সরকারের অর্থনৈতিক সাশ্রয়ী নীতি সময়োচিত ও সাধুবাদযোগ্য
jugantor
সরকারের অর্থনৈতিক সাশ্রয়ী নীতি সময়োচিত ও সাধুবাদযোগ্য

  সৈয়দ আতিকুর রব, আয়ারল্যান্ড থেকে  

১৩ আগস্ট ২০২২, ০৪:০২:৫১  |  অনলাইন সংস্করণ

সৈয়দ আতিকুর রব, আয়ারল্যান্ড থেকেসম্প্রতি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে শুরু করেছে। গত দুই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে দেশের বৈদিশিক মু্দ্রার রিজার্ভ।

কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যেও ২০২১ সালের আগস্টে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে দেশের ইতিহাসে যে সর্বোচ্চ রিজার্ভের রেকর্ড গড়েছিল সেটি এখন কমতে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদরা বাণিজ্য ঘাটতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে বলছেন।

২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদেশে রপ্তানি করে ৫২.০৮ বিলিয়ন ডলার আয়ের রেকর্ড গড়েছিল। পক্ষান্তরে উক্ত অর্থ বছরে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতিও ছিল উদ্বেগজনক। এই উচ্চ বাণিজ্যে ঘাটতির জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে অনেকে দায়ী করছেন, যার ফলে বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়েছে।

বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের রিজার্ভ সংকটের জন্যও এটিকেআরেকটি কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বৈদেশিক রেমিট্যান্স বাংলাদেশের লাইফলাইন। রেমিটেন্স যোদ্ধারা প্রচুর প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

বিশ্বব্যাংকের সূত্রমতে, বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ। রেমিট্যান্সের প্রবাহ ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪.৭৭ বিলিয়ন ডলারের সর্বোচ্চে রেকর্ডে পৌঁছেছিল, কিন্তু পরের বছর এর প্রবাহ ২১.০৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। বাংলাদেশের বৈদিশিক মুকদ্রার রিজার্ভ কমার পেছনে অবৈধভাবে বিদেশে অর্থ পাচারকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদরা।

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে অর্থ পাচারকারী তালিকাভুক্ত বিশ্বের ৩০টি শীর্ষস্থানীয় অর্থ পাচারকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নামও রয়েছে। অনেক অর্থনীতি বিশ্লেষক এ সমস্যাটিকে অর্থনীতির ক্যান্সার হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ইউএসভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুসারে, বাণিজ্য-ভিত্তিক বিদেশে অর্থ পাচারের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জিএফআইয়ের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নামে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭.৫৩ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়।

কিন্তু অর্থ পাচার রোধে সরকারের তেমন কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ২০২১ সালের শেষে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭১.১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঙ্ক (প্রায় ৯১৬.৯২ মিলিয়ন ডলার)।

ওই প্রতিবেদনে আরেও বলা হয়, এক বছরে এর পরিমাণ ৩১০ মিলিয়ন ডলার বেড়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক ঋণ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মেগা অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গত পাঁচ বছরে এই ঋণ দ্বিগুণ হয়েছে।কিন্তু অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, এসব মেগা প্রকল্প আগামীতে সরকারের জন্য উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এর কারণ হিসেবেঅর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করেছেন, অদূর ভবিষ্যেতে এসব মেগা প্রকল্পের ঋণেরকিস্তি পরিশোধের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা খুঁজে বের করা সরকারের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, ২০টি বড় মেগা প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ২০২৪ এবং ২০২৬ সালে বড় ধরনের ধাক্কার সম্মুখীন হতে পারে।

এই প্রকল্পগুলোর প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলার পরিমাণের অর্থ রাশিয়া, জাপান এবং চীনের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া। অপরদিকে ক্রমবর্ধমান আমদানি বিলের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাবার ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) কাছে ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ চেয়েছে।

এক্ষেত্রে তারা অবশ্য বাংলাদেশ সরকারকে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে। IMFথেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ চাওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় কমানোর ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের উদ্যেগে আয়োজিত সাম্প্রতিক এক আলোচনা সভায় অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, বাংলাদেশ একটি ‘অর্থনৈতিক সংকটের’ সম্মুখীন হচ্ছে, যা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হবে না।

২৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বিবৃতিতে দেশে চলমান সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, দেশে ৬-৯ মাসের জন্য খাদ্য আমদানির পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে। যেকোনো সংকটের জন্য কমপক্ষে তিন মাসের খাদ্যশস্য এবং অন্যান্য (প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র) আমদানি করার মতো নগদ অর্থ সরকারের হাতে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবের সাথে প্রধানমন্ত্রীর কথার মিল পাওয়া যাচ্ছে না বলে নাগরিকদের অভিযোগ রয়েছে।

নাগরিকরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় বলছেন, অর্থনৈতিক সংকটের নানাবিধ লক্ষণ বর্তমানে দেশে সুস্পষ্ট। প্রতিনিয়ত বাংলাদেশি টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের দাম বাড়ছে এবং প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বাংলাদেশি মুদ্রার অবমূল্যায়ন হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের র্ধ্বগতিতে নাগরিক জীবনের দুর্ভোগ এখন চরমে। অর্থনৈতিক সংকটের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ডিজেল, পেট্রলসহ জ্বালানি তেলের দাম ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির ঘটনা।

তবে অর্থনৈতিক সংকট ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বাংলাদেশ সরকার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় রোধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। স্পোর্টস ইউটিলিটি যানবাহন, ওয়াশিং মেশিন এবং এয়ার কন্ডিশনারগুলোর মতো বিলাসবহুল এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তার আমদানি নীতি কঠোর করেছে।

এদিকে সরকার তার কর্মকর্তাদের ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের নামে দল বেঁধে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর বাতিল করা হয়েছে।

বিদ্যুতের ব্যবহার ২০ শতাংশ কমাতে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহার করা যানবাহনের সংখ্যা সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। সরকারের কঠোর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও তার সরকার মার্চ মাসে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১০০ শতাংশ বিদ্যুৎ কাভারেজ উদযাপন করেছে। জ্বালানি খরচ কমাতে কিছু পাওয়ার স্টেশন ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া সাশ্রয়ী হতে শেখ হাসিনা সরকার তার গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রায় সমাপ্ত প্রকল্পগুলো (এ বিভাগ) চালু রাখা হবে, যখন (বিবিভাগ) প্রকল্পগুলো তাদের বাজেটের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারে। অর্থনৈতিক সংকট দূর না হওয়া পর্যন্ত (সি ক্যাটাগরি) প্রকল্পগুলো স্থগিত থাকবে।

সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শেখ হাসিনা সরকারের গৃহীত এ পদক্ষেপগুলো কি বাংলাদেশকে শ্রীলংকার পথে হাঁটা থেকে রক্ষা করতে পারবে কি পারবে না, সেটি বোঝার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে অর্থনৈতিক মন্দার পূর্বাভাসের ফলে সরকারের গৃহীত সাশ্রয়ী নীতি অর্থ অপচয় রোধসহ দেশের চলমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকা শক্তিকে গতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

সরকারের অর্থনৈতিক সাশ্রয়ী নীতি সময়োচিত ও সাধুবাদযোগ্য

 সৈয়দ আতিকুর রব, আয়ারল্যান্ড থেকে 
১৩ আগস্ট ২০২২, ০৪:০২ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

সৈয়দ আতিকুর রব, আয়ারল্যান্ড থেকেসম্প্রতি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে শুরু করেছে। গত দুই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে দেশের বৈদিশিক মু্দ্রার রিজার্ভ। 

কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যেও ২০২১ সালের আগস্টে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে দেশের ইতিহাসে যে সর্বোচ্চ রিজার্ভের রেকর্ড গড়েছিল সেটি এখন কমতে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদরা বাণিজ্য ঘাটতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে বলছেন।

২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদেশে রপ্তানি করে ৫২.০৮ বিলিয়ন ডলার আয়ের রেকর্ড গড়েছিল। পক্ষান্তরে উক্ত অর্থ বছরে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতিও ছিল উদ্বেগজনক। এই উচ্চ বাণিজ্যে ঘাটতির জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে অনেকে দায়ী করছেন, যার ফলে বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়েছে। 

বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের রিজার্ভ সংকটের জন্যও এটিকেআরেকটি কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বৈদেশিক রেমিট্যান্স বাংলাদেশের লাইফলাইন। রেমিটেন্স যোদ্ধারা প্রচুর প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

বিশ্বব্যাংকের সূত্রমতে, বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ। রেমিট্যান্সের প্রবাহ ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪.৭৭ বিলিয়ন ডলারের সর্বোচ্চে রেকর্ডে পৌঁছেছিল, কিন্তু পরের বছর এর প্রবাহ ২১.০৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। বাংলাদেশের বৈদিশিক মুকদ্রার রিজার্ভ কমার পেছনে অবৈধভাবে বিদেশে অর্থ পাচারকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদরা। 

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে অর্থ পাচারকারী তালিকাভুক্ত বিশ্বের ৩০টি শীর্ষস্থানীয় অর্থ পাচারকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নামও রয়েছে। অনেক অর্থনীতি বিশ্লেষক এ সমস্যাটিকে অর্থনীতির ক্যান্সার হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ইউএসভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুসারে, বাণিজ্য-ভিত্তিক বিদেশে অর্থ পাচারের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জিএফআইয়ের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নামে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭.৫৩ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়। 

কিন্তু অর্থ পাচার রোধে সরকারের তেমন কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ২০২১ সালের শেষে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭১.১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঙ্ক (প্রায় ৯১৬.৯২ মিলিয়ন ডলার)। 

ওই প্রতিবেদনে আরেও বলা হয়, এক বছরে এর পরিমাণ ৩১০ মিলিয়ন ডলার বেড়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক ঋণ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মেগা অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গত পাঁচ বছরে এই ঋণ দ্বিগুণ হয়েছে।কিন্তু অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, এসব মেগা প্রকল্প আগামীতে সরকারের জন্য উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এর কারণ হিসেবেঅর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করেছেন, অদূর ভবিষ্যেতে এসব মেগা প্রকল্পের ঋণেরকিস্তি পরিশোধের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা খুঁজে বের করা সরকারের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, ২০টি বড় মেগা প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ২০২৪ এবং ২০২৬ সালে বড় ধরনের ধাক্কার সম্মুখীন হতে পারে।

এই প্রকল্পগুলোর প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলার পরিমাণের অর্থ রাশিয়া, জাপান এবং চীনের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া। অপরদিকে ক্রমবর্ধমান আমদানি বিলের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাবার ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) কাছে ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ চেয়েছে।

এক্ষেত্রে তারা অবশ্য বাংলাদেশ সরকারকে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে। IMFথেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ চাওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় কমানোর ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের উদ্যেগে আয়োজিত সাম্প্রতিক এক আলোচনা সভায় অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, বাংলাদেশ একটি ‘অর্থনৈতিক সংকটের’ সম্মুখীন হচ্ছে, যা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হবে না।

২৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বিবৃতিতে দেশে চলমান সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, দেশে ৬-৯ মাসের জন্য খাদ্য আমদানির পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে। যেকোনো সংকটের জন্য কমপক্ষে তিন মাসের খাদ্যশস্য এবং অন্যান্য (প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র) আমদানি করার মতো নগদ অর্থ সরকারের হাতে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবের সাথে প্রধানমন্ত্রীর কথার মিল পাওয়া যাচ্ছে না বলে নাগরিকদের অভিযোগ রয়েছে।

নাগরিকরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় বলছেন, অর্থনৈতিক সংকটের নানাবিধ লক্ষণ বর্তমানে দেশে সুস্পষ্ট। প্রতিনিয়ত বাংলাদেশি টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের দাম বাড়ছে এবং প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বাংলাদেশি মুদ্রার অবমূল্যায়ন হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের র্ধ্বগতিতে নাগরিক জীবনের দুর্ভোগ এখন চরমে। অর্থনৈতিক সংকটের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ডিজেল, পেট্রলসহ জ্বালানি তেলের দাম ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির ঘটনা।    

তবে অর্থনৈতিক সংকট ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বাংলাদেশ সরকার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় রোধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। স্পোর্টস ইউটিলিটি যানবাহন, ওয়াশিং মেশিন এবং এয়ার কন্ডিশনারগুলোর মতো বিলাসবহুল এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তার আমদানি নীতি কঠোর করেছে।

এদিকে সরকার তার কর্মকর্তাদের ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের নামে দল বেঁধে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর বাতিল করা হয়েছে। 

বিদ্যুতের ব্যবহার ২০ শতাংশ কমাতে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহার করা যানবাহনের সংখ্যা সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। সরকারের কঠোর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও তার সরকার মার্চ মাসে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১০০ শতাংশ বিদ্যুৎ কাভারেজ উদযাপন করেছে। জ্বালানি খরচ কমাতে কিছু পাওয়ার স্টেশন ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 

এছাড়া সাশ্রয়ী হতে শেখ হাসিনা সরকার তার গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রায় সমাপ্ত প্রকল্পগুলো (এ বিভাগ) চালু রাখা হবে, যখন (বিবিভাগ) প্রকল্পগুলো তাদের বাজেটের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারে। অর্থনৈতিক সংকট দূর না হওয়া পর্যন্ত (সি ক্যাটাগরি) প্রকল্পগুলো স্থগিত থাকবে।

সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শেখ হাসিনা সরকারের গৃহীত এ পদক্ষেপগুলো কি বাংলাদেশকে শ্রীলংকার পথে হাঁটা থেকে রক্ষা করতে পারবে কি পারবে না, সেটি বোঝার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে অর্থনৈতিক মন্দার পূর্বাভাসের ফলে সরকারের গৃহীত সাশ্রয়ী নীতি অর্থ অপচয় রোধসহ দেশের চলমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকা শক্তিকে গতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন