স্মরণে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম
jugantor
স্মরণে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম

  রাকিব হাসান রাফি, স্লোভেনিয়া থাকে  

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৫:২৫:০৪  |  অনলাইন সংস্করণ

এক হাতে তার অগ্নিবীণা, অন্যহাতে তার বিষের বাঁশি। ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো এক মহান পুরুষ যার কলমের প্রতিটি লাইন যেনও মহান সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা। কণ্ঠে তাঁর এক সুর-

"আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না -
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত"

বুঝতে পেরেছেন, এখানে কার কথা বলা হয়েছে? তিনি আর কেউ নন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি একসঙ্গে বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবেও পরিচিত।

বাংলাভাষী মানুষের কাছে তিনি যেন এক দ্রোহের প্রতীকরূপে সমাদৃত। তবে এ দ্রোহ নিতান্তভাবে অন্য সব বিদ্রোহ থেকে আলাদা। কেবলমাত্র নিপীড়িত মানুষের উদ্দেশ্যে ধ্বনিত হয়েছে এ বিদ্রোহ।

সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহও বিদ্রোহের কবিতা রচনা করেছেন, তবে তাদের প্রত্যেকের বিদ্রোহ ছিলো মার্কসবাদী চিন্তাধারার নিরিখে প্রতিফলিত, এদিক থেকে নজরুল ছিলেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং তার বিদ্রোহী চেতনাকে কোন ধরণের রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে কখনও ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

সমাজের সকল বৈষম্যের মূলে তিনি কুঠারাঘাত করেছেন নিম্নের দুই চরণের মাধ্যমে-

"গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান!"

বাংলা সাহিত্যে নজরুল হচ্ছেন এমন একজন কবি যাকে আপনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারেন।

একদিকে তিনি যেমন তার সাহিত্যচর্চায় ইসলামী মূল্যবোধ ও ভাবধারাকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে শ্যামা সঙ্গীত চর্চায়ও তিনি পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।

আবার ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললে কেউই লেখনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতাকে সেভাবে প্রস্ফুটিত করতে পারেননি কবি কাজী নজরুল ইসলাম যেরকমভাবে করেছেন।

বিংশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে তাই যখন হিন্দু এবং মুসলমান এ দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে অসহিষ্ণুতা রীতিমতো যখন এক বিপর্যয়ের রূপ নিলো সে সময়ে তিনি লিখেছেন-

“ মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।।
এক সে আকাশ মায়ের কোলে
যেন রবি শশী দোলে,
এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ির টান।।
এক সে দেশের খাই গো হাওয়া, এক সে দেশের জল,
এক সে মায়ের বক্ষে ফলাই একই ফুল ও ফল।
এক সে দেশের মাটিতে পাই
কেউ গোরে কেউ শ্মাশানে ঠাঁই
এক ভাষাতে মা’কে ডাকি, এক সুরে গাই গান।।"

এমনকি সে যুগেও তিনি তার সন্তানদের নাম রেখেছিলেন কাজী সব্যসাচী, কৃষ্ণ মুহাম্মদ, কাজী অনিরুদ্ধ এবং অরিন্দম খালেদ। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেননি অথচ বাংলা সাহিত্যকে তিনি করেছেন সমৃদ্ধ।

৪২ বছর বয়সে তিনি মস্তিষ্কের এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে তার সাহিত্য চর্চায় ছেদ পড়ে এবং তিনি ধীরে ধীরে তার বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন।

সত্যিকথা বলতে গেলে তার সাহিত্যচর্চার সময় ছিলো বিশ থেকে চব্বিশ বছরের মতো, যেটা নিতান্ত কম বলতে হবে। তবুও এ স্বল্প সময়ে তিনি তার লেখনী দিয়ে গোটা বাঙালির হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছেন।

আর একারণে বিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সময় বাংলা সাহিত্যের মধ্যগগণে পদচারণা করছেন, ঠিক সেসময় নজরুলের আবির্ভাবকে অনেকে ধূমকেতুর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

নজরুলের আরও একটি কৃতিত্ব হচ্ছে, বিশ্বের কোনো কবি কিংবা গীতিকার এককভাবে একসঙ্গে এতো বেশি সঙ্গীত রচনা করতে পারেননি যেটা নজরুল পেরেছেন।

আরবি, ফার্সি, সংস্কৃতসহ বিভিন্ন ভাষার শব্দমালার সংমিশ্রণে তিনি নতুন নতুন অনেক সুরের সৃষ্টি করেছেন। আবার প্রেমিক কবি হিসেবেও নজরুল ঠাঁই করে নিয়েছেন কোটি কোটি যুগলের হৃদয়ে। তার রচিত একটি বিখ্যাত প্রেমের কবিতা-

"তোমারে পড়িছে মনে
আজি নীপ-বালিকার ভীরু-শিহরণে,
যুথিকার অশ্রুসিক্ত ছলছল মুখে
কেতকী-বধূর অবগুন্ঠিত ও বুকে-
তোমারে পড়িছে মনে।
হয়তো তেমনি আজি দূর বাতায়নে
ঝিলিমিলি-তলে
ম্লান লুলিত অঞ্ছলে
চাহিয়া বসিয়া আছ একা,
বারে বারে মুছে যায় আঁখি-জল-লেখা।
বারে বারে নিভে যায় শিয়রেরে বাতি,
তুমি জাগ, জাগে সাথে বরষার রাতি।"

বস্তুতপক্ষে বাংলা সাহিত্যে নজরুলের তুলনা নেই, তিনি নিজেই তার প্রতিদ্বন্দ্বী। এমনকি নিখিল ভারতে স্বাধীনতাকামী মানুষের মাঝে প্রথম স্বাধীনতার বীজ বোপিত হয়েছিলো তার মাধ্যমে এমনটি দাবি করলেও ভুল হবে না।

সত্যি কথা বলতে গেলে ১৯২০ সালের ১২ জুলাই নবযুগ নামক একটি সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া শুরু করে। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরে-বাংলা এ কে ফজলুল হক।

ওই পত্রিকার মাধ্যমেই নজরুল নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেন। ওই বছরই পত্রিকায় "মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে" শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন যার জন্য পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়।

নজরুল ব্রিটিশ সরকারের জনরোষে পড়েন এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে তাকে কারারুদ্ধ করা হয়। স্বাধীনতাকামী মানুষের উদ্দেশ্যে তাঁর লেখা-

"কারার ঐ লৌহকপাট,
ভেঙ্গে ফেল, কর রে লোপাট,
রক্ত-জমাট
শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।
ওরে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!
ধ্বংস নিশান
উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।"

আজ ২৭ শে আগস্ট। ১৯৭৬ সালের এ দিনে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান। মৃত্যবার্ষিকীর এই দিনে তাই নজরুলের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা।

ভারত যদি দাবি করে যে, মহাত্মা গান্ধী কিংবা কংগ্রেসের কারণে এ উপমহাদেশের মানুষ ব্রিটিশ শাসনের যাঁতাকল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছিলো এবং পাকিস্তান যদি দাবি করে থাকে যে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের কারণে তারা ভারত থেকে পৃথক হয়ে স্বতন্ত্র ও স্বাধীনতা লাভ করতে পেরেছিলো, তবে তাদের সবার এ দাবি বাস্তবে রূপ নেয়ার পেছনে নিভৃত কারিগর ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম যিনি সব সময় থেকে গেছেন পর্দার অন্তরালে।

বস্তুতপক্ষে বলতে গেলে কাজী নজরুল ইসলাম যখন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কলম ধরে দখলদার শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে "সেই দিন হবো শান্ত'' লিখেন সেটিই ভারতের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার ডাক।তাই নজরুলকে ছাড়া এ ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকে কল্পনা করা কখনও সম্ভব নয়।

লেখক: রাকিব হাসান রাফি, স্লোভেনিয়া প্রবাসী শিক্ষার্থী।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

স্মরণে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম

 রাকিব হাসান রাফি, স্লোভেনিয়া থাকে 
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৫:২৫ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

এক হাতে তার অগ্নিবীণা, অন্যহাতে তার বিষের বাঁশি। ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো এক মহান পুরুষ যার কলমের প্রতিটি লাইন যেনও মহান সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা। কণ্ঠে তাঁর এক সুর-

"আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না -
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত"

বুঝতে পেরেছেন, এখানে কার কথা বলা হয়েছে? তিনি আর কেউ নন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি একসঙ্গে বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবেও পরিচিত।

বাংলাভাষী মানুষের কাছে তিনি যেন এক দ্রোহের প্রতীকরূপে সমাদৃত। তবে এ দ্রোহ নিতান্তভাবে অন্য সব বিদ্রোহ থেকে  আলাদা। কেবলমাত্র নিপীড়িত মানুষের উদ্দেশ্যে ধ্বনিত হয়েছে এ বিদ্রোহ।

সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহও বিদ্রোহের কবিতা রচনা করেছেন, তবে তাদের প্রত্যেকের বিদ্রোহ ছিলো মার্কসবাদী চিন্তাধারার নিরিখে প্রতিফলিত, এদিক থেকে নজরুল ছিলেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং তার বিদ্রোহী চেতনাকে কোন ধরণের রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে কখনও ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

সমাজের সকল বৈষম্যের মূলে তিনি কুঠারাঘাত করেছেন নিম্নের দুই চরণের মাধ্যমে-

"গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান!"

বাংলা সাহিত্যে নজরুল হচ্ছেন এমন একজন কবি যাকে আপনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারেন।

একদিকে তিনি যেমন তার সাহিত্যচর্চায় ইসলামী মূল্যবোধ ও ভাবধারাকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে শ্যামা সঙ্গীত চর্চায়ও তিনি পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।

আবার ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললে কেউই লেখনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতাকে সেভাবে প্রস্ফুটিত করতে পারেননি কবি কাজী নজরুল ইসলাম যেরকমভাবে করেছেন।

বিংশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে তাই যখন হিন্দু এবং মুসলমান এ দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে অসহিষ্ণুতা রীতিমতো যখন এক বিপর্যয়ের রূপ নিলো সে সময়ে তিনি লিখেছেন-

“ মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।।
 এক সে আকাশ মায়ের কোলে
 যেন রবি শশী দোলে,
এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ির টান।।
এক সে দেশের খাই গো হাওয়া, এক সে দেশের জল,
এক সে মায়ের বক্ষে ফলাই একই ফুল ও ফল।
 এক সে দেশের মাটিতে পাই
 কেউ গোরে কেউ শ্মাশানে ঠাঁই
এক ভাষাতে মা’কে ডাকি, এক সুরে গাই গান।।"

এমনকি সে যুগেও তিনি তার সন্তানদের নাম রেখেছিলেন কাজী সব্যসাচী, কৃষ্ণ মুহাম্মদ, কাজী অনিরুদ্ধ এবং অরিন্দম খালেদ। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেননি অথচ বাংলা সাহিত্যকে তিনি করেছেন সমৃদ্ধ।

৪২ বছর বয়সে তিনি মস্তিষ্কের এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে তার সাহিত্য চর্চায় ছেদ পড়ে এবং তিনি ধীরে ধীরে তার বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন।

সত্যিকথা বলতে গেলে তার সাহিত্যচর্চার সময় ছিলো বিশ থেকে চব্বিশ বছরের মতো, যেটা নিতান্ত কম বলতে হবে। তবুও এ স্বল্প সময়ে তিনি তার লেখনী দিয়ে গোটা বাঙালির হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছেন।

আর একারণে বিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সময় বাংলা সাহিত্যের মধ্যগগণে পদচারণা করছেন, ঠিক সেসময় নজরুলের আবির্ভাবকে অনেকে ধূমকেতুর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

নজরুলের আরও একটি কৃতিত্ব হচ্ছে, বিশ্বের কোনো কবি কিংবা গীতিকার এককভাবে  একসঙ্গে এতো বেশি সঙ্গীত রচনা করতে পারেননি যেটা নজরুল পেরেছেন।

আরবি, ফার্সি, সংস্কৃতসহ বিভিন্ন ভাষার শব্দমালার সংমিশ্রণে তিনি নতুন নতুন অনেক সুরের সৃষ্টি করেছেন। আবার প্রেমিক কবি হিসেবেও নজরুল ঠাঁই করে নিয়েছেন কোটি কোটি যুগলের হৃদয়ে। তার রচিত একটি বিখ্যাত প্রেমের কবিতা-

"তোমারে পড়িছে মনে
আজি নীপ-বালিকার ভীরু-শিহরণে,
যুথিকার অশ্রুসিক্ত ছলছল মুখে
কেতকী-বধূর অবগুন্ঠিত ও বুকে-
তোমারে পড়িছে মনে।
হয়তো তেমনি আজি দূর বাতায়নে
ঝিলিমিলি-তলে
ম্লান   লুলিত অঞ্ছলে
চাহিয়া বসিয়া আছ একা,
বারে বারে মুছে যায় আঁখি-জল-লেখা।
বারে বারে নিভে যায় শিয়রেরে বাতি,
তুমি জাগ, জাগে সাথে বরষার রাতি।"

বস্তুতপক্ষে বাংলা সাহিত্যে নজরুলের তুলনা নেই, তিনি নিজেই তার প্রতিদ্বন্দ্বী। এমনকি নিখিল ভারতে স্বাধীনতাকামী মানুষের মাঝে প্রথম স্বাধীনতার বীজ বোপিত হয়েছিলো তার মাধ্যমে এমনটি দাবি করলেও ভুল হবে না।

সত্যি কথা বলতে গেলে ১৯২০ সালের ১২ জুলাই নবযুগ নামক একটি সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া শুরু করে। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরে-বাংলা এ কে ফজলুল হক।

ওই পত্রিকার মাধ্যমেই নজরুল নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেন। ওই বছরই পত্রিকায় "মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে" শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন যার জন্য পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়।

নজরুল ব্রিটিশ সরকারের জনরোষে পড়েন এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে তাকে কারারুদ্ধ করা হয়। স্বাধীনতাকামী মানুষের উদ্দেশ্যে তাঁর লেখা-

"কারার ঐ লৌহকপাট,
ভেঙ্গে ফেল, কর রে লোপাট,
রক্ত-জমাট
শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।
ওরে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!
ধ্বংস নিশান
উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।"

আজ ২৭ শে আগস্ট। ১৯৭৬ সালের এ দিনে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান। মৃত্যবার্ষিকীর এই দিনে তাই নজরুলের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা।

ভারত যদি দাবি করে যে, মহাত্মা গান্ধী কিংবা কংগ্রেসের কারণে এ উপমহাদেশের মানুষ ব্রিটিশ শাসনের যাঁতাকল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছিলো এবং পাকিস্তান যদি দাবি করে থাকে যে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের কারণে তারা ভারত থেকে পৃথক হয়ে স্বতন্ত্র ও স্বাধীনতা লাভ করতে পেরেছিলো, তবে তাদের সবার এ দাবি বাস্তবে রূপ নেয়ার পেছনে নিভৃত কারিগর ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম যিনি সব সময় থেকে গেছেন পর্দার অন্তরালে।

বস্তুতপক্ষে বলতে গেলে কাজী নজরুল ইসলাম যখন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কলম ধরে দখলদার শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে "সেই দিন হবো শান্ত'' লিখেন সেটিই ভারতের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার ডাক।তাই নজরুলকে ছাড়া এ ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকে কল্পনা করা কখনও সম্ভব নয়।

লেখক: রাকিব হাসান রাফি, স্লোভেনিয়া প্রবাসী শিক্ষার্থী।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]