নতুন প্রজন্মের শিক্ষাঘরের এ কী হাল!
jugantor
নতুন প্রজন্মের শিক্ষাঘরের এ কী হাল!

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

১৯ আগস্ট ২০২০, ১৩:৩২:৩৩  |  অনলাইন সংস্করণ

উপরের যে ছবিটি দেখছেন সেটা সুইমিং পুল নয়, সুইমিং সেন্টারও নয়, নয় কারও পড়ে থাকা বসতবাড়ি। ওটা নতুন প্রজন্মের শিক্ষাঘর। ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আসে আবার সূর্যাস্ত গেলে সেখান থেকে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যায়।

সারা দিন কঠিন পরিশ্রম করে যখন রাতে ঘুমোয় তখন স্বপ্ন দেখে সকাল হলে তারা স্কুলের সামনের খেলার মাঠটিতে খেলবে। কারণ রাত পোহালেই আর পানি জমে থাকবে না। আর মশামাছির অত্যাচার শ্রেণী কক্ষে দেখা যাবে না। আর বিষণ্ণতা দেখা যাবে না আগামীকাল।

তাড়াহুড়ো করে সকালে যখন আবার সেই স্বপ্নের স্কুলে আসে, কী দেখে? সেই স্কুল আগের মতই আছে। এভাবেই সবাই একেক করে প্রাইমারি স্কুল পার করে চলে যায় হাইস্কুলে। সেখানে নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন সমস্যা। এখন আর স্বপ্নে প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়; হাইস্কুল নিয়ে ভাবনা।

স্কুলের মাঠটিতে হাট বসে, তাও সপ্তাহে দুইদিন। এছাড়া মাঝেমধ্যে বাজারও। তাহলে সেখানে একটু ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, গোল্লাছুট তার কিছুই আর হলো না খেলা। শুধু বই নিয়েই পড়ে আছে সবাই আর ফ্যাল ফ্যাল করে দেখতে দেখতে কোন এক সময় হাইস্কুল শেষ করে গেল কলেজে।

ওমা এ তো দেখছি এক নতুন রাজ্য। বাড়ি ছেড়ে পরের বাড়ি লজিং থাকতে হবে। গরম ঠাণ্ডা বা পান্তা বলে কথা নাই, যা পাবে তাই খেতে হবে, নইলে কেটে পরো। কলেজের বড় ভাইদের মুখের বুলি শুনতে ভালোই লাগে যখন তারা স্লোগানের সুরে বলে বাঁচতে চাই, বাঁচার মত বাঁচতে চাই ইত্যাদি।

দেখতে দেখতে কলেজ জীবন শেষ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হবে। ওমা! কী ভয়ংকর জায়গা এখানে। উল্টোপাল্টা কিছু করলেই খবর আছের পরিবর্তে বরং চুপ চাপ থাকলেই ঝামেলা। কিছু করার চেয়ে কিছু না করলে বিপদ বেশি। কোন রকমে কেটেকুটে বিশ্ববিদ্যালয় শেষে কর্মের সন্ধানে।

৩৫ বছর পার হলে চাকরি মিলবে না, কী বিপদ! এ তো এক মহাসমুদ্র! এর আগে খাল, নালা, নদী আর সাগর ছিল এখন মহাসাগর, মহাবিপদ। সব কিছু পেরিয়ে হলো জীবনে একটি চাকরি।

বিয়ে থেকে শুরু করে পরিবার পরিজন দেখতে দেখতে কখন সময় পার হয়ে গেলো! প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন যে স্বপ্ন দেখেছি তার আর বাস্তবায়ন করা হলো না। তাই তো বছরের পর বছর এ স্কুলগুলোর মাঠ বৃষ্টির পানিতে জমে নিজেরা যেমন ডুবে আছে, তেমনি শিশুকালের স্বপ্নকে ডুবিয়ে রেখেছে।

জন্মের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্যার মাঝে যাদের জীবন তাদেরই কিন্তু সমাধান করার কথা। অথচ তা সম্ভব কখনও হয়নি, হবেও না। কারণ যারা শুধু সমস্যায় জর্জরিত তারা কখনও সমাধানের সুযোগ পায় না।

কথায় বলে “শরীরের নাম মহাশয় যাহা সহায় তাহা সয়।” আমরা ভুলে যাই অতীতের স্মৃতি। তার কারণ যে স্মৃতি মধুর নয় তা কেউ মনে রেখে জ্বলেপুড়ে মরতে চায় না।
আমরা স্বপ্ন দেখিয়ে গেলাম, আমরা স্বপ্ন দেখে গেলাম কেউ স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করে গেলাম না।

আমার দেশের সঙ্গে হৃদ্যতা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। আমার নজরে পড়ে অনেক কিছুই। যেমনটি পড়েছে বেজড়া নারানদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিতে ডুবে থাকার ছবি।

বেজড়া নহাটা ইউনিয়ন, মহম্মদপুর উপজেলা, মাগুরা জেলার অধীনে। খেলার মাঠটি জলাবদ্ধতার কারণে বছরের প্রায় বেশির ভাগ সময় পানিতে ডুবে থাকে। অথচ কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে এলাকার জন প্রতিনিধিরা কেউ বিষয়টির সমাধান করতে চেষ্টা করে না।

কারণ সম্ভবত ওটাই তাদের চোখে স্বাভাবিক। সবাই হয়ত আমার মত করে শুধু আহাজারি করে বলে “আহারে কী অবস্থা”। সত্যিকারার্থে কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে মূল দায়িত্ব এবং করতে হবে এর সমাধান।

বর্তমানে এমন অবস্থা হয়েছে যে এটা দেখে সবাই অভ্যস্ত। এ কারণে কেউ বদলাতে চায় না। কিন্তু সচেতন জাতি হিসাবে এসব দিনকে সাহসের সঙ্গে বদলাতে হবে। তা না হলে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না।

এটা একটি বিদ্যালয়, ইট আর বালুর ঘর কিন্তু সেখান থেকে যারা শিক্ষা গ্রহণ করছে তারা রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। ইট আর বালু প্রতিবাদ করতে পারে না বুঝলাম কিন্তু রক্তে মাংসে গড়া মানুষ, তারা কীভাবে প্রতিবাদ করতে ভুলে গেল? সবাই যখন ভুলতে বসেছে তখন বেচারা বন্যার পানি তার কান্নার জল দিয়ে স্কুলটিকে ভারী, শ্যাত-শ্যাতে করে রেখেছে। যদি কখনও কেউ দু'চোখ মেলে দেখে আর কিছু করে এই আশায়।

আমি অনুরোধ করব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি, সমাজপতি, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের প্লীজ কিছু একটা করুন। দেশের এরকম শত শত স্কুল যা অবহেলায় অবহেলিত হয়ে ডুবে মরছে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রাণপ্রিয় বিদ্যালয়গুলো ফিরে পাক তার ন্যাচারাল দৃশ্য। শিশুরা প্রশিক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে খেলাধুলায় মানিয়ে উঠুক এবং স্বপ্নে নতুন সোনার বাংলা গড়ার সুযোগ পাক।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

নতুন প্রজন্মের শিক্ষাঘরের এ কী হাল!

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
১৯ আগস্ট ২০২০, ০১:৩২ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

উপরের যে ছবিটি দেখছেন সেটা সুইমিং পুল নয়, সুইমিং সেন্টারও নয়, নয় কারও পড়ে থাকা বসতবাড়ি। ওটা নতুন প্রজন্মের শিক্ষাঘর। ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আসে আবার সূর্যাস্ত গেলে সেখান থেকে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যায়। 

সারা দিন কঠিন পরিশ্রম করে যখন রাতে ঘুমোয় তখন স্বপ্ন দেখে সকাল হলে তারা স্কুলের সামনের খেলার মাঠটিতে খেলবে। কারণ রাত পোহালেই আর পানি জমে থাকবে না। আর মশামাছির অত্যাচার শ্রেণী কক্ষে দেখা যাবে না। আর বিষণ্ণতা দেখা যাবে না আগামীকাল। 

তাড়াহুড়ো করে সকালে যখন আবার সেই স্বপ্নের স্কুলে আসে, কী দেখে? সেই স্কুল আগের মতই আছে। এভাবেই সবাই একেক করে প্রাইমারি স্কুল পার করে চলে যায় হাইস্কুলে। সেখানে নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন সমস্যা। এখন আর স্বপ্নে প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়; হাইস্কুল নিয়ে ভাবনা। 

স্কুলের মাঠটিতে হাট বসে, তাও সপ্তাহে দুইদিন। এছাড়া মাঝেমধ্যে বাজারও। তাহলে সেখানে একটু ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, গোল্লাছুট তার কিছুই আর হলো না খেলা। শুধু বই নিয়েই পড়ে আছে সবাই আর ফ্যাল ফ্যাল করে দেখতে দেখতে কোন এক সময় হাইস্কুল শেষ করে গেল কলেজে। 

ওমা এ তো দেখছি এক নতুন রাজ্য। বাড়ি ছেড়ে পরের বাড়ি লজিং থাকতে হবে। গরম ঠাণ্ডা বা পান্তা বলে কথা নাই, যা পাবে তাই খেতে হবে, নইলে কেটে পরো। কলেজের বড় ভাইদের মুখের বুলি শুনতে ভালোই লাগে যখন তারা স্লোগানের সুরে বলে বাঁচতে চাই, বাঁচার মত বাঁচতে চাই ইত্যাদি। 

দেখতে দেখতে কলেজ জীবন শেষ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হবে। ওমা! কী ভয়ংকর জায়গা এখানে। উল্টোপাল্টা কিছু করলেই খবর আছের পরিবর্তে বরং চুপ চাপ থাকলেই ঝামেলা। কিছু করার চেয়ে কিছু না করলে বিপদ বেশি। কোন রকমে কেটেকুটে বিশ্ববিদ্যালয় শেষে কর্মের সন্ধানে। 

৩৫ বছর পার হলে চাকরি মিলবে না, কী বিপদ! এ তো এক মহাসমুদ্র! এর আগে খাল, নালা, নদী আর সাগর ছিল এখন মহাসাগর, মহাবিপদ। সব কিছু পেরিয়ে হলো জীবনে একটি চাকরি।

বিয়ে থেকে শুরু করে পরিবার পরিজন দেখতে দেখতে কখন সময় পার হয়ে গেলো! প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন যে স্বপ্ন দেখেছি তার আর বাস্তবায়ন করা হলো না। তাই তো বছরের পর বছর এ স্কুলগুলোর মাঠ বৃষ্টির পানিতে জমে নিজেরা যেমন ডুবে আছে, তেমনি শিশুকালের স্বপ্নকে ডুবিয়ে রেখেছে। 

জন্মের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্যার মাঝে যাদের জীবন তাদেরই কিন্তু সমাধান করার কথা। অথচ তা সম্ভব কখনও হয়নি, হবেও না। কারণ যারা শুধু সমস্যায় জর্জরিত তারা কখনও সমাধানের সুযোগ পায় না। 

কথায় বলে “শরীরের নাম মহাশয় যাহা সহায় তাহা সয়।” আমরা ভুলে যাই অতীতের স্মৃতি। তার কারণ যে স্মৃতি মধুর নয় তা কেউ মনে রেখে জ্বলেপুড়ে মরতে চায় না। 
আমরা স্বপ্ন দেখিয়ে গেলাম, আমরা স্বপ্ন দেখে গেলাম কেউ স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করে গেলাম না।

আমার দেশের সঙ্গে হৃদ্যতা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। আমার নজরে পড়ে অনেক কিছুই। যেমনটি পড়েছে বেজড়া নারানদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিতে ডুবে থাকার ছবি। 

বেজড়া নহাটা ইউনিয়ন, মহম্মদপুর উপজেলা, মাগুরা জেলার অধীনে। খেলার মাঠটি জলাবদ্ধতার কারণে বছরের প্রায় বেশির ভাগ সময় পানিতে ডুবে থাকে। অথচ কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে এলাকার জন প্রতিনিধিরা কেউ বিষয়টির সমাধান করতে চেষ্টা করে না। 

কারণ সম্ভবত ওটাই তাদের চোখে স্বাভাবিক। সবাই হয়ত আমার মত করে শুধু আহাজারি করে বলে “আহারে কী অবস্থা”। সত্যিকারার্থে কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে মূল দায়িত্ব এবং করতে হবে এর সমাধান।
 
বর্তমানে এমন অবস্থা হয়েছে যে এটা দেখে সবাই অভ্যস্ত। এ কারণে কেউ বদলাতে চায় না। কিন্তু সচেতন জাতি হিসাবে এসব দিনকে সাহসের সঙ্গে বদলাতে হবে। তা না হলে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না। 

এটা একটি বিদ্যালয়, ইট আর বালুর ঘর কিন্তু সেখান থেকে যারা শিক্ষা গ্রহণ করছে তারা রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। ইট আর বালু প্রতিবাদ করতে পারে না বুঝলাম কিন্তু রক্তে মাংসে গড়া মানুষ, তারা কীভাবে প্রতিবাদ করতে ভুলে গেল? সবাই যখন ভুলতে বসেছে তখন বেচারা বন্যার পানি তার কান্নার জল দিয়ে স্কুলটিকে ভারী, শ্যাত-শ্যাতে করে রেখেছে। যদি কখনও কেউ দু'চোখ মেলে দেখে আর কিছু করে এই আশায়।
 
আমি অনুরোধ করব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি, সমাজপতি, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের প্লীজ কিছু একটা করুন। দেশের এরকম শত শত স্কুল যা অবহেলায় অবহেলিত হয়ে ডুবে মরছে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রাণপ্রিয় বিদ্যালয়গুলো ফিরে পাক তার ন্যাচারাল দৃশ্য। শিশুরা প্রশিক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে খেলাধুলায় মানিয়ে উঠুক এবং স্বপ্নে নতুন সোনার বাংলা গড়ার সুযোগ পাক।  

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
 

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

০৪ অক্টোবর, ২০২০
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০