প্রবাসী পিতাকে ঈদ উপহার ভালোবাসা

  জাহাঙ্গীর বাবু, সিঙ্গাপুর ১৮ জুন ২০১৮, ১৫:৩১ | অনলাইন সংস্করণ

প্রবাসী পিতাকে ঈদ উপহার

তুমি টেনশন করো না। আমরা ভালো আছি। রফিকের ছোট মেয়ে বলছে সরাসরি ভিডিওকলে। গত তিন মাস বেতন হচ্ছে না রফিকের। বন্ধুদের সাহায্যে চলছে তার দিনগুলো। এই ব্যয়বহুল অভিজাত শহরে মোবাইল খরচ, গাড়িভাড়াসহ জীবন চালানো খুব সহজ নয়।

ছোট মেয়ে পাখি এবার ক্লাস ফাইভে। অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে। মেয়ের কথায় চোখ ভিজে ওঠে রফিকের। মোবাইল স্ক্রিন থেকে মুখ সরিয়ে নেয় রফিক। পাখি বুঝতে পারে বাবা কাঁদছে। মেয়ে প্রশ্ন করে- তুমি কাঁদছ কেন?

কোনো কথা আসে না। গলাটা বন্ধ হয়ে আসে। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে এমনটি হয়নি। এবারই প্রথম। কোম্পানির বেশ কয়েকটা বিল আটকে গেছে। কোম্পানিও নিরুপায়। প্রতি রোজার ঈদে রফিকের বাবার কাছে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র আত্মীয়স্বজন আসে জাকাত-ফিতরা নেয়ার জন্য। এবারও এসেছে। রফিকের বাবা ভাবে কী করে সম্ভব, এতদিন বেতন ছাড়া থাকে কী করে?

বাড়িতে কাজের লোক, অসুস্থ বাবা-মা। গত মাস পর্যন্ত স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মায়ের খরচের টাকা, বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নিয়ে দিয়েছে সময়মতো। ইতিমধ্যে কয়েক বন্ধু ঈদ করতে বাড়িতে গেছে। যে দু-একজন আছে তাদের কোম্পানির অবস্থা ভালো নয়। তার পরও যৎসামান্য তারাও সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। কিন্তু এভাবে কতদিন। নানা ভাবনায় রফিকের ঘুম আসে না।

রফিকের স্ত্রী প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। নতুন চাকরি। ন্যূনতম বেসিকে যা পায় জেলা শহরের খরচের এক-তৃতীয়াংশ চালানো কষ্টকর। ২৭ রমজান শেষ হয়ে আটাশে সেহরির সময়। সারারাত ঘুম হয়নি রফিকের। রফিকের বড় মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে। সেহরির সময় প্রায় কল আসে ইমোতে, সাহরি খাবারের দৃশ্য ভাগাভাগি করে ওরা। ইফতারেও ব্যতিক্রম হয় না। তারারির নামাজের পর পড়াশোনা, গল্প হয় ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে ভিডিও চ্যাটে।

পাখি জানতে চায়, আব্বু ঈদের জন্য পাঞ্জাবি নিয়েছ। নারে মা, উত্তর দেয় রফিক। পাখির বড় বোন বন্যা এসে একই প্রশ্ন- কি নিয়েছ ঈদে, রফিক বলে তোরা আমার পিছে পড়লি কেনরে মা। আমি ভাবছি তোদের কথা, এই প্রথম তোদের ঈদে কিছুই দিতে পারলাম না।

পাখি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়, আব্বু এবারের ঈদে আমাদের কিছুই চাই না। প্লিজ তুমি একটা কিছু নাও। প্লিজ, প্লিজ। মেয়েটা ওর মায়ের মতো প্লিজ খুব দরদ দিয়ে বলে।

রফিক অনেকের চেয়ে আলাদা একজন মানুষ।

একসময় বাবা-মায়ের কাছে লুকাত না কিছু। এখন সন্তানদের কাছেও গোপন করে না। কারণ নিজের রক্তের কাছে লুকানোর কিছু নেই। সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে সত্য জেনেই সন্তান বড় হবে।

রফিকের বড় মেয়ে বন্যা রফিককে বলে আব্বু, এখন কি সময় আছে, কুরিয়ার করে তোমার জন্য একটা পাঞ্জাবি পাঠিয়ে দিই। ছোট মেয়ে কেঁদে ফেলে, রফিকের স্ত্রী বুকে তুলে নেয় পাখিকে।

রফিকের মন মানে না। প্রবাসে রফিক চোখ মোছে, দেশে স্ত্রী আর দুই মেয়ে। দুদিন পর ঈদ। জেলা শহর থেকে কাল ওরা গ্রামে যাবে ঈদ করতে। দাদা-দাদির কাছে।

কোনো এক চাপা কষ্ট বুকে চেপে ধরে। বিশ্বাস ছিল ঈদের আগেই অন্তত একটা সেলারি হবে। নিজেকে খুব ছোট মনে হয় রফিকের।

আদুরে মেয়েদের কথা মনে পড়ে বারবার। বড় মেয়ে কুরিয়ার করে পাঞ্জাবি পাঠাতে চায়। তাকে রফিক বলেছে- এখন ঈদের সময় হাতে মাত্র দুদিন, পারবে না আম্মু। তুমি টাকা কোথায় পাবে। বন্যা জানায় তার বৃত্তির টাকা রাখা আছে মায়ের কাছে। ছোট মেয়ে পাখি বলেছে, এবারের ঈদে কিছুই লাগবে না, রফিক যেন টেনশন না করে।

রফিক অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসে? কি চাই আর এ যে মেয়েদের কাছে পিতার ভালোবাসার সেরা উপহার পাওয়া হয়ে গেছে।

কি ভাগ্যবান সে! তার মেয়েরা তাকে কত ভালোবাসে। সেলারি না হওয়ায় এবারের ঈদে মেয়েরা নতুন জামা পরতে পারবে না। অথচ কতজন ভাবে রফিক অনেক দিন বিদেশ থেকে নিশ্চয়ই কোটিপতি হয়েছে। প্রবাসে যেন টাকা ওড়ে। প্রবাসীর কষ্ট প্রবাসী বোঝে। [প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter