ইউরো-ডলারের দাম বাড়ায় খুশি প্রবাসীরা
jugantor
ইউরো-ডলারের দাম বাড়ায় খুশি প্রবাসীরা

  জাকির হোসাইন চৌধুরী, গ্রিস থেকে  

১২ আগস্ট ২০২২, ০৩:৩০:৪৫  |  অনলাইন সংস্করণ

গত এক সপ্তাহে ইউরো এবং ডলারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। এতে খুশি প্রবাসী ও দেশে থাকা প্রবাসীর পরিবার।

কারণ দেশে ভালো রেটে ডলার-ইউরোর বিপরীতে টাকা পাওয়া যাচ্ছে, সাথে বাড়তি শতকরা ২.৫ ভাগ প্রণোদনা তো আছেই। যার ফলে জুলাই মাসে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। কিন্তু তার বিপরীতে কেন রিজার্ভ কমছে?

এই প্রশ্নের উত্তরে অভিজ্ঞ অর্থনীবিদরা বলছেন- বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দায়, অনেক উন্নত দেশ অর্থনৈতিক বিপর্যের মুখে রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারকে সংকুচিত করে ফেলেছেন।

ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও আবারো ঋণ নিচ্ছেন। অনেক দেশ সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করার কারণে করোনার মধ্যেও বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক বিশ্ব আর্থিক সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের চাপের মুখে আছে।

গত দুই বছরের করোনার ধাক্কায় সমগ্র বিশ্ব ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখে। আজ থেকে প্রায় তেঁতাল্লিশ বছর আগে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দার পর থেকে অর্থনীতিতে এত বড় আঘাত আর আসেনি। তবে আর্থিক মন্দার নেতিবাচক প্রভাব বেশি পরিলক্ষিত হয় প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকা উন্নত দেশগুলোতে।

উন্নয়নশীল ও অ-উন্নত অনেক দেশ, যাদের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে কম, আর্থিক মন্দার কবল থেকে নিজেদের অনেকটাই সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিল। কিন্তু বিশ্বজুড়ে করোনার প্রভাব ছিল সমান্তরাল ও অভাবনীয়।

করোনার এ নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে বিশ্ব যখন উম্মুখ ঠিক তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সেই পুনরুদ্ধারের গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে অনেকটাই। ইতোমধ্যে আবারো তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের শংকায় চীন-তাইওয়ান সীমান্তে বিরাজ করছে উত্তেজনা।

বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে সারা বিশ্বে ‘মূল্যস্ফীতি’ নামক এক অর্থনৈতিক খড়গ আরোপ করেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোতে সবার উপরে রয়েছে ‘মূল্যস্ফীতি’।

বাংলাদেশ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং ও ফাইন্যান্স বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. নুরুল কবির বলেন, প্রকৃত মূল্যস্ফীতির হার সরকারি হিসাবের তুলনায় একটু বেশিই হবে। কারণ ‘মূল্যস্ফীতি’ হিসাব করতে যে খাদ্য সমারোহ বা ভাণ্ডার বিবেচনা করা হয়, তা অনেকটাই অনেক পুরোনো চিন্তা ধারার। এরই মধ্যে মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়েছে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হিসাবে পুরোপুরি প্রতিফলিত ঘটায় না।

‘মূল্যস্ফীতি’ কেন হয় এবং কীভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করা যায়, এ নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট ধোঁয়াশা। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বাস্তবতা এত জটিল যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কেউ ভালো করে জানেন না কী কারণে ‘মূল্যস্ফীতি’ হয়।

মূল্যস্ফীতি ব্যাখ্যা করার জন্য অর্থনীতিবিদ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের কাছে দুটি প্রচলিত তথ্য রয়েছে- অর্থের তারল্য তথ্য এবং ফিলিপস কার্ভ। অর্থের তারল্য তথ্যের ভাষায়, মূল্যস্ফীতি হলো অর্থ সরবরাহের অত্যাধিক বৃদ্ধির ফলাফল। বেশি অর্থ যখন সীমিত পণ্য এবং সেবার জন্য বরাদ্দ করা হয়, তখন পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যায়। এ আলোকে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে ব্যাখ্যা করার জন্য করোনাকালীন সম্প্রসারণমূলক আর্থিক নীতিকে দায়ী করা হয়।

