অদ্ভূত ঘড়ির গল্প
jugantor
অদ্ভূত ঘড়ির গল্প

  পারভেজ রাকসান্দ কামাল, অস্ট্রেলিয়া থেকে  

০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:২১:৫৪  |  অনলাইন সংস্করণ

সভ্যতার শুরুর অনেক আগে থেকেই সময় গণনার প্রতি মানুষের অদম্য আগ্রহ। কিন্তু ঘড়ির টিক টিক শব্দ মানুষের কানে এসেছে মেকানিক্যাল ক্লক বা যান্ত্রিক ঘড়ি আবিষ্কারের পর।

বিভিন্ন মানুষের মতো ঘড়ির প্রতি আমারও আগ্রহ কম নয়। বিভিন্ন দেশে গেলে সেই দেশের নানা রকম বড় বড় ঘড়ি দেখা আমার এক ধরণের নেশা। আমার কাছে মনে হয় একেকটি ঘড়ি একেকটি সভ্যতার কথা বলছে ও একেকটি সময়ের গল্প বলছে।

তাই সেদিন খবর পেয়ে আমি ও আমার স্ত্রী শিলা একটি সূর্যঘড়ি দেখতে যাই। এমনিতে করোনাভাইরাসের প্রভাবে গত বেশ কয়েক মাস কোনো জায়গায় ঘোরাঘুরি করতে পারিনি। সে কারণেই বোধহয় সূর্যঘড়ি দেখবার লোভ সামলাতে পারলাম না। তাছাড়া এ জায়গাটি আমাদের বাসা থেকে খুব বেশি একটা দূরেও নয়। মাত্র ৫০-৬০ কিমি দূরে জিলং নামের একটি জায়গায়।

জিলংয়ের পরে টরকোয়ে নামের একটি সমুদ্র সৈকত আছে। সেখানে সমুদ্রের কিনারে মাটির উপর নির্মিত হয়েছে এই সূর্যঘড়ি।

সাধারণত দেখেছি, সূর্যঘড়ি ভূমি থেকে একটু উপরে বসানো হয়। আর সেই ঘড়ির উপর একটি দণ্ড থাকে। দণ্ডটির নাম gnomon (নোমোন) বা নির্দেশক দণ্ড। নোমোনের ছায়া আকাশে সূর্যের গতিপথ অনুযায়ী ঘড়ির ডায়ালের ওপর পড়ে। আর সেই ছায়া দেখেই সময় নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু এই বিশেষ ঘড়িতে একটি অবাক ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। এটাতে কোনো আলাদা দণ্ড বা নোমোন নেই। ঘড়িটি বিশাল আকৃতির। এর ভিতরে বিভিন্ন গাছ-গাছালী, পশু, পাখি ও সরিসৃপের ছবি আঁকা। আর এসব দৃশ্য আঁকা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ছোট ছোট মোজাইক টাইলস দিয়ে।

পুরো ঘড়িটিকে ঘিরে রেখেছে একটি মোটাসোটা সাপ। দেখলেই কেমন ভয় ভয় করে। দেখে অনেকটা মনে হয়, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছু অশুভ শক্তি দ্বারা আক্রান্ত। আমার বেশ কিছুদিন অস্ট্রেলিয়ায় থাকার কারণে এদেশের আদিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত সংস্কার ও পুরাণ নিয়ে কিছুটা জানার সৌভাগ্য হয়েছে। এই সাপটিকে ভিক্টোরিয়ার ‘কুরিস’ আদিবাসিরা ‘মিন্ডি’ বলে ডাকে।

পুরাণমতে চরম বিষাক্ত এই সাপটি যত ইচ্ছা লম্বা ও মোটা হতে পারে। এর বাসস্থান হচ্ছে ভিক্টোরিয়ার উত্তর-উত্তরপূর্ব অংশে। আদিবাসিদের ধারণা অনুযায়ী, সাপটি মাঝে মাঝে লম্বা হয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রদক্ষিণ করে বিষ ছড়ায়। ফলে সেই এলাকায় মহামারী দেখা দেয়। তাই আদিবাসীরা একে খুব ভয় করে। সব কৃষ্টি কালচারে অশুভকে বিনাশ করার জন্য শুভ শক্তির আবির্ভাব হয়। ‘কুরিস’ জাতি মনে করে যে ‘বুনজিল’ নামের একটি ঈগল পাখি তাঁদেরকে এই সাপের হাত থেকে বাঁচিয়ে থাকে।

ঈগল পাখিটির দুই ডানার মাঝের শরীরের অংশটি বেশ অদ্ভূত। শরীরটি অনেকটা ইংরেজি আট এর মতো। কুরিস জাতি এই ঈগল পাখিটিকে স্রষ্টা বা রক্ষক জ্ঞানে ভক্তি করে থাকে।

আবার ঘড়ির কথায় ফিরে আসি। ঘড়ির ওপরের দিকে অর্ধবৃত্তাকৃতি চাপের উপর ৭টা থেকে ৬টা পর্যন্ত মোট ১৪টি দাগ রয়েছে। প্রতিটি দাগের নিচে রোমান হরফে ঘণ্টা লেখা আছে।

আর সেই অর্ধবৃত্তাকৃতি চাপের কেন্দ্রের দিকে একটি ঈগল পাখির অবয়ব রয়েছে। ঈগল পাখিটি দু’পাশে ডানা মেলে রয়েছে। আর তার শরীরটি দেখতে ইংরেজি আট এর মতোই। দেখেই বোঝা যায় এই ঈগল পাখিই হলো ‘বুনজিল’।

মজার ব্যপার লক্ষ্য করলাম, বুনজিলের শরীরের অংশের ওপর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন মাসের নাম লেখা ও দাগ দেওয়া। শিলা ততক্ষণে কোথা থেকে একটি লিফলেট জোগাড় করে নিয়ে এসেছে। লিফলেট পড়ে যা বোঝা গেল তা হলো, এই সূর্যঘড়িটি ১৯৯৬ সালে লায়নস ইন্টারন্যশনাল উদ্বোধন করে। এটি অক্ষাংশ S38°
19.404' ও দ্রাঘিমাংশ E144°19.892' এ অবস্থিত। জানা গেল, এটি আসলে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বিভিন্ন বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে নির্মিত হয়েছে।

সবই তো বুঝলাম। কিন্তু সময় পরিমাপ করে কীভাবে? কারণ আগেই বলেছি, এই ঘড়িতে কোনো নোমোন নেই। তাই আবার লিফলেট পড়া শুরু করলাম। ঘুরতে এসে লিফলেট পড়তে কারোরই ভালো লাগে না। কিন্তু সময় পরিমাপ শেখার জন্য অগত্যা আমাকে লিফলেট পড়তে হচ্ছে।

হঠাৎ শুনি শিলা ডাকছে। তাকিয়ে দেখি সে ওই ঈগলের শরীরে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের দাগের উপর দাঁড়িয়ে পড়েছে। আর ওর ছায়া পড়ছে সেই ঘন্টার দাগ কাঁটা ঘরগুলোর ওপর। পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখি বিকাল ৩:৩০টার মতো বাজে। ওমা! অবাক হয়ে দেখলাম, শিলার ছায়াও ভূমিতে সেই ঘড়ির উপর ৩:৩০টার কাছাকাছি জায়গায়। দেখে কেমন যেন একটা শিহরণ বয়ে গেল। তার মানে এই সূর্যঘড়িতে আলাদা কোনো নোমোন নেই। মানুষের নিজের শরীরই হলো এই বিশেষ ঘড়ির নোমোন। মুখ থেকে শুধু একটি কথাই বের হয়ে এলো- ‘কী অসাধারণ! কী অসাধারণ!!’।

যাই হোক, সেদিনের মতো সেই ঘড়ির অজস্র ছবি তুলে ফিরে এলাম বাসায়। গাড়িতে বসে বারবার মনে হচ্ছিল সেই ঘড়ি যেন আমার মস্তিষ্কের কোনো কোণায় টিক টিক করে আবার ডাকছে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

অদ্ভূত ঘড়ির গল্প

 পারভেজ রাকসান্দ কামাল, অস্ট্রেলিয়া থেকে 
০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:২১ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

সভ্যতার শুরুর অনেক আগে থেকেই সময় গণনার প্রতি মানুষের অদম্য আগ্রহ। কিন্তু ঘড়ির টিক টিক শব্দ মানুষের কানে এসেছে মেকানিক্যাল ক্লক বা যান্ত্রিক ঘড়ি আবিষ্কারের পর।

বিভিন্ন মানুষের মতো ঘড়ির প্রতি আমারও আগ্রহ কম নয়। বিভিন্ন দেশে গেলে সেই দেশের নানা রকম বড় বড় ঘড়ি দেখা আমার এক ধরণের নেশা। আমার কাছে মনে হয় একেকটি ঘড়ি একেকটি সভ্যতার কথা বলছে ও একেকটি সময়ের গল্প বলছে।

তাই সেদিন খবর পেয়ে আমি ও আমার স্ত্রী শিলা একটি সূর্যঘড়ি দেখতে যাই। এমনিতে করোনাভাইরাসের প্রভাবে গত বেশ কয়েক মাস কোনো জায়গায় ঘোরাঘুরি করতে পারিনি। সে কারণেই বোধহয় সূর্যঘড়ি দেখবার লোভ সামলাতে পারলাম না। তাছাড়া এ জায়গাটি আমাদের বাসা থেকে খুব বেশি একটা দূরেও নয়। মাত্র ৫০-৬০ কিমি দূরে জিলং নামের একটি জায়গায়। 

জিলংয়ের পরে টরকোয়ে নামের একটি সমুদ্র সৈকত আছে। সেখানে সমুদ্রের কিনারে মাটির উপর নির্মিত হয়েছে এই সূর্যঘড়ি।

সাধারণত দেখেছি, সূর্যঘড়ি ভূমি থেকে একটু উপরে বসানো হয়। আর সেই ঘড়ির উপর একটি দণ্ড থাকে। দণ্ডটির নাম gnomon (নোমোন) বা নির্দেশক দণ্ড। নোমোনের ছায়া আকাশে সূর্যের গতিপথ অনুযায়ী ঘড়ির ডায়ালের ওপর পড়ে। আর সেই ছায়া দেখেই সময় নির্ধারণ করা হয়। 

কিন্তু এই বিশেষ ঘড়িতে একটি অবাক ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। এটাতে কোনো আলাদা দণ্ড বা নোমোন নেই। ঘড়িটি বিশাল আকৃতির। এর ভিতরে বিভিন্ন গাছ-গাছালী, পশু, পাখি ও সরিসৃপের ছবি আঁকা। আর এসব দৃশ্য আঁকা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ছোট ছোট মোজাইক টাইলস দিয়ে।

পুরো ঘড়িটিকে ঘিরে রেখেছে একটি মোটাসোটা সাপ। দেখলেই কেমন ভয় ভয় করে। দেখে অনেকটা মনে হয়, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছু অশুভ শক্তি দ্বারা আক্রান্ত। আমার বেশ কিছুদিন অস্ট্রেলিয়ায় থাকার কারণে এদেশের আদিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত সংস্কার ও পুরাণ নিয়ে কিছুটা জানার সৌভাগ্য হয়েছে। এই সাপটিকে ভিক্টোরিয়ার ‘কুরিস’ আদিবাসিরা ‘মিন্ডি’ বলে ডাকে।

পুরাণমতে চরম বিষাক্ত এই সাপটি যত ইচ্ছা লম্বা ও মোটা হতে পারে। এর বাসস্থান হচ্ছে ভিক্টোরিয়ার উত্তর-উত্তরপূর্ব অংশে। আদিবাসিদের ধারণা অনুযায়ী, সাপটি মাঝে মাঝে লম্বা হয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রদক্ষিণ করে বিষ ছড়ায়। ফলে সেই এলাকায় মহামারী দেখা দেয়। তাই আদিবাসীরা একে খুব ভয় করে। সব কৃষ্টি কালচারে অশুভকে বিনাশ করার জন্য শুভ শক্তির আবির্ভাব হয়। ‘কুরিস’ জাতি মনে করে যে ‘বুনজিল’ নামের একটি ঈগল পাখি তাঁদেরকে এই সাপের হাত থেকে বাঁচিয়ে থাকে। 

ঈগল পাখিটির দুই ডানার মাঝের শরীরের অংশটি বেশ অদ্ভূত। শরীরটি অনেকটা ইংরেজি আট এর মতো। কুরিস জাতি এই ঈগল পাখিটিকে স্রষ্টা বা রক্ষক জ্ঞানে ভক্তি করে থাকে।

আবার ঘড়ির কথায় ফিরে আসি। ঘড়ির ওপরের দিকে অর্ধবৃত্তাকৃতি চাপের উপর ৭টা থেকে ৬টা পর্যন্ত মোট ১৪টি দাগ রয়েছে। প্রতিটি দাগের নিচে রোমান হরফে ঘণ্টা লেখা আছে।

আর সেই অর্ধবৃত্তাকৃতি চাপের কেন্দ্রের দিকে একটি ঈগল পাখির অবয়ব রয়েছে। ঈগল পাখিটি দু’পাশে ডানা মেলে রয়েছে। আর তার শরীরটি দেখতে ইংরেজি আট এর মতোই। দেখেই বোঝা যায় এই ঈগল পাখিই হলো ‘বুনজিল’।

মজার ব্যপার লক্ষ্য করলাম, বুনজিলের শরীরের অংশের ওপর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন মাসের নাম লেখা ও দাগ দেওয়া। শিলা ততক্ষণে কোথা থেকে একটি লিফলেট জোগাড় করে নিয়ে এসেছে। লিফলেট পড়ে যা বোঝা গেল তা হলো, এই সূর্যঘড়িটি ১৯৯৬ সালে লায়নস ইন্টারন্যশনাল উদ্বোধন করে। এটি অক্ষাংশ S38°
19.404' ও দ্রাঘিমাংশ E144°19.892' এ অবস্থিত। জানা গেল, এটি আসলে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বিভিন্ন বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে নির্মিত হয়েছে।

সবই তো বুঝলাম। কিন্তু সময় পরিমাপ করে কীভাবে? কারণ আগেই বলেছি, এই ঘড়িতে কোনো নোমোন নেই। তাই আবার লিফলেট পড়া শুরু করলাম। ঘুরতে এসে লিফলেট পড়তে কারোরই ভালো লাগে না। কিন্তু সময় পরিমাপ শেখার জন্য অগত্যা আমাকে লিফলেট পড়তে হচ্ছে।
 
হঠাৎ শুনি শিলা ডাকছে। তাকিয়ে দেখি সে ওই ঈগলের শরীরে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের দাগের উপর দাঁড়িয়ে পড়েছে। আর ওর ছায়া পড়ছে সেই ঘন্টার দাগ কাঁটা ঘরগুলোর ওপর। পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখি বিকাল ৩:৩০টার মতো বাজে। ওমা! অবাক হয়ে দেখলাম, শিলার ছায়াও ভূমিতে সেই ঘড়ির উপর ৩:৩০টার কাছাকাছি জায়গায়। দেখে কেমন যেন একটা শিহরণ বয়ে গেল। তার মানে এই সূর্যঘড়িতে আলাদা কোনো নোমোন নেই। মানুষের নিজের শরীরই হলো এই বিশেষ ঘড়ির নোমোন। মুখ থেকে শুধু একটি কথাই বের হয়ে এলো- ‘কী অসাধারণ! কী অসাধারণ!!’।

যাই হোক, সেদিনের মতো সেই ঘড়ির অজস্র ছবি তুলে ফিরে এলাম বাসায়। গাড়িতে বসে বারবার মনে হচ্ছিল সেই ঘড়ি যেন আমার মস্তিষ্কের কোনো কোণায় টিক টিক করে আবার ডাকছে।
 

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন