নতুন কিছু আবিষ্কারের সময় এসেছে

প্রযুক্তির যুগ হয়তো শেষের পথে!

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৪ আগস্ট ২০২০, ১৩:৩০:৫২ | অনলাইন সংস্করণ

এত সুন্দর করে বড় বড় নামীদামী শপিং মল তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়। কী হবে সেগুলোর যখন সবকিছু কেনাবেচা চলছে অনলাইনে। লকডাউনের কারণে আমরা ঘরে বসে অর্ডার দিলেই সব হুড় হুড় করে চলে আসছে দরজার সামনে।

অফিস আদালত বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না গিয়ে আমরা জুমের মাধ্যমে ফোনালাপ, ভিডিওর মাধ্যমে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের সমস্যার সমাধান করছি। সব কিছুই ম্যানেজ হয়ে যাচ্ছে ফিজিক্যাল মুভমেন্ট ছাড়াই। তাহলে এত যুগ ধরে এত কিছু তৈরি করা হলো, সব কিছু কি তাহলে পড়ে থাকবে, নাকি এটাই “নিউ নরমাল”?

২০২০ সালে কোভিড-১৯ এর কারণে পৃথিবী লকডাউন থেকে শুরু করে সাটডাউন হয়েছে। বর্তমানে সবকিছু চলছে স্লোডাউনের ওপর। বাংলাদেশে ঢাকার বাজারগুলোতে আগের মতো ভীড় নেই, কারও তাড়াহুড়ো নেই বাজারে গিয়ে বাজার করার। দরজায় এসে দেশের সেই সাধারণ মানুষগুলোই যার যা দরকার সেগুলো পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে।

এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্যদ্রব্য মজুদ আছে বিধায় কেনাকাটা করতে শপিং মল, বাজার বা দেশ-বিদেশে যাবার দরকার পড়ছে না। ঘরে বসেই অনলাইনে যা পছন্দের তাই কেনা সম্ভব হচ্ছে। করোনার কারণে এখন বড়লোক লকডাউনে ঘরে বসে সব অর্ডার করছে। অন্যদিকে বিশ্বের সাধারণ মেহনতি মানুষ সেটা দরজায় পৌঁছে দিচ্ছে। এতে করে নতুন চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে সবার মাথায় তা হলো অনলাইন বিজনেস।

কোনো কোনো দেশ যেমন জাপান শুরু করেছে মানুষের পরিবর্তে রোবটের ব্যবহার। কারণ বেচারা গরিবদের যদি করোনায় আক্রমণ করে তাহলে কে পণ্যদ্রব্য বড় লোকদের দরজায় পৌঁছে দিবে? সমস্যা এসেছে আর মানুষ তার সমাধান করছে, দারুণ।

এখন যদি পণ্যদ্রব্য শেষ হয়ে যায় বা মজুদ না থাকে তবে তো তা উৎপাদন করতে হবে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস সেক্টর বিশ্বের মানুষের চাহিদানুযায়ী নানা ডিজাইনের পোশাক তৈরি করে আসছে কয়েক যুগ ধরে। এখন অনলাইনে অর্ডার দিয়ে কিনতে হলে তো তা তৈরি করতে হবে। সেটাও না হয় রোবট দিয়ে তৈরি করা সম্ভব হবে।

নানা ধরণের পোশাক তৈরি করতে দরকার র ম্যাটেরিয়ালসের এবং তার জন্য কৃষি কাজে লোকের দরকার। তাও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি এবং রোবট দিয়ে ম্যানেজ করা সম্ভব হচ্ছে। আবার রোবট তৈরি করতে রোবট কাজে লাগছে।

এখন প্রশ্ন তাহলে অভাগা মানুষ জাতি, আমাদের হবে কী? আমরা কী করবো? ঘরে শুয়ে বসে সময় কাটাবো আর অনলাইনে সব কিছু অর্ডার দিবো? বাইরে গিয়ে পার্কে ঘুরতে পারবো না। মলে গিয়ে শপিং করতে পারবো না। গাড়িতে করে কোথাও যেতে পারবো না। প্লেনে করে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে সুন্দর পৃথিবীকে দেখতে পারবো না। সাগরে হই হুল্লোড় করতে পারবো না। স্ত্রী বা বান্ধবীর হাত ধরে ঘুরতে পারবো না। এ কেমন অবিচার? এত সুন্দর পৃথিবী হঠাৎ অনলাইনে ঢুকে গেল? ভাবনার বিষয়!

এদিকে অতীতের মত দুর্নীতিও করা সম্ভব হবে না। কারণ অনলাইনে কার্ড দিয়ে পে করতে হয়, ক্যাশ টাকার ব্যবহার কমতে শুরু করেছে। আমি দুই বছর আগে লিখেছিলাম দুর্নীতিমুক্ত সমাজ পেতে কাগজের টাকা বন্ধ করতে হবে। অনেকেই বিষয়টি পছন্দ করেনি তখন। কিন্তু এখন কী হবে? কী করা যেতে পারে অনলাইন থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করতে হলে?

বাংলায় একটি প্রবাদবাক্য ছোটবেলায় গ্রামে শুনেছি “ছ্যাপ দিয়ে কাশ ঢাকা।” আমার মনে হচ্ছে আমরা একটি সমস্যাকে আরেকটি সমস্যা দিয়ে ম্যানেজ করে চলছি মাত্র।
এখন লকডাউন বা স্লোডাউনে না থেকে দ্রুতগতিতে বিশ্বের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে চলতে শুরু করতে হবে।

আকাশে পাখি উড়তে দেখে যেমন একদিন রাইট ব্রাদার্সদের মনে ভাবনা এসেছিল কীভাবে মানুষও আকাশে উড়তে পারে। সেই ভাবনাকে তারা বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছিল। কোভিড-১৯ আমাদের চাপ সৃষ্টি করছে নতুন করে ভাবতে। কেন যেন মনে হচ্ছে প্রযুক্তির যুগ হয়তো শেষের পথে এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের সময় এসেছে।

প্রযুক্তিগত সমাধান বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে পোশাকশিল্পও। সেক্ষেত্রে ব্যবসায়ের সফলতা ধরে রাখার জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক পটভূমি তৈরি অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

কোভিড-১৯ এ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন হলো দুটি প্রধান শক্তি, যা বাংলাদেশের পোশাক খাতের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। এতদিন ধরে যে প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি অনুযায়ী বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে পরিচালনা করা হয়েছে, ভবিষ্যতে একইভাবে কার্যক্রমগুলো চালিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ব্যবসায়িক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নতুন পন্থার উদ্ভাবন করতে হবে।

উৎপাদন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন, উৎপাদনের অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠা, সরবরাহের ক্ষেত্রে বিলম্ব দূর করা, সামগ্রিক ব্যয় হ্রাস এবং গুণগত মান উন্নয়নের দিকে কড়া নজর দিতে হবে।
যেকোনো কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে ধারাবাহিকভাবে ক্রেতাদের প্রত্যাশা পূরণের সক্ষমতার ওপর।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত মূলত বড় ধরনের রপ্তানিনির্ভর শিল্প। এর গ্রাহকদের একটি বড় অংশই খুচরা বিক্রেতা। এদের বেশির ভাগই ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। এর পাশাপাশি লাতিন আমেরিকা এবং অতি সম্প্রতি তৈরি হওয়া বেশ কিছু উদীয়মান বাজারগুলোয় বৃহত্তর রিটেইল চেইনের মাধ্যমে তাদের পণ্য বিক্রি করছে।

সেক্ষেত্রে সেরা সব সরঞ্জাম যেমন কাইজেন, লিন, সিক্স সিগমা, টোটাল প্রোডাক্টিভিটি ম্যানেজমেন্ট (টিপিএম), থিওরি অব কনস্ট্রেইন্টস (টিওসি), অ্যাডজাস্ট-ইন-টাইম (এআইটি) পদ্ধতিগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পকারখানার উৎপাদনের মান আরও উন্নত করা দরকার।

অনেকে বলবে করোনার ভ্যাকসিন এলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। নতুন করে করোনার চেয়ে ভয়ঙ্কর কিছু যে আসবে না তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? সমস্যা জীবনে আসবে তার সমাধান এবং তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সু-শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস এবং দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

আমি মনে করি শুধু পোশাকশিল্প, রোবট বা অনলাইন বিজনেস নয়; প্রযুক্তি যেন আরও ভালো তথ্য ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারে তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। জাগো বাংলাদেশ জাগো, নতুন করে ভাবো।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত