বিশ্ব নাগরিকদের কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই
jugantor
বিশ্ব নাগরিকদের কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৫:৫২:৩৩  |  অনলাইন সংস্করণ

বিশ্ব নাগরিক হতে ওভারঅল কোয়ালিটির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বিশ্ব নাগরিকদের কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই। তারা বিশ্বের যেকোনো জায়গায় বসবাস করতে পারে। অতীতে দেখা গেছে পরিবারের একটি স্থায়ী ঠিকানাসহ সবাই একত্রে বসবাস করছে। বাংলাদেশে যেমন এখনও সবার গ্রামের বাড়িই তার স্থায়ী ঠিকানা। সেক্ষেত্রে বাড়ি মাঠের মধ্যে হোক বা নদীর ধারে হোক কথা নেই, সেখানেই সবাই ঘর দুয়ার তৈরি করে বসবাস করে আসছে।

সুইডেনেও অতীতে এমনটি ছিল। এখনও অনেক পুরনো ঘর দুয়ার দেখলে আমরা দেখতে পাই যেমন বাড়ির টয়লেট, রান্না ঘর ছোট। কিন্তু যদি বর্তমানের ঘর দুয়ার দেখি, দেখা যাবে টয়লেট বড়, রান্নাঘর বড় এবং নানা ধরনের ডিজাইনে তৈরি। যে জিনিসগুলো বেশি লক্ষণীয় বর্তমানে তা হলো বসতবাড়ি তৈরিতে পরিবেশের গুরুত্ব খুব বেশি।

সুইডিশ জাতি ইদানীং পানির ধারে অথবা ন্যাচারের কাছে বসবাস করতে পছন্দ করছে। খেলাধুলার জন্য প্রচুর জায়গা থাকতে হবে, ট্রাফিক থাকবে না, খুব নিরিবিলি পরিবেশ সাথে স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, যোগাযোগের ব্যবস্থা এ দিকগুলোর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

আজীবন একই জায়গায় বসবাস করা ইদানীং সম্ভব নয় নানা কারণে। যেমন কর্ম ক্ষেত্রের ওপর বেশির ভাগ সময় গুরুত্ব দিয়ে কোথায় বসবাস করতে হবে সে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। এরা বেশ কয়েকবার চাকরি পাল্টায়। তা ছাড়া বিয়ে, পার্টনার পরিবর্তন এসব ক্ষেত্রেও এরা পুরোপুরি স্বাধীন।

মূলত কর্ম এবং জীবনসাথীর কারণেই এদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মুভ করা। আমি সুইডেনে আসার পর বিভিন্ন কারণে সাত বার বসতবাড়ি চেঞ্জ করেছি। সেক্ষেত্রে আমার স্থায়ী ঠিকানা সাত বার পরিবর্তন হয়েছে। একজন সুইডিশ তার জীবনে ছয় থেকে নয় বার বসতবাড়ি চেঞ্জ করে।

তাছাড়া বেশিরভাগ সুইডিশের সামার বা উইন্টার হাউজ বা কটেজ রয়েছে যা দেশে বা বিদেশেও থাকতে পারে। ইদানীং বাংলাদেশের মানুষও দেশের বিভিন্ন স্থানে মুভ করা শুরু করেছে মূলত লেখাপড়া এবং কাজকর্মের সুবিধার্থে।

তবে যারা অর্থে বেশি সবল তারা রাজধানীকেন্দ্রিক হতে সাধ্যমতো চেষ্টা করে। কারণ বাংলাদেশের পরিকাঠামোয় শুধুমাত্র সেখানেই সুযোগসুবিধাগুলো বেশি থাকার কারণে সবাই ঢাকাতে বসবাস করতে পছন্দ করে। একটা ধনী দেশে এমনটি সাধারণত দেখা যায় না।

সুইডেনের গ্রাম বা শহর বলে কোনো কথা নেই। যেকোনো জায়গায় বসবাস করা যেতে পারে এবং সব ধরণের সুযোগ সুবিধা রয়েছে তার জন্য। বরং গ্রামের পরিবেশ রাজধানীর চেয়ে বেশ সুস্থ, সহজ এবং সুন্দর। একজন নাগরিকের যা দরকার তা পেতে হলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলে হবে না।

সেক্ষেত্রে সমষ্টিকেন্দ্রিক হতে হবে। সেজন্য দরকার সবার প্রচেষ্টা, যার যার জায়গা থেকে। যে যেকাজই করুক না কেন তাকে ট্যাক্স দিতে হবে। ট্যাক্স দেয়া মানেই নাগরিকের অধিকার পাওয়া। দেশের পরিকাঠামোকে মজবুত করতে হলে সবাইকেই ট্যাক্স দিতে হবে।

সুইডিশ জাতি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। কারণ গণতন্ত্রে তারা নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো সব সময় পেয়ে থাকে। এই মৌলিক অধিকার পাবার পেছনে যে জিনিসটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হোল ট্যাক্স পে করা।

রুচিসম্পন্ন বা বিলাসবহুল জীবন পেতে হলে বসবাস থেকে শুরু করে জীবন সঙ্গি/সঙ্গিনী, পরিবেশ, প্রতিবেশী সবকিছুরই গুরুত্ব রয়েছে। তাই শুধু নিজের কথা ভাবলেই হবে না। সবাইকে নিয়েই বসবাস করার মতো পরিবেশ গড়তে হবে।

বাবা-মা হিসেবে সুইডিশ জাতি কখনও চিন্তিত নয় তাদের ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন তারা কী করবে, কোথায় থাকবে, কাকে বিয়ে করবে ইত্যাদি। কারণ তারা জানে যেখানে বা যে পরিবেশে যাই করুক না কেন, বেসিক যেসব জিনিসের দরকার তা প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে।

অতএব তারা আগেভাগে দুশ্চিন্তা করে সন্তানের জীবনকে মিজারেবল করে তোলে না। সন্তানের জীবনকে মিজারেবল করা বলতে এটাই বোঝাতে চাচ্ছি সে কী হবে বা না হবে এ দায়ভার নয়। বাবা-মা হিসেবে তারা যেটা করে তাহলো সন্তানের দিক নির্দেশনায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় কোনোরকম হস্তক্ষেপ ছাড়া। এটা বাংলাদেশে সম্ভব নয়। দেশের পরিবেশ পরিস্থিতির সর্বাঙ্গীণ উন্নতি না থাকা এর জন্য দায়ী। আর এ কারণেই বাবা-মা সন্তানের জীবনের প্রতিটি স্টেপে ইন্টারফেয়ার করতে বাধ্য হয়।

আমার এ সব বিষয় গুলো তুলে ধরার যে মূল উদ্দেশ্য হলো কোয়ালিটি লাইফ পেতে একটি দেশের জন্য সুশিক্ষা, দুর্নীতিমুক্ত সুস্থ পরিবেশ, নাগরিকের অধিকার এসব কিছুর দরকার। আর সেটা পেতে হলে দেশের পরিকাঠামোকে কোয়ালিটিপূর্ণ করতে হবে। যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে কোয়ালিটির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে কোনো কম্প্রোমাইজ ছাড়া।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

বিশ্ব নাগরিকদের কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
৩০ অক্টোবর ২০২০, ০৩:৫২ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বিশ্ব নাগরিক হতে ওভারঅল কোয়ালিটির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বিশ্ব নাগরিকদের কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই। তারা বিশ্বের যেকোনো জায়গায় বসবাস করতে পারে। অতীতে দেখা গেছে পরিবারের একটি স্থায়ী ঠিকানাসহ সবাই একত্রে বসবাস করছে। বাংলাদেশে যেমন এখনও সবার গ্রামের বাড়িই তার স্থায়ী ঠিকানা। সেক্ষেত্রে বাড়ি মাঠের মধ্যে হোক বা নদীর ধারে হোক কথা নেই, সেখানেই সবাই ঘর দুয়ার তৈরি করে বসবাস করে আসছে। 

সুইডেনেও অতীতে এমনটি ছিল। এখনও অনেক পুরনো ঘর দুয়ার দেখলে আমরা দেখতে পাই যেমন বাড়ির টয়লেট, রান্না ঘর ছোট। কিন্তু যদি বর্তমানের ঘর দুয়ার দেখি, দেখা যাবে টয়লেট বড়, রান্নাঘর বড় এবং নানা ধরনের ডিজাইনে তৈরি। যে জিনিসগুলো বেশি লক্ষণীয় বর্তমানে তা হলো বসতবাড়ি তৈরিতে পরিবেশের গুরুত্ব খুব বেশি। 

সুইডিশ জাতি ইদানীং পানির ধারে অথবা ন্যাচারের কাছে বসবাস করতে পছন্দ করছে। খেলাধুলার জন্য প্রচুর জায়গা থাকতে হবে, ট্রাফিক থাকবে না, খুব নিরিবিলি পরিবেশ সাথে স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, যোগাযোগের ব্যবস্থা এ দিকগুলোর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। 

আজীবন একই জায়গায় বসবাস করা ইদানীং সম্ভব নয় নানা কারণে। যেমন কর্ম ক্ষেত্রের ওপর বেশির ভাগ সময় গুরুত্ব দিয়ে কোথায় বসবাস করতে হবে সে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। এরা বেশ কয়েকবার চাকরি পাল্টায়। তা ছাড়া বিয়ে, পার্টনার পরিবর্তন এসব ক্ষেত্রেও এরা পুরোপুরি স্বাধীন। 

মূলত কর্ম এবং জীবনসাথীর কারণেই এদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মুভ করা। আমি সুইডেনে আসার পর বিভিন্ন কারণে সাত বার বসতবাড়ি চেঞ্জ করেছি। সেক্ষেত্রে আমার স্থায়ী ঠিকানা সাত বার পরিবর্তন হয়েছে। একজন সুইডিশ তার জীবনে ছয় থেকে নয় বার বসতবাড়ি চেঞ্জ করে। 

তাছাড়া বেশিরভাগ সুইডিশের সামার বা উইন্টার হাউজ বা কটেজ রয়েছে যা দেশে বা বিদেশেও থাকতে পারে। ইদানীং বাংলাদেশের মানুষও দেশের বিভিন্ন স্থানে মুভ করা শুরু করেছে মূলত লেখাপড়া এবং কাজকর্মের সুবিধার্থে। 

তবে যারা অর্থে বেশি সবল তারা রাজধানীকেন্দ্রিক হতে সাধ্যমতো চেষ্টা করে। কারণ বাংলাদেশের পরিকাঠামোয় শুধুমাত্র সেখানেই সুযোগসুবিধাগুলো বেশি থাকার কারণে সবাই ঢাকাতে বসবাস করতে পছন্দ করে। একটা ধনী দেশে এমনটি সাধারণত দেখা যায় না। 

সুইডেনের গ্রাম বা শহর বলে কোনো কথা নেই। যেকোনো জায়গায় বসবাস করা যেতে পারে এবং সব ধরণের সুযোগ সুবিধা রয়েছে তার জন্য। বরং গ্রামের পরিবেশ রাজধানীর চেয়ে বেশ সুস্থ, সহজ এবং সুন্দর। একজন নাগরিকের যা দরকার তা পেতে হলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলে হবে না। 

সেক্ষেত্রে সমষ্টিকেন্দ্রিক হতে হবে। সেজন্য দরকার সবার প্রচেষ্টা, যার যার জায়গা থেকে। যে যেকাজই করুক না কেন তাকে ট্যাক্স দিতে হবে। ট্যাক্স দেয়া মানেই নাগরিকের অধিকার পাওয়া। দেশের পরিকাঠামোকে মজবুত করতে হলে সবাইকেই ট্যাক্স দিতে হবে। 

সুইডিশ জাতি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। কারণ গণতন্ত্রে তারা নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো সব সময় পেয়ে থাকে। এই মৌলিক অধিকার পাবার পেছনে যে জিনিসটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হোল ট্যাক্স পে করা। 

রুচিসম্পন্ন বা বিলাসবহুল জীবন পেতে হলে বসবাস থেকে শুরু করে জীবন সঙ্গি/সঙ্গিনী, পরিবেশ, প্রতিবেশী সবকিছুরই গুরুত্ব রয়েছে। তাই শুধু নিজের কথা ভাবলেই হবে না। সবাইকে নিয়েই বসবাস করার মতো পরিবেশ গড়তে হবে। 

বাবা-মা হিসেবে সুইডিশ জাতি কখনও চিন্তিত নয় তাদের ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন তারা কী করবে, কোথায় থাকবে, কাকে বিয়ে করবে ইত্যাদি। কারণ তারা জানে যেখানে বা যে পরিবেশে যাই করুক না কেন, বেসিক যেসব জিনিসের দরকার তা প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে। 

অতএব তারা আগেভাগে দুশ্চিন্তা করে সন্তানের জীবনকে মিজারেবল করে তোলে না। সন্তানের জীবনকে মিজারেবল করা বলতে এটাই বোঝাতে চাচ্ছি সে কী হবে বা না হবে এ দায়ভার নয়। বাবা-মা হিসেবে তারা যেটা করে তাহলো সন্তানের দিক নির্দেশনায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় কোনোরকম হস্তক্ষেপ ছাড়া। এটা বাংলাদেশে সম্ভব নয়। দেশের পরিবেশ পরিস্থিতির সর্বাঙ্গীণ উন্নতি না থাকা এর জন্য দায়ী। আর এ কারণেই বাবা-মা সন্তানের জীবনের প্রতিটি স্টেপে ইন্টারফেয়ার করতে বাধ্য হয়। 

আমার এ সব বিষয় গুলো তুলে ধরার যে মূল উদ্দেশ্য হলো কোয়ালিটি লাইফ পেতে একটি দেশের জন্য সুশিক্ষা, দুর্নীতিমুক্ত সুস্থ পরিবেশ, নাগরিকের অধিকার এসব কিছুর দরকার। আর সেটা পেতে হলে দেশের পরিকাঠামোকে কোয়ালিটিপূর্ণ করতে হবে। যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে কোয়ালিটির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে কোনো কম্প্রোমাইজ ছাড়া।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
 

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম