইসেন্স বাতিল হবে নাকি জেল-জরিমানা হবে সেটি দেখার বিষয়।

অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষের চিন্তা সুইডেনও কি তাহলে স্বেচ্ছায় রোগী মরতে আইন পরিবর্তন করবে? ঘটনাটি শেষ দেখার আশায় সবাই। আজ থেকে প্রায় ৩৬ বছর আগে সাইমোন এবং সারা নিজেদের দায়িত্বে সবার অজান্তে মৃত্যুবরণ করা সত্ত্বেও সুইডিশ জাতি আইন চেঞ্জ করেনি, দেখি এবার কী হয়।

মানুষ জাতির মৃত্যুর পেছনে সব সময় একটি কারণ থাকে। এখন যদি কেউ মৃত্যুশয্যায় মরে বেঁচে থাকতে না চায় সেক্ষেত্রে বিষয়টি নতুন করে ভাববার বিষয় হতে পারে। তবে যারা ধর্মে বিশ্বাসী তারা জানেন, নিজের প্রাণ নিজে নেয়া মহাপাপ।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত