জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ধারাবাহিকতা চাই
jugantor
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ধারাবাহিকতা চাই

  তোফাজ্জল লিটন, নিউইয়র্ক থেকে  

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫:৪০:৫৫  |  অনলাইন সংস্করণ

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু। ফাইল ছবি

বাংলায় ১০টি বর্ণ লাগে ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ লিখতে। এই দশ বর্ণই যেন বাংলার দশ দিক। আমাদের ‘দশ দিগন্ত’ বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আমাদের নিয়ে যেতে শুরু করেছিলেন বিশ্ব প্রাঙ্গণে, যেখানে তিনি জানান দিয়েছিলেন বাঙালি জাতিসত্তার কথা; আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কথা।

বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা উত্তাল আন্দোলনই দিশা হয়েছিল মুক্ত-স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার। বঙ্গবন্ধু এই ভাষার জন্য জেলে গেছেন। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তিনি বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন দেখেছেন। হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতি নিজেদের ভূমির জন্য সংগ্রাম করেছে। একটি স্বাধীন দেশের জন্য অযুত-নিযুত প্রাণ দিয়েছে। সেই জাতির জন্য একটি দেশ এনে দিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। তাই বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু তার ভাষার কথা ভুলে যাননি কখনও। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য দেশের মর্যাদা লাভ করে। এর মাত্র আট দিন পর, ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন বাংলায়। জাতিসংঘে এটি ছিল প্রথম বাংলায় ভাষণ। এতে করে বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে পেয়েছে সম্মানের আসন, আর এই ভাষাভাষী মানুষেরা পেয়েছে গর্ব করার অবকাশ।

বিশ্বপরিসরে এর আগে এমন করে বাংলা ভাষাকে কেউ পরিচয় করিয়ে দেয়নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে প্রথম বাঙালি হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তার মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে প্রথম বাংলা ভাষা পরিচিত পেয়েছিল। কিন্তু বিশ্বাঙ্গনের কোথাও তিনি বাংলায় বক্তব্য রাখেননি।

১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল পুরস্কার পাওয়া দ্বিতীয় বাঙালি তিনি। তিনিও তার বক্তব্যটি রেখেছিলেন ইংরেজিতে। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনুস ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। ড. মুহম্মদ ইউনুস চাইলে তার নোবেল বক্তব্যের পুরোটি বাংলায় দিতে পারতেন। তাতে বাংলা ভাষা বিশ্বজনের কাছে আরও পরিচিত ও সম্মানিত হতে পারত। তিনি তার ৩৫ মিনিটের ভাষণের মধ্যে মাত্র দেড় মিনিট বাংলায় বলেছেন।

বঙ্গবন্ধুর পরে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে চেতনায় ধারণ করে লালন করেছেন আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিতে পেরেছেন সুদৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে। এরপর শেখ হাসিনা যতবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এসেছেন, ততবার বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি করেছেন।

বিশ্বব্যাপী ৩৫ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। তবে বাংলা ভাষা বলতে বিশ্ব বাংলাদেশকেই বুঝে। মাতৃভাষা বিবেচনায় বাংলা এখন চতুর্থ। সংখ্যার দিক দিয়ে সপ্তম। ইউনেসকো ২০১০ সালে বাংলাভাষাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুরেলা ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বের ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা পড়ানো হয়। বাংলা ভাষার এত গৌরব সত্ত্বেও সারা বিশ্বে তার তেমন কোনো প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অথচ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী শুধু ভাষার নয়, ‘বাংলাদেশ’ নামটির একটি ইতিবাচক প্রচার করা যেত সহজেই। কীভাবে? এই উত্তরটি দেওয়ার আগে বলে নিই তাতে দেশের কী লাভ হতো। মোটা দাগে বলতে গেলে মানুষ সব সময় তার পরিচিত গণ্ডির মধ্যে থাকতে চায়। আপনি বাজারে একটি পণ্য কিনতে গিয়ে পরিচিত দেশের পণ্যটাই কেনেন। তেমনি বিশ্ববাজারে সমমানের কোনো পণ্য যদি অপরিচিত কোনো দেশের হয়, মানুষ তাতে নির্ভর না করে পূর্বপরিচিত দেশের জিনিসে আস্থা রাখে।

কীভাবে প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়— বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বাংলাদেশের মানুষ আছে। দেশের আদলে অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা জাতীয় শহীদ দিবস পালন করেন। দেশে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সবাই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালেও প্রবাসে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় একত্রে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ সীমিত। তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে দিবসটির আয়োজন করতে বাধ্য হন।

বিচ্ছিন্ন আয়োজনটা যদি প্রতিটা দেশে সম্মিলিতভাবে বিদেশিদের সম্পৃক্ত করে ব্যাপক আয়োজন করে করা যেত, তাহলে প্রতিটা দেশের স্থানীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ইতিবাচক স্থান দখল করতে পারত। এমনটি ঘটতে পারত বিশ্ব গণমাধ্যমেও। এর মাধ্যমে আমাদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কথা বিশ্ববাসী জানতে পারত।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন, রাতারগুলের মতো আরও অনেক দর্শনীয় স্থান ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটা জেলায় কিছু না কিছু আছেই দর্শনীয়। শুধু বিশ্বব্যাপী প্রচারের অভাবে আমাদের পর্যটন বিকশিত হচ্ছে না। আমাদের গৌরব আর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও প্রকৃতি বিশ্ব দরবারে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারলে পর্যটনে সুবাতাস বয়ে যেতে পারত।

প্রশ্ন আসতে পারে, সম্মিলিত আয়োজন করাটা কি এতই সহজ? হ্যাঁ, একেবারেই সোজা। প্রতিটা দেশে বাংলাদেশের হাইকমিশন এই কাজটি সহজেই করতে পারে। বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে যারা নিয়মিত ভাষা দিবস উদযাপনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তাদের ও স্থানীয় কমিউনিটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করে, তাহলে অধিকাংশ প্রবাসীই সম্মানিত বোধ করবে কাজটি করতে।

তখন অর্থনৈতিক বিষয়টাও বড় কোনো ব্যাপার হবে না। পাশের দেশ ভারতের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘দিওয়ালি’ এক সময় নিজে বড় করে আয়োজন করত। এখন আমেরিকা সরকার নিজে তা উৎসব হিসেবে উদযাপন করে। চীন সরকার তাদের নিজেদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিশ্বব্যাপী। এ সব আয়োজনে সেই সব দেশের কী লাভ হচ্ছে, তা সরকার ভালো করেই জানে। এমন অসংখ্য নজির চোখের সামনে থাকার পরও আমাদের দেশের তরফ থেকে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেই। অন্যান্য দেশের এসব সম্মিলিত আয়োজন দেখে বাংলাদেশি প্রবাসীদের আফসোস করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না।

বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত কেউ নিজে উদ্যোগী হয়ে কাজ করার চেয়ে কোনো দায়িত্ব পেলে তা পালন করতে বেশি স্বস্তিবোধ করে। এ জন্যই হয়তো কোনো হাইকমিশনার নিজে উদ্যোগী হয়ে এ ধরনের কাজ হাতে নেন না। যারা প্রবাসে সরকারিভাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা প্রত্যেকেই দেশপ্রেমী তাতে সন্দেহ নেই। তারা প্রত্যেকে দেশের জন্য কিছু করতে পারলে গর্ববোধ করেন।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে যদি একটি চিঠির মাধ্যমে ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা দিবসের আয়োজনটি সম্মিলিতভাবে করার কথা বলা হয়, তাহলে সরকারি প্রতিনিধিরা এই উদ্যোগ স্বচ্ছন্দে নেবেন বলেই বিশ্বাস। এমনকি সরকারের এতে কোনো বাড়তি ব্যয় পর্যন্ত হবে না। প্রবাসীরা অর্থনৈতিক ও শারীরিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন সরকারের একটি আহ্বানের জন্য। সরকারের পক্ষ থেকে একটি চিঠি কি লেখা যায় একুশের জন্য?

লেখক: তোফাজ্জল লিটন, নিউ ইয়র্ক প্রবাসী নাট্যকার ও সাংবাদিক

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ধারাবাহিকতা চাই

 তোফাজ্জল লিটন, নিউইয়র্ক থেকে 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:৪০ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু। ফাইল ছবি
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু। ফাইল ছবি

বাংলায় ১০টি বর্ণ লাগে ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ লিখতে। এই দশ বর্ণই যেন বাংলার দশ দিক। আমাদের ‘দশ দিগন্ত’ বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আমাদের নিয়ে যেতে শুরু করেছিলেন বিশ্ব প্রাঙ্গণে, যেখানে তিনি জানান দিয়েছিলেন বাঙালি জাতিসত্তার কথা; আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কথা।

বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা উত্তাল আন্দোলনই দিশা হয়েছিল মুক্ত-স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার। বঙ্গবন্ধু এই ভাষার জন্য জেলে গেছেন। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তিনি বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন দেখেছেন। হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতি নিজেদের ভূমির জন্য সংগ্রাম করেছে। একটি স্বাধীন দেশের জন্য অযুত-নিযুত প্রাণ দিয়েছে। সেই জাতির জন্য একটি দেশ এনে দিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। তাই বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ।
 
বঙ্গবন্ধু তার ভাষার কথা ভুলে যাননি কখনও। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য দেশের মর্যাদা লাভ করে। এর মাত্র আট দিন পর, ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন বাংলায়। জাতিসংঘে এটি ছিল প্রথম বাংলায় ভাষণ। এতে করে বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে পেয়েছে সম্মানের আসন, আর এই ভাষাভাষী মানুষেরা পেয়েছে গর্ব করার অবকাশ।

বিশ্বপরিসরে এর আগে এমন করে বাংলা ভাষাকে কেউ পরিচয় করিয়ে দেয়নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে প্রথম বাঙালি হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তার মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে প্রথম বাংলা ভাষা পরিচিত পেয়েছিল। কিন্তু বিশ্বাঙ্গনের কোথাও তিনি বাংলায় বক্তব্য রাখেননি। 

১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল পুরস্কার পাওয়া দ্বিতীয় বাঙালি তিনি। তিনিও তার বক্তব্যটি রেখেছিলেন ইংরেজিতে। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনুস ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। ড. মুহম্মদ ইউনুস চাইলে তার নোবেল বক্তব্যের পুরোটি বাংলায় দিতে পারতেন। তাতে বাংলা ভাষা বিশ্বজনের কাছে আরও পরিচিত ও সম্মানিত হতে পারত। তিনি তার ৩৫ মিনিটের ভাষণের মধ্যে মাত্র দেড় মিনিট বাংলায় বলেছেন।

বঙ্গবন্ধুর পরে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে চেতনায় ধারণ করে লালন করেছেন আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিতে পেরেছেন সুদৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে। এরপর শেখ হাসিনা যতবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এসেছেন, ততবার বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি করেছেন।

বিশ্বব্যাপী ৩৫ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। তবে বাংলা ভাষা বলতে বিশ্ব বাংলাদেশকেই বুঝে। মাতৃভাষা বিবেচনায় বাংলা এখন চতুর্থ। সংখ্যার দিক দিয়ে সপ্তম। ইউনেসকো ২০১০ সালে বাংলাভাষাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুরেলা ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বের ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা পড়ানো হয়। বাংলা ভাষার এত গৌরব সত্ত্বেও সারা বিশ্বে তার তেমন কোনো প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

অথচ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী শুধু ভাষার নয়, ‘বাংলাদেশ’ নামটির একটি ইতিবাচক প্রচার করা যেত সহজেই। কীভাবে? এই উত্তরটি দেওয়ার আগে বলে নিই তাতে দেশের কী লাভ হতো। মোটা দাগে বলতে গেলে মানুষ সব সময় তার পরিচিত গণ্ডির মধ্যে থাকতে চায়। আপনি বাজারে একটি পণ্য কিনতে গিয়ে পরিচিত দেশের পণ্যটাই কেনেন। তেমনি বিশ্ববাজারে সমমানের কোনো পণ্য যদি অপরিচিত কোনো দেশের হয়, মানুষ তাতে নির্ভর না করে পূর্বপরিচিত দেশের জিনিসে আস্থা রাখে।

কীভাবে প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়— বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বাংলাদেশের মানুষ আছে। দেশের আদলে অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা জাতীয় শহীদ দিবস পালন করেন। দেশে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সবাই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালেও প্রবাসে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় একত্রে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ সীমিত। তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে দিবসটির আয়োজন করতে বাধ্য হন। 

বিচ্ছিন্ন আয়োজনটা যদি প্রতিটা দেশে সম্মিলিতভাবে বিদেশিদের সম্পৃক্ত করে ব্যাপক আয়োজন করে করা যেত, তাহলে প্রতিটা দেশের স্থানীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ইতিবাচক স্থান দখল করতে পারত। এমনটি ঘটতে পারত বিশ্ব গণমাধ্যমেও। এর মাধ্যমে আমাদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কথা বিশ্ববাসী জানতে পারত। 

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন, রাতারগুলের মতো আরও অনেক দর্শনীয় স্থান ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটা জেলায় কিছু না কিছু আছেই দর্শনীয়। শুধু বিশ্বব্যাপী প্রচারের অভাবে আমাদের পর্যটন বিকশিত হচ্ছে না। আমাদের গৌরব আর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও প্রকৃতি বিশ্ব দরবারে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারলে পর্যটনে সুবাতাস বয়ে যেতে পারত। 

প্রশ্ন আসতে পারে, সম্মিলিত আয়োজন করাটা কি এতই সহজ? হ্যাঁ, একেবারেই সোজা। প্রতিটা দেশে বাংলাদেশের হাইকমিশন এই কাজটি সহজেই করতে পারে। বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে যারা নিয়মিত ভাষা দিবস উদযাপনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তাদের ও স্থানীয় কমিউনিটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করে, তাহলে অধিকাংশ প্রবাসীই সম্মানিত বোধ করবে কাজটি করতে। 

তখন অর্থনৈতিক বিষয়টাও বড় কোনো ব্যাপার হবে না। পাশের দেশ ভারতের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘দিওয়ালি’ এক সময় নিজে বড় করে আয়োজন করত। এখন আমেরিকা সরকার নিজে তা উৎসব হিসেবে উদযাপন করে। চীন সরকার তাদের নিজেদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিশ্বব্যাপী। এ সব আয়োজনে সেই সব দেশের কী লাভ হচ্ছে, তা সরকার ভালো করেই জানে। এমন অসংখ্য নজির চোখের সামনে থাকার পরও আমাদের দেশের তরফ থেকে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেই। অন্যান্য দেশের এসব সম্মিলিত আয়োজন দেখে বাংলাদেশি প্রবাসীদের আফসোস করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না।

বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত কেউ নিজে উদ্যোগী হয়ে কাজ করার চেয়ে কোনো দায়িত্ব পেলে তা পালন করতে বেশি স্বস্তিবোধ করে। এ জন্যই হয়তো কোনো হাইকমিশনার নিজে উদ্যোগী হয়ে এ ধরনের কাজ হাতে নেন না। যারা প্রবাসে সরকারিভাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা প্রত্যেকেই দেশপ্রেমী তাতে সন্দেহ নেই। তারা প্রত্যেকে দেশের জন্য কিছু করতে পারলে গর্ববোধ করেন। 

তবে সরকারের পক্ষ থেকে যদি একটি চিঠির মাধ্যমে ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা দিবসের আয়োজনটি সম্মিলিতভাবে করার কথা বলা হয়, তাহলে সরকারি প্রতিনিধিরা এই উদ্যোগ স্বচ্ছন্দে নেবেন বলেই বিশ্বাস। এমনকি সরকারের এতে কোনো বাড়তি ব্যয় পর্যন্ত হবে না। প্রবাসীরা অর্থনৈতিক ও শারীরিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন সরকারের একটি আহ্বানের জন্য। সরকারের পক্ষ থেকে একটি চিঠি কি লেখা যায় একুশের জন্য?

লেখক: তোফাজ্জল লিটন, নিউ ইয়র্ক প্রবাসী নাট্যকার ও সাংবাদিক

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]