জীব জন্তুর কোয়ালিটি লাইফের জন্য উলার অন্যরকম উদ্যোগ
jugantor
জীব জন্তুর কোয়ালিটি লাইফের জন্য উলার অন্যরকম উদ্যোগ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৮:২৭:২৭  |  অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বের নারী ধর্ষণের দিক দিয়ে প্রথম দশটি দেশের মধ্যে সাতটি দেশই আফ্রিকা মহাদেশে। তবে তালিকার এক নম্বরে রয়েছে আফগানিস্তান। এই জরিপটি সহায়তা সংস্থা কেয়ার দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান সাত নম্বরে।

এসব দেশে নারীদের আইনি, রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার খুব কম। এসব দেশের অর্ধেক মেয়ের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয় এবং দশজনের মধ্যে আট জনই গৃহিণী। ধর্ষণ পৃথিবীর সব দেশেই কম বেশি হয়ে থাকে। সুইডেনে ধর্ষণের ধরণ সম্পর্কে একটু বর্ণনা করি। এখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ধর্ষণের পরিমাণ বেশ লক্ষণীয়। প্রশ্ন হতে পারে সে আবার কী?

বিবাহিত জীবনে ধর্ষণ হয় বেশি, কারণ অনেকের ধারণা বিয়ে করা মানে যা ইচ্ছা তাই করা যেতে পারে। ইচ্ছের বিরুদ্ধে বা ঘুমের ঘোরে যদি কিছু করা হয় সেটা ধর্ষণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতিসহ ধর্ষণের দায়ে জেল হয়ে থাকে।

এছাড়াও যারা বিয়ে করেনি বা যাদের বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড নেই, যারা সমাজে ছোটবেলা থেকে বাবা-মা, পরিবার, বন্ধু-বান্ধবী থেকে লাঞ্ছিত, দেখা যায় তারা এ ধরনের কাজে লিপ্ত হয়। অনেকে মানসিক অসুস্থতার কারণে ধর্ষণ করে থাকে।

বাংলাদেশে যেভাবে ধর্ষণ হচ্ছে সেটার সাথে কি বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনা করার প্রয়োজন রয়েছে? আমি যদি চল্লিশ বছর আগে আমার জীবনে ফিরে যাই, তখনও নিশ্চিত ধর্ষণ হয়েছে। তবে তার মাত্রা বর্তমানের মতো ছিল না।

১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকসেনারা অমানসিক বর্বরতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে যেভাবে ধর্ষণ করেছিল বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশে তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। আমরা রাজাকারদের ঘৃণা করি তাদের জঘন্য কর্মের জন্য, ধর্ষণ ছিল এর মধ্যে অন্যতম।

বর্তমানে যারা দিনে দুপুরে যাকে খুশি তাকে গণধর্ষণ করছে এরা পাকিস্তানি বা রাজাকারদের বংশধর নয় নিশ্চয়ই। তবে এরা কারা এবং কীভাবে এদের সংখ্যা সমাজে দিনের পর দিন বাড়ছে? শুধু জানলে হবে না এর প্রতিকার করতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কে করবে? মনে হচ্ছে আমরা শুধু সমাজে ঘৃণার বীজ বপন করে চলছি, যার কারণে এটা বেড়ে চলছে।

ঘৃণা নয় ভালোবাসা, যদি এমনটি ভাবতে শুরু করি এবং সেভাবে কাজ করি, তাহলে সম্ভব হবে কি ঘৃণাকে বর্জন করে ভালোবাসাকে অর্জন করা? আমি মনে করি সম্ভব এবং সেটা শুরু করতে হবে সর্বস্তরে। বারবার পুরনো ইতিহাস না টেনে বরং সবাইকে ভাবতে হবে নতুন করে, যা হবার হয়েছে, আর নয়, এবার ভালোবাসার পালা। সময় এসেছে যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্তে আসা, কে মানুষ আর কে অমানুষ।

