২০২১ সালেও ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ
jugantor
২০২১ সালেও ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

২৬ জানুয়ারি ২০২১, ১৪:৫৫:২২  |  অনলাইন সংস্করণ

দেশ-বিদেশ ঘুরি আর অতীতের মানুষের শিল্পকর্ম দেখে বিস্ময়ে হতবাক হই। তারা কীভাবে এত সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করত? তখন তো সব কিছু আজকের মত ছিল না। তাজমহলের দিকে তাকাই আর ভাবি কী চমৎকার! কী চমৎকার!! সবকিছু মিলিয়ে কী অপূর্ব দৃশ্য! আমি মনে করি মানুষ সব সময়ই ক্রিয়েটিভ ছিল, ছিল যুগোপযোগী। যার ফলে ধাপে ধাপে মানুষ জাতির চাহিদার ধরণের পরিবর্তনের সঙ্গে চিন্তাচেতনারও পরিবর্তন হয়েছে। তবে প্রয়োজনের চেয়ে প্রয়োজনের চাপ মানুষ জাতিকে সামনের দিকে এগোতেই বেশি সাহায্য করেছে।

অনেকেই বলবে, বিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে চিকিৎসা বা প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে। আমি অন্যভাবে বর্ণনা করবো, তা হল সমস্যা এবং চাপ আমাদেরকে বাধ্য করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে। বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভালো অগ্রগতি হয়েছে সত্ত্বেও করোনাভাইরাস ভয়াবহ রূপ নিয়ে মানুষ জাতিকে চাপের মধ্যে রেখেছে। করোনা মহামারির চাপ মানুষ জাতিকে বাধ্য করছে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে সামনের দিকে নিতে। করোনাভাইরাসের যাত্রা শুরু চীনের উহান শহর থেকে। আর সে যাত্রা শেষ কোথায়, কখন, কীভাবে সেটা আমাদের অজানা।

মহামারির ইতিহাস মানব সভ্যতার মতোই প্রাচীন। বিভিন্ন সময় সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায়, কখনও আবার বিশ্বব্যাপী। প্লেগ, কলেরা, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটিবসন্ত বিভিন্ন রোগ নানা সময়ে মহামারির আকার নিয়েছে। আসুন কিছু মহামারি নিয়ে স্মৃতিচারণ করি।

রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ান প্লেগের নামে নামকরণ করা হয় প্লেগ রোগের। ইঁদুরের মাধ্যমে চীন ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ব্যাকটেরিয়াজনিত এই রোগের উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করেন। সমুদ্রপথে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোতে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণ নেয় এই মহামারি। বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর সেই সময়কার জনসংখ্যার ১০ ভাগ এই মহামারিতে মারা যায়। তখন বহু মানুষের প্রাণহানির কারণে শ্রমিক পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। অবসান ঘটে ইউরোপের ভূমিদাস ব্যবস্থার। বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের ভালো মজুরি হয়, তাদের জীবনমানের পরিবর্তন ঘটে। এই ধাক্কায় সস্তা শ্রমের অভাব প্রযুক্তির উদ্ভাবনকেও এগিয়ে দেয়।

কলেরা রোগ ১৮১৭ সাল থেকে আজ অবধি বিদ্যমান সারাবিশ্বে। তবে শুরুতে বিভিন্ন দফায় কলেরা ছড়িয়ে এ পর্যন্ত সাতবার তা বৈশ্বিক মহামারির রূপ নিয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতেও লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছে কলেরা মহামারির কারণে। এর চিকিৎসায় স্যালাইন ও খাবার স্যালাইন পেতে দেড় শতকের বেশি সময় লেগে যায়। এখনও প্রতি বছর এই রোগে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশের যশোরে এই রোগের প্রাদুর্ভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটতে থাকে। আমার বাবা-মার প্রথম সন্তানটি চার বছর বয়সে মারা যায়, সে প্রায় ৭০ বছর আগের কথা।

আধুনিক যুগের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারির রোগটি হচ্ছে ১৯১৮ সালে ধরা পড়া স্প্যানিশ ফ্লু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যেখানে পাঁচ বছরে ১ কোটি ১৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, সেখানে স্প্যানিশ ফ্লুতে মাত্র দুই বছরে মারা যায় ২ কোটি মানুষ। দক্ষিণ সাগর থেকে উত্তর মেরু পর্যন্ত ৫০ কোটির মত মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। তাদের এক পঞ্চমাংশের মৃত্যু ঘটে, অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী বিলুপ্তির পথে চলে যায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিকদের গাদাগাদি করে থাকা এবং যুদ্ধকালীন অপুষ্টি এই রোগের বিস্তার ও প্রাণহানি বাড়িয়ে তোলে। স্প্যানিশ ফ্লুর কারণ ছিল এইচ১এন১ ভাইরাস। স্প্যানিশ ফ্লু যখন মহামারিতে রূপ নেয়, তখন বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম সেই সংবাদ প্রচারে বাধা-নিষেধ আরোপ করলেও স্পেনের মিডিয়া ফলাও করে এই ফ্লুর প্রাদুর্ভাবের কথা প্রচার করেছিল। তাই এই মহামারির নাম হয়ে যায় স্প্যানিশ ফ্লু, যদিও এর প্রভাব ছিল পুরো ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকাজুড়েই।

বিশ্বে ইনফ্লুয়েঞ্জার ধাক্কার আরেক নাম এশিয়ান ফ্লু। এইচ২এন২ ভাইরাস ঘটিত এই ইনফ্লুয়েঞ্জা চীনে দেখা দেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে যুক্তরাজ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এশিয়ান ফ্লুতে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মারা গিয়েছিল ১ লাখ ১৬ হাজার মানুষ। পরে ভ্যাকসিন দিয়ে ওই মহামারি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল।

প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে গুটি বসন্ত ছিল পৃথিবীতে। চতুর্থ শতকে চীনের এমন এক রোগের সবচেয়ে পুরনো লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় যা গুটি বসন্তের সঙ্গে হুবহু মিল খায়। ষষ্ঠ শতক থেকে অষ্টাদশ শতক নাগাদ বিশ্বজুড়ে এই রোগের দাপট ছিল। শতকের পর শতক বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রাণহানি ঘটনার পরে এটি পৃথিবী থেকে একেবারে বিদায় নিয়েছে টিকার কারণে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভাইরাস- এইচআইভি প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৮০র দশকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বর্তমানে আনুমানিক তিন কোটি ৬৯ লাখের বেশি মানুষের দেহে এই ভাইরাস রয়েছে। বিশ্বজুড়ে এইডসে প্রাণ হারিয়েছেন তিন কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ। এখনও চিকিৎসা আবিষ্কার না হওয়া এই রোগ ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক। ধারণা করা হয় ১৯২০ এর দশকে পশ্চিম আফ্রিকায় শিম্পাঞ্জি থেকে এইচআইভি ভাইরাস মানুষের দেহে যায়। এরপর ভাইরাসটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উনিশ শতকের শেষ দিকে বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেয়। বর্তমানে ৩৬.৯ মিলিয়ন মানুষের দেহে এই ভাইরাস রয়েছে। চার দশকেও এই রোগের প্রতিকার আবিষ্কার হয়নি। তবে নব্বই দশকে কিছু ওষুধ বেরিয়েছে যাতে সেগুলো নিয়ে আক্রান্তরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন।

একুশ শতকে প্রথম যে সংক্রামক রোগ আতঙ্ক হয়ে এসেছিল তার নাম ‘সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম’- সার্সও; এটিও এক ধরনের করোনাভাইরাস। প্রথম সার্স আক্রান্ত রোগী মিলেছিল চীনেই। বিশ্ব ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়। ফ্লু উপসর্গের এই রোগে প্রায় ২৬টি দেশে আক্রান্ত হয়েছিল ৮ হাজারের বেশি মানুষ; মারা গিয়েছিল অন্তত ৮০০ জন। তবে মানব শরীরে কী করে এই জীবাণুর সংক্রমণ ঘটেছিল সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বায়ুবাহিত এ রোগের জীবাণু সহজেই ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম বলে জনমনে সংক্রমণের আশঙ্কাটা ছিল বেশি। এশিয়ার কিছু অংশসহ ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় সার্স ছড়িয়ে পড়ে।

