স্বর্ণমন্দিরের সোনালি মানুষের বর্ণিল ভালোবাসা
jugantor
স্বর্ণমন্দিরের সোনালি মানুষের বর্ণিল ভালোবাসা

  খান লিটন, জার্মানি থেকে  

২০ অক্টোবর ২০২১, ০১:৩৬:০২  |  অনলাইন সংস্করণ

পুরো নাম রাম বাবু, ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের ফরিদকোর্ট জেলার মানুষ। বহু বছর জার্মানিতে থাকেন। জার্মানিতে একই কোম্পানিতে কাজের সুবাদে বন্ধুত্ব। আমি নার্ভের সমস্যায় ভুগছিলাম, রামেরও একই সমস্যা ছিল। গ্রামে এক হাতুরে ডাক্তার আছে, তার চিকিৎসায় রাম সুস্থ হয়েছে । আমাকেও তার কাছে যেতে বললো । ফ্রাংকফুর্টে ভারতীয় দূতাবাস থেকে ভিসা নিলাম। পাঞ্জাবে কোথায় থাকবো, কীভাবে ডাক্তার দেখাবো, সব রাম ঠিক করে দিলেন।

জার্মানিতে আরেক সহকর্মী বলবীর সিং সেই সময় ছুটিতে ছিলেন পাঞ্জাবে। বিমানবন্দরে এসেছিলেন আমাকে নিতে। ভোর রাতের মৃদু আলো আর মৃদু অন্ধকারে আধাঘন্টা গাড়ি চালাবার পর বলবীর বলল- চল খান তোমাকে ঐতিহাসিক গোল্ডেন টেম্পল বা স্বর্ণমন্দির দেখাই। সৌভাগ্য হলো এই ঐতিহাসিক স্থাপনা ও শিব সম্প্রদায়ের সব চেয়ে বড় তীর্থস্থান দেখার। প্রতিদিন লাখো দর্শনার্থী আসেন, নানান ধর্মের দেশ-বিদেশের। আমার সঙ্গে কয়েকজন জার্মান দর্শনার্থীর দেখা হয়েছে। যে যেই ধর্মের বা যেই দেশের হোক না কেন থাকা খাওয়া ফ্রি। অনেক নারী পুরুষ ভক্তকেই দেখলাম স্বর্ণমন্দিরের দিঘীর শীতল জলে স্নান করছে পাপ মোচনের প্রত্যাশায়। কাছেই বলবীরের দ্বিতল নিজস্ব বাড়ি। বাড়িতে বলবীরের ঘোমটা দেয়া স্ত্রী ও ডাক্তার কন্যার আবহমানকালের ভারতীয় আতিথেয়তা আমার মা-বোনের মতোই মনে হলো। পূর্বেই আমার পুরো সময়ের জন্য রাম ড্রাইভারসহ গাড়ি ঠিক করে রেখেছিল- রোজ তিন হাজার রুপি।

অমৃতসর বলবীরের বাড়ি থেকে তিন ঘণ্টা গাগি চালাবার পর ফরিদকোর্ট পৌঁছলাম। তার পাশের গ্রামেই ডাক্তার। প্যারাডাইস নামের তিনতারা হোটেলে বসবাস। সকালে রামের ভাগ্নে জ্যোতি, যে পুরো দুই সপ্তাহ পাঞ্জাবে আমাকে সময় দিয়েছে ও রামের বন্ধু অ্যাডভোকেট বিনোদ মাইনি, ফরিদকোর্ট জেলা বার সমিতির সভাপতি ও জেলা কংগ্রেসের সভাপতি হোটেলে এলেন। যতদিন থেকেছি বিনোদ মাইনি সকালে তার অফিসে যাওয়ার সময় আমার হোটেলে বাসায় তৈরি নাস্তা দিয়ে গেছেন আবার রাতে সাথে নিয়ে বাসায় পরিবারের সাথে খাইয়ে হোটেলে দিয়ে গেছেন।

এমনকি তার স্ত্রী যিনি একটি কলেজে পড়ান, পুত্র যে কানাডায় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ে, তাদের নিয়ে আমাকেসহ বিকালে আইসক্রিম ও পাঞ্জাবের বিখ্যাত খাবার “রুটিকা মুরগির“ দোকানে খেয়েছেন। রুটিকা মুরগি হচ্ছে আস্তা মুরগির ওপরে আটার প্রলেপ দিয়ে মাটির চুলায় পোড়ানো। ড্রাইভার রণজিৎ সিং প্রতিদিন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেত।

শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছি। এক দেয়ালের একপাশে মসজিদ আরেক পাশে গুরুদয়ারা। ড্রাইভারের সঙ্গে ভারত পাকিস্তান বর্ডারসহ ক্ষেতখামার ও স্থানীয় বিবাহ উৎসব দেখেছি । রামের বৃদ্ধা মা, বড়দিসহ তার পড়শিরা, রাম রহিমের মতো আদর করেছেন। পাঞ্জাবে হাতুড়ে ডাক্তারে অসুখ ভালো হয়নি; তবে ২০ মার্চ ২০১৯ রাত ২টায় রামের ভাগ্নে জ্যোতি ও ড্রাইভার আমাকে অমৃতসর বিমানবন্দরে বিদায় দিতে এসে চোখের জল ঝরাল, যেটা স্বর্ণমন্দিরের সোনালি মানুষের বর্ণিল ভালোবাসা হিসেবে দাগ কেটে রইল।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

স্বর্ণমন্দিরের সোনালি মানুষের বর্ণিল ভালোবাসা

 খান লিটন, জার্মানি থেকে 
২০ অক্টোবর ২০২১, ০১:৩৬ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

পুরো নাম রাম বাবু, ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের ফরিদকোর্ট জেলার মানুষ। বহু বছর জার্মানিতে থাকেন। জার্মানিতে একই কোম্পানিতে কাজের সুবাদে বন্ধুত্ব। আমি নার্ভের সমস্যায় ভুগছিলাম, রামেরও একই সমস্যা ছিল। গ্রামে এক হাতুরে ডাক্তার আছে, তার চিকিৎসায় রাম সুস্থ হয়েছে । আমাকেও তার কাছে যেতে বললো । ফ্রাংকফুর্টে ভারতীয় দূতাবাস থেকে ভিসা নিলাম। পাঞ্জাবে কোথায় থাকবো, কীভাবে ডাক্তার দেখাবো, সব রাম ঠিক করে দিলেন। 

জার্মানিতে আরেক  সহকর্মী বলবীর সিং সেই সময় ছুটিতে ছিলেন পাঞ্জাবে। বিমানবন্দরে এসেছিলেন আমাকে নিতে। ভোর রাতের মৃদু আলো আর মৃদু অন্ধকারে আধাঘন্টা গাড়ি চালাবার পর বলবীর বলল- চল খান তোমাকে ঐতিহাসিক গোল্ডেন টেম্পল বা স্বর্ণমন্দির দেখাই। সৌভাগ্য হলো এই ঐতিহাসিক স্থাপনা ও শিব সম্প্রদায়ের সব চেয়ে বড় তীর্থস্থান  দেখার। প্রতিদিন লাখো দর্শনার্থী আসেন, নানান ধর্মের দেশ-বিদেশের। আমার সঙ্গে কয়েকজন জার্মান দর্শনার্থীর দেখা হয়েছে। যে যেই ধর্মের বা যেই দেশের হোক না কেন থাকা খাওয়া ফ্রি। অনেক নারী পুরুষ ভক্তকেই দেখলাম স্বর্ণমন্দিরের দিঘীর শীতল জলে স্নান করছে পাপ মোচনের প্রত্যাশায়। কাছেই বলবীরের দ্বিতল নিজস্ব বাড়ি। বাড়িতে বলবীরের ঘোমটা দেয়া স্ত্রী ও ডাক্তার কন্যার আবহমানকালের ভারতীয় আতিথেয়তা আমার মা-বোনের মতোই মনে হলো। পূর্বেই আমার পুরো সময়ের জন্য রাম ড্রাইভারসহ গাড়ি ঠিক করে রেখেছিল- রোজ তিন হাজার রুপি।

অমৃতসর বলবীরের বাড়ি থেকে তিন ঘণ্টা গাগি চালাবার পর ফরিদকোর্ট পৌঁছলাম। তার পাশের গ্রামেই ডাক্তার। প্যারাডাইস নামের তিনতারা হোটেলে বসবাস। সকালে রামের ভাগ্নে জ্যোতি, যে পুরো দুই সপ্তাহ পাঞ্জাবে আমাকে সময় দিয়েছে ও রামের বন্ধু অ্যাডভোকেট বিনোদ মাইনি, ফরিদকোর্ট জেলা বার সমিতির সভাপতি ও জেলা কংগ্রেসের সভাপতি হোটেলে এলেন। যতদিন থেকেছি বিনোদ মাইনি সকালে তার অফিসে যাওয়ার সময় আমার হোটেলে বাসায় তৈরি নাস্তা দিয়ে গেছেন আবার রাতে সাথে নিয়ে বাসায় পরিবারের সাথে খাইয়ে হোটেলে দিয়ে গেছেন। 

এমনকি তার স্ত্রী যিনি একটি কলেজে পড়ান, পুত্র যে কানাডায় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ে, তাদের নিয়ে আমাকেসহ বিকালে আইসক্রিম ও পাঞ্জাবের বিখ্যাত খাবার “রুটিকা মুরগির“ দোকানে খেয়েছেন। রুটিকা মুরগি হচ্ছে আস্তা মুরগির ওপরে আটার প্রলেপ দিয়ে মাটির চুলায় পোড়ানো। ড্রাইভার রণজিৎ সিং প্রতিদিন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেত।

শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছি। এক দেয়ালের একপাশে মসজিদ আরেক পাশে গুরুদয়ারা। ড্রাইভারের সঙ্গে ভারত পাকিস্তান বর্ডারসহ ক্ষেতখামার ও স্থানীয় বিবাহ উৎসব দেখেছি । রামের বৃদ্ধা মা, বড়দিসহ তার পড়শিরা, রাম রহিমের মতো আদর করেছেন। পাঞ্জাবে হাতুড়ে ডাক্তারে অসুখ ভালো হয়নি; তবে ২০ মার্চ ২০১৯ রাত ২টায় রামের ভাগ্নে জ্যোতি ও ড্রাইভার আমাকে অমৃতসর বিমানবন্দরে বিদায় দিতে এসে চোখের জল ঝরাল, যেটা স্বর্ণমন্দিরের সোনালি মানুষের বর্ণিল ভালোবাসা হিসেবে দাগ কেটে রইল।
 

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন