গন্তব্যহীন এক বিকাল
jugantor
গন্তব্যহীন এক বিকাল
প্রবাস ডায়েরি-১

  নাসরীন সুলতানা  

২৩ নভেম্বর ২০২২, ০৬:৪৭:৪২  |  অনলাইন সংস্করণ

স্প্রিংয়ে অন্টারিওর প্রকৃতি খুব সুন্দর। যেদিকে তাকাই কেবল রং আর রং। রংধনুর সব রং দিয়ে যেন প্রকৃতি আপন হাতে সেজেছে।

বরফের চাদর থেকে বের হয়ে একেবারে মেলে ধরেছে নিজেকে। আজ মনটাও এক অজানা কারণে খুব ভালো।

জগারস, কেডস, আর হুডি পরে অজানার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। শরীর আর মন যতক্ষণ সাহায্য করে হাঁটব। আমার বাসা থেকে বের হতেই স্প্রুস স্ট্রিট। এটা ডান্ডাস স্ট্রিট থেকে সোজা নিনিতের স্কুলে গিয়ে থেমেছে। এর দুইপাশে লাইন ধরে পরপর একতলা বাড়ি। বাড়িগুলো দেখতে আমাদের দেশের টিনের চার চালা ঘরের মতো। সামনে এবং পেছনে রয়েছে ইয়ার্ড।
প্রতিটা বাড়ির ফ্রন্ট ইয়ার্ডে সোভা পাচ্ছে নানা রংয়ের বসন্তের ফুল। আমি অবশ্য সব ফুলের নাম জানি না, কিন্তু দেখতে খুব ভালো লাগে। ফুল মানেই এক ধরনের পবিত্র কিছু মনে হয়, যার নিজের উদ্দেশ্যই যেন কেবল অপরকে আনন্দ দেওয়া। আমি ভাবি মানুষ যদি এমন হতো! আমরা সবাই যদি নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে অন্যের জন্য কাজ করতাম জগতটা অন্য রকম হতো।

কিন্তু না, সেটা তো হবার নয়। মানুষ মাত্রই পৃথিবীর সবচেয়ে স্বার্থপর প্রাণী। এই পৃথিবীর আলো বাতাসে বেঁচে আছে, নিজেদের ইচ্ছেমতো পৃথিবীকে ব্যবহার করছে, আবার সেটাকে নিজের হাতেই বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বড় বড় জমি, বাড়ি কিংবা ব্যাংকভর্তি সঞ্চয় রেখে যাচ্ছে কিন্তু তাদের বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে জরুরি যেটা সেই সুন্দর প্রকৃতি, বিশুদ্ধ অক্সিজেন, সেটার দিকে কোনো মনোযোগ নেই।

আমি ডান দিকে হাঁটা শুরু করলাম, ঠিক নিনিতের স্কুল বরাবর। একটু আগাতেই নাকে ভেসে এলো কোনো এক অজানা ফুলের তীব্র গন্ধ। গন্ধটায় এক ধরনের মাদকতা আছে, ঠিক যেন মহানিমের গন্ধ পাচ্ছি আমি। এ মহানিম ফুল নিয়ে আমার খুব সুন্দর কিছু স্মৃতি আছে। আমি তখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। নিনিতের বাবার সঙ্গে নতুন নতুন পরিচয় হয়েছে। সে শুনেছে মহানিম ফুল আমার খুব প্রিয়। পৃথিবীতে এতো ফুল থাকতে এ ধরনের বৃক্ষজাতীয় ফুলের প্রতি আকর্ষণ শুনে সে তখন একটু অবাক হয়েছিল। এরপর প্রতিদিন নিম গাছের ডাল ভেঙে আমাকে উপহার দিতো। আমিও সেগুলো আমার টেবিলে ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখতাম। সারা ঘর এক ধরনের মাদকতায় ছেয়ে থাকতো। আর দুইদিন পরে টেবিলের উপড়ে ছোট ছোট ফুল ঝরে এক ধরনের সাদা আর বেগুনি রঙের আলপনা তৈরি করতো। আমি মাঝে মাঝে মুগ্ধ হয়ে সেই দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এক ঝলকের জন্য আমি যেন আমার সেই চির চেনা রং আর গন্ধের আস্বাদন পেলাম। কিন্তু শুধু স্মৃতি রোমন্থন করলেই তো হবে না। আমাকে তো খুঁজে বের করতে হবে কোত্থেকে এ গন্ধ আসছে।

হাতের ডান দিকে দেখি অনেকগুলো রঙের ফুল ফুটে আছে। কিছু ফুল অফ হোয়াইট রঙের, অনেকটা নলের মতো সামনের দিকে বেঁকে গেছে। পুরো নলের চারদিকে ছোট ছোট হাসনাহেনা ফুলের মতো ফুল। গাছগুলো গুল্ম জাতীয়। এর ঠিক পাশেই দেখা যাচ্ছে ল্যাভেন্ডার কালারের থোকা থোকা ফুল। এর গাছও গুল জাতীয়। আমি একটু কাছে গেলাম। না, এটা সাদা ফুলের ঘ্রাণ নয়, এটা এ ল্যাভেন্ডার বেগুনি ফুল থেকে আসছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমি যেন আমার দেশের সেই মহানিম পেয়ে গেছি। কি সুন্দর, কি এক মাদকতা এ ঘ্রাণে।

বুক ভরে অনেকটা জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে আমি হাঁটতে থাকলাম। সরু হাঁটার পথ। দুই পাশে সবুজ দুর্বা ঘাস। তার ফাঁকে ফাঁকে উকি দিচ্ছে হলুদ রঙের ডান্ডেলিওন। এখানে ডান্ডেলিওন কেউ রোপন করে না মনে হয়। কিন্তু আগাছার মতো দুর্বা ঘাসের মধ্যে মিশে থাকে। দেখতে অনেকটা সূর্যমুখীর মতো। আর এটি সূর্যের হাসির প্রতীকও বটে। দূর থেকে তাকালে মনে হয় এক সবুজ মাঠে হাজারো হাসিমুখ। অনেকটা ইমোজির মতো।

আমি ইচ্ছে করে একটু ঘাসের মধ্যে পাটা মাড়িয়ে দিলাম যাতে করে আমার পায়ে ডান্ডেলিওনের কিছু রেণু লেগে থাকে, আমার শরীরে সূর্যের হাসি লেগে থাকে। আমি মনে মনে হেসে ফেললাম। কী সব আবোল তাবোল চিন্তা করছি। এগুলো নিছক পাগলামি ছাড়