মূল্যস্ফীতির দ্বিতীয় তথ্যটি হলো ‘ফিলিপস রেখা’, যার অর্থ মোটামুটি এ রকম যে একটা নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য ও সেবার চাহিদা যখন অর্থনীতির উৎপাদন ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায় ঠিক তখনই মূল্যস্ফীতি ঘটে।

মুদ্রাস্ফীতির কারণে অর্থনীতিতে একাধারে ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যে নগদ অর্থের সুযোগ ব্যয় কমে যায় এবং মানুষ নগদ অর্থের সঞ্চয়ের বদলে তা খরচ করে ফেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান সঞ্চয়ের অভাবে ভোগে এবং অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমে আসে।

এছাড়াও মুদ্রাস্ফীতির ফলে গঁৎবাধা আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে আসে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের প্রকৃত হার পুনরায় নিরূপণ করতে হয়। আধুনিক অর্থনীতিবিদরা সবসময় একটি স্বল্প কিন্তু স্থিতিশীল মুদ্রাস্ফীতির পক্ষে মতামত দেন। স্বল্পমাত্রার ও স্থিতিশীল মুদ্রাস্ফীতি অর্থনীতির সূচকগুলো চলমান রাখে এবং এর বাজারগুলোকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে সচল ও স্থিতিশীল রাখে।

তবে এই বাস্তবতা সবার জন্য নয়, আমদানিকারক এবং আমদানি করা পণ্য ভোক্তাদের অবস্থা শোচনীয়। বিশ্বের সিংহভাগ বৈদেশিক বাণিজ্য বা আমদানি-রপ্তানি হয় ডলারের বিনিময়ে। ফলে বাংলাদেশ, তুরস্ক, মিসর ও ভারতের মতো যেসব দেশ কাঁচামাল আমদানি করে তারা বর্তমান ডলারের ঊর্ধ্বগতির কারণে কোণঠাসা হয়ে গেছে।

এতে অধিকাংশ আমদানি করা পণ্যের দাম স্থানীয় বাজারে রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে, যার একমাত্র কারণ মুদ্রাস্ফীতি-মূল্যস্ফীতি।

মুদ্রাস্ফীতি বলতে অর্থনীতিতে মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি কি বোঝানো হয়। অর্থনীতিতে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে গেলে এবং পণ্য ও সেবার সরবরাহ অপরিবর্তিত থাকলে মূল্যস্ফীতি ঘটে। কারণ অনেক বেশি টাকা সীমিত পণ্য ও সেবার পেছনে ধাওয়া করে। এতে চাহিদা ও মূল্যস্তর— দুটিই বেড়ে যায়।

গত বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকেই বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি হতে শুরু করে। প্রথম দিকে এটি ছিল সরবরাহ ব্যবস্থাজনিত মূল্যস্ফীতি, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের বাড়তি বিনিময়মূল্য। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এমনিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তি, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের রেকর্ড দাম। ফলে সব দেশকে অতিরিক্ত দামি হয়ে ওঠা ডলারের বিনিময়ে বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। যার প্রভাব গিয়ে পড়ছে পণ্যমূল্যে।

বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিপদজনক মাত্রায় চলে গেছে বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। তারা বলছেন, এখন রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসায় তা দিয়ে তিন মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়।

তবে সরকার এই পরিস্থিতি এখনও আশঙ্কাজনক মনে করছে না। যদিও রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে বিদ্যুতের লোডশেডিং করাসহ সাশ্রয়ী বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে যাতে জ্বালানি আমদানির খরচ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

পেট্রল আর অকটেন দেশে উদপাদন সত্ত্বেও কেন আবারো দাম বাড়লো, এই প্রশ্নের জবাবে মুদ্রাস্ফীতি আর মূল্যস্ফীতিই একমাত্র কারণ।

দেশে উৎপাদিত অনেক পণ্য দেশেই চড়া মূল্যে বিক্রি হচ্ছে, এর সাথে উপাদান খরচের সাথে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট দায়ী বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা কিন্তু ভোক্তাদের আয়-রোজগার না বাড়ার কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দাম খুব সহজেই চোখে পড়ছে। এদিকে দেশের সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে পোশাক তৈরি কারখানা, তাহলে মুদ্রাস্ফীতি আর মূল্যস্ফীতির সমঞ্জস্য থাকছে না কেন (?)। কিছু অসৎ কারসাজি শুরু থেকেই এই পোশাক খাতে আমদানির চেয়ে কিছু অঘোষিত বেশি রপ্তানি খরচ দেখিয়ে টাকা পাচার করছে। এই রকম পোশাক খাতের মতো অন্যান্য খাতেও একই রকমভাবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে অর্জিত অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সাথে শ্রীলংকার তুলনা যারা করছেন, তাদের দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। বাংলাদেশের রিজার্ভ যখন ৪৬ বিলিয়ন ডলার গত বছরের জুন মাসেও ছিল, সেখানে ২০১৯ সালের শেষের দিকে শ্রীলংকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৭.৬ বিলিয়ন ডলার আর সেটা যখন কমে ২৫০ মিলিয়নে নেমে এসেছে তখনই শ্রীলংকায় দেখা দিয়েছে দুর্যোগ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া তথ্য মতে এখন রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিপজ্জনক মাত্রায় চলে গেছে বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। কিন্তু এই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় দুই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মত ৪০ বিলিয়ন বা চার হাজার কোটি ডলারের নিচে নেমে এসেছে। রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কয়েক মাস ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলারের মজুদ চাপ বাড়ছিল।

সর্বশেষ কয়েকদিন আগে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নকে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের আমদানি দায় শোধ করতে হয়েছে বাংলাদেশ সরকারকে এবং সে কারণে রিজার্ভ এ কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, নেপাল, মিয়ানমার, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপ- এই নয়টি দেশ এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন বা (ACU) আকুর সদস্য। এই দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করে তার বিল দুই মাস পর পর এই আকুর মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।

বিশ্বের যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্য বা আমদানি-রপ্তানি বেশি হয়, টাকার অংকে সেই তালিকার শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে নেই রাশিয়া বা ইউক্রেন। কিন্তু দুইটি দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের বাণিজ্য রয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক দেশেই জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে। বৈশ্বায়নের এই যুগে পৃথিবীর যে কোনো দেশের মধ্যে সংঘাতের প্রভাব অন্য দেশগুলোর উপরেও ছড়িয়ে পড়ে, যদিও গত দু'সপ্তাহ যাবৎ বিশেষ বাজারে তেলের দাম অনেকটা কমতির দিকে। সেখানে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম যখন কমছে তখন বাংলাদেশ সরকার কেন তেলের দাম বাড়ালো।

এই প্রশ্ন সাধারণ জনগণের মনে জাগাটা খুবই স্বাভাবিক কিন্তু সাধারণ জনগণ নিশ্চই জানেন না যে, পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে যে দামে জ্বালানি তেল কিনে বাংলাদেশে নিজেদের বাজারে বিক্রি করছে, তাতে প্রতিদিন ১৫ কোটি ডলার লোকসান গুনতে হচ্ছে।

ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়বে, তখন দেশের বাজারে মূল্য সমন্বয়ের চেষ্টা করতে হবে সরকারকে বলে মনে করছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে দাম বাড়লে তার প্রভাবে পরিবহনের ভাড়া বাড়বে। পণ্য পরিবহনে খরচ বেশি হলে সেগুলোর দাম বাড়বে, যাত্রীদের বেশি ভাড়া গুণতে হবে, এমনকি কৃষি উৎপাদনেও খরচ বেড়ে যাবে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ইউরো-ডলারের দাম বাড়ায় খুশি প্রবাসীরা

 জাকির হোসাইন চৌধুরী, গ্রিস থেকে 
১২ আগস্ট ২০২২, ০৩:৩০ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

গত এক সপ্তাহে ইউরো এবং ডলারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। এতে খুশি প্রবাসী ও দেশে থাকা প্রবাসীর পরিবার। 

কারণ দেশে ভালো রেটে ডলার-ইউরোর বিপরীতে টাকা পাওয়া যাচ্ছে, সাথে বাড়তি শতকরা ২.৫ ভাগ প্রণোদনা তো আছেই। যার ফলে জুলাই মাসে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। কিন্তু তার বিপরীতে কেন রিজার্ভ কমছে? 

এই প্রশ্নের উত্তরে অভিজ্ঞ অর্থনীবিদরা বলছেন- বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দায়, অনেক উন্নত দেশ অর্থনৈতিক বিপর্যের মুখে রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারকে সংকুচিত করে ফেলেছেন। 

ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও আবারো ঋণ নিচ্ছেন। অনেক দেশ সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করার কারণে করোনার মধ্যেও বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক বিশ্ব আর্থিক সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের চাপের মুখে আছে। 

গত দুই বছরের করোনার ধাক্কায় সমগ্র বিশ্ব ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখে। আজ থেকে প্রায় তেঁতাল্লিশ বছর আগে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দার পর থেকে অর্থনীতিতে এত বড় আঘাত আর আসেনি। তবে আর্থিক মন্দার নেতিবাচক প্রভাব বেশি পরিলক্ষিত হয় প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকা উন্নত দেশগুলোতে। 

উন্নয়নশীল ও অ-উন্নত অনেক দেশ, যাদের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে কম, আর্থিক মন্দার কবল থেকে নিজেদের অনেকটাই সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিল। কিন্তু বিশ্বজুড়ে করোনার প্রভাব ছিল সমান্তরাল ও অভাবনীয়। 

করোনার এ নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে বিশ্ব যখন উম্মুখ ঠিক তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সেই পুনরুদ্ধারের গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে অনেকটাই। ইতোমধ্যে আবারো তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের শংকায় চীন-তাইওয়ান সীমান্তে বিরাজ করছে উত্তেজনা। 

বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে সারা বিশ্বে ‘মূল্যস্ফীতি’ নামক এক অর্থনৈতিক খড়গ আরোপ করেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোতে সবার উপরে রয়েছে ‘মূল্যস্ফীতি’।

বাংলাদেশ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং ও ফাইন্যান্স বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. নুরুল কবির বলেন, প্রকৃত মূল্যস্ফীতির হার সরকারি হিসাবের তুলনায় একটু বেশিই হবে। কারণ ‘মূল্যস্ফীতি’ হিসাব করতে যে খাদ্য সমারোহ বা ভাণ্ডার বিবেচনা করা হয়, তা অনেকটাই অনেক পুরোনো চিন্তা ধারার। এরই মধ্যে মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়েছে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হিসাবে পুরোপুরি প্রতিফলিত ঘটায় না।

‘মূল্যস্ফীতি’ কেন হয় এবং কীভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করা যায়, এ নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট ধোঁয়াশা। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বাস্তবতা এত জটিল যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কেউ ভালো করে জানেন না কী কারণে ‘মূল্যস্ফীতি’ হয়। 

মূল্যস্ফীতি ব্যাখ্যা করার জন্য অর্থনীতিবিদ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের কাছে দুটি প্রচলিত তথ্য রয়েছে- অর্থের তারল্য তথ্য এবং ফিলিপস কার্ভ। অর্থের তারল্য তথ্যের ভাষায়, মূল্যস্ফীতি হলো অর্থ সরবরাহের অত্যাধিক বৃদ্ধির ফলাফল। বেশি অর্থ যখন সীমিত পণ্য এবং সেবার জন্য বরাদ্দ করা হয়, তখন পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যায়। এ আলোকে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে ব্যাখ্যা করার জন্য করোনাকালীন সম্প্রসারণমূলক আর্থিক নীতিকে দায়ী করা হয়। 

মূল্যস্ফীতির দ্বিতীয় তথ্যটি হলো ‘ফিলিপস রেখা’, যার অর্থ মোটামুটি এ রকম যে একটা নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য ও সেবার চাহিদা যখন অর্থনীতির উৎপাদন ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায় ঠিক তখনই মূল্যস্ফীতি ঘটে।

মুদ্রাস্ফীতির কারণে অর্থনীতিতে একাধারে ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যে নগদ অর্থের সুযোগ ব্যয় কমে যায় এবং মানুষ নগদ অর্থের সঞ্চয়ের বদলে তা খরচ করে ফেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান সঞ্চয়ের অভাবে ভোগে এবং অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমে আসে। 

এছাড়াও মুদ্রাস্ফীতির ফলে গঁৎবাধা আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে আসে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের প্রকৃত হার পুনরায় নিরূপণ করতে হয়। আধুনিক অর্থনীতিবিদরা সবসময় একটি স্বল্প কিন্তু স্থিতিশীল মুদ্রাস্ফীতির পক্ষে মতামত দেন। স্বল্পমাত্রার ও স্থিতিশীল মুদ্রাস্ফীতি অর্থনীতির সূচকগুলো চলমান রাখে এবং এর বাজারগুলোকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে সচল ও স্থিতিশীল রাখে।

তবে এই বাস্তবতা সবার জন্য নয়, আমদানিকারক এবং আমদানি করা পণ্য ভোক্তাদের অবস্থা শোচনীয়। বিশ্বের সিংহভাগ বৈদেশিক বাণিজ্য বা আমদানি-রপ্তানি হয় ডলারের বিনিময়ে। ফলে বাংলাদেশ, তুরস্ক, মিসর ও ভারতের মতো যেসব দেশ কাঁচামাল আমদানি করে তারা বর্তমান ডলারের ঊর্ধ্বগতির কারণে কোণঠাসা হয়ে গেছে। 

এতে অধিকাংশ আমদানি করা পণ্যের দাম স্থানীয় বাজারে রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে, যার একমাত্র কারণ মুদ্রাস্ফীতি-মূল্যস্ফীতি। 

মুদ্রাস্ফীতি বলতে অর্থনীতিতে মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি কি বোঝানো হয়। অর্থনীতিতে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে গেলে এবং পণ্য ও সেবার সরবরাহ অপরিবর্তিত থাকলে মূল্যস্ফীতি ঘটে। কারণ অনেক বেশি টাকা সীমিত পণ্য ও সেবার পেছনে ধাওয়া করে। এতে চাহিদা ও মূল্যস্তর— দুটিই বেড়ে যায়।

গত বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকেই বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি হতে শুরু করে। প্রথম দিকে এটি ছিল সরবরাহ ব্যবস্থাজনিত মূল্যস্ফীতি, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের বাড়তি বিনিময়মূল্য। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এমনিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তি, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের রেকর্ড দাম। ফলে সব দেশকে অতিরিক্ত দামি হয়ে ওঠা ডলারের বিনিময়ে বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। যার প্রভাব গিয়ে পড়ছে পণ্যমূল্যে।

বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিপদজনক মাত্রায় চলে গেছে বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। তারা বলছেন, এখন রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসায় তা দিয়ে তিন মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়।

তবে সরকার এই পরিস্থিতি এখনও আশঙ্কাজনক মনে করছে না। যদিও রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে বিদ্যুতের লোডশেডিং করাসহ সাশ্রয়ী বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে যাতে জ্বালানি আমদানির খরচ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

পেট্রল আর অকটেন দেশে উদপাদন সত্ত্বেও কেন আবারো দাম বাড়লো, এই প্রশ্নের জবাবে মুদ্রাস্ফীতি আর মূল্যস্ফীতিই একমাত্র কারণ। 

দেশে উৎপাদিত অনেক পণ্য দেশেই চড়া মূল্যে বিক্রি হচ্ছে, এর সাথে উপাদান খরচের সাথে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট দায়ী বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা কিন্তু ভোক্তাদের আয়-রোজগার না বাড়ার কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দাম খুব সহজেই চোখে পড়ছে। এদিকে দেশের সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে পোশাক তৈরি কারখানা, তাহলে মুদ্রাস্ফীতি আর মূল্যস্ফীতির সমঞ্জস্য থাকছে না কেন (?)। কিছু অসৎ কারসাজি শুরু থেকেই এই পোশাক খাতে আমদানির চেয়ে কিছু অঘোষিত বেশি রপ্তানি খরচ দেখিয়ে টাকা পাচার করছে। এই রকম পোশাক খাতের মতো অন্যান্য খাতেও একই রকমভাবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে অর্জিত অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সাথে শ্রীলংকার তুলনা যারা করছেন, তাদের দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। বাংলাদেশের রিজার্ভ যখন ৪৬ বিলিয়ন ডলার গত বছরের জুন মাসেও ছিল, সেখানে ২০১৯ সালের শেষের দিকে শ্রীলংকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৭.৬ বিলিয়ন ডলার আর সেটা যখন কমে ২৫০ মিলিয়নে নেমে এসেছে তখনই শ্রীলংকায় দেখা দিয়েছে দুর্যোগ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া তথ্য মতে এখন রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিপজ্জনক মাত্রায় চলে গেছে বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। কিন্তু এই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় দুই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মত ৪০ বিলিয়ন বা চার হাজার কোটি ডলারের নিচে নেমে এসেছে। রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কয়েক মাস ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলারের মজুদ চাপ বাড়ছিল।

সর্বশেষ কয়েকদিন আগে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নকে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের আমদানি দায় শোধ করতে হয়েছে বাংলাদেশ সরকারকে এবং সে কারণে রিজার্ভ এ কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, নেপাল, মিয়ানমার, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপ- এই নয়টি দেশ এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন বা (ACU) আকুর সদস্য। এই দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করে তার বিল দুই মাস পর পর এই আকুর মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।

বিশ্বের যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্য বা আমদানি-রপ্তানি বেশি হয়, টাকার অংকে সেই তালিকার শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে নেই রাশিয়া বা ইউক্রেন। কিন্তু দুইটি দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের বাণিজ্য রয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক দেশেই জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে। বৈশ্বায়নের এই যুগে পৃথিবীর যে কোনো দেশের মধ্যে সংঘাতের প্রভাব অন্য দেশগুলোর উপরেও ছড়িয়ে পড়ে, যদিও গত দু'সপ্তাহ যাবৎ বিশেষ বাজারে তেলের দাম অনেকটা কমতির দিকে। সেখানে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম যখন কমছে তখন বাংলাদেশ সরকার কেন তেলের দাম বাড়ালো। 

এই প্রশ্ন সাধারণ জনগণের মনে জাগাটা খুবই স্বাভাবিক কিন্তু সাধারণ জনগণ নিশ্চই জানেন না যে, পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে যে দামে জ্বালানি তেল কিনে বাংলাদেশে নিজেদের বাজারে বিক্রি করছে, তাতে প্রতিদিন ১৫ কোটি ডলার লোকসান গুনতে হচ্ছে।

ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়বে, তখন দেশের বাজারে মূল্য সমন্বয়ের চেষ্টা করতে হবে সরকারকে বলে মনে করছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে দাম বাড়লে তার প্রভাবে পরিবহনের ভাড়া বাড়বে। পণ্য পরিবহনে খরচ বেশি হলে সেগুলোর দাম বাড়বে, যাত্রীদের বেশি ভাড়া গুণতে হবে, এমনকি কৃষি উৎপাদনেও খরচ বেড়ে যাবে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন