নর্থ সাইপ্রাসে বাংলাদেশি দম্পতির কৃতিত্ব
jugantor
নর্থ সাইপ্রাসে বাংলাদেশি দম্পতির কৃতিত্ব

  মাহাফুজুল হক চৌধুরী, সাইপ্রাস থেকে  

২১ জুন ২০২১, ১৯:১৮:০৫  |  অনলাইন সংস্করণ

নর্থ সাইপ্রাস ইউরোপের ভূমধ্যসাগরে অবস্থিত একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। ১৯৭৪ সালে গ্রিক সাইপ্রাস থেকে তুরস্ক এ অংশটি নেয়।

একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও আন্তর্জাতিকভাবে কোনো দেশের কাছে এখনো স্বীকৃতি পায়নি। ৩ হাজার ৯০০ বর্গ কিলোমিটারের দেশটিতে মাত্র ৩ লাখ মানুষের বসবাস। তুর্কি সরকার শাসিত নর্থ সাইপ্রাস এখনো বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলির কাছে তেমনটা পরিচিতি লাভ করতে পারেনি।

বাংলাদেশের মানুষও এ দেশটি সম্পর্কে তেমন অবগত নয়। যদিও বাঙালি নেই বিশ্বের এমন দেশ পাওয়া বিরল। তেমনি নর্থ সাইপ্রাসের মতো একটি ছোট্ট দেশেও যে ৩০০০ এর মত বাংলাদেশির বসবাস এটা হয়তো বাংলাদেশ সরকারেরও অজানা।

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজারেরও উপর বাংলাদেশি এখানে আসে। তারমধ্যে অর্ধেক আসে ওয়ার্ক পারমিট ভিসায়, বাকিরা স্টুডেন্ট ভিসায়। এ দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রতি বছর অসংখ্য স্টুডেন্ট আনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। এদেশের বেশকটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পড়ালেখার মান অত্যন্ত ভাল এবং আন্তর্জাতিক মানের।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশিরা এ দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। তারা পড়ালেখার জন্য গেলেও ৬ মাস এক বছর পর কেউ আর স্টাডি কন্টিনিউ করে না। বেশিরভাগই পাশ্ববর্তী দেশ গ্রিক সাইপ্রাসে চলে যায়, আবার অনেকেই ওয়ার্ক পারমিটে চলে আসে।

কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বাংলাদেশি স্টুডেন্টদের একটা সুনাম থাকলেও সেটা প্রায় ক্ষুণ্ন হওয়ার পথে। ব্যাচেলর শেষ করেছে এমন বাংলাদেশির সংখ্যা হাতেগোনার মতই৷ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছে মাত্র দুইজন।

ঠিক এমন সময়ে সালেহ আহমেদ ও শাহিনুর আক্তার দম্পতি নর্থ সাইপ্রাসে এক অনন্য রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। তারা দুজন একসঙ্গে গিরনে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে সম্মাননার সঙ্গে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ১৮ জুন ইউনিভার্সিটি থেকে তাদেরকে সম্মাননা জানানো হয়। নর্থ সাইপ্রাসের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি দম্পতি একসঙ্গে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেছেন। নর্থ সাইপ্রাসে যেখানে প্রায় সকলের কাছে পড়াশোনা চালিয়ে নেয়া ছিল অসম্ভব সালেহ আহমদ সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন।

সালেহ আহমেদ ২০০৯ সালে পাড়ি জমিয়েছিলেন নর্থ সাইপ্রাসে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে ব্যাচেলর পড়াশোনা করার সময় তিনি বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে কাজ করে পড়াশোনার খরচ সংগ্রহ করতেন। পাশাপাশি বাড়িতেও টাকা পাঠাতেন। পড়াশোনা চালিয়ে নেয়াটা ছিল খুবই কষ্টকর ব্যাপার। অবশেষে সফলতার দেখা পান তিনি ২০১৪ সালে। ব্যাচেলর শেষ করার পর তিনি সাইপ্রাস আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং সেখানে পড়াশোনা করা অবস্থায় এডমিশন রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এডমিশন অফিসে যুক্ত হন।

তিনি ২০১৮ সালে সাইপ্রাস আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যয়ন শেষ করে গিরনে আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। একাডেমিক রেজাল্ট ভালো করার ফলে তিনি সেখানে রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার সুজুগ পান। রোহিঙ্গা রিফিউজি ক্রাইসিস নিয়ে মাস্টার্স থিসিস লিখেন। থিসিসে তিনি রোহিঙ্গাদের ব্যপারে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে রোহিঙ্গা ক্রাইসিসের প্রভাব তুলে ধরেন।

সালেহ আহমেদ বাংলাদেশি কমিউনিটি ইন নর্থ সাইপ্রাসের একটি আলোচিত নাম। তিনি বাংলাদেশি স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন নর্থ সাইপ্রাসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সালেহ আহমেদ আমিরগঞ্জ রায়পুরা, নরসংদীর সিরাজুল ইসলাম এবং হোজাইফা বেগমের কনিষ্ট পুত্র।

শাহিনুর আক্তার ২০১৯ সালে নর্থ সাইপ্রাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তিনি শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অর্থনীতিতে ব্যাচেলর শেষ করে নর্থ সাইপ্রাসে পাড়ি জমান। তিনি সর্বোচ্চ সম্মান (একাডেমিক হাই অনার) নিয়ে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেন। শাহিনুর রহমান শরীয়তপুরের আব্দুর রহমান এবং হাসিনা বেগমের প্রথম মেয়ে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

নর্থ সাইপ্রাসে বাংলাদেশি দম্পতির কৃতিত্ব

 মাহাফুজুল হক চৌধুরী, সাইপ্রাস থেকে 
২১ জুন ২০২১, ০৭:১৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

নর্থ সাইপ্রাস ইউরোপের ভূমধ্যসাগরে অবস্থিত একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। ১৯৭৪ সালে গ্রিক সাইপ্রাস থেকে তুরস্ক এ অংশটি নেয়।

একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও আন্তর্জাতিকভাবে কোনো দেশের কাছে এখনো স্বীকৃতি পায়নি। ৩ হাজার ৯০০ বর্গ কিলোমিটারের দেশটিতে মাত্র ৩ লাখ মানুষের বসবাস। তুর্কি সরকার শাসিত নর্থ সাইপ্রাস এখনো বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলির কাছে তেমনটা পরিচিতি লাভ করতে পারেনি।

বাংলাদেশের মানুষও এ দেশটি সম্পর্কে তেমন অবগত নয়। যদিও বাঙালি নেই বিশ্বের এমন দেশ পাওয়া বিরল। তেমনি নর্থ সাইপ্রাসের মতো একটি ছোট্ট দেশেও যে ৩০০০ এর মত বাংলাদেশির বসবাস এটা হয়তো বাংলাদেশ সরকারেরও অজানা। 

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজারেরও উপর বাংলাদেশি এখানে আসে। তারমধ্যে অর্ধেক আসে ওয়ার্ক পারমিট ভিসায়, বাকিরা স্টুডেন্ট ভিসায়। এ দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রতি বছর অসংখ্য স্টুডেন্ট আনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। এদেশের বেশকটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পড়ালেখার মান অত্যন্ত ভাল এবং আন্তর্জাতিক মানের।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশিরা এ দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। তারা পড়ালেখার জন্য গেলেও ৬ মাস এক বছর পর কেউ আর স্টাডি কন্টিনিউ করে না। বেশিরভাগই পাশ্ববর্তী দেশ গ্রিক সাইপ্রাসে চলে যায়, আবার অনেকেই ওয়ার্ক পারমিটে চলে আসে।

কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বাংলাদেশি স্টুডেন্টদের একটা সুনাম থাকলেও সেটা প্রায় ক্ষুণ্ন হওয়ার পথে। ব্যাচেলর শেষ করেছে এমন বাংলাদেশির সংখ্যা হাতেগোনার মতই৷ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছে মাত্র দুইজন।

ঠিক এমন সময়ে সালেহ আহমেদ ও শাহিনুর আক্তার দম্পতি নর্থ সাইপ্রাসে এক অনন্য রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। তারা দুজন একসঙ্গে গিরনে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে সম্মাননার সঙ্গে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ১৮ জুন ইউনিভার্সিটি থেকে তাদেরকে সম্মাননা জানানো হয়। নর্থ সাইপ্রাসের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি দম্পতি একসঙ্গে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেছেন। নর্থ সাইপ্রাসে যেখানে প্রায় সকলের কাছে পড়াশোনা চালিয়ে নেয়া ছিল অসম্ভব সালেহ আহমদ সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন। 

সালেহ আহমেদ ২০০৯ সালে পাড়ি জমিয়েছিলেন নর্থ সাইপ্রাসে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে ব্যাচেলর পড়াশোনা করার সময় তিনি বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে কাজ করে পড়াশোনার খরচ সংগ্রহ করতেন। পাশাপাশি বাড়িতেও টাকা পাঠাতেন। পড়াশোনা চালিয়ে নেয়াটা ছিল খুবই কষ্টকর ব্যাপার। অবশেষে সফলতার দেখা পান তিনি ২০১৪ সালে।  ব্যাচেলর শেষ করার পর তিনি সাইপ্রাস আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং সেখানে পড়াশোনা করা অবস্থায় এডমিশন রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এডমিশন অফিসে যুক্ত হন।

তিনি ২০১৮ সালে সাইপ্রাস আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যয়ন শেষ করে গিরনে আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। একাডেমিক রেজাল্ট ভালো করার ফলে তিনি সেখানে রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার সুজুগ পান। রোহিঙ্গা রিফিউজি ক্রাইসিস নিয়ে মাস্টার্স থিসিস লিখেন। থিসিসে তিনি রোহিঙ্গাদের ব্যপারে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে রোহিঙ্গা ক্রাইসিসের প্রভাব তুলে ধরেন। 

সালেহ আহমেদ বাংলাদেশি কমিউনিটি ইন নর্থ সাইপ্রাসের একটি আলোচিত নাম। তিনি বাংলাদেশি স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন নর্থ সাইপ্রাসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সালেহ আহমেদ আমিরগঞ্জ রায়পুরা, নরসংদীর সিরাজুল ইসলাম এবং হোজাইফা বেগমের কনিষ্ট পুত্র।

শাহিনুর আক্তার ২০১৯ সালে নর্থ সাইপ্রাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তিনি শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অর্থনীতিতে ব্যাচেলর শেষ করে নর্থ সাইপ্রাসে পাড়ি জমান। তিনি সর্বোচ্চ সম্মান (একাডেমিক হাই অনার) নিয়ে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেন। শাহিনুর রহমান শরীয়তপুরের আব্দুর রহমান এবং হাসিনা বেগমের প্রথম মেয়ে।
 

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও খবর