তবু কেন তারা দুর্নীতি করে?
jugantor
গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকার
তবু কেন তারা দুর্নীতি করে?

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

০২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:৫৬:১১  |  অনলাইন সংস্করণ

ক্ষমতাসীন প্রশাসন এবং রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিমুক্ত হলে কর্তৃপক্ষ দক্ষতার সঙ্গে দেশের সেবা করতে সক্ষম হয়। সমাজের রাজনীতিবিদদের মাসিক বেতন বা অন্য কোনো ভাতার ব্যবস্থা না থাকার কারণে তারা হয়তোবা দুর্নীতিগ্রস্ত। কিন্তু সিভিল প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের মাসিক বেতনসহ সকল সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কেন তারা দুর্নীতি করে?

রাষ্ট্রপতি হিসেবে জো বাইডেনের প্রথম বক্তব্য ছিল এমন- “আমি দেশ সার্ভ করতে এসেছি, ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়াতে নয়। যদি ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ানোর ইচ্ছা থাকতো তবে ব্যবসায়ী হতাম, রাজনীতিবিদ নয়। রাজনীতি হলো বিলিয়ে দেওয়ার জায়গা, বিলিয়নিয়ার হবার নয়। ব্যবসায় মুনাফা থাকে। রাজনীতিতে থাকে শুধু সেবা। এই সেবাটাই হলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মুনাফা।”

এমনটিই রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে হবার কথা। আবার যারা বিভিন্ন প্রশাসনের দায়িত্বে নিযুক্ত তাদের ক্ষেত্রেও একই বার্তা, সেটা হলো সেবা দেয়া। এই সেবা দেয়ার মনোভাব যেসব দেশ থেকে বিলীন হতে চলছে বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। কিছু পেতে কিছু দিতে হবে কথাটি সত্য। যারা চাকরি করে তাদের কাজ সেবা দেয়া। বিনিময়ে তাদের বেতন থেকে শুরু করে সকল সুবিধা দেয়া হয়। তারপরও কেন সেবা পেতে আলাদা মুনাফা? ঘটনাটি কি ভাববার বিষয় না?

একজন রিকসাচালক আমাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা নিয়ে গেল। বিনিময়ে তাকে তার কায়িক পরিশ্রমের জন্য সঠিক মজুরি দিতে আমার সমস্যা হবার কথা নয়। কিন্তু যদি একজন পুলিশ, ব্যাংকার, ডাক্তার, এসিল্যান্ড, ইঞ্জিনিয়ার আরও শত শত কর্মরত বেতনভুক্ত কর্মীও যদি রিকশাচালকের মতো মজুরির ডিমান্ড করে, তবে দেয়া নেয়ার ভারসাম্য কেমন হয়ে গেল না? সরকারি সুযোগ-সুবিধা যারা ভোগ করে তারা তো জনগণের থেকে নতুন করে সেবার বিনিময়ে মজুরি নিতে পারে না।

যদি সবাই রিকশাচালকের মতো ব্যক্তি মালিকানা হয় সেক্ষেত্রে বুঝলাম সেবার বিনিময়ে মুজরি দিতে হবে। এই সহজ কাজগুলো যাতে সমাজে সঠিকভাবে পালিত হয় তার জন্য কর্তৃপক্ষ রয়েছে এবং তাদেরও কাজের বিনিময়ে সরকার সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে। তারা যাতে সে দায়িত্ব পালন করে সে বিষয়ে নজর রাখার জন্য রয়েছে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি যেমন উপরের বর্ণনায় জো বাইডেনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন যদি জো বাইডেন সেই সঠিক কাজ না করে এবং আলাদা মুনাফা নিতে শুরু করে তবে আমেরিকার জনগণ কি সেটা মেনে নেবে? নিশ্চয় না। তাহলে বাংলাদেশের জনগণও গণতন্ত্রের সংজ্ঞানুযায়ী সেটা মেনে নিতে পারে না। অথচ মেনে নেওয়া হচ্ছে যার ফলে অরাজকতা দেশের সর্বত্রই ভরপুর। এর থেকে রেহাই পেতে হলে প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন নয়, পরিবর্তন হতে হবে সবাইকে।

বাংলাদেশে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে তিনটি দল দেশ পরিচালনা করছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি। যদি ধরি পুনরায় বিএনপি ক্ষমতায় এলো তাহলে কী হবে? পার্টির পরিবর্তন হবে, মুষ্টিমেয় প্রশাসনের কিছু রদবদল হবে বা চাকরি যাবে, তবে কারও স্বভাবের পরিবর্তন হবে না।

পৃথিবীতে অনেক দেশ রয়েছে যেখানে একনায়কতন্ত্রের শাসন চলছে। উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া তার মধ্যে অন্যতম। তারা তাদের দেশকে গণতন্ত্রের দেশ বলে দাবি করে না। যেহেতু বাংলাদেশ গণতন্ত্রের দেশ হিসেবে পরিচিত, গণতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ভ এবং গণতন্ত্রই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। তাই আমি মনে করি দেশে গণতন্ত্রের বেস্ট প্রাকটিস হওয়া উচিত। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে কিছু অপ্রিয় সত্যকে তুলে ধরলাম সোনার বাংলা গড়ার স্বার্থে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকার

তবু কেন তারা দুর্নীতি করে?

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:৫৬ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ক্ষমতাসীন প্রশাসন এবং রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিমুক্ত হলে কর্তৃপক্ষ দক্ষতার সঙ্গে দেশের সেবা করতে সক্ষম হয়। সমাজের রাজনীতিবিদদের মাসিক বেতন বা অন্য কোনো ভাতার ব্যবস্থা না থাকার কারণে তারা হয়তোবা দুর্নীতিগ্রস্ত। কিন্তু সিভিল প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের মাসিক বেতনসহ সকল সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কেন তারা দুর্নীতি করে?

রাষ্ট্রপতি হিসেবে জো বাইডেনের প্রথম বক্তব্য ছিল এমন- “আমি দেশ সার্ভ করতে এসেছি, ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়াতে নয়। যদি ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ানোর ইচ্ছা থাকতো তবে ব্যবসায়ী হতাম, রাজনীতিবিদ নয়। রাজনীতি হলো বিলিয়ে দেওয়ার জায়গা, বিলিয়নিয়ার হবার নয়। ব্যবসায় মুনাফা থাকে। রাজনীতিতে থাকে শুধু সেবা। এই সেবাটাই হলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মুনাফা।”

এমনটিই রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে হবার কথা। আবার যারা বিভিন্ন প্রশাসনের দায়িত্বে নিযুক্ত তাদের ক্ষেত্রেও একই বার্তা, সেটা হলো সেবা দেয়া। এই সেবা দেয়ার মনোভাব যেসব দেশ থেকে বিলীন হতে চলছে বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। কিছু পেতে কিছু দিতে হবে কথাটি সত্য। যারা চাকরি করে তাদের কাজ সেবা দেয়া। বিনিময়ে তাদের বেতন থেকে শুরু করে সকল সুবিধা দেয়া হয়। তারপরও কেন সেবা পেতে আলাদা মুনাফা? ঘটনাটি কি ভাববার বিষয় না?

একজন রিকসাচালক আমাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা নিয়ে গেল। বিনিময়ে তাকে তার কায়িক পরিশ্রমের জন্য সঠিক মজুরি দিতে আমার সমস্যা হবার কথা নয়। কিন্তু যদি একজন পুলিশ, ব্যাংকার, ডাক্তার, এসিল্যান্ড, ইঞ্জিনিয়ার আরও শত শত কর্মরত বেতনভুক্ত কর্মীও যদি রিকশাচালকের মতো মজুরির ডিমান্ড করে, তবে দেয়া নেয়ার ভারসাম্য কেমন হয়ে গেল না? সরকারি সুযোগ-সুবিধা যারা ভোগ করে তারা তো জনগণের থেকে নতুন করে সেবার বিনিময়ে মজুরি নিতে পারে না।

যদি সবাই রিকশাচালকের মতো ব্যক্তি মালিকানা হয় সেক্ষেত্রে বুঝলাম সেবার বিনিময়ে মুজরি দিতে হবে। এই সহজ কাজগুলো যাতে সমাজে সঠিকভাবে পালিত হয় তার জন্য কর্তৃপক্ষ রয়েছে এবং তাদেরও কাজের বিনিময়ে সরকার সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে। তারা যাতে সে দায়িত্ব পালন করে সে বিষয়ে নজর রাখার জন্য রয়েছে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি যেমন উপরের বর্ণনায় জো বাইডেনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 

এখন যদি জো বাইডেন সেই সঠিক কাজ না করে এবং আলাদা মুনাফা নিতে শুরু করে তবে আমেরিকার জনগণ কি সেটা মেনে নেবে? নিশ্চয় না। তাহলে বাংলাদেশের জনগণও গণতন্ত্রের সংজ্ঞানুযায়ী সেটা মেনে নিতে পারে না। অথচ মেনে নেওয়া হচ্ছে যার ফলে অরাজকতা দেশের সর্বত্রই ভরপুর। এর থেকে রেহাই পেতে হলে প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন নয়, পরিবর্তন হতে হবে সবাইকে। 

বাংলাদেশে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে তিনটি দল দেশ পরিচালনা করছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি। যদি ধরি পুনরায় বিএনপি ক্ষমতায় এলো তাহলে কী হবে? পার্টির পরিবর্তন হবে, মুষ্টিমেয় প্রশাসনের কিছু রদবদল হবে বা চাকরি যাবে, তবে কারও স্বভাবের পরিবর্তন হবে না।

পৃথিবীতে অনেক দেশ রয়েছে যেখানে একনায়কতন্ত্রের শাসন চলছে। উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া তার মধ্যে অন্যতম। তারা তাদের দেশকে গণতন্ত্রের দেশ বলে দাবি করে না। যেহেতু বাংলাদেশ গণতন্ত্রের দেশ হিসেবে পরিচিত, গণতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ভ এবং গণতন্ত্রই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। তাই আমি মনে করি দেশে গণতন্ত্রের বেস্ট প্রাকটিস হওয়া উচিত। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে কিছু অপ্রিয় সত্যকে তুলে ধরলাম সোনার বাংলা গড়ার স্বার্থে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

০৭ মার্চ, ২০২১
১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১