২০০৩ সালে সার্সের প্রাদুর্ভাবের সময় সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সার্সের জীবাণু দেহে প্রবেশ করলে প্রাথমিকভাবে মাথাব্যথা, জ্বর থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে শুষ্ক কাশি শুরু হয়, যা এক সময় নিউমোনিয়ায় রূপ নেয়। মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী সার্স নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তারপর প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ দেখা দেয় ১৯৭৬ সালে, একইসঙ্গে কঙ্গো ও দক্ষিণ সুদানের দুটি অঞ্চলে। পরে ইবোলা নদীর তীরবর্তী একটি গ্রামে এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে ভাইরাসটি ইবোলা নাম পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, ভয়াবহ এই রোগে মৃত্যু হার ৫০ শতাংশের মতো। ১৯৭৬ সালে ইবোলা প্রথম শনাক্ত হলেও এর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ২০১৪-২০১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকায়।

২০১৪ সালে বিশ্বে এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়ায় ইবোলা ভাইরাস। এই ভাইরাসের প্রভাব পশ্চিম আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও বিভিন্ন সূত্রে ইবোলা রোগী বা সন্দেহভাজন আক্রান্ত চিহ্নিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দূরবর্তী ভূখণ্ডেও। বর্তমানে ইবোলার টিকা দেওয়া হচ্ছে।

‌২০২০ সাল শুরুর আগ মুহূর্তে চীনের উহানে যে নতুন ভাইরাস বাসা বেঁধেছিল মানুষের শরীরে, সেই ভাইরাস লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিল বছরজুড়ে। বছরব্যাপী দুনিয়াজুড়ে আতঙ্ক হয়ে থাকা এই ভাইরাস নাম পেয়েছে নভেল করোনাভাইরাস (সার্স সিওভি-২), আর রোগের নাম হয়েছে কভিড-১৯। এ যাবত পৃথিবীতে যত মহামারি এসেছে তার মধ্যে করোনাভাইরাসই সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়েছে। এরই মধ্যে বিশ্বে এই রোগে আট কোটির বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে সাড়ে ১৭ লাখের বেশি মানুষের।

স্বস্তির খবর এই নতুন করোনাভাইরাসের টিকা এরইমধ্যে অনেক দেশে প্রয়োগ করা শুরু হয়েছে। তবে যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশে এই ভাইরাসের নতুন ধরন শনাক্ত হয়েছে, যা আবার বিজ্ঞানীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারি বছর পার করলেও জীবাণুটি এখনও দুর্বল হয়নি। ভাইরাস থেকে যেসব রোগ মহামারি আকারে ছড়ায় সেগুলো বিভিন্ন কারণে এক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে করোনাভাইরাস দুর্বল হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

এটা ছিল মোটামুটি ঘটনা প্রবাহ। সব রোগের মূলে জড়িত রয়েছে বিশ্বযুদ্ধের কিছু কারণ। চীন ও আফ্রিকা থেকে বেশির ভাগ রোগের শুরু। কী কারণ জড়িত সেটা আমার লেখার মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হচ্ছে বিপদ বা রোগব্যাধি যখন এলাকাভিত্তিক দেখা দেয় তখন ন্যূনতম সাহায্য গোটা বিশ্বের থেকে আসে। যখন রোগের মাত্রা সারা পৃথিবী জুড়ে দেখা যায় তখন চাপের কারণে সবার সক্রিয় প্রচেষ্টায় যত কঠিন রোগই হোক না কেন মানুষ জাতি সেটার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে। এবারেরও কভিড-১৯ তা প্রমাণ করতে যাচ্ছে।

সেক্ষেত্রে আমার ভাবনা থেকে একটিই প্রশ্ন, কেন খাবারের অভাবে বিশ্বে লাখো লাখো মানুষ মারা যাচ্ছে? পুষ্টির অভাবে জটিল এবং কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে বিশ্ব দরবারে হাত পেতে বসে আছে। কই কেউ তো কভিড-১৯ দূর করার মত ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষুধা দূর করতে চেষ্টা করছি না? এই ক্ষুধা যদি কভিড-১৯ এর মত সারা বিশ্বজুড়ে থাকতো তাহলে সমস্যার সমাধান এতদিনে হয়ে যেত। করোনাভাইরাস তাহলে এমনটি শিক্ষা দিতে এসেছে পৃথিবীর মানুষকে; সেটা হতে পারে লাখো লাখো না খেতে পারা ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ, আমরা যেন করোনার মত তারও সমাধান করি, সুনার বেটার।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

২০২১ সালেও ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
২৬ জানুয়ারি ২০২১, ০২:৫৫ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

দেশ-বিদেশ ঘুরি আর অতীতের মানুষের শিল্পকর্ম দেখে বিস্ময়ে হতবাক হই। তারা কীভাবে এত সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করত? তখন তো সব কিছু আজকের মত ছিল না। তাজমহলের দিকে তাকাই আর ভাবি কী চমৎকার! কী চমৎকার!! সবকিছু মিলিয়ে কী অপূর্ব দৃশ্য! আমি মনে করি মানুষ সব সময়ই ক্রিয়েটিভ ছিল, ছিল যুগোপযোগী। যার ফলে ধাপে ধাপে মানুষ জাতির চাহিদার ধরণের পরিবর্তনের সঙ্গে চিন্তাচেতনারও পরিবর্তন হয়েছে। তবে প্রয়োজনের চেয়ে প্রয়োজনের চাপ মানুষ জাতিকে সামনের দিকে এগোতেই বেশি সাহায্য করেছে।

অনেকেই বলবে, বিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে চিকিৎসা বা প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে। আমি অন্যভাবে বর্ণনা করবো, তা হল সমস্যা এবং চাপ আমাদেরকে বাধ্য করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে। বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভালো অগ্রগতি হয়েছে সত্ত্বেও করোনাভাইরাস ভয়াবহ রূপ নিয়ে মানুষ জাতিকে চাপের মধ্যে রেখেছে। করোনা মহামারির চাপ মানুষ জাতিকে বাধ্য করছে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে সামনের দিকে নিতে। করোনাভাইরাসের যাত্রা শুরু চীনের উহান শহর থেকে। আর সে যাত্রা শেষ কোথায়, কখন, কীভাবে সেটা আমাদের অজানা। 

মহামারির ইতিহাস মানব সভ্যতার মতোই প্রাচীন। বিভিন্ন সময় সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায়, কখনও আবার বিশ্বব্যাপী। প্লেগ, কলেরা, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটিবসন্ত বিভিন্ন রোগ নানা সময়ে মহামারির আকার নিয়েছে। আসুন কিছু মহামারি নিয়ে স্মৃতিচারণ করি।

রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ান প্লেগের নামে নামকরণ করা হয় প্লেগ রোগের। ইঁদুরের মাধ্যমে চীন ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ব্যাকটেরিয়াজনিত এই রোগের উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করেন। সমুদ্রপথে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোতে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণ নেয় এই মহামারি। বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর সেই সময়কার জনসংখ্যার ১০ ভাগ এই মহামারিতে মারা যায়। তখন বহু মানুষের প্রাণহানির কারণে শ্রমিক পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। অবসান ঘটে ইউরোপের ভূমিদাস ব্যবস্থার। বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের ভালো মজুরি হয়, তাদের জীবনমানের পরিবর্তন ঘটে। এই ধাক্কায় সস্তা শ্রমের অভাব প্রযুক্তির উদ্ভাবনকেও এগিয়ে দেয়।

কলেরা রোগ ১৮১৭ সাল থেকে আজ অবধি বিদ্যমান সারাবিশ্বে। তবে শুরুতে বিভিন্ন দফায় কলেরা ছড়িয়ে এ পর্যন্ত সাতবার তা বৈশ্বিক মহামারির রূপ নিয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতেও লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছে কলেরা মহামারির কারণে। এর চিকিৎসায় স্যালাইন ও খাবার স্যালাইন পেতে দেড় শতকের বেশি সময় লেগে যায়। এখনও প্রতি বছর এই রোগে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশের যশোরে এই রোগের প্রাদুর্ভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটতে থাকে। আমার বাবা-মার প্রথম সন্তানটি চার বছর বয়সে মারা যায়, সে প্রায় ৭০ বছর আগের কথা।

আধুনিক যুগের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারির রোগটি হচ্ছে ১৯১৮ সালে ধরা পড়া স্প্যানিশ ফ্লু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যেখানে পাঁচ বছরে ১ কোটি ১৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, সেখানে স্প্যানিশ ফ্লুতে মাত্র দুই বছরে মারা যায় ২ কোটি মানুষ। দক্ষিণ সাগর থেকে উত্তর মেরু পর্যন্ত ৫০ কোটির মত মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। তাদের এক পঞ্চমাংশের মৃত্যু ঘটে, অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী বিলুপ্তির পথে চলে যায়।
 
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিকদের গাদাগাদি করে থাকা এবং যুদ্ধকালীন অপুষ্টি এই রোগের বিস্তার ও প্রাণহানি বাড়িয়ে তোলে। স্প্যানিশ ফ্লুর কারণ ছিল এইচ১এন১ ভাইরাস। স্প্যানিশ ফ্লু যখন মহামারিতে রূপ নেয়, তখন বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম সেই সংবাদ প্রচারে বাধা-নিষেধ আরোপ করলেও স্পেনের মিডিয়া ফলাও করে এই ফ্লুর প্রাদুর্ভাবের কথা প্রচার করেছিল। তাই এই মহামারির নাম হয়ে যায় স্প্যানিশ ফ্লু, যদিও এর প্রভাব ছিল পুরো ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকাজুড়েই। 

বিশ্বে ইনফ্লুয়েঞ্জার ধাক্কার আরেক নাম এশিয়ান ফ্লু। এইচ২এন২ ভাইরাস ঘটিত এই ইনফ্লুয়েঞ্জা চীনে দেখা দেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে যুক্তরাজ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এশিয়ান ফ্লুতে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মারা গিয়েছিল ১ লাখ ১৬ হাজার মানুষ। পরে ভ্যাকসিন দিয়ে ওই মহামারি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল।

প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে গুটি বসন্ত ছিল পৃথিবীতে। চতুর্থ শতকে চীনের এমন এক রোগের সবচেয়ে পুরনো লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় যা গুটি বসন্তের সঙ্গে হুবহু মিল খায়। ষষ্ঠ শতক থেকে অষ্টাদশ শতক নাগাদ বিশ্বজুড়ে এই রোগের দাপট ছিল। শতকের পর শতক বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রাণহানি ঘটনার পরে এটি পৃথিবী থেকে একেবারে বিদায় নিয়েছে টিকার কারণে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভাইরাস- এইচআইভি প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৮০র দশকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বর্তমানে আনুমানিক তিন কোটি ৬৯ লাখের বেশি মানুষের দেহে এই ভাইরাস রয়েছে। বিশ্বজুড়ে এইডসে প্রাণ হারিয়েছেন তিন কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ। এখনও চিকিৎসা আবিষ্কার না হওয়া এই রোগ ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক। ধারণা করা হয় ১৯২০ এর দশকে পশ্চিম আফ্রিকায় শিম্পাঞ্জি থেকে এইচআইভি ভাইরাস মানুষের দেহে যায়। এরপর ভাইরাসটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উনিশ শতকের শেষ দিকে বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেয়। বর্তমানে ৩৬.৯ মিলিয়ন মানুষের দেহে এই ভাইরাস রয়েছে। চার দশকেও এই রোগের প্রতিকার আবিষ্কার হয়নি। তবে নব্বই দশকে কিছু ওষুধ বেরিয়েছে যাতে সেগুলো নিয়ে আক্রান্তরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন।

একুশ শতকে প্রথম যে সংক্রামক রোগ আতঙ্ক হয়ে এসেছিল তার নাম ‘সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম’- সার্সও; এটিও এক ধরনের করোনাভাইরাস। প্রথম সার্স আক্রান্ত রোগী মিলেছিল চীনেই। বিশ্ব ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়। ফ্লু উপসর্গের এই রোগে প্রায় ২৬টি দেশে আক্রান্ত হয়েছিল ৮ হাজারের বেশি মানুষ; মারা গিয়েছিল অন্তত ৮০০ জন। তবে মানব শরীরে কী করে এই জীবাণুর সংক্রমণ ঘটেছিল সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বায়ুবাহিত এ রোগের জীবাণু সহজেই ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম বলে জনমনে সংক্রমণের আশঙ্কাটা ছিল বেশি। এশিয়ার কিছু অংশসহ ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় সার্স ছড়িয়ে পড়ে।
 
২০০৩ সালে সার্সের প্রাদুর্ভাবের সময় সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সার্সের জীবাণু দেহে প্রবেশ করলে প্রাথমিকভাবে মাথাব্যথা, জ্বর থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে শুষ্ক কাশি শুরু হয়, যা এক সময় নিউমোনিয়ায় রূপ নেয়। মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী সার্স নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তারপর প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ দেখা দেয় ১৯৭৬ সালে, একইসঙ্গে কঙ্গো ও দক্ষিণ সুদানের দুটি অঞ্চলে। পরে ইবোলা নদীর তীরবর্তী একটি গ্রামে এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে ভাইরাসটি ইবোলা নাম পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, ভয়াবহ এই রোগে মৃত্যু হার ৫০ শতাংশের মতো। ১৯৭৬ সালে ইবোলা প্রথম শনাক্ত হলেও এর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ২০১৪-২০১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকায়।

২০১৪ সালে বিশ্বে এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়ায় ইবোলা ভাইরাস। এই ভাইরাসের প্রভাব পশ্চিম আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও বিভিন্ন সূত্রে ইবোলা রোগী বা সন্দেহভাজন আক্রান্ত চিহ্নিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দূরবর্তী ভূখণ্ডেও। বর্তমানে ইবোলার টিকা দেওয়া হচ্ছে।

‌২০২০ সাল শুরুর আগ মুহূর্তে চীনের উহানে যে নতুন ভাইরাস বাসা বেঁধেছিল মানুষের শরীরে, সেই ভাইরাস লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিল বছরজুড়ে। বছরব্যাপী দুনিয়াজুড়ে আতঙ্ক হয়ে থাকা এই ভাইরাস নাম পেয়েছে নভেল করোনাভাইরাস (সার্স সিওভি-২), আর রোগের নাম হয়েছে কভিড-১৯। এ যাবত পৃথিবীতে যত মহামারি এসেছে তার মধ্যে করোনাভাইরাসই সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়েছে। এরই মধ্যে বিশ্বে এই রোগে আট কোটির বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে সাড়ে ১৭ লাখের বেশি মানুষের।

স্বস্তির খবর এই নতুন করোনাভাইরাসের টিকা এরইমধ্যে অনেক দেশে প্রয়োগ করা শুরু হয়েছে। তবে যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশে এই ভাইরাসের নতুন ধরন শনাক্ত হয়েছে, যা আবার বিজ্ঞানীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারি বছর পার করলেও জীবাণুটি এখনও দুর্বল হয়নি। ভাইরাস থেকে যেসব রোগ মহামারি আকারে ছড়ায় সেগুলো বিভিন্ন কারণে এক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে করোনাভাইরাস দুর্বল হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

এটা ছিল মোটামুটি ঘটনা প্রবাহ। সব রোগের মূলে জড়িত রয়েছে বিশ্বযুদ্ধের কিছু কারণ। চীন ও আফ্রিকা থেকে বেশির ভাগ রোগের শুরু। কী কারণ জড়িত সেটা আমার লেখার মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হচ্ছে বিপদ বা রোগব্যাধি যখন এলাকাভিত্তিক দেখা দেয় তখন ন্যূনতম সাহায্য গোটা বিশ্বের থেকে আসে। যখন রোগের মাত্রা সারা পৃথিবী জুড়ে দেখা যায় তখন চাপের কারণে সবার সক্রিয় প্রচেষ্টায় যত কঠিন রোগই হোক না কেন মানুষ জাতি সেটার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে। এবারেরও কভিড-১৯ তা প্রমাণ করতে যাচ্ছে। 

সেক্ষেত্রে আমার ভাবনা থেকে একটিই প্রশ্ন, কেন খাবারের অভাবে বিশ্বে লাখো লাখো মানুষ মারা যাচ্ছে? পুষ্টির অভাবে জটিল এবং কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে বিশ্ব দরবারে হাত পেতে বসে আছে। কই কেউ তো কভিড-১৯ দূর করার মত ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষুধা দূর করতে চেষ্টা করছি না? এই ক্ষুধা যদি কভিড-১৯ এর মত সারা বিশ্বজুড়ে থাকতো তাহলে সমস্যার সমাধান এতদিনে হয়ে যেত। করোনাভাইরাস তাহলে এমনটি শিক্ষা দিতে এসেছে পৃথিবীর মানুষকে; সেটা হতে পারে লাখো লাখো না খেতে পারা ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ, আমরা যেন করোনার মত তারও সমাধান করি, সুনার বেটার।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
২৮ জানুয়ারি, ২০২১