এখনও প্রেসক্রিপশন হাতে লিখতে হবে কেন?
jugantor
এখনও প্রেসক্রিপশন হাতে লিখতে হবে কেন?

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

০৩ জানুয়ারি ২০২১, ১৩:১৩:৪০  |  অনলাইন সংস্করণ

এতগুলো বছর কেটে গেল বিদেশে, আমি ভুলিনি আমার প্রিয় মাতৃভূমিকে এবং আমার ভালোবাসাও কমেনি আমার দেশের জন্য। বাংলাদেশের কথা উঠতেই ছোটবেলায় ফিরে যাই। কারণ একটাই, ছোটবেলায় সেখানে থেকেছি, যা দেখার দেখেছি, যা শোনার শুনেছি, যা শেখার শিখেছি। পরে দেশ ছেড়েছি, বিদেশের পরিবেশ পরিস্থিতি দেখছি।

এখানের সমাজ এবং শিক্ষাব্যবস্থা দেখছি, শুনছি এবং জানছি। প্রতিদিন নতুন করে বাংলাদেশে ফিরে যাই আর ভাবি আমাদের এটা, সেটা, ওটা আছে কি? কেমন আছে বা কেমন হওয়া উচিত ইত্যাদি।

ইংরেজিতে বলে বেঞ্চ মার্কিং করা বা তুলনা করা। তুলনা করা মানেই পরিবর্তনের প্রবণতা যোগানো। যদি মনে করি যেমন আছি তেমন থাকতে চাই, তাহলে পরিবর্তনের দরকার নেই। কিন্তু যদি গুড টু বেটার হতে চাই তবে তুলনা করতে হবে। আমি সাহিত্যিক নই, আমি যেটা ভালো সেটার পূজারি। আর তাই চেষ্টা করি সেটা তুলে ধরতে আমার লেখার মাধ্যমে শেয়ার ভ্যালু কনসেপ্ট থেকে।

আজ বছরের তৃতীয় দিন, বসে টিভি দেখছি হঠাৎ মেসেঞ্জারে নিচের টেক্সটি নজরে পড়ল, বাংলাদেশের এত বড় একজন ডাক্তার, তার প্রেসক্রিপশন দেখেন, কী লিখেছে কোনো ফার্মেসিই পড়তে পারে না, আবার ডাক্তারের কাছে জানতে চাইলেও তিনি বিরক্তবোধ করেন। এই প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে তাহলে রোগী কিভাবে ওষুধ পাবে আর কীভাবেই বা খাবে? যদি পারেন তাহলে দয়া করে বিষয়টি একটু লিখে পত্রিকায় দেয়ার ব্যবস্থা করেন। কারণ এসব ডাক্তার সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকেন, ফিস ঠিকই এক থেকে দেড় হাজার টাকা নেন। রোগীকে সময় দেন না, অন্যদিকে তার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া যোগাযোগ করারও উপায় থাকে না। তার মানে তাকে আবার নতুন করে ভিজিট দিয়ে দেখাতে হবে। অনেকে হয়তো গ্রাম থেকে শহরে আসেন ডাক্তার দেখাতে এবং প্রেসক্রিপশন নিয়ে গ্রামের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে চায়। পরে ওষুধ কিনতে গেলে তার প্রেসক্রিপশন পড়তে না পারার কারণে ওষুধই কেনা হয় না। মস্তবড় ডাক্তার অথচ তার প্রেসক্রিপশন পড়ার সাধ্য কারো নেই। প্লিজ কিছু একটা করেন।

লেখাটি লিখেছেন আশরাফুর রহমান, সমাজের একজন সৃজনশীল ব্যক্তি। আমি সুইডেনের ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন দেখেছি, বেশিরভাগ সময় ইলেক্ট্রনিক, আবার কখনও বা ম্যানুয়েল, যেটাই হোক না কেন পড়তে কখনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের ডাক্তারদের বেশিরভাগই এভাবেই প্রেসক্রিপশন লিখে থাকেন।

এটা দেখার পর সেই ছোটবেলার বাংলাদেশে ফিরে গেলাম। ওমা এ দেখি সেই আগের মতই! তাহলে দেশের ডাক্তারদের কি কোনই পরিবর্তন হয়নি? অবশ্যই হয়েছে, তা সত্ত্বেও এমন ধরণের উদ্ভট ঘটনা প্রায়ই নজর কেড়ে নেয়।

শুনেছি সরকার কড়া নির্দেশ জারি করেছে প্রেসক্রিপশন লেখার উপরে। ওষুধের নাম এমনভাবে লিখতে হবে যাতে সেটি সহজেই পড়া যায়। তা সত্ত্বেও কেন এমনটি প্রায়ই হয়? কী কারণ থাকতে পারে এর পেছনে?

আমরা নিশ্চিত যে ডাক্তারি যারা পড়ে তারা দেশের সেরা শিক্ষার্থী এবং তাদের পরীক্ষার ফলাফল সেই শিশুশিক্ষা থেকেই ভালো। তারা তাদের শিক্ষা জীবনে পরীক্ষা দিয়েই মেধা তালিকার শীর্ষ স্থানগুলো বরাবরই দখল করেছে। সেক্ষেত্রে যদি তাদের লেখা না পড়া যেত তাহলে কি তারা সেরা শিক্ষার্থী হতে পারত? নিশ্চয় না, তাহলে কেন তাদের এই অধঃপতন?

মনে রাখতে হবে এটা বাংলাদেশের সব ডাক্তারদের ক্ষেত্রেই যে ঘটে তা নয়। এ ধরণের অধঃপতনের পেছনে কারণ একটিই তা হলো প্রেসার; পরিবারের প্রেসার, সমাজের প্রেসার সঙ্গে প্রতিদিন সেভেন ইলেভেন রোগী দেখা যা তাদের ওপর একটি অমানবিক প্রেসার।

ফলে ডাক্তারি পেশার উপর যে শখ তাদের ছিল তা এখন তিলে তিলে ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে অর্থ আর স্বার্থ এই পেশাকে পুরো গ্রাস করে ফেলেছে। একটি রোগীর জন্য দশটি মিনিটও সময় ব্যয় করার মত মন-মানসিকতা বেশির ভাগ ডাক্তারের এখন নেই। যার ফলে দ্রুততার মাঝে নানা ধরনের রোগী দেখা এবং তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ওষুধের নামগুলো প্রেসক্রিপশনে তুলে ধরে, যা পড়ার ক্ষমতা কারো থাকে না।

একজন রোগী যখন ডাক্তারের কাছে যায় তার কাছে ডাক্তারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যদি তেমনটি না হয় ডাক্তারের ক্ষেত্রে তবে পাবে কি রোগী তার সঠিক চিকিৎসা? যদি কর্মের উপর ভালোবাসা না থাকে তবে সে পেশা থেকে সরে যাওয়া শ্রেয় নয় কি?

রোগীদের সেবা দেয়া এবং রোগীর জটিলতাকে সহজ করাই একজন ডাক্তারের কাজ। বৃক্ষ তোমার নাম কী ফলে পরিচয়। বাংলাদেশের ডাক্তারদের পরিচয় তাদের কর্মে এবং আচরণে সেটা ভুলে গেলে চলবে কি?

নিজের প্রতি, সমাজের প্রতি এবং দেশের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য পালন করতে হলে সব বিষয়ের উপর খেয়াল রাখতে হবে। যাকে বলা যেতে পারে হলিস্টিক ভিউ অফ পার্সপেক্টিভ। সচেতন জাতি অজুহাত নয় খোঁজে সমাধান। আসুন সমাধান করি সমস্যার। শুরু হোক না সেটা সুন্দর একটি প্রেসক্রিপশন লেখার মাধ্যমে, যেটা হোক সর্বজনস্বীকৃত সহজ এবং বোধগম্য। আল্লাহ আমাদের সহজ এবং সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুণ, আমিন।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

এখনও প্রেসক্রিপশন হাতে লিখতে হবে কেন?

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
০৩ জানুয়ারি ২০২১, ০১:১৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

এতগুলো বছর কেটে গেল বিদেশে, আমি ভুলিনি আমার প্রিয় মাতৃভূমিকে এবং আমার ভালোবাসাও কমেনি আমার দেশের জন্য। বাংলাদেশের কথা উঠতেই ছোটবেলায় ফিরে যাই। কারণ একটাই, ছোটবেলায় সেখানে থেকেছি, যা দেখার দেখেছি, যা শোনার শুনেছি, যা শেখার শিখেছি। পরে দেশ ছেড়েছি, বিদেশের পরিবেশ পরিস্থিতি দেখছি।

এখানের সমাজ এবং শিক্ষাব্যবস্থা দেখছি, শুনছি এবং জানছি। প্রতিদিন নতুন করে বাংলাদেশে ফিরে যাই আর ভাবি আমাদের এটা, সেটা, ওটা আছে কি? কেমন আছে বা কেমন হওয়া উচিত ইত্যাদি। 

ইংরেজিতে বলে বেঞ্চ মার্কিং করা বা তুলনা করা। তুলনা করা মানেই পরিবর্তনের প্রবণতা যোগানো। যদি মনে করি যেমন আছি তেমন থাকতে চাই, তাহলে পরিবর্তনের দরকার নেই। কিন্তু যদি গুড টু বেটার হতে চাই তবে তুলনা করতে হবে। আমি সাহিত্যিক নই, আমি যেটা ভালো সেটার পূজারি। আর তাই চেষ্টা করি সেটা তুলে ধরতে আমার লেখার মাধ্যমে শেয়ার ভ্যালু কনসেপ্ট থেকে। 

আজ বছরের তৃতীয় দিন, বসে টিভি দেখছি হঠাৎ মেসেঞ্জারে নিচের টেক্সটি নজরে পড়ল, বাংলাদেশের এত বড় একজন ডাক্তার, তার প্রেসক্রিপশন দেখেন, কী লিখেছে কোনো ফার্মেসিই পড়তে পারে না, আবার ডাক্তারের কাছে জানতে চাইলেও তিনি বিরক্তবোধ করেন। এই প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে তাহলে রোগী কিভাবে ওষুধ পাবে আর কীভাবেই বা খাবে? যদি পারেন তাহলে দয়া করে বিষয়টি একটু লিখে পত্রিকায় দেয়ার ব্যবস্থা করেন। কারণ এসব ডাক্তার সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকেন, ফিস ঠিকই এক থেকে দেড় হাজার টাকা নেন। রোগীকে সময় দেন না, অন্যদিকে তার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া যোগাযোগ করারও উপায় থাকে না। তার মানে তাকে আবার নতুন করে ভিজিট দিয়ে দেখাতে হবে। অনেকে হয়তো গ্রাম থেকে শহরে আসেন ডাক্তার দেখাতে এবং প্রেসক্রিপশন নিয়ে গ্রামের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে চায়। পরে ওষুধ কিনতে গেলে তার প্রেসক্রিপশন পড়তে না পারার কারণে ওষুধই কেনা হয় না। মস্তবড় ডাক্তার অথচ তার প্রেসক্রিপশন পড়ার সাধ্য কারো নেই। প্লিজ কিছু একটা করেন।

লেখাটি লিখেছেন আশরাফুর রহমান, সমাজের একজন সৃজনশীল ব্যক্তি। আমি সুইডেনের ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন দেখেছি, বেশিরভাগ সময় ইলেক্ট্রনিক, আবার কখনও বা ম্যানুয়েল, যেটাই হোক না কেন পড়তে কখনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের ডাক্তারদের বেশিরভাগই এভাবেই প্রেসক্রিপশন লিখে থাকেন। 

এটা দেখার পর সেই ছোটবেলার বাংলাদেশে ফিরে গেলাম। ওমা এ দেখি সেই আগের মতই! তাহলে দেশের ডাক্তারদের কি কোনই পরিবর্তন হয়নি? অবশ্যই হয়েছে, তা সত্ত্বেও এমন ধরণের উদ্ভট ঘটনা প্রায়ই নজর কেড়ে নেয়। 

শুনেছি সরকার কড়া নির্দেশ জারি করেছে প্রেসক্রিপশন লেখার উপরে। ওষুধের নাম এমনভাবে লিখতে হবে যাতে সেটি সহজেই পড়া যায়। তা সত্ত্বেও কেন এমনটি প্রায়ই হয়? কী কারণ থাকতে পারে এর পেছনে?
 
আমরা নিশ্চিত যে ডাক্তারি যারা পড়ে তারা দেশের সেরা শিক্ষার্থী এবং তাদের পরীক্ষার ফলাফল সেই শিশুশিক্ষা থেকেই ভালো। তারা তাদের শিক্ষা জীবনে পরীক্ষা দিয়েই মেধা তালিকার শীর্ষ স্থানগুলো বরাবরই দখল করেছে। সেক্ষেত্রে যদি তাদের লেখা না পড়া যেত তাহলে কি তারা সেরা শিক্ষার্থী হতে পারত? নিশ্চয় না, তাহলে কেন তাদের এই অধঃপতন? 

মনে রাখতে হবে এটা বাংলাদেশের সব ডাক্তারদের ক্ষেত্রেই যে ঘটে তা নয়। এ ধরণের অধঃপতনের পেছনে কারণ একটিই তা হলো প্রেসার; পরিবারের প্রেসার, সমাজের প্রেসার সঙ্গে প্রতিদিন সেভেন ইলেভেন রোগী দেখা যা তাদের ওপর একটি অমানবিক প্রেসার। 

ফলে ডাক্তারি পেশার উপর যে শখ তাদের ছিল তা এখন তিলে তিলে ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে অর্থ আর স্বার্থ এই পেশাকে পুরো গ্রাস করে ফেলেছে। একটি রোগীর জন্য দশটি মিনিটও সময় ব্যয় করার মত মন-মানসিকতা বেশির ভাগ ডাক্তারের এখন নেই। যার ফলে দ্রুততার মাঝে নানা ধরনের রোগী দেখা এবং তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ওষুধের নামগুলো প্রেসক্রিপশনে তুলে ধরে, যা পড়ার ক্ষমতা কারো থাকে না। 

একজন রোগী যখন ডাক্তারের কাছে যায় তার কাছে ডাক্তারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যদি তেমনটি না হয় ডাক্তারের ক্ষেত্রে তবে পাবে কি রোগী তার সঠিক চিকিৎসা? যদি কর্মের উপর ভালোবাসা না থাকে তবে সে পেশা থেকে সরে যাওয়া শ্রেয় নয় কি?
 
রোগীদের সেবা দেয়া এবং রোগীর জটিলতাকে সহজ করাই একজন ডাক্তারের কাজ। বৃক্ষ তোমার নাম কী ফলে পরিচয়। বাংলাদেশের ডাক্তারদের পরিচয় তাদের কর্মে এবং আচরণে সেটা ভুলে গেলে চলবে কি? 

নিজের প্রতি, সমাজের প্রতি এবং দেশের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য পালন করতে হলে সব বিষয়ের উপর খেয়াল রাখতে হবে। যাকে বলা যেতে পারে হলিস্টিক ভিউ অফ পার্সপেক্টিভ। সচেতন জাতি অজুহাত নয় খোঁজে সমাধান। আসুন সমাধান করি সমস্যার। শুরু হোক না সেটা সুন্দর একটি প্রেসক্রিপশন লেখার মাধ্যমে, যেটা হোক সর্বজনস্বীকৃত সহজ এবং বোধগম্য। আল্লাহ আমাদের সহজ এবং সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুণ, আমিন।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
 

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
২৮ জানুয়ারি, ২০২১