আমি সুইডেনে ভেড়ার গোস্ত কিনি এক সুইডিশ মহিলার কাছ থেকে। তার নাম উলা এবং তার কৃষিক্ষেত আমার বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। উলা একোলজি উপায়ে সবকিছু উৎপন্ন করে। সুইডিশ জাতি তার এই উদ্যোগের প্রতি কৃতজ্ঞ। সর্বোপরি উলা একজন অবসরপ্রাপ্ত ৭৮ বছর বয়সী বিধবা। ইচ্ছে করলে অবসর জীবনটাকে আরাম আয়াসে আর দশজনের মতো কাটিয়ে দিতে পারতো।

উলা তা না করে সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছে, তাকে কেউ জোর করেনি। উলার ভেড়াগুলো যখন জন্ম নেয় তখন সে চেষ্টা করে যেন সেগুলো একান্নবর্তী পরিবার হিসেবে বসবাস করে। যখনই ভেড়ার বাচ্চাগুলোর বয়স দুইমাস হয় এবং তাদের মধ্যে যৌনতার ভাব দেখা যায় তখনই উলা সেগুলোকে পরিবার থেকে পৃথক করে ফেলে। সেইসঙ্গে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয় যেন একই পরিবারভুক্ত ভেড়ার বাচ্চাদের মাঝে যৌনতার সম্পর্ক না ঘটে।

বিষয়টি উলা আমাকে বলেছে এবং এও বলেছে ভেড়া তো পশু ওরা আপন ভাইবোনের সম্পর্কটা আমাদের মতো বোঝে না। তাই আমি ওদের যৌনতার সম্পর্কটা যেন মধুর হয়। তাই আপ্রাণ চেষ্টা করি সব কিছু সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে।

উলার চিন্তা-চেতনা আমাকে বেশ আপ্লুত করেছে। তাই মাঝে মাঝে তার সঙ্গে দেখা করি এবং অনেক গল্প করি। বর্তমান বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনাগুলো জানার পর মনে পড়ে গেল উলার কথা। কেউই কি নেই যে উলার মতো দেশের ভেড়াগুলোকে সরিয়ে রাখে। কারণ মানুষ নামের দানবগুলো যেহেতু বুঝতে অক্ষম তখন উলার মতো চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বের খুবই প্রয়োজন।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

জীব জন্তুর কোয়ালিটি লাইফের জন্য উলার অন্যরকম উদ্যোগ

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৬:২৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বের নারী ধর্ষণের দিক দিয়ে প্রথম দশটি দেশের মধ্যে সাতটি দেশই আফ্রিকা মহাদেশে। তবে তালিকার এক নম্বরে রয়েছে আফগানিস্তান। এই জরিপটি সহায়তা সংস্থা কেয়ার দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান সাত নম্বরে। 

এসব দেশে নারীদের আইনি, রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার খুব কম। এসব দেশের অর্ধেক মেয়ের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয় এবং দশজনের মধ্যে আট জনই গৃহিণী। ধর্ষণ পৃথিবীর সব দেশেই কম বেশি হয়ে থাকে। সুইডেনে ধর্ষণের ধরণ সম্পর্কে একটু বর্ণনা করি। এখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ধর্ষণের পরিমাণ বেশ লক্ষণীয়। প্রশ্ন হতে পারে সে আবার কী?

বিবাহিত জীবনে ধর্ষণ হয় বেশি, কারণ অনেকের ধারণা বিয়ে করা মানে যা ইচ্ছা তাই করা যেতে পারে। ইচ্ছের বিরুদ্ধে বা ঘুমের ঘোরে যদি কিছু করা হয় সেটা ধর্ষণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতিসহ ধর্ষণের দায়ে জেল হয়ে থাকে।

এছাড়াও যারা বিয়ে করেনি বা যাদের বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড নেই, যারা সমাজে ছোটবেলা থেকে বাবা-মা, পরিবার, বন্ধু-বান্ধবী থেকে লাঞ্ছিত, দেখা যায় তারা এ ধরনের কাজে লিপ্ত হয়। অনেকে মানসিক অসুস্থতার কারণে ধর্ষণ করে থাকে।

বাংলাদেশে যেভাবে ধর্ষণ হচ্ছে সেটার সাথে কি বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনা করার প্রয়োজন রয়েছে? আমি যদি চল্লিশ বছর আগে আমার জীবনে ফিরে যাই, তখনও নিশ্চিত ধর্ষণ হয়েছে। তবে তার মাত্রা বর্তমানের মতো ছিল না। 

১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকসেনারা অমানসিক বর্বরতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে যেভাবে ধর্ষণ করেছিল বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশে তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। আমরা রাজাকারদের ঘৃণা করি তাদের জঘন্য কর্মের জন্য, ধর্ষণ ছিল এর মধ্যে অন্যতম। 

বর্তমানে যারা দিনে দুপুরে যাকে খুশি তাকে গণধর্ষণ করছে এরা পাকিস্তানি বা রাজাকারদের বংশধর নয় নিশ্চয়ই। তবে এরা কারা এবং কীভাবে এদের সংখ্যা সমাজে দিনের পর দিন বাড়ছে? শুধু জানলে হবে না এর প্রতিকার করতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কে করবে? মনে হচ্ছে আমরা শুধু সমাজে ঘৃণার বীজ বপন করে চলছি, যার কারণে এটা বেড়ে চলছে।

ঘৃণা নয় ভালোবাসা, যদি এমনটি ভাবতে শুরু করি এবং সেভাবে কাজ করি, তাহলে সম্ভব হবে কি ঘৃণাকে বর্জন করে ভালোবাসাকে অর্জন করা? আমি মনে করি সম্ভব এবং সেটা শুরু করতে হবে সর্বস্তরে। বারবার পুরনো ইতিহাস না টেনে বরং সবাইকে ভাবতে হবে নতুন করে, যা হবার হয়েছে, আর নয়, এবার ভালোবাসার পালা। সময় এসেছে যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্তে আসা, কে মানুষ আর কে অমানুষ।

আমি সুইডেনে ভেড়ার গোস্ত কিনি এক সুইডিশ মহিলার কাছ থেকে। তার নাম উলা এবং তার কৃষিক্ষেত আমার বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। উলা একোলজি উপায়ে সবকিছু উৎপন্ন করে। সুইডিশ জাতি তার এই উদ্যোগের প্রতি কৃতজ্ঞ। সর্বোপরি উলা একজন অবসরপ্রাপ্ত ৭৮ বছর বয়সী বিধবা। ইচ্ছে করলে অবসর জীবনটাকে আরাম আয়াসে আর দশজনের মতো কাটিয়ে দিতে পারতো। 

উলা তা না করে সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছে, তাকে কেউ জোর করেনি। উলার ভেড়াগুলো যখন জন্ম নেয় তখন সে চেষ্টা করে যেন সেগুলো একান্নবর্তী পরিবার হিসেবে বসবাস করে। যখনই ভেড়ার বাচ্চাগুলোর বয়স দুইমাস হয় এবং তাদের মধ্যে যৌনতার ভাব দেখা যায় তখনই উলা সেগুলোকে পরিবার থেকে পৃথক করে ফেলে। সেইসঙ্গে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয় যেন একই পরিবারভুক্ত ভেড়ার বাচ্চাদের মাঝে যৌনতার সম্পর্ক না ঘটে। 

বিষয়টি উলা আমাকে বলেছে এবং এও বলেছে ভেড়া তো পশু ওরা আপন ভাইবোনের সম্পর্কটা আমাদের মতো বোঝে না। তাই আমি ওদের যৌনতার সম্পর্কটা যেন মধুর হয়। তাই আপ্রাণ চেষ্টা করি সব কিছু সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে। 

উলার চিন্তা-চেতনা আমাকে বেশ আপ্লুত করেছে। তাই মাঝে মাঝে তার সঙ্গে দেখা করি এবং অনেক গল্প করি। বর্তমান বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনাগুলো জানার পর মনে পড়ে গেল উলার কথা। কেউই কি নেই যে উলার মতো দেশের ভেড়াগুলোকে সরিয়ে রাখে। কারণ মানুষ নামের দানবগুলো যেহেতু বুঝতে অক্ষম তখন উলার মতো চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বের খুবই প্রয়োজন।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
 

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

০৪ অক্টোবর, ২০২০
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০