তপ্ত মরুর দেশের তিন বছরের সুপ্ত কথা
jugantor
তপ্ত মরুর দেশের তিন বছরের সুপ্ত কথা

  খান লিটন, জার্মানি থেকে  

০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:৩৫:১৫  |  অনলাইন সংস্করণ

১৯৯২ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ বিমানের একটি বোয়িং উড়োজাহাজ ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা উড়ে পৌঁছল সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি শেখ জায়েদ বিন আল নাহিয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।

১৮৩ জন যাত্রীর মধ্যে আমিও একজন। স্বপ্নে বিনাভিসায়, বিনাটিকিটে, নিরাপত্তা তল্লাশি ছাড়া অনেকবার আকাশে উড়েছি কিন্তু বাস্তবে এটাই প্রথম আকাশ ভ্রমণ। বড়ভাই মরহুম এমএ সাত্তার খান বিমানের সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা থেকে বিমানের পাইলট ও বিমানসেবায় নিয়োজিতদের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন; সেই সুবাদে সেবার মানটা আমার জন্য বেশ আপগ্রেড ছিল। আবুধাবির স্থানীয় সময় বিকাল ৪টায় নামলাম।

ইমিগ্রেশন থেকে বের হওয়ার পর মনে হলো আগুনের ফুলকি গায়ে লাগছে, এতটাই গরম আবহাওয়া, ৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা। অপেক্ষায় ছিলেন সেজোভাই এমএ কুদ্দুস খান, যিনি আমার কর্মস্থল ‘টেইলস রিয়েল স্টেটের’ মালিক।

ট্যাক্সিতে করে বাসায় মানে মেসে গেলাম। একটি দশতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার তিন রুমের বাসায় ছয়জন থাকেন, আমিসহ সাতজন। ভাইয়ের রুমমেট ছিলেন পাকিস্তান শিয়ালকোর্টের। আবুধাবিতে আর্মির সৈনিক। খাওয়া দাওয়ার পর ভাই অফিসে নিয়ে গেলেন ও সব কিছু বুঝিয়ে দিলেন; এছাড়া লোকাল স্পন্সর আল হামাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

বলাবাহুল্য সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিদেশি কোনো নাগরিক যদি তখন ব্যবসা করতে চাইত তাহলে স্থানীয় কোনো নাগরিকের সঙ্গে ৪৯% ও ৫১% পার্টনারশিপের মাধ্যমে ব্যবসা করতে হতো।

স্থানীয় নাগরিকের ৫১% পার্টনারশিপের জন্য সে কোনো মূলধন খাটাত না, বরং তাকে মাসে মাসে চুক্তি অনুযায়ী টাকা দিতে হতো। তবে ব্যবসার জন্য কোনো ট্যাক্স দিতে হতো না। আমাদের কাজ ছিল বাড়ি ভাড়া নিয়ে আবার ভাড়া দেওয়া ও বাড়ি বা দোকানপাট ও জমির ক্রয়-বিক্রয় করার মধ্যস্থতা করা, মানে দালাল। ১৮ জন কর্মচারী কাজ করত। আমি ছিলাম অফিসের দ্বিতীয় বস। সেই সুবাদে অফিসের সেক্রেটারি মিসরের মেয়ে আমেলকে প্রেম নিবেদন করেছিলাম, কিন্তু সে বলল- আমি গরিব দেশের মানুষ, তাই প্রেমিক হওয়ার যোগ্য না; আমাদের অফিসের সে একজন কর্মচারী এটা কোনো ব্যাপার না। অফিস ছিল সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা ও বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা। সব নামাজের ওয়াক্তে সেজো ভাইয়ের সঙ্গে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে হতো।

ভাই চাইতেন যেহেতু নিজেদের ব্যবসা তাই অফিস আওয়ার ছাড়াও অফিসের কাজ করি। কিন্তু অফিস আওয়ার শেষ হলে আমাকে পেতেন না। আমি বাংলাদেশ খবর গ্রুপের আমিরাত ব্যুরো চিফ হিসেবে বিনা বেতনের সাংবাদিকতা শুরু করি। তাছাড়া আবুধাবি বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করি।

অফিসে মন না বসার কারণ ছিল- মাস শেষ হলে বেতন দিত না ভাই। পকেট খরচ দিত এবং তার নিজের জন্য যা কিনতেন আমাকেও কিনে দিতেন। দেশে জমি কিনলেও দুইজনের নামে কিনতেন এবং দেশে যাওয়ার বিমান টিকিটসহ সব দিতেন।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

তপ্ত মরুর দেশের তিন বছরের সুপ্ত কথা

 খান লিটন, জার্মানি থেকে 
০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:৩৫ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

১৯৯২ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ বিমানের একটি বোয়িং উড়োজাহাজ ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা উড়ে পৌঁছল সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি শেখ জায়েদ বিন আল নাহিয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। 

১৮৩ জন যাত্রীর মধ্যে আমিও একজন। স্বপ্নে বিনাভিসায়, বিনাটিকিটে, নিরাপত্তা তল্লাশি ছাড়া অনেকবার আকাশে উড়েছি কিন্তু বাস্তবে এটাই প্রথম আকাশ ভ্রমণ। বড়ভাই মরহুম এমএ সাত্তার খান বিমানের সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা থেকে বিমানের পাইলট ও বিমানসেবায় নিয়োজিতদের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন; সেই সুবাদে সেবার মানটা আমার জন্য বেশ আপগ্রেড ছিল। আবুধাবির স্থানীয় সময় বিকাল ৪টায় নামলাম। 

ইমিগ্রেশন থেকে বের হওয়ার পর মনে হলো আগুনের ফুলকি গায়ে লাগছে, এতটাই গরম আবহাওয়া, ৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা। অপেক্ষায় ছিলেন সেজোভাই এমএ কুদ্দুস খান, যিনি আমার কর্মস্থল ‘টেইলস রিয়েল স্টেটের’ মালিক। 

ট্যাক্সিতে করে বাসায় মানে মেসে গেলাম। একটি দশতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার তিন রুমের বাসায় ছয়জন থাকেন, আমিসহ সাতজন। ভাইয়ের রুমমেট ছিলেন পাকিস্তান শিয়ালকোর্টের। আবুধাবিতে আর্মির সৈনিক। খাওয়া দাওয়ার পর ভাই অফিসে নিয়ে গেলেন ও সব কিছু বুঝিয়ে দিলেন; এছাড়া লোকাল স্পন্সর আল হামাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

বলাবাহুল্য সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিদেশি কোনো নাগরিক যদি তখন ব্যবসা করতে চাইত তাহলে স্থানীয় কোনো নাগরিকের সঙ্গে ৪৯% ও ৫১% পার্টনারশিপের মাধ্যমে ব্যবসা করতে হতো। 

স্থানীয় নাগরিকের ৫১% পার্টনারশিপের জন্য সে কোনো মূলধন খাটাত না, বরং তাকে মাসে মাসে চুক্তি অনুযায়ী টাকা দিতে হতো। তবে ব্যবসার জন্য কোনো ট্যাক্স দিতে হতো না। আমাদের কাজ ছিল বাড়ি ভাড়া নিয়ে আবার ভাড়া দেওয়া ও বাড়ি বা দোকানপাট ও জমির ক্রয়-বিক্রয় করার মধ্যস্থতা করা, মানে দালাল। ১৮ জন কর্মচারী কাজ করত। আমি ছিলাম অফিসের দ্বিতীয় বস। সেই সুবাদে অফিসের সেক্রেটারি মিসরের মেয়ে আমেলকে প্রেম নিবেদন করেছিলাম, কিন্তু সে বলল- আমি গরিব দেশের মানুষ, তাই প্রেমিক হওয়ার যোগ্য না; আমাদের অফিসের সে একজন কর্মচারী এটা কোনো ব্যাপার না। অফিস ছিল সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা ও বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা। সব নামাজের ওয়াক্তে সেজো ভাইয়ের সঙ্গে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে হতো।

ভাই চাইতেন যেহেতু নিজেদের ব্যবসা তাই অফিস আওয়ার ছাড়াও অফিসের কাজ করি। কিন্তু অফিস আওয়ার শেষ হলে আমাকে পেতেন না। আমি বাংলাদেশ খবর গ্রুপের আমিরাত ব্যুরো চিফ হিসেবে বিনা বেতনের সাংবাদিকতা শুরু করি। তাছাড়া আবুধাবি বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করি।

অফিসে মন না বসার কারণ ছিল- মাস শেষ হলে বেতন দিত না ভাই। পকেট খরচ দিত এবং তার নিজের জন্য যা কিনতেন আমাকেও কিনে দিতেন। দেশে জমি কিনলেও দুইজনের নামে কিনতেন এবং দেশে যাওয়ার বিমান টিকিটসহ সব দিতেন।
 

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও খবর