গুজব কী এবং কেন ছড়ায়
jugantor
গুজব কী এবং কেন ছড়ায়

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

০৭ মার্চ ২০২১, ১০:৫৪:২৮  |  অনলাইন সংস্করণ

যাদেরকে বা যে বিষয়গুলো নিয়ে পরচর্চা, পরনিন্দা বা গুজব ছড়ানো হয়, হতে পারে তারা সহকর্মী, রাজনীতিবিদ, হতে পারে কোন রোগবালাই, হতে পারে কোন ব্যক্তি বিশেষ। কারো সম্পর্কে গুজব বা খারাপ কথা বলা কোনও ইতিবাচক উদ্দেশ্যে কাজ করে না, বরং এতে ব্যক্তি বা সমাজের ক্ষতি করে। আমরা মাঝে মধ্যে যেভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে ঘটনার বর্ণনা দেই তা অনেক সময় সত্য, মিথ্যা বা দুটোর মিশ্রণে সংঘটিত হয়। ফলে আমাদের পারিপার্শ্বিকতা সেই ভাবেই ঘটনার বিশ্লেষণ পাই।

অনেক সময় এমনও হয় যে আমরা নিশ্চিত না হয়েই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করি। এমনকি আমরা নিশ্চিত ভাবে জানিও না সেগুলোর সত্যতা, স্বত্বেও সিদ্ধান্তগুলো নিজেদের মতো করে আঁকতে চেষ্টা করি এবং সেটা ছড়িয়ে দেই, যা শুধু সমাজে অশান্তিরই সৃষ্টি করে।

সমাজ এবং মনোবিজ্ঞানশাস্ত্রে গুজব, পরনিন্দা বা পরচর্চার ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা রয়েছে। জনসাধারণের সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়, ঘটনা বা ব্যক্তি নিয়ে মুখে মুখে প্রচারিত কোন বর্ণনা বা গল্পকে গুজব বলা হয়েছে। অতীতে যখন প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল না তখন মুখে মুখে এটা প্রচার হতো কিন্তু এখন প্রযুক্তির কারণে লিখিত ভাবেও প্রচারিত হচ্ছে ব্যাপক ভাবে।

গুজব অনেক ক্ষেত্রে ভুল তথ্য এবং অসঙ্গত তথ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ভুল তথ্য বলতে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্যকে বুঝায় এবং অসঙ্গতি তথ্য বলতে বুঝায় ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করা। রাজনীতিতে গুজব বা পরনিন্দা বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে ইতিবাচক পরচর্চার পরিবর্তে নেতিবাচক গুজব বা পরনিন্দা অধিক কার্যকর হতে দেখা গেছে।

কোনো কোনো ঘটনা আমাদের এত বেশি নাড়া দেয় যে, সেটি অন্যকে তাৎক্ষণিকভাবে না বলে পারা যায় না। অথবা সেই ঘটনাটি কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এতটাই মানহানিকর যে, সেটি সহজে বিশ্বাস হয় না। তাই ব্যাপারটা আসলে গুজব না সত্যি, তা যাচাইয়ের জন্য হলেও অন্যকে বলতে হয়। গুজব একজনের কাছ থেকে আরেকজন হয়ে হাজারো মানুষের কাছে এভাবেই ছড়ায়। এটা এমন এমন এক বিবৃতি যার সত্যতা অল্প সময়ের মধ্যে বা আদৌ নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।

অনেকের জন্য গুজব ছড়ানো বা পরচর্চা করা একটি পছন্দের কাজ। যে কাহিনীর মধ্য দিয়ে কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে মানুষের ধারণা পাল্টে যেতে পারে, সেটি গুজব হিসেবে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। বিখ্যাত ব্যক্তি ছাড়াও মানুষ নিজেদের বন্ধুবান্ধব সম্পর্কে মজা করেও অনেক গুজব ছড়ায়। বিশ্বের সর্বত্রই গুজব ছড়াতে দেখা যায়। চেনা মানুষ, তারকা এবং বিখ্যাত কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে গুজব বা অদ্ভুত ধরনের কথাবার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার সহজাত প্রবণতা মানুষের মধ্যে রয়েছে।

ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বা কোনো রসাল ঘটনা হলে তো কথাই নেই, দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে সেটি। এসব গুজব অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়ায়, বিশেষ করে ছোটখাটো কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মধ্যে। কিন্তু মানুষ কেন গুজব ছড়ানোর প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে না, সেটিই গবেষণার বিষয় হওয়া উচিত। গুজব ছড়ানোর প্রবণতা মানুষ নিজের ভেতর থেকেই পায়।

এটা বিস্ময়কর কোনো ব্যাপার নয়। পরিচিত লোকজন বা মজার কোনো ঘটনা নিয়ে গল্পগুজব করাটা মানুষের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। তবে চেনা কাউকে নিয়ে আকর্ষণীয় কোনো ব্যাপার যা সুখবর হতে পারে আবার কলঙ্কজনকও হতে পারে যা সব সময়ই বাড়তি মনোযোগ কাড়ে, যেমন- মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সম্পর্কে প্রায়ই যে গুজবটি মাথা চাড়া দেয়, সেটি তার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে। তার মধ্যনাম হুসেন-এর কারণেই এ গুজবটি রটে। ইসলামিক টেররিজমের সূত্র ধরে ওবামার নীতি নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষ।

নির্মাণ প্রকল্পগুলোর জন্য মানুষের কাটা মাথা লাগবে এটা বোধহয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় গুজব। আফ্রিকা, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া বা পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই এ ধরনের গুজব প্রায়ই শোনা যায়। কিছুদিন আগে বাংলাদেশেও কাটা মাথার গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। মাইকেল জ্যাকসন বেঁচে আছেন, একটি ফেক ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করে জানানো হয়, এও বলা হয় প্যারিসের রাস্তায় ঘুরতে দেখা গিয়েছে মাইকেল জ্যাকসনকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যেই জানা যায় ভিডিওটি ফেক।

এই শতাব্দী-তত্ত্বের মতোই নানান ভুয়া খবর, ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব ও গুজব ছড়িয়েছে ঋতু-ভিত্তিক। স্বপ্নের মাধ্যমে পাওয়া প্রতিষেধক তো আছেই, এর বাইরেও অনেকগুলো ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব ও গুজব ডালপালা মেলেছে করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে। সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছিল যে গুজব, সেটি হলো চীনের লোকজন বাদুড়ের স্যুপ খায়, সে কারণেই এই ভাইরাস ছড়িয়েছে, যেমন চীনের এক ল্যাবরেটরিতে এই ভাইরাস কৃত্রিমভাবে উৎপন্ন করা হয়েছে।

অনেকে বলেছে চীনকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে এসব আসলে আমেরিকার ষড়যন্ত্র ইত্যাদি। আমেরিকার ওপরে এর আগেও ভিত্তিহীন, তথ্য-প্রমাণহীন কিছু অভিযোগ এসেছে। যেমন নব্বইয়ের দশকে আফ্রিকায় ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে আমেরিকা আর ব্রিটেনকে দায়ী করে। মহামারি তার ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞের সামনে মানুষকে একরকম অসহায় করে দেয়। কিন্তু দেখা যায়, মানুষ একসময় তার চেয়েও বেশি অসহায় হয়ে পড়ে মহামারি ঘিরে বেড়ে ওঠা অসংখ্য গুজব।

অসুখ যত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে, মহাদেশ থেকে মহাদেশে, তার চেয়েও দ্রুত ছড়ায় একে কেন্দ্র করে অসংখ্য গুজব। সেসব গুজবের প্রতিক্রিয়া হয় সুদূরপ্রসারী। মানুষ মূলত আতঙ্ক থেকে মুক্তি চায়, নিজের ওপর থেকে দায় সরাতে চায় সব সময়। আর কেউ কেউ এই আতঙ্ককে পুঁজি করে গড়ে তুলতে চায় নিজের আখের।

নানান কুসংস্কার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট জায়গা থেকেই শুরু হয় এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও গুজবের মহামারি। আর মানুষ পা দেয় ফাঁদে। নিজেকে নিয়ে যায় বোকার কাতারে; কখনো কখনো সেটা গিয়ে পৌঁছায় অপরাধের পর্যায়ে। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তও হয় মানুষই। কথিত আছে ‘মহামারির জীবাণুরা মরে না, লুকিয়ে থাকে কেবল আমাদের চোখের আড়ালে, ওত পেতে থাকে, সুযোগ পেলে আবার ফিরে আসে হানা দেওয়ার জন্য’, এই গুজব ছড়ানোর প্রক্রিয়াও তেমনি নিশ্চিহ্ন হয় না, লুকিয়ে থাকে কেবল আমাদের মনের আড়ালে।

আমি অতীতে বলেছি বাংলাদেশে হঠাৎ হঠাৎ একটার পর একটা ঘটনার উদয় হয় এবং বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এতো আলোড়ন সৃষ্টি করে যে অনেকের খাওয়া-দাওয়া এবং ঘুম হারাম হয়ে যায়। কিছু দিন যেতে নতুন কাহিনীর উদ্ভাবন ঘটে। পরে বিলীন হয়ে যায় অতীতের ঘটনা যা শেষে ইতিহাসের পাতায়ও খোঁজ করলে পাওয়া যাবে না।

আমি এ ধরণের সিদ্ধান্তের বিচার-বিশ্লেষণে না গিয়ে বরং তুলে ধরি মিয়ানমারের আং সান সু চির নোবেল পুরস্কার পাওয়া এবং তা বাতিল করা নিয়ে কিছু তথ্য। বিশ্বের অনেক দেশ থেকে চাপ এসেছিল নরওয়ের নোবেল কমিটির কাছে যখন মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে। নরওয়ের উত্তর একটিই ছিল সেটা হলো সু চিকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় তার অতীতের কর্মের বিনিময়ে। নোবেল পুরস্কার পাবার পর যদি তার মনুষ্যত্বের অধঃপতন ঘটে তার জন্য নতুন বিচারব্যবস্থাই যথেষ্ট।
বিষয়টি থেকে কী শিক্ষা পেতে পারি?

যাইহোক অনেক কথার পর কিছু উপদেশ যেটা আমরা মেনে চলতে পারি যেমন না জেনে কারও নিন্দা করা বা বিশেষ যুক্তি ছাড়া পরচর্চা করা থেকে আমরা বিরত থাকতে পারি। কারও ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে গুজব রটানো যে অন্যায় তা থেকে আমরা দূরে থাকতে পারি। গণতন্ত্রের বেস্ট প্রাকটিস চালু করে খোলামেলা আলোচনার সুযোগ তৈরি করা আশু প্রয়োজন।

শুধু সরকারের নিন্দা না করে সরকারের ভালো কাজেরও প্রশংসা করা দরকার। আমরা যা নিজে পছন্দ করি সেটা অন্যরাও কিন্তু করে বিষয়টি মনে রাখা দরকার। শুধু সোনার বাংলা গড়লে কী হবে যদি সেখানকার মানুষগুলোর অন্তর সোনার মতো খাঁটি না হয়!

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

গুজব কী এবং কেন ছড়ায়

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
০৭ মার্চ ২০২১, ১০:৫৪ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

যাদেরকে বা যে বিষয়গুলো নিয়ে পরচর্চা, পরনিন্দা বা গুজব ছড়ানো হয়, হতে পারে তারা সহকর্মী, রাজনীতিবিদ, হতে পারে কোন রোগবালাই, হতে পারে কোন ব্যক্তি বিশেষ। কারো সম্পর্কে গুজব বা খারাপ কথা বলা কোনও ইতিবাচক উদ্দেশ্যে কাজ করে না, বরং এতে ব্যক্তি বা সমাজের ক্ষতি করে। আমরা মাঝে মধ্যে যেভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে ঘটনার বর্ণনা দেই তা অনেক সময় সত্য, মিথ্যা বা দুটোর মিশ্রণে সংঘটিত হয়। ফলে আমাদের পারিপার্শ্বিকতা সেই ভাবেই ঘটনার বিশ্লেষণ পাই। 

অনেক সময় এমনও হয় যে আমরা নিশ্চিত না হয়েই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করি। এমনকি আমরা নিশ্চিত ভাবে জানিও না সেগুলোর সত্যতা, স্বত্বেও সিদ্ধান্তগুলো নিজেদের মতো করে আঁকতে চেষ্টা করি এবং সেটা ছড়িয়ে দেই, যা শুধু সমাজে অশান্তিরই সৃষ্টি করে।

সমাজ এবং মনোবিজ্ঞানশাস্ত্রে গুজব, পরনিন্দা বা পরচর্চার ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা রয়েছে। জনসাধারণের সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়, ঘটনা বা ব্যক্তি নিয়ে মুখে মুখে প্রচারিত কোন বর্ণনা বা গল্পকে গুজব বলা হয়েছে। অতীতে যখন প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল না তখন মুখে মুখে এটা প্রচার হতো কিন্তু এখন প্রযুক্তির কারণে লিখিত ভাবেও প্রচারিত হচ্ছে ব্যাপক ভাবে।

গুজব অনেক ক্ষেত্রে ভুল তথ্য এবং অসঙ্গত তথ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ভুল তথ্য বলতে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্যকে বুঝায় এবং অসঙ্গতি তথ্য বলতে বুঝায় ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করা। রাজনীতিতে গুজব বা পরনিন্দা বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে ইতিবাচক পরচর্চার পরিবর্তে নেতিবাচক গুজব বা পরনিন্দা অধিক কার্যকর হতে দেখা গেছে। 

কোনো কোনো ঘটনা আমাদের এত বেশি নাড়া দেয় যে, সেটি অন্যকে তাৎক্ষণিকভাবে না বলে পারা যায় না। অথবা সেই ঘটনাটি কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এতটাই মানহানিকর যে, সেটি সহজে বিশ্বাস হয় না। তাই ব্যাপারটা আসলে গুজব না সত্যি, তা যাচাইয়ের জন্য হলেও অন্যকে বলতে হয়। গুজব একজনের কাছ থেকে আরেকজন হয়ে হাজারো মানুষের কাছে এভাবেই ছড়ায়। এটা এমন এমন এক বিবৃতি যার সত্যতা অল্প সময়ের মধ্যে বা আদৌ নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। 

অনেকের জন্য গুজব ছড়ানো বা পরচর্চা করা একটি পছন্দের কাজ। যে কাহিনীর মধ্য দিয়ে কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে মানুষের ধারণা পাল্টে যেতে পারে, সেটি গুজব হিসেবে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। বিখ্যাত ব্যক্তি ছাড়াও মানুষ নিজেদের বন্ধুবান্ধব সম্পর্কে মজা করেও অনেক গুজব ছড়ায়। বিশ্বের সর্বত্রই গুজব ছড়াতে দেখা যায়। চেনা মানুষ, তারকা এবং বিখ্যাত কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে গুজব বা অদ্ভুত ধরনের কথাবার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার সহজাত প্রবণতা মানুষের মধ্যে রয়েছে। 

ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বা কোনো রসাল ঘটনা হলে তো কথাই নেই, দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে সেটি। এসব গুজব অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়ায়, বিশেষ করে ছোটখাটো কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মধ্যে। কিন্তু মানুষ কেন গুজব ছড়ানোর প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে না, সেটিই গবেষণার বিষয় হওয়া উচিত। গুজব ছড়ানোর প্রবণতা মানুষ নিজের ভেতর থেকেই পায়। 

এটা বিস্ময়কর কোনো ব্যাপার নয়। পরিচিত লোকজন বা মজার কোনো ঘটনা নিয়ে গল্পগুজব করাটা মানুষের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। তবে চেনা কাউকে নিয়ে আকর্ষণীয় কোনো ব্যাপার যা সুখবর হতে পারে আবার কলঙ্কজনকও হতে পারে যা সব সময়ই বাড়তি মনোযোগ কাড়ে, যেমন- মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সম্পর্কে প্রায়ই যে গুজবটি মাথা চাড়া দেয়, সেটি তার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে। তার মধ্যনাম হুসেন-এর কারণেই এ গুজবটি রটে। ইসলামিক টেররিজমের সূত্র ধরে ওবামার নীতি নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষ।

নির্মাণ প্রকল্পগুলোর জন্য মানুষের কাটা মাথা লাগবে এটা বোধহয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় গুজব। আফ্রিকা, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া বা পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই এ ধরনের গুজব প্রায়ই শোনা যায়। কিছুদিন আগে বাংলাদেশেও কাটা মাথার গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। মাইকেল জ্যাকসন বেঁচে আছেন, একটি ফেক ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করে জানানো হয়, এও বলা হয় প্যারিসের রাস্তায় ঘুরতে দেখা গিয়েছে মাইকেল জ্যাকসনকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যেই জানা যায় ভিডিওটি ফেক।

এই শতাব্দী-তত্ত্বের মতোই নানান ভুয়া খবর, ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব ও গুজব ছড়িয়েছে ঋতু-ভিত্তিক। স্বপ্নের মাধ্যমে পাওয়া প্রতিষেধক তো আছেই, এর বাইরেও অনেকগুলো ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব ও গুজব ডালপালা মেলেছে করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে। সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছিল যে গুজব, সেটি হলো চীনের লোকজন বাদুড়ের স্যুপ খায়, সে কারণেই এই ভাইরাস ছড়িয়েছে, যেমন চীনের এক ল্যাবরেটরিতে এই ভাইরাস কৃত্রিমভাবে উৎপন্ন করা হয়েছে। 

অনেকে বলেছে চীনকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে এসব আসলে আমেরিকার ষড়যন্ত্র ইত্যাদি। আমেরিকার ওপরে এর আগেও ভিত্তিহীন, তথ্য-প্রমাণহীন কিছু অভিযোগ এসেছে। যেমন নব্বইয়ের দশকে আফ্রিকায় ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে আমেরিকা আর ব্রিটেনকে দায়ী করে। মহামারি তার ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞের সামনে মানুষকে একরকম অসহায় করে দেয়। কিন্তু দেখা যায়, মানুষ একসময় তার চেয়েও বেশি অসহায় হয়ে পড়ে মহামারি ঘিরে বেড়ে ওঠা অসংখ্য গুজব। 

অসুখ যত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে, মহাদেশ থেকে মহাদেশে, তার চেয়েও দ্রুত ছড়ায় একে কেন্দ্র করে অসংখ্য গুজব। সেসব গুজবের প্রতিক্রিয়া হয় সুদূরপ্রসারী। মানুষ মূলত আতঙ্ক থেকে মুক্তি চায়, নিজের ওপর থেকে দায় সরাতে চায় সব সময়। আর কেউ কেউ এই আতঙ্ককে পুঁজি করে গড়ে তুলতে চায় নিজের আখের। 

নানান কুসংস্কার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট জায়গা থেকেই শুরু হয় এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও গুজবের মহামারি। আর মানুষ পা দেয় ফাঁদে। নিজেকে নিয়ে যায় বোকার কাতারে; কখনো কখনো সেটা গিয়ে পৌঁছায় অপরাধের পর্যায়ে। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তও হয় মানুষই। কথিত আছে ‘মহামারির জীবাণুরা মরে না, লুকিয়ে থাকে কেবল আমাদের চোখের আড়ালে, ওত পেতে থাকে, সুযোগ পেলে আবার ফিরে আসে হানা দেওয়ার জন্য’, এই গুজব ছড়ানোর প্রক্রিয়াও তেমনি নিশ্চিহ্ন হয় না, লুকিয়ে থাকে কেবল আমাদের মনের আড়ালে।

আমি অতীতে বলেছি বাংলাদেশে হঠাৎ হঠাৎ একটার পর একটা ঘটনার উদয় হয় এবং বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এতো আলোড়ন সৃষ্টি করে যে অনেকের খাওয়া-দাওয়া এবং ঘুম হারাম হয়ে যায়। কিছু দিন যেতে নতুন কাহিনীর উদ্ভাবন ঘটে। পরে বিলীন হয়ে যায় অতীতের ঘটনা যা শেষে ইতিহাসের পাতায়ও খোঁজ করলে পাওয়া যাবে না।  

আমি এ ধরণের সিদ্ধান্তের বিচার-বিশ্লেষণে না গিয়ে বরং তুলে ধরি মিয়ানমারের আং সান সু চির নোবেল পুরস্কার পাওয়া এবং তা বাতিল করা নিয়ে কিছু তথ্য। বিশ্বের অনেক দেশ থেকে চাপ এসেছিল নরওয়ের নোবেল কমিটির কাছে যখন মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে। নরওয়ের উত্তর একটিই ছিল সেটা হলো সু চিকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় তার অতীতের কর্মের বিনিময়ে। নোবেল পুরস্কার পাবার পর যদি তার মনুষ্যত্বের অধঃপতন ঘটে তার জন্য নতুন বিচারব্যবস্থাই যথেষ্ট।
বিষয়টি থেকে কী শিক্ষা পেতে পারি? 

যাইহোক অনেক কথার পর কিছু উপদেশ যেটা আমরা মেনে চলতে পারি যেমন না জেনে কারও নিন্দা করা বা বিশেষ যুক্তি ছাড়া পরচর্চা করা থেকে আমরা বিরত থাকতে পারি। কারও ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে গুজব রটানো যে অন্যায় তা থেকে আমরা দূরে থাকতে পারি। গণতন্ত্রের বেস্ট প্রাকটিস চালু করে খোলামেলা আলোচনার সুযোগ তৈরি করা আশু প্রয়োজন। 

শুধু সরকারের নিন্দা না করে সরকারের ভালো কাজেরও প্রশংসা করা দরকার। আমরা যা নিজে পছন্দ করি সেটা অন্যরাও কিন্তু করে বিষয়টি মনে রাখা দরকার। শুধু সোনার বাংলা গড়লে কী হবে যদি সেখানকার মানুষগুলোর অন্তর সোনার মতো খাঁটি না হয়!

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১