আবার যদি ফিরে পেতাম, মাদুলি বানাইয়া রাখতাম
jugantor
আবার যদি ফিরে পেতাম, মাদুলি বানাইয়া রাখতাম

  খান লিটন, জার্মানি থেকে  

১৯ অক্টোবর ২০২১, ০০:২১:২৯  |  অনলাইন সংস্করণ

ঢাকা প্রেসিডেন্সিয়াল লায়ন্স কিন্ডারগার্টেন (বর্তমানে যেখানে মোহাম্মদপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ) থেকে প্রাইমারি লেভেল শেষে ভর্তি হয়েছিলাম মোহাম্মদপুর নূরজাহান রোডে বেঙ্গলি মিডিয়াম হাইস্কুলে। পারিবারিক কারণে বছরের মাঝখানে চলে যেতে হয়েছিল গ্রামের বাড়িতে। এখন যেমন লকডাউনের কারণে ঢাকা ছাড়ে লাখো মানুষ। ভর্তি হলাম ফুলঝুড়ী বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পড়াশুনায় ভালো তথা বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হলাম বলে শ্রদ্ধেয় স্যারদের কাছে প্রিয় ছাত্র ও সহপাঠীদের সহজেই বন্ধু হলাম । স্কুলের মাসিক বেতন ছিল ১৬ টাকা।

যারা ক্লাসে প্রথম ও দ্বিতীয় হতো তাদের বেতন মওকুফ করা হতো। সেই সুবাদে আমার বেতন দিতে হতো না কিন্তু বাড়িতে বলতাম না। আমার বেতনের টাকা আমার সহপাঠীর জন্য দিতাম, ওর দিতে কস্ট হতো বলে। নাম বলা যাবে না। আমার এক প্রতিবেশীর ছেলেকে আমার বই দিতাম, আমার এক ক্লাস নিচে পড়তো। ওর বাবা ওকে পড়াতে চাইত না। সে আজ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। সহপাঠীদের ভোটে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি, চারবার ক্লাস ক্যাপটেন ছিলাম। ভোটে জিতলে সহপাঠীদের নাবিস্কো গ্লুকোজ বিস্কিট খাওয়াতে হতো। মজার ব্যাপার ছিল ভোটে জিততাম আমি আর বিস্কিট খাওয়াতো সহপাঠী বন্ধুরা- রূপী কির্তনীয়া ( সত্যিই সে ছিল রূপবতী দুধে আলতা মেহেদি রং যার ), নসু—নূরুল ইসলাম ( সাবেক সেনা কর্মকর্তা ), ইদ্রিস ( জানিনা কি করে ), দুলু। ওদের ভালবাসা কৃতজ্ঞতাভরে মনে করি।

কম বয়সে রূপী স্বর্গবাসী হয়েছে। ওপারে ভাল থাকুক এই কামনা। রুপীকে উপরের ক্লাসের ছাত্ররা প্রচণ্ডভাবে পছন্দ করতো এবং অনেক স্যাররাও পিছিয়ে ছিলেন না। আমার মেয়ে অনিমা সাঈমা খান জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট লিভিগ স্কুলে ওর ক্লাসে তিনবার ক্যাপ্টেন হয়েছে । আমি ওর সহপাঠীদের চকলেট কিনে দিয়েছি। সে যাই হোক, তখন স্কুলটির মূল ভবন ছিল দোতলা, সেখানে ছিল হেড স্যারের রুম, স্যারদের রুম, মেয়েদের কমন রুম, দোতালায় স্যারদের থাকা ও ছাত্রাবাস। লম্বা টিনের দোচালা ঘর ছিল ক্লাস রুম । সঙ্গে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ছিল । ক্লাসরুমগুলোর কোনো দরজায় বা জানালায় কপাট (পুস্তকগত শব্দটা জানা নাই) ছিলো না। প্রধান শিক্ষক ছিলেন শাহআলম বিএসসি । সুদর্শন পুরুষ, যথেষ্ট মার্জিত , রুচিশীল , এক কথায় অমায়িক শিক্ষক ছিলেন।

সপ্তাহের শুরুতে বরগুনা থেকে আসতেন আবার সপ্তাহান্তে চলে যেতেন । দপ্তরি শাহআলম ভাই বা আলম তাকে লঞ্চঘাট থেকে নিয়ে আসতো আবার দিয়ে আসতো। সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন মাহতাব স্যার। বাবরি চুল-দাঁড়ি, প্রচণ্ড রাগী আর ইসলামী চেতনার মানুষ ছিলেন। যারা ছাত্রাবাসে থাকতো (আমিও ছিলাম অষ্টম শ্রেণিতে স্কলারশিপ দেয়ার সময়) তাদের বাধ্য করতেন ভোর ৪টায় উঠে আজান দিয়ে নামাজ পড়তে। আমার ছাত্রাবাসে অনেক রাতে বড় ভাই কাম বন্ধু পরলোকগত হারুন সিকদার ঘুমাতে আসতো, ভোর হবার আগে চলে যেতো।

বাংলার স্যার ইউসুফ আলী খানও প্রচণ্ড রাগী ছিলেন। পড়াশুনার জন্য নয়, একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির সময় — আমি, সহপাঠী বশির আহমেদ বশির, খালেক ডাক্তারের ছেলে মিজান এক ক্লাস উপরে পড়ত, আমরা তিনজন একটা অমার্জনীয় দুস্টামীতে ব্যস্ত ছিলাম। ওই সময় আমরা লুঙ্গি পরে স্কুলে যেতাম বৃষ্টি ও কাঁদার কারণে।

ইউসুফ স্যার দূর থেকে আমাদের দুষ্টামী দেখে ফেলেন । লাইবেব্রীতে গিয়ে দপ্তরী দিয়ে আমাদের ডাকেন, দরজা বন্ধ করে জোড়া বেত দিয়ে ইচ্ছেমতো পিটিয়ে পিঠের, রানের চামড়া তুলে ফেলেন । তার ফার্মেসি ছিল—কাগজে ঔষধ লিখে দিয়ে তিনদিনের ছুটি দিয়েছিলেন। আর একদিন তিনি বিনাদোষে মেরেছিলেন, একটি মেয়ের সঙ্গে আমার বেশ সখ্য ছিল, কেউ বেঞ্চের ওপরে ব্লেড দিয়ে আমার আর ওর নাম লিখে ছিল। তা দেখে স্যার আমাকে অনেক পিটিয়েছিলেন। পড়ালেখার জন্য কখনও মার খেতে হয়নি। এত রাগী মানুষকেও উল্লাসে লাফাতে দেখেছি যেদিন সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছিলেন। কোনো ক্লাসে তৃতীয় হইনি কখনও। আমি, জাকির হোসেন (বর্তমানে সহকারী প্রধান শিক্ষক এই স্কুলের) ও নাসির মোল্লা (সেও বরগুনায় শিক্ষক) ও বসির আহমেদ আকনের মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় থাকতাম।

ইংরেজি পড়াতেন আশরাফ স্যার ও ইসলামিয়াত পড়াতেন যে হুজুর নাম মনে নাই। তারা সেলিমের (আমজাদ দফাদারের ছেলে) বাড়ি লজিং থাকতেন বলে সেলিমরে বা যারা প্রাইভেট পড়তো তাদের নম্বর বেশি দিতেন না পারলেও। নিরোধ স্যার ও নিখিল স্যার অনেকটা ব্যাতিক্রমধর্মী আদর্শ শিক্ষক ছিলেন, কেউ তাদের সহজে পা ধরে সালাম করতে পারতো না বা দিতেন না। সালেক বিএসসি স্যার যার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য শিক্ষকতা পেশায় এবং মোসলেম স্যার, যারা বিনা পয়সায় ছাত্র/ছাত্রীদের প্রাইভেট পড়াতেন ও বই বা পড়ালেখার জন্য সহায়তা করতেন। এদের বন্ধুসুলভ আচরণ ও সহযোগিতা অনেক ছাত্রছাত্রীর জীবনে সাফল্য এনে দিয়েছে। শরীরচর্চা বিষয়ক ও সংস্কৃতিসহ সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন মরহুম কাজী আবুল হাসেম। প্রতিদিন শীত বা শুকনা মৌসুমে জাতীয় সংগীত ও কুচকাওয়াজ করাতেন।

আমি, বসির, মমতাজ, তুলশি দি, মিরাজ কাজী, শিখা দাশ, আলমগীর মাস সাব (আমাদের সময় উপরের ক্লাসে যারা পড়তো তাদের মাস সাব সম্মোধন করতে হতো) এরা কুচকাওয়াজের নেতৃত্ব দিতাম। স্কুলে কোনো শিক্ষা কর্মকর্তা বা মেহমান এলে কাজী স্যার ছাত্রদের দ্বারা মনুমেন্ট বানাতেন একজনকে আরেকজনের ঘাড়েঁ বসিয়ে। একশে ফেব্রুয়ারিতে কলা গাছ আর কাঁদামাটি দিয়ে শহীদ মিনার বানাতাম। কাজী স্যারের সহায়তায় ও হাতে কলমে শিক্ষায়, স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী” কবিতা আবৃত্তি করে, কমিক করে, যেমন খুশী তেমন সাজো, নাটক করে পরপর চার বার প্রতিটি বিষয় প্রথম হয়েছিলাম। কমল “কবর” কবিতা আবৃত্তি করে দ্বিতীয় হতো। তবে সাইজে ছোট ও নাদুসনুদুস ছিলাম বলে নাটকে আমাকে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করাতেন। সাজাতেন তুলশি দি। এই নাটক করতে গিয়ে জীবনে প্রথম ও শেষবারের মতো পাতার বিড়ি টেনেছিলাম শাহজাদা তালুকদার ও মিরাজ আর হারুনের সাথে। একবার পরলোকগত অমল বাড়ৈ লাশ সেজে সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলেন। কাজী স্যার আমাকে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে, আমার নিচের ক্লাসের পরীক্ষার খাতা দেখতে দিতেন। তিনি ছাত্রদের আচরণ ভেদে নাম দিতেন— যেমন, উটকল, প্যাঁচা ইত্যাদি। পরবর্তীতে স্যার বিপুল ভোটে সরিষামুরী ইউনিয়নের চেয়্যারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই সময়টায়ই খালা আনোয়ারা লতিফের অনুপ্রেরণায় রেডিও তেহরান, পিকিং রেডিও, ভয়েস অফ আমেরিকাসহ ডয়েচে ভেলের শ্রোতা হিসেবে চিঠি লেখার অভ্যাস তৈরি হয়। সেই থেকেই তৎকালীন ডয়েচে ভেলের সাংবাদিক নাজমুন্নেছা পিয়ারীকে (২১শে পদকপ্রাপ্ত ) চিনি। স্কুলের সাথে যে বন্দরটি রয়েছে, ফুলঝুড়ি বন্দর—সেখানকার একটি ব্যাপার আজও টানে প্রবাসে বসে। তা হলো, মেনাজের রুটি। আমরা ছাত্র/ছাত্রী, শিক্ষক সবাই খেতাম। দাম ছিলো ৭৫ পয়সা। উপাদান দু’টা আটার রুটি, সঙ্গে রওয়াপরা খেজুরগুড় ও নারিকেল। লেইজার বা সবার টিফিন। একটা নিচু বেঞ্চে বসে প্লেট বা থালা আরেকটা বেঞ্চে রেখে খাওয়া হতো। বাকিরও সুবিধা ছিল। সঠিক হিসাব করলে এখনও মেনাজ ভাই আমার কাছে টাকা পায়। তবে দেশে গেলে তার আধুনিক রেস্তোরাঁয় খেয়ে পুষিয়ে দেই। চাচাতো বোন আমেনা বুর বাড়ি স্কুলের কাছে হওয়ায় প্রায়ই পিঠার দাওয়াত পেতাম। একটি অপরাধবোধও আছে এত ভালোর মাঝে- এসএসসি টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আমি, বশির, মনির পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বাঁশের লাঠি জড়ো করে ভাংচুর করেছিলাম, অভিযুক্ত শিক্ষকদের অপমান করার দু:সাহস করেছিলাম, পরীক্ষা বাতিল করেছিলাম। আজ মাফ চেয়ে নেই আবারও।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

আবার যদি ফিরে পেতাম, মাদুলি বানাইয়া রাখতাম

 খান লিটন, জার্মানি থেকে 
১৯ অক্টোবর ২০২১, ১২:২১ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ঢাকা প্রেসিডেন্সিয়াল লায়ন্স কিন্ডারগার্টেন (বর্তমানে যেখানে মোহাম্মদপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ) থেকে প্রাইমারি লেভেল শেষে ভর্তি হয়েছিলাম মোহাম্মদপুর নূরজাহান রোডে বেঙ্গলি মিডিয়াম হাইস্কুলে। পারিবারিক কারণে বছরের মাঝখানে চলে যেতে হয়েছিল গ্রামের বাড়িতে। এখন যেমন লকডাউনের কারণে ঢাকা ছাড়ে লাখো মানুষ। ভর্তি হলাম ফুলঝুড়ী বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পড়াশুনায় ভালো তথা বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হলাম বলে শ্রদ্ধেয় স্যারদের কাছে প্রিয় ছাত্র ও সহপাঠীদের সহজেই বন্ধু হলাম । স্কুলের মাসিক বেতন ছিল ১৬ টাকা। 

যারা ক্লাসে প্রথম ও দ্বিতীয় হতো তাদের বেতন মওকুফ করা হতো। সেই সুবাদে আমার বেতন দিতে হতো না কিন্তু বাড়িতে বলতাম না। আমার বেতনের টাকা আমার সহপাঠীর জন্য দিতাম, ওর দিতে কস্ট হতো বলে। নাম বলা যাবে না। আমার এক প্রতিবেশীর ছেলেকে আমার বই দিতাম, আমার এক ক্লাস নিচে পড়তো। ওর বাবা ওকে পড়াতে চাইত না। সে আজ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। সহপাঠীদের ভোটে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি, চারবার ক্লাস ক্যাপটেন ছিলাম। ভোটে জিতলে সহপাঠীদের নাবিস্কো গ্লুকোজ বিস্কিট খাওয়াতে হতো। মজার ব্যাপার ছিল ভোটে জিততাম আমি আর বিস্কিট খাওয়াতো সহপাঠী বন্ধুরা- রূপী কির্তনীয়া ( সত্যিই সে ছিল রূপবতী দুধে আলতা মেহেদি রং যার ), নসু—নূরুল ইসলাম ( সাবেক সেনা কর্মকর্তা ), ইদ্রিস ( জানিনা কি করে ), দুলু। ওদের ভালবাসা কৃতজ্ঞতাভরে মনে করি।

কম বয়সে রূপী স্বর্গবাসী হয়েছে। ওপারে ভাল থাকুক এই কামনা। রুপীকে উপরের ক্লাসের ছাত্ররা প্রচণ্ডভাবে পছন্দ করতো এবং অনেক স্যাররাও পিছিয়ে ছিলেন না। আমার মেয়ে অনিমা সাঈমা খান জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট লিভিগ স্কুলে ওর ক্লাসে তিনবার ক্যাপ্টেন হয়েছে । আমি ওর সহপাঠীদের চকলেট কিনে দিয়েছি। সে যাই হোক, তখন স্কুলটির মূল ভবন ছিল দোতলা, সেখানে ছিল হেড স্যারের রুম, স্যারদের রুম, মেয়েদের কমন রুম, দোতালায় স্যারদের থাকা ও ছাত্রাবাস। লম্বা টিনের দোচালা ঘর ছিল ক্লাস রুম । সঙ্গে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ছিল । ক্লাসরুমগুলোর কোনো দরজায় বা জানালায় কপাট (পুস্তকগত শব্দটা জানা নাই) ছিলো না। প্রধান শিক্ষক ছিলেন শাহআলম বিএসসি । সুদর্শন পুরুষ, যথেষ্ট মার্জিত , রুচিশীল , এক কথায় অমায়িক শিক্ষক ছিলেন। 

সপ্তাহের শুরুতে বরগুনা থেকে আসতেন আবার সপ্তাহান্তে চলে যেতেন । দপ্তরি শাহআলম ভাই বা আলম তাকে লঞ্চঘাট থেকে নিয়ে আসতো আবার দিয়ে আসতো। সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন মাহতাব স্যার। বাবরি চুল-দাঁড়ি, প্রচণ্ড রাগী আর ইসলামী চেতনার মানুষ ছিলেন। যারা ছাত্রাবাসে থাকতো (আমিও ছিলাম অষ্টম শ্রেণিতে স্কলারশিপ দেয়ার সময়) তাদের বাধ্য করতেন ভোর ৪টায় উঠে আজান দিয়ে নামাজ পড়তে। আমার ছাত্রাবাসে অনেক রাতে বড় ভাই কাম বন্ধু পরলোকগত হারুন সিকদার ঘুমাতে আসতো, ভোর হবার আগে চলে যেতো।

বাংলার স্যার ইউসুফ আলী খানও প্রচণ্ড রাগী ছিলেন। পড়াশুনার জন্য নয়, একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির সময় — আমি, সহপাঠী বশির আহমেদ বশির, খালেক ডাক্তারের ছেলে মিজান এক ক্লাস উপরে পড়ত, আমরা তিনজন একটা অমার্জনীয় দুস্টামীতে ব্যস্ত ছিলাম। ওই সময় আমরা লুঙ্গি পরে স্কুলে যেতাম বৃষ্টি ও কাঁদার কারণে।

ইউসুফ স্যার দূর থেকে আমাদের দুষ্টামী দেখে ফেলেন । লাইবেব্রীতে গিয়ে দপ্তরী দিয়ে আমাদের ডাকেন, দরজা বন্ধ করে জোড়া বেত দিয়ে ইচ্ছেমতো পিটিয়ে পিঠের, রানের চামড়া তুলে ফেলেন । তার ফার্মেসি ছিল—কাগজে ঔষধ লিখে দিয়ে তিনদিনের ছুটি দিয়েছিলেন। আর একদিন তিনি বিনাদোষে মেরেছিলেন, একটি মেয়ের সঙ্গে আমার বেশ সখ্য ছিল, কেউ বেঞ্চের ওপরে ব্লেড দিয়ে আমার আর ওর নাম লিখে ছিল। তা দেখে স্যার আমাকে অনেক পিটিয়েছিলেন। পড়ালেখার জন্য কখনও মার খেতে হয়নি। এত রাগী মানুষকেও উল্লাসে লাফাতে দেখেছি যেদিন সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছিলেন। কোনো ক্লাসে তৃতীয় হইনি কখনও। আমি, জাকির হোসেন (বর্তমানে সহকারী প্রধান শিক্ষক এই স্কুলের) ও নাসির মোল্লা (সেও বরগুনায় শিক্ষক) ও বসির আহমেদ আকনের মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় থাকতাম। 

ইংরেজি পড়াতেন আশরাফ স্যার ও ইসলামিয়াত পড়াতেন যে হুজুর নাম মনে নাই। তারা সেলিমের (আমজাদ দফাদারের ছেলে) বাড়ি লজিং থাকতেন বলে সেলিমরে বা যারা প্রাইভেট পড়তো তাদের নম্বর বেশি দিতেন না পারলেও। নিরোধ স্যার ও নিখিল স্যার অনেকটা ব্যাতিক্রমধর্মী আদর্শ শিক্ষক ছিলেন, কেউ তাদের সহজে পা ধরে সালাম করতে পারতো না বা দিতেন না। সালেক বিএসসি স্যার যার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য শিক্ষকতা পেশায় এবং মোসলেম স্যার, যারা বিনা পয়সায় ছাত্র/ছাত্রীদের প্রাইভেট পড়াতেন ও বই বা পড়ালেখার জন্য সহায়তা করতেন। এদের বন্ধুসুলভ আচরণ ও সহযোগিতা অনেক ছাত্রছাত্রীর জীবনে সাফল্য এনে দিয়েছে। শরীরচর্চা বিষয়ক ও সংস্কৃতিসহ সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন মরহুম কাজী আবুল হাসেম। প্রতিদিন শীত বা শুকনা মৌসুমে জাতীয় সংগীত ও কুচকাওয়াজ করাতেন।

আমি, বসির, মমতাজ, তুলশি দি, মিরাজ কাজী, শিখা দাশ, আলমগীর মাস সাব (আমাদের সময় উপরের ক্লাসে যারা পড়তো তাদের মাস সাব সম্মোধন করতে হতো) এরা কুচকাওয়াজের নেতৃত্ব দিতাম। স্কুলে কোনো শিক্ষা কর্মকর্তা বা মেহমান এলে কাজী স্যার ছাত্রদের দ্বারা মনুমেন্ট বানাতেন একজনকে আরেকজনের ঘাড়েঁ বসিয়ে। একশে ফেব্রুয়ারিতে কলা গাছ আর কাঁদামাটি দিয়ে শহীদ মিনার বানাতাম। কাজী স্যারের সহায়তায় ও হাতে কলমে শিক্ষায়, স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী” কবিতা আবৃত্তি করে, কমিক করে, যেমন খুশী তেমন সাজো, নাটক করে পরপর চার বার প্রতিটি বিষয় প্রথম হয়েছিলাম। কমল “কবর” কবিতা আবৃত্তি করে দ্বিতীয় হতো। তবে সাইজে ছোট ও নাদুসনুদুস ছিলাম বলে নাটকে আমাকে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করাতেন। সাজাতেন তুলশি দি। এই নাটক করতে গিয়ে জীবনে প্রথম ও শেষবারের মতো পাতার বিড়ি টেনেছিলাম শাহজাদা তালুকদার ও মিরাজ আর হারুনের সাথে। একবার পরলোকগত অমল বাড়ৈ লাশ সেজে সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলেন। কাজী স্যার আমাকে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে, আমার নিচের ক্লাসের পরীক্ষার খাতা দেখতে দিতেন। তিনি ছাত্রদের আচরণ ভেদে নাম দিতেন— যেমন, উটকল, প্যাঁচা ইত্যাদি। পরবর্তীতে স্যার বিপুল ভোটে সরিষামুরী ইউনিয়নের চেয়্যারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই সময়টায়ই খালা আনোয়ারা লতিফের অনুপ্রেরণায় রেডিও তেহরান, পিকিং রেডিও, ভয়েস অফ আমেরিকাসহ ডয়েচে ভেলের শ্রোতা হিসেবে চিঠি লেখার অভ্যাস তৈরি হয়। সেই থেকেই তৎকালীন ডয়েচে ভেলের সাংবাদিক নাজমুন্নেছা পিয়ারীকে (২১শে পদকপ্রাপ্ত ) চিনি। স্কুলের সাথে যে বন্দরটি রয়েছে, ফুলঝুড়ি বন্দর—সেখানকার একটি ব্যাপার আজও টানে প্রবাসে বসে। তা হলো, মেনাজের রুটি। আমরা ছাত্র/ছাত্রী, শিক্ষক সবাই খেতাম। দাম ছিলো ৭৫ পয়সা। উপাদান দু’টা আটার রুটি, সঙ্গে রওয়াপরা খেজুরগুড় ও নারিকেল। লেইজার বা সবার টিফিন। একটা নিচু বেঞ্চে বসে প্লেট বা থালা আরেকটা বেঞ্চে রেখে খাওয়া হতো। বাকিরও সুবিধা ছিল। সঠিক হিসাব করলে এখনও মেনাজ ভাই আমার কাছে টাকা পায়। তবে দেশে গেলে তার আধুনিক রেস্তোরাঁয় খেয়ে পুষিয়ে দেই। চাচাতো বোন আমেনা বুর বাড়ি স্কুলের কাছে হওয়ায় প্রায়ই পিঠার দাওয়াত পেতাম। একটি অপরাধবোধও আছে এত ভালোর মাঝে- এসএসসি টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আমি, বশির, মনির পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বাঁশের লাঠি জড়ো করে ভাংচুর করেছিলাম, অভিযুক্ত শিক্ষকদের অপমান করার দু:সাহস করেছিলাম, পরীক্ষা বাতিল করেছিলাম। আজ মাফ চেয়ে নেই আবারও।
 

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন