এ কেমন অবিচার?
jugantor
এ কেমন অবিচার?

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

০৪ অক্টোবর ২০২০, ১৪:৩৩:০৯  |  অনলাইন সংস্করণ

কোভিড-১৯ শুরু হয়েছে ২০১৯ সালে। এর শেষ কোথায় এবং কবে তা কেউ জানে না। শুরুতে এটা ছিল সবার কাছেই অচেনা এবং অজানা। কিছুদিন যেতেই হিংস্ররূপে আবির্ভূত হয়ে এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে একের পর এক কেড়ে নিতে শুরু করে মানব জীবন। দূরে সরিয়ে দেয় প্রিয় জনকে। চিহ্নিত হয় ছোঁয়াচে রোগ হিসেবে। আতঙ্কিত হয় সারা বিশ্বের মানুষ।

বিশ্বের মানুষ লকডাউন থেকে শাটডাউন আবার শাটডাউন থেকে স্লোডাউনে চলে যেতে শুরু করে। কয়েক মাস পরে অবস্থা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে বর্তমানে নতুন করে কোভিড-১৯ আবার এসে হাজির হয়েছে ইউরোপের সর্বত্র। পৃথিবীর মানুষ এখন আগের মত আতঙ্কিত নয়; বিরক্ত। কবে হবে এর অবসান কেউ তা জানে না। এখন অপেক্ষা এবং প্রতীক্ষা ভ্যাকসিনের। কে, কবে এবং কখন তা নিয়ে হাজির হবে এমনটি ভরসা নিয়ে দিন গুনছি আমরা মানব জাতি।

আজ সুইডেনে প্রথম বহুদিন পরে গুনিলা বৃদ্ধাশ্রমে এসেছে তার স্বামীকে দেখতে। গুনিলার স্বামী হোকান অসুস্থ এবং তার সাহায্যের দরকার বিধায় গুনিলাকে ছেড়ে সে বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস করছে। তারা দুজনা আলাদা বসবাস করলেও প্রতিদিন তাদের মাঝে দেখা হত। করোনা তাও বহুদিন আগে বন্ধ করে দিয়েছে। আজকের দেখায় গুনিলা না পারল একটু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরতে, না পারল পাশাপাশি বসতে সেই আগের মতো।

একজন সাংবাদিক হোকানকে জিজ্ঞেস করল কেমন লাগছে গুনিলার আগমন? হোকান শুধু বললো চমৎকার। দুজনে বেঁচে থাকা সত্ত্বেও দেখা নাই ছয়টি মাস। বিষয়টি মর্মান্তিক। সব থাকতেও কিছু নেই কেউ নেই, এ কেমন অবিচার!

সুইডেনের মতো এ ধরণের ঘটনা বয়ে চলছে বিশ্বের অনেক দেশে। বাংলাদেশেও এমন সময় যাচ্ছে যেখানে একাকীত্বটি সমাজের চোখে ধরা পড়ছে না। এই তো কিছুদিন আগের কথা আমার পরিচিত একটি ছেলে হঠাৎ বাংলাদেশ থেকে ফোন করেছে।

'কী ব্যাপার কেমন আছো তুমি', জিজ্ঞেস করতেই কেঁদে ফেললো। যতটুকু জানলাম তাতে মনে হলো কোভিড-১৯ এর কারণে সে তার পেশা হারিয়ে বাড়িতে বসে দিন কাটাচ্ছে। না পারছে কাউকে বলতে যে ঘরে একমুঠো চাল নেই, না পারছে কারো কাছে হাত পাততে, লোকে কী বলবে এই ভেবে।

এ ধরণের লাখো লাখো মানুষ নানা সমস্যার মাঝে দিন কাটাচ্ছে। মনের গভীরে নানা দুঃখ কষ্ট নিয়ে কাটছে এভাবে প্রতিদিন অনেকের জীবন। কেউ হয়তো অর্থে কেউ আবার একাকীত্বে। এমন একটি দুর্দিনে আমাদের সবার উচিত হবে পাড়া প্রতিবেশীর খোঁজখবর রাখা। এখনই সময় মানবতার পরিচয় দেয়া। জীবনে এমন সুযোগ হয়তো আর নাও আসতে পারে। বিপদে কারো পাশে দাঁড়ানো, এ এক মহত কাজ যদি এমনটি সুযোগ কেউ পান প্লীজ তার অপব্যবহার করবেন না।

আমি সুইডেনে দেখি আপেলের মতো কত দামি ফল মাটিতে পড়ে রয়েছে খাবারের কেউ নেই। অথচ বাংলাদেশে খাবারের জন্য অনেকে কী সংগ্রামটাই না করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে যেমন খুব কম মানুষ রয়েছে যার কেউ নেই, খুবই একা। কিন্তু পাশ্চাত্যের দেশগুলোর বৃদ্ধাশ্রমে এমনও দিন, সপ্তাহ বা মাস পেরিয়ে যায় অথচ কেউ নেই যে একবার এসে হাই বা বাই বলে।

আমরা দরিদ্র দেশের মানুষ শুধু অর্থের মূল্যায়ন করি বেশি। কারণ ওটার অভাবই গ্রাস করেছে আমাদের মনুষ্যত্বকে। পাশ্চাত্যে অর্থ নয় নিঃসঙ্গতা গ্রাস করছে জীবনকে। সব কিছু দেখে, জেনে এবং শুনে মনে হচ্ছে কোভিড-১৯ শুধু নিতে নয় দিতেও এসেছে।

নতুন করে মনে করিয়ে দিতে যে আমরা বিবেকহীন, মনুষ্যত্বহীন নই। আমরা স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ জাতি। আমরা হাসতে পারি, কাঁদতে পারি। আমরা পরস্পর পরস্পরের সুখ এবং দুঃখে পাশে থাকতে পারি। আমরা অন্ধকারে শুধু জেগে থাকি না। আমরা ঘুমিয়ে পড়ি, যাতে করে সে সময়টি যেমন সহজে পার হয়ে যায়। একই সাথে আমরা ক্লান্তিকে দূর করারও একটি চমৎকার সুযোগ পাই।

ঠিক সেই অন্ধকার কেটে যাবার সঙ্গে সঙ্গে পাই চমৎকার একটি দিনের আলো। কত আশা কত চিন্তা-চেতনা নিয়ে শুরু করি দিনটাকে। শুধুমাত্র ভালো থাকার জন্য। কোভিড-১৯ অন্ধকারের মতো শেষ হয়ে যাবে, শুরু হবে নতুন চেতনা, বেঁচে থাকার চেতনা। এবারের চেতনা যেন সবাইকে নিয়ে হয়। অতীতের যেসব ভুলের কারণে অনেকে একাকী আর ক্ষুধার্ত ছিল সেটা যেন কেউ না থাকে, সেদিকে যেন আমাদের সবার খেয়াল থাকে। ভালো থাকুন, ভালো রাখুন।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

এ কেমন অবিচার?

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
০৪ অক্টোবর ২০২০, ০২:৩৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

কোভিড-১৯ শুরু হয়েছে ২০১৯ সালে। এর শেষ কোথায় এবং কবে তা কেউ জানে না। শুরুতে এটা ছিল সবার কাছেই অচেনা এবং অজানা। কিছুদিন যেতেই হিংস্ররূপে আবির্ভূত হয়ে এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে একের পর এক কেড়ে নিতে শুরু করে মানব জীবন। দূরে সরিয়ে দেয় প্রিয় জনকে। চিহ্নিত হয় ছোঁয়াচে রোগ হিসেবে। আতঙ্কিত হয় সারা বিশ্বের মানুষ। 

বিশ্বের মানুষ লকডাউন থেকে শাটডাউন আবার শাটডাউন থেকে স্লোডাউনে চলে যেতে শুরু করে। কয়েক মাস পরে অবস্থা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে বর্তমানে নতুন করে কোভিড-১৯ আবার এসে হাজির হয়েছে ইউরোপের সর্বত্র। পৃথিবীর মানুষ এখন আগের মত আতঙ্কিত নয়; বিরক্ত। কবে হবে এর অবসান কেউ তা জানে না। এখন অপেক্ষা এবং প্রতীক্ষা ভ্যাকসিনের। কে, কবে এবং কখন তা নিয়ে হাজির হবে এমনটি ভরসা নিয়ে দিন গুনছি আমরা মানব জাতি।

আজ সুইডেনে প্রথম বহুদিন পরে গুনিলা বৃদ্ধাশ্রমে এসেছে তার স্বামীকে দেখতে। গুনিলার স্বামী হোকান অসুস্থ এবং তার সাহায্যের দরকার বিধায় গুনিলাকে ছেড়ে সে বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস করছে। তারা দুজনা আলাদা বসবাস করলেও প্রতিদিন তাদের মাঝে দেখা হত। করোনা তাও বহুদিন আগে বন্ধ করে দিয়েছে। আজকের দেখায় গুনিলা না পারল একটু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরতে, না পারল পাশাপাশি বসতে সেই আগের মতো। 

একজন সাংবাদিক হোকানকে জিজ্ঞেস করল কেমন লাগছে গুনিলার আগমন? হোকান শুধু বললো চমৎকার। দুজনে বেঁচে থাকা সত্ত্বেও দেখা নাই ছয়টি মাস। বিষয়টি মর্মান্তিক। সব থাকতেও কিছু নেই কেউ নেই, এ কেমন অবিচার!  

সুইডেনের মতো এ ধরণের ঘটনা বয়ে চলছে বিশ্বের অনেক দেশে। বাংলাদেশেও এমন সময় যাচ্ছে যেখানে একাকীত্বটি সমাজের চোখে ধরা পড়ছে না। এই তো কিছুদিন আগের কথা আমার পরিচিত একটি ছেলে হঠাৎ বাংলাদেশ থেকে ফোন করেছে।

'কী ব্যাপার কেমন আছো তুমি', জিজ্ঞেস করতেই কেঁদে ফেললো। যতটুকু জানলাম তাতে মনে হলো কোভিড-১৯ এর কারণে সে তার পেশা হারিয়ে বাড়িতে বসে দিন কাটাচ্ছে। না পারছে কাউকে বলতে যে ঘরে একমুঠো চাল নেই, না পারছে কারো কাছে হাত পাততে, লোকে কী বলবে এই ভেবে। 

এ ধরণের লাখো লাখো মানুষ নানা সমস্যার মাঝে দিন কাটাচ্ছে। মনের গভীরে নানা দুঃখ কষ্ট নিয়ে কাটছে এভাবে প্রতিদিন অনেকের জীবন। কেউ হয়তো অর্থে কেউ আবার একাকীত্বে। এমন একটি দুর্দিনে আমাদের সবার উচিত হবে পাড়া প্রতিবেশীর খোঁজখবর রাখা। এখনই সময় মানবতার পরিচয় দেয়া। জীবনে এমন সুযোগ হয়তো আর নাও আসতে পারে। বিপদে কারো পাশে দাঁড়ানো, এ এক মহত কাজ যদি এমনটি সুযোগ কেউ পান প্লীজ তার অপব্যবহার করবেন না।
 
আমি সুইডেনে দেখি আপেলের মতো কত দামি ফল মাটিতে পড়ে রয়েছে খাবারের কেউ নেই। অথচ বাংলাদেশে খাবারের জন্য অনেকে কী সংগ্রামটাই না করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে যেমন খুব কম মানুষ রয়েছে যার কেউ নেই, খুবই একা। কিন্তু পাশ্চাত্যের দেশগুলোর বৃদ্ধাশ্রমে এমনও দিন, সপ্তাহ বা মাস পেরিয়ে যায় অথচ কেউ নেই যে একবার এসে হাই বা বাই বলে। 

আমরা দরিদ্র দেশের মানুষ শুধু অর্থের মূল্যায়ন করি বেশি। কারণ ওটার অভাবই গ্রাস করেছে আমাদের মনুষ্যত্বকে। পাশ্চাত্যে অর্থ নয় নিঃসঙ্গতা গ্রাস করছে জীবনকে। সব কিছু দেখে, জেনে এবং শুনে মনে হচ্ছে কোভিড-১৯ শুধু নিতে নয় দিতেও এসেছে। 

নতুন করে মনে করিয়ে দিতে যে আমরা বিবেকহীন, মনুষ্যত্বহীন নই। আমরা স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ জাতি। আমরা হাসতে পারি, কাঁদতে পারি। আমরা পরস্পর পরস্পরের সুখ এবং দুঃখে পাশে থাকতে পারি। আমরা অন্ধকারে শুধু জেগে থাকি না। আমরা ঘুমিয়ে পড়ি, যাতে করে সে সময়টি যেমন সহজে পার হয়ে যায়। একই সাথে আমরা ক্লান্তিকে দূর করারও একটি চমৎকার সুযোগ পাই। 

ঠিক সেই অন্ধকার কেটে যাবার সঙ্গে সঙ্গে পাই চমৎকার একটি দিনের আলো। কত আশা কত চিন্তা-চেতনা নিয়ে শুরু করি দিনটাকে। শুধুমাত্র ভালো থাকার জন্য। কোভিড-১৯ অন্ধকারের মতো শেষ হয়ে যাবে, শুরু হবে নতুন চেতনা, বেঁচে থাকার চেতনা। এবারের চেতনা যেন সবাইকে নিয়ে হয়। অতীতের যেসব ভুলের কারণে অনেকে একাকী আর ক্ষুধার্ত ছিল সেটা যেন কেউ না থাকে, সেদিকে যেন আমাদের সবার খেয়াল থাকে। ভালো থাকুন, ভালো রাখুন। 

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
 

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম