মৃত্যুদণ্ড দিলেই কি ধর্ষণ বন্ধ হবে
jugantor
মৃত্যুদণ্ড দিলেই কি ধর্ষণ বন্ধ হবে

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

১২ অক্টোবর ২০২০, ১৩:১৭:৩৫  |  অনলাইন সংস্করণ

যৌনতা একটি প্রকৃতিগত অভ্যাস এবং এটা সমস্ত প্রাণীর মধ্যে বিদ্যমান। পশুপাখিরাও চেষ্টা করে তাদের পছন্দের পার্টনারের সঙ্গে যৌনতার সম্পর্ক গড়তে। যৌনতা নারী-পুরুষের জীবনের একটি অন্যতম অধিকার এবং বিনোদন। বর্তমান বিশ্বে যৌনতাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং যে কেউ সহজে ডিজিটালের মাধ্যমে সেটা দেখতে পারছে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে এসব কী অতীতে ছিল না? অবশ্যই ছিল তবে এত খোলামেলাভাবে এর প্রকাশ হয়নি। বিশ্বের মানুষ এখন গণতন্ত্রের বেস্ট প্রাকটিস করার সুযোগ পাচ্ছে আর যার যা খুশি তাই করছে। তবে গণতন্ত্রের যে জিনিসটি বেসিক তা হলো মনের বিরুদ্ধ বা জোর করে কিছু করা বা করানো যাবে না।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের মানুষও গণতন্ত্রের আসল ম্যাসেজটিই মিস করছে। সেটা হলো জোর করে কিছু করা বা করানো যাবে না। এটাই যদি গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র হয় তবে ধর্ষণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যেটা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ সেটা করলে কঠিন শাস্তি হবে এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণ থেকে শুরু করে সব ধরণের কর্মে দুর্নীতি এবং আইনের অপব্যবহার হচ্ছে। সেক্ষেত্রে মানুষ যখন অর্থের বিনিময়ে যৌনতাকে কিনতে ব্যর্থ হয়, তখন ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ধর্ষণ করে। তাদের ধারণা তারা পুরুষ, তাদের ক্ষমতা আছে যেকোনো সময় যেকোনো নারী বা শিশুকে ভোগ করার!

একজন যৌনকর্মীরও অধিকার আছে তিনি কার সঙ্গে যৌনকাজ করবে আর কার সঙ্গে করবে না। একজন যৌনকর্মী যদি ‘না’ করে, তা মানা নাহলে তা হবে ধর্ষণ। একইভাবে একজন স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে সহবাস করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করতেই পারে। স্ত্রীর ইচ্ছার সম্মান না দিয়ে জোর করে সহবাস করা হলে সেটিও হবে ধর্ষণ।

কিন্তু বাংলাদেশের সমাজে এই বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি বলেই ধর্ষণের ঘটনা এত বেশি। ধর্ষকের হাত থেকে তিন বছরের শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। পরিচিতজনদের মাধ্যমে ধর্ষণের ঘটনাও বাড়ছে। সবকিছুর মূলে রয়েছে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের অভাব।

বর্তমানে সমাজে পর্নোগ্রাফির বিস্তার ঘটছে। প্রতিদিন কী পরিমাণ ধর্ষণ হচ্ছে বাংলাদেশে সেটা আমরা জানি? সব থাকতেও সিস্টেমের অভাবে কিছুই মনিটর করা সম্ভব হচ্ছে না। সেই সঙ্গে বিভিন্ন জঘন্য ঘটনা প্রবাহ বয়ে চলেছে যেমন সামাজিক অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার, কর্মহীনতা, স্যাটেলাইটের নেতিবাচক প্রভাব, আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকা, পর্নোগ্রাফির অবাধ প্রসার ইত্যাদি।

ছেলে-মেয়েরা ইন্টারনেটে কোন সাইটে কী দেখছে, বাবা-মায়েরা কী সেদিকে নজর রাখছেন? কারণ পুরো বিষয়টিই সবার কাছে নতুন। সমাজে যা করতে নিষেধ করা হয় সেটার প্রতি আগ্রহ বেশি, বিশেষ করে শিশুদের। সর্বোপরি নারীর প্রতি পুরুষের হীন-দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা। এর সঙ্গে জড়িতরা হয়ে পড়ছে অপ্রতিরোধ্য।

শিশু থেকে কিশোরী, যুবতী থেকে বৃদ্ধা, স্কুল ছাত্রী থেকে পোশাককর্মী, ডাক্তার, আইনজীবী এমন কি ভিখারিনীও রেহাই পাচ্ছে না মানুষরূপী এসব দানবের ছোবল থেকে। ধর্ষকরা শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত থাকছে না, ঘটনা ধামাচাপা দিতে ঘটাচ্ছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড।

ধর্ষিতাদের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করা হচ্ছে, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন হচ্ছে দেশের আনাচে কানাচে। মিছিলে স্লোগান উঠছে অপরাধীর ফাঁসি চাই। একেকটা ঘটনা ঘটে, তারপর গণমাধ্যমসহ সব জায়গায় তুমুল আলোচনা হয়, তারপর একসময় সবকিছু থেমে যায়। কিছু দিন আগে সিনহা হত্যা নিয়ে সারা দেশে হৈচৈ, এখন বড় ঘটনা হচ্ছে ধর্ষণ।

এছাড়াও সমকামিতা এবং বিকৃত যৌন আগ্রহের সৃষ্টি হচ্ছে, সেই সাথে হচ্ছে মূল্যবোধ এবং আদর্শের অবক্ষয়। কারণ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যৌন শিক্ষার ধারণা না থাকায় এমনটি হচ্ছে। ধর্ষণের সময় ধর্ষক মনে করছে তারা এনজয় করছে। পরে দেখা গেল ধর্ষিতাকে মেরে নদীতে ফেলে দিচ্ছে।

পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতাদের মতে, থানায় দায়ের হওয়া মামলা এবং পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে নারী ও শিশু ধর্ষণের প্রকৃত পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে না। অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনায় ভিকটিমের পরিবার সেটা গোপন করার চেষ্টা করে। কিন্তু এরপরও যে তথ্য পাওয়া যায় সেটা ভয়াবহ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সচেতনতার অভাবে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে ধর্ষণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এসব পরিবার সব সময় নানা ধরনের টানাপোড়নের মধ্যে থাকে। এর সুযোগ নেয় এক ধরনের নরপশু। তারা সুযোগ বুঝে এসব পরিবারের শিশুদের নিজের কাছে নেয় এবং অবুঝ শিশুরা তাদের লালসার শিকার হয়।

সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে বেশিরভাগ নারী বিচার চাইতে যান না। আবার যেসব নারী বিচার চাইতে যান, তাদের পুলিশ, প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে যথেষ্ট হেনস্তা হতে হয়। ধর্ষণের অভিযোগগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রমাণ হয় না। এর মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে ঘটনার তদন্ত প্রভাবিত করা।

ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার ওই নারীর সাথে ধর্ষকের বিয়ে দিয়ে অথবা ভুক্তভোগীর পরিবারকে টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করে ফেলা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবার সামাজিকতার ভয়ে বিষয়টি গোপন রাখতে বাধ্য হয়। অনেক মূর্খ মন্তব্য করে কেন একা বাইরে গেল বা রাতে কোথাও গেল এবং কেন উগ্র ধরণের পোশাক পরল ইত্যাদি। রাতে বাইরে গিয়েছে বলেই তাদের ধর্ষণ করতে হবে?

ধর্ষণ বন্ধ করতে প্রতিরোধের চেয়ে প্রতিকার গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি পরিবারে যেমন কন্যা সন্তান আছে, তেমনি ধর্ষকরাও কোনো না কোনো পরিবারের সন্তান। তাই ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজ নির্মূলে প্রতিটি পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে।

ঘটনা যাতে ঘটতেই না পারে, সে জন্য একটি আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করাও জরুরি। আইন বিশেষজ্ঞরা যেন কোনভাবেই ধর্ষকদের হয়ে কাজ না করেন। সময় মতো সঠিক তদন্ত না হওয়া ও প্রসিকিউশন শাখার ব্যর্থতায় নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাগুলোর দ্রুত বিচার হচ্ছে না।

শুধু আইন সংশোধন করে ধর্ষণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড যুক্ত করলেই হবে না, বিচার ও তদন্ত কাঠামোও যুগোপযোগী করা আশু প্রয়োজন। এটি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর বিভিন্ন গণমাধ্যম এমনভাবে খবরটা প্রকাশ বা প্রচার করছে, তাতে ঘর্ষকদের আরও বেশি করে সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনায় ধর্ষকদের মধ্যে সাইকোলজিক্যাল একটি ব্যাপার কাজ করে। কোনো স্থানে একজন ধর্ষণ করলে তা প্রচার হওয়ার পর দেখা যায়, এক নাগাড়ে এখানে-ওখানে সেটা হতেই থাকে। এটা হয় কারণ, যারা এসব করে তারা ঘটনাটির প্রচার দেখে উদ্বুদ্ধ হয়।

এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের খবর প্রকাশের পাশাপাশি মিডিয়াকে এ ধরনের ঘটনা প্রচারে কৌশলী হতে হবে। কারণ যে বা যারা ধর্ষণ করে সে বা তারা মানসিকভাবে অসুস্থ। সর্বোপরি ধর্ষণ প্রতিরোধে সবার সচেতনতা বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজে যথাযথ জ্ঞানচর্চা, নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

মৃত্যুদণ্ড দিলেই কি ধর্ষণ বন্ধ হবে

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
১২ অক্টোবর ২০২০, ০১:১৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

যৌনতা একটি প্রকৃতিগত অভ্যাস এবং এটা সমস্ত প্রাণীর মধ্যে বিদ্যমান। পশুপাখিরাও চেষ্টা করে তাদের পছন্দের পার্টনারের সঙ্গে যৌনতার সম্পর্ক গড়তে। যৌনতা নারী-পুরুষের জীবনের একটি অন্যতম অধিকার এবং বিনোদন। বর্তমান বিশ্বে যৌনতাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং যে কেউ সহজে ডিজিটালের মাধ্যমে সেটা দেখতে পারছে। 

এখন প্রশ্ন হতে পারে এসব কী অতীতে ছিল না? অবশ্যই ছিল তবে এত খোলামেলাভাবে এর প্রকাশ হয়নি। বিশ্বের মানুষ এখন গণতন্ত্রের বেস্ট প্রাকটিস করার সুযোগ পাচ্ছে আর যার যা খুশি তাই করছে। তবে গণতন্ত্রের যে জিনিসটি বেসিক তা হলো মনের বিরুদ্ধ বা জোর করে কিছু করা বা করানো যাবে না। 

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের মানুষও গণতন্ত্রের আসল ম্যাসেজটিই মিস করছে। সেটা হলো জোর করে কিছু করা বা করানো যাবে না। এটাই যদি গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র হয় তবে ধর্ষণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যেটা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ সেটা করলে কঠিন শাস্তি হবে এটাই স্বাভাবিক।
 
কিন্তু বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণ থেকে শুরু করে সব ধরণের কর্মে দুর্নীতি এবং আইনের অপব্যবহার হচ্ছে। সেক্ষেত্রে মানুষ যখন অর্থের বিনিময়ে যৌনতাকে কিনতে ব্যর্থ হয়, তখন ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ধর্ষণ করে। তাদের ধারণা তারা পুরুষ, তাদের ক্ষমতা আছে যেকোনো সময় যেকোনো নারী বা শিশুকে ভোগ করার!
 
একজন যৌনকর্মীরও অধিকার আছে তিনি কার সঙ্গে যৌনকাজ করবে আর কার সঙ্গে করবে না। একজন যৌনকর্মী যদি ‘না’ করে, তা মানা নাহলে তা হবে ধর্ষণ। একইভাবে একজন স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে সহবাস করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করতেই পারে। স্ত্রীর ইচ্ছার সম্মান না দিয়ে জোর করে সহবাস করা হলে সেটিও হবে ধর্ষণ। 

কিন্তু বাংলাদেশের সমাজে এই বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি বলেই ধর্ষণের ঘটনা এত বেশি। ধর্ষকের হাত থেকে তিন বছরের শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। পরিচিতজনদের মাধ্যমে ধর্ষণের ঘটনাও বাড়ছে। সবকিছুর মূলে রয়েছে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের অভাব। 

বর্তমানে সমাজে পর্নোগ্রাফির বিস্তার ঘটছে। প্রতিদিন কী পরিমাণ ধর্ষণ হচ্ছে বাংলাদেশে সেটা আমরা জানি? সব থাকতেও সিস্টেমের অভাবে কিছুই মনিটর করা সম্ভব হচ্ছে না। সেই সঙ্গে বিভিন্ন জঘন্য ঘটনা প্রবাহ বয়ে চলেছে যেমন সামাজিক অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার, কর্মহীনতা, স্যাটেলাইটের নেতিবাচক প্রভাব, আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকা, পর্নোগ্রাফির অবাধ প্রসার ইত্যাদি। 

ছেলে-মেয়েরা ইন্টারনেটে কোন সাইটে কী দেখছে, বাবা-মায়েরা কী সেদিকে নজর রাখছেন? কারণ পুরো বিষয়টিই সবার কাছে নতুন। সমাজে যা করতে নিষেধ করা হয় সেটার প্রতি আগ্রহ বেশি, বিশেষ করে শিশুদের। সর্বোপরি নারীর প্রতি পুরুষের হীন-দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা। এর সঙ্গে জড়িতরা হয়ে পড়ছে অপ্রতিরোধ্য। 

শিশু থেকে কিশোরী, যুবতী থেকে বৃদ্ধা, স্কুল ছাত্রী থেকে পোশাককর্মী, ডাক্তার, আইনজীবী এমন কি ভিখারিনীও রেহাই পাচ্ছে না মানুষরূপী এসব দানবের ছোবল থেকে। ধর্ষকরা শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত থাকছে না, ঘটনা ধামাচাপা দিতে ঘটাচ্ছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। 

ধর্ষিতাদের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করা হচ্ছে, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন হচ্ছে দেশের আনাচে কানাচে। মিছিলে স্লোগান উঠছে অপরাধীর ফাঁসি চাই। একেকটা ঘটনা ঘটে, তারপর গণমাধ্যমসহ সব জায়গায় তুমুল আলোচনা হয়, তারপর একসময় সবকিছু থেমে যায়। কিছু দিন আগে সিনহা হত্যা নিয়ে সারা দেশে হৈচৈ, এখন বড় ঘটনা হচ্ছে ধর্ষণ।

এছাড়াও সমকামিতা এবং বিকৃত যৌন আগ্রহের সৃষ্টি হচ্ছে, সেই সাথে হচ্ছে মূল্যবোধ এবং আদর্শের অবক্ষয়। কারণ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যৌন শিক্ষার ধারণা না থাকায় এমনটি হচ্ছে। ধর্ষণের সময় ধর্ষক মনে করছে তারা এনজয় করছে। পরে দেখা গেল ধর্ষিতাকে মেরে নদীতে ফেলে দিচ্ছে।
 
পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতাদের মতে, থানায় দায়ের হওয়া মামলা এবং পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে নারী ও শিশু ধর্ষণের প্রকৃত পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে না। অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনায় ভিকটিমের পরিবার সেটা গোপন করার চেষ্টা করে। কিন্তু এরপরও যে তথ্য পাওয়া যায় সেটা ভয়াবহ। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, সচেতনতার অভাবে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে ধর্ষণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এসব পরিবার সব সময় নানা ধরনের টানাপোড়নের মধ্যে থাকে। এর সুযোগ নেয় এক ধরনের নরপশু। তারা সুযোগ বুঝে এসব পরিবারের শিশুদের নিজের কাছে নেয় এবং অবুঝ শিশুরা তাদের লালসার শিকার হয়।
 
সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে বেশিরভাগ নারী বিচার চাইতে যান না। আবার যেসব নারী বিচার চাইতে যান, তাদের পুলিশ, প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে যথেষ্ট হেনস্তা হতে হয়। ধর্ষণের অভিযোগগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রমাণ হয় না। এর মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে ঘটনার তদন্ত প্রভাবিত করা।

ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার ওই নারীর সাথে ধর্ষকের বিয়ে দিয়ে অথবা ভুক্তভোগীর পরিবারকে টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করে ফেলা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবার সামাজিকতার ভয়ে বিষয়টি গোপন রাখতে বাধ্য হয়। অনেক মূর্খ মন্তব্য করে কেন একা বাইরে গেল বা রাতে কোথাও গেল এবং কেন উগ্র ধরণের পোশাক পরল ইত্যাদি। রাতে বাইরে গিয়েছে বলেই তাদের ধর্ষণ করতে হবে?
 
ধর্ষণ বন্ধ করতে প্রতিরোধের চেয়ে প্রতিকার গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি পরিবারে যেমন কন্যা সন্তান আছে, তেমনি ধর্ষকরাও কোনো না কোনো পরিবারের সন্তান। তাই ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজ নির্মূলে প্রতিটি পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে। 

ঘটনা যাতে ঘটতেই না পারে, সে জন্য একটি আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করাও জরুরি। আইন বিশেষজ্ঞরা যেন কোনভাবেই ধর্ষকদের হয়ে কাজ না করেন। সময় মতো সঠিক তদন্ত না হওয়া ও প্রসিকিউশন শাখার ব্যর্থতায় নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাগুলোর দ্রুত বিচার হচ্ছে না।

শুধু আইন সংশোধন করে ধর্ষণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড যুক্ত করলেই হবে না, বিচার ও তদন্ত কাঠামোও যুগোপযোগী করা আশু প্রয়োজন। এটি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। 

বর্তমানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর বিভিন্ন গণমাধ্যম এমনভাবে খবরটা প্রকাশ বা প্রচার করছে, তাতে ঘর্ষকদের আরও বেশি করে সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনায় ধর্ষকদের মধ্যে সাইকোলজিক্যাল একটি ব্যাপার কাজ করে। কোনো স্থানে একজন ধর্ষণ করলে তা প্রচার হওয়ার পর দেখা যায়, এক নাগাড়ে এখানে-ওখানে সেটা হতেই থাকে। এটা হয় কারণ, যারা এসব করে তারা ঘটনাটির প্রচার দেখে উদ্বুদ্ধ হয়। 

এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের খবর প্রকাশের পাশাপাশি মিডিয়াকে এ ধরনের ঘটনা প্রচারে কৌশলী হতে হবে। কারণ যে বা যারা ধর্ষণ করে সে বা তারা মানসিকভাবে অসুস্থ। সর্বোপরি ধর্ষণ প্রতিরোধে সবার সচেতনতা বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজে যথাযথ জ্ঞানচর্চা, নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। 

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
 

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম