প্রবাসীদের হৃদয়ে ঈদে ভূমিকম্প

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৮, ১৫:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

  মো. শরীফ উদ্দীন, সিঙ্গাপুর

মোবাইলে ফিসফিস কান্নার আওয়াজে ঘুম ভাঙল। প্রবাসে বছরে কয়েকবার পুরুষরা এভাবে কাঁদে। হৃদয়ে অতিমাত্রায় ভূমিকম্প হয় এবং সেই ক্ষত নিয়েই সময় অতিবাহিত হয়। আজকে পবিত্র ঈদুল ফিতর।

ঈদের আগের রাতে আমার বসকে অনেকবার বলেছিলাম, ভাই আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান আমাকে একটু আগে ছুটি দিয়েন। কিন্তু দেয়নি ছুটি। বলেছিল  কাজ শেষ না করে যাওয়া যাবে না। নয়তো বসের কাছে কমপ্লেইন করবে। যখন শেষরাতে কাজ শেষ হল চোখে পানি চলে এসেছে!

 

প্রবাসী শ্রমিক আর কৃতদাসের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনি। বউটা অনেকবার কল দিয়েছিল, ব্যস্ততায় ধরতে পারিনি। হয়তো অভিমান করে আছে। শেষ রাতে ওকে আর জাগাইনি। ভেবেছিলাম আর একটু বেলা হলে ওকে কল দেব।

ঈদ উপলক্ষে মিষ্টি করে কয়েকবার আই লাভ ইউ বললেই ও আর রাগ করে থাকতে পারবে না। মেয়েদের মন কেন যে এত কোমল হয় জানি না। মনে পড়ে ঈদের দিন ভোরে উঠে রান্নাবান্নার কাজে লেগে যেত। আর কিছুক্ষণ পর পর আমাকে এসে বিরক্ত করে যেত। তাড়া দিত নামাজ পড়তে যাওয়ার জন্য, দেরি হলে ঘুমন্ত শরীরে পানি ঢেলে দিত।

 

পাশের বেডে একজনকে দেখলাম ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আমি নিজেই দগ্ধ হয়ে ফিরে এলাম। মা হারানোর কষ্টে পুড়ছে। আমি কীভাবে ওকে সান্ত্বনা দিই?

আমিও যে ওর মতো দুর্ভাগা। মা ছাড়া কি কখনও ঈদের আনন্দে পরিপূর্ণতা আসে? কখনই না। কাঁদুক, আমাদের মতো দুর্ভাগা প্রবাসীদের কান্নাতেই তো সুখ, কান্নাই তো অন্তরকে পরিষ্কার রাখে।

 

শৈশবের কথা বারবার মনে পড়ে যায়। ঈদের দিনগুলোয় মা ভোরবেলায় সবাইকে ডেকে তুলত। গোসল করে সেমাই মুখে দিয়ে নামাজ পড়তে যেতাম। ফিরে এসে পা ছুঁয়ে সালাম করতাম।

মা কাপড়ের আঁচল থেকে গিটখুলে টাকা বের করে দিত। তখন মায়ের মুখে কী যে স্নিগ্ধতা মেশানো থাকত, কী যে প্রশান্তি পেতাম। পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতাম, মা মৃদু ধমক দিত। মুরব্বিদের সালাম করতে বলত। আচ্ছা পৃথিবীটা এত নিষ্ঠুর কেন?

আমাদের পাপের শাস্তি কি আর কোনোভাবে পরিশোধ করা যায় না? পৃথিবীর কি মা নেই? পৃথিবী কি মা হারানোর কষ্ট বুঝে না?

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]