খিচুড়ি: ইতালি বনাম বাংলাদেশ
jugantor
খিচুড়ি: ইতালি বনাম বাংলাদেশ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

২০ অক্টোবর ২০২০, ১৫:৩৪:৫৭  |  অনলাইন সংস্করণ

কিছুদিন আগে খিচুড়ি রান্না শিখতে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার বিদেশে যাওয়া নিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়ায় বেশ তোলপাড় হয়েছিল। শেষে গ্রহণযোগ্য যুক্তি না দেখাতে পারার কারণে সে প্রোগ্রাম বাতিল হয়ে যায়। খুবই দুঃখের বিষয় যে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এমনটি হয়েছে।

লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রিটের সংযোগস্থলে পিকাডেলি সার্কাস যা বিশ্বের ব্যস্ততম একটি চত্বর। এটি পর্যটকদের কাছে একটি অন্যতম আকর্ষণ। গত কয়েক শতাব্দী ধরে পাল্টে গিয়েছে পিকাডেলি সার্কাসের চরিত্র। ওপর দিয়ে পথচারীদের হাঁটার ব্যবস্থা আর নিচ দিয়ে টিউব রেল স্টেশন তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ লেখক, কমেডিয়ান এবং নির্বাক ছবির জাদুকরী অভিনেতা মিস্টার বিন তার একটি ছবিতে গাড়ি করে লন্ডন ভ্রমণে এসেছিলেন।

হঠাৎ পিকাডেলি সার্কাসে গাড়ি ঢুকিয়ে পড়েছিলেন বিপদে, কারণ তার জানা ছিল না সে কোথায় এবং কোন রাস্তা দিয়ে বের হবেন। সারাদিন গাড়ি নিয়ে সেখানেই ধরতে থাকেন। শেষে পুলিশ তাকে পিকাডেলি সার্কাস থেকে বের হতে সাহায্য করে।

আমাদের জীবনেও অনেক সময় এমনটি ঘটে যখন আমরা জীবনের উদ্দেশ্য কী তা না জানি। উদ্দেশ্যটা জানা থাকলে যত সমস্যাই আসুক না কেন সমাধান পেতে সহজ হবে। আমাদের প্রতিটি চিন্তা চেতনা যদি পূর্বপরিকল্পিত হয়, তাতে ব্যর্থ হলেও শিক্ষণীয় হবে কেন ব্যর্থ হলাম।

খিচুড়ি বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় খাবার যা খুব সহজ উপায়ে। যেমন রান্না করা সম্ভব আবার খেতেও সুস্বাদু। এটা বিভিন্নভাবে রান্না করা যেতে পারে। আমি খিচুড়ির চেয়ে ডাল ভাত খেতে বেশি পছন্দ করি। তবে মাঝে মধ্যে নানা ধরণের সবজি দিয়ে খিচুড়ি রান্না করি।

অনেক সময় গরু, খাসি বা ভেড়ার গোসত দিতেও খিচুড়ি রান্না করে থাকি। বাংলাদেশে নানা ধরণের ডাল পাওয়া যায় বিধায় খিচুড়ি নানাভাবে, নানা স্বাদে এবং নানা রকম মসলা দিয়ে রান্না করা হয়। বাংলাদেশের বাইরে বিশ্বের অন্য কোথাও এত চমৎকার খিচুড়ি রান্না হয় তা আমার জানা নেই। তবে বিশ্বের কিছু কিছু দেশ যেমন ইতালি এবং স্পেনের খাবারের মধ্যে বাংলাদেশের দুটো খাবারের কিছুটা মিল পাওয়া যায়।

আমাদের দেশের বিরানীর সঙ্গে স্পেনের পায়েইয়া (Paella, স্প্যানিশ ভাষায় যখন দুটি L পাশাপাশি থাকে তখন তার উচ্চারণ LL এর পরিবর্তে Y হয়) এবং খিচুড়ির সঙ্গে ইতালির রিসুতো (Risotto) রান্না করার পদ্ধতির কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়, তবে স্বাদে বা গন্ধে নয়।

আজ পায়েইয়া এবং রিসুতো খাবার সম্পর্কে একটু বর্ণনা করব। যদি পছন্দ হয় তবে বাংলাদেশে প্রাইমারি স্কুলের লাঞ্চে এ খাবার দুটো অ্যাড করা যেতে পারে। তাছাড়া ঘরেও এসব মজাদার খাবার রান্না করা সম্ভব।

পায়েইয়া স্পেনের জাতীয় খাবার বললে ভুল হবে না। তবে এটা ভালেন্সিয়া প্রভিন্সের ঐতিহ্যবাহী খাবার। আমরা যেমন বিরানী রান্না করার সময় নানা ধরণের মসলা ব্যবহার করি, স্প্যানিশরাও তাদের পায়েইয়া রান্না করতে নানা ধরনের মসলা ব্যবহার করে। আমি সুইডিশ সামারে পায়েইয়া রান্না করি বাইরের পরিবেশে। আমার পায়েইয়া ঘরের বাইরের পরিবেশে রান্না করতে ভালো লাগে কারণ এতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া যায়।

ইতালিয়ান রিসুতোর সঙ্গে খিচুড়ির তুলনা করা যেতে পারে। তবে রিসুতো রান্না করতে ডাল বা হলুদ ব্যবহার করা হয় না। এদের রান্নার ধরণ দেখলে খিচুড়ির কথা মনে পড়ে যায়। আজ বাসায় রিসুতো রান্না করার সময় ছোটবেলার অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল। রিসুতো রান্না করেছি নানা ধরণের মাশরুম, এসপারাগাস এবং এন্ট্রেকোটে স্টেক (Entrecote steak) দিয়ে। ইতালিতে বহুবার রিসুতো খেয়েছি তবে আমার রান্না করা রিসুতোর মত এত সুস্বাদু হয়নি।

আমি বাংলাদেশের সব ধরণের রান্না করতে পছন্দ করি এবং বাংলা খাবারকেই সব সময় প্রাধান্য দেই। তারপরও আমি বিশ্বের নানা ধরণের খাবার খেতে যেমন পছন্দ করি পাশাপাশি সেগুলো রান্না করতেও চেষ্টা করি। গ্লোবালাইজেশনের যুগে মাল্টিকালচারের সমন্বয় ঘটাতে এগ্রি টু ডিজএগ্রি কনসেপ্টের ওপর রেসপেক্ট থাকতে হবে। নিজের দেশের সব কিছু ভালোবাসতে হবে ঠিকই; একই সাথে মনে রাখতে হবে বিশ্বনাগরিক হতে অ্যাডজাস্ট করে চলাও শিখতে হবে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

খিচুড়ি: ইতালি বনাম বাংলাদেশ

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
২০ অক্টোবর ২০২০, ০৩:৩৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

কিছুদিন আগে খিচুড়ি রান্না শিখতে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার বিদেশে যাওয়া নিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়ায় বেশ তোলপাড় হয়েছিল। শেষে গ্রহণযোগ্য যুক্তি না দেখাতে পারার কারণে সে প্রোগ্রাম বাতিল হয়ে যায়। খুবই দুঃখের বিষয় যে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এমনটি হয়েছে।

লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রিটের সংযোগস্থলে পিকাডেলি সার্কাস যা বিশ্বের ব্যস্ততম একটি চত্বর। এটি পর্যটকদের কাছে একটি অন্যতম আকর্ষণ। গত কয়েক শতাব্দী ধরে পাল্টে গিয়েছে পিকাডেলি সার্কাসের চরিত্র। ওপর দিয়ে পথচারীদের হাঁটার ব্যবস্থা আর নিচ দিয়ে টিউব রেল স্টেশন তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ লেখক, কমেডিয়ান এবং নির্বাক ছবির জাদুকরী অভিনেতা মিস্টার বিন তার একটি ছবিতে গাড়ি করে লন্ডন ভ্রমণে এসেছিলেন। 

হঠাৎ পিকাডেলি সার্কাসে গাড়ি ঢুকিয়ে পড়েছিলেন বিপদে, কারণ তার জানা ছিল না সে কোথায় এবং কোন রাস্তা দিয়ে বের হবেন। সারাদিন গাড়ি নিয়ে সেখানেই ধরতে থাকেন। শেষে পুলিশ তাকে পিকাডেলি সার্কাস থেকে বের হতে সাহায্য করে। 

আমাদের জীবনেও অনেক সময় এমনটি ঘটে যখন আমরা জীবনের উদ্দেশ্য কী তা না জানি। উদ্দেশ্যটা জানা থাকলে যত সমস্যাই আসুক না কেন সমাধান পেতে সহজ হবে। আমাদের প্রতিটি চিন্তা চেতনা যদি পূর্বপরিকল্পিত হয়, তাতে ব্যর্থ হলেও শিক্ষণীয় হবে কেন ব্যর্থ হলাম। 

খিচুড়ি বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় খাবার যা খুব সহজ উপায়ে। যেমন রান্না করা সম্ভব আবার খেতেও সুস্বাদু। এটা বিভিন্নভাবে রান্না করা যেতে পারে। আমি খিচুড়ির চেয়ে ডাল ভাত খেতে বেশি পছন্দ করি। তবে মাঝে মধ্যে নানা ধরণের সবজি দিয়ে খিচুড়ি রান্না করি। 

অনেক সময় গরু, খাসি বা ভেড়ার গোসত দিতেও খিচুড়ি রান্না করে থাকি। বাংলাদেশে নানা ধরণের ডাল পাওয়া যায় বিধায় খিচুড়ি নানাভাবে, নানা স্বাদে এবং নানা রকম মসলা দিয়ে রান্না করা হয়। বাংলাদেশের বাইরে বিশ্বের অন্য কোথাও এত চমৎকার খিচুড়ি রান্না হয় তা আমার জানা নেই। তবে বিশ্বের কিছু কিছু দেশ যেমন ইতালি এবং স্পেনের খাবারের মধ্যে বাংলাদেশের দুটো খাবারের কিছুটা মিল পাওয়া যায়। 

আমাদের দেশের বিরানীর সঙ্গে স্পেনের পায়েইয়া (Paella, স্প্যানিশ ভাষায় যখন দুটি L পাশাপাশি থাকে তখন তার উচ্চারণ LL এর পরিবর্তে Y হয়) এবং খিচুড়ির সঙ্গে ইতালির রিসুতো (Risotto) রান্না করার পদ্ধতির কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়, তবে স্বাদে বা গন্ধে নয়।

আজ পায়েইয়া এবং রিসুতো খাবার সম্পর্কে একটু বর্ণনা করব। যদি পছন্দ হয় তবে বাংলাদেশে প্রাইমারি স্কুলের লাঞ্চে এ খাবার দুটো অ্যাড করা যেতে পারে। তাছাড়া ঘরেও  এসব মজাদার খাবার রান্না করা সম্ভব।

পায়েইয়া স্পেনের জাতীয় খাবার বললে ভুল হবে না। তবে এটা ভালেন্সিয়া প্রভিন্সের ঐতিহ্যবাহী খাবার। আমরা যেমন বিরানী রান্না করার সময় নানা ধরণের মসলা ব্যবহার করি, স্প্যানিশরাও তাদের পায়েইয়া রান্না করতে নানা ধরনের মসলা ব্যবহার করে। আমি সুইডিশ সামারে পায়েইয়া রান্না করি বাইরের পরিবেশে। আমার পায়েইয়া ঘরের বাইরের পরিবেশে রান্না করতে ভালো লাগে কারণ এতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া যায়।

ইতালিয়ান রিসুতোর সঙ্গে খিচুড়ির তুলনা করা যেতে পারে। তবে রিসুতো রান্না করতে ডাল বা হলুদ ব্যবহার করা হয় না। এদের রান্নার ধরণ দেখলে খিচুড়ির কথা মনে পড়ে যায়। আজ বাসায় রিসুতো রান্না করার সময় ছোটবেলার অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল। রিসুতো রান্না করেছি নানা ধরণের মাশরুম, এসপারাগাস এবং এন্ট্রেকোটে স্টেক (Entrecote steak) দিয়ে। ইতালিতে বহুবার রিসুতো খেয়েছি তবে আমার রান্না করা রিসুতোর মত এত সুস্বাদু হয়নি।

আমি বাংলাদেশের সব ধরণের রান্না করতে পছন্দ করি এবং বাংলা খাবারকেই সব সময় প্রাধান্য দেই। তারপরও আমি বিশ্বের নানা ধরণের খাবার খেতে যেমন পছন্দ করি পাশাপাশি সেগুলো রান্না করতেও চেষ্টা করি। গ্লোবালাইজেশনের যুগে মাল্টিকালচারের সমন্বয় ঘটাতে এগ্রি টু ডিজএগ্রি কনসেপ্টের ওপর রেসপেক্ট থাকতে হবে। নিজের দেশের সব কিছু ভালোবাসতে হবে ঠিকই; একই সাথে মনে রাখতে হবে বিশ্বনাগরিক হতে অ্যাডজাস্ট করে চলাও শিখতে হবে। 

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
 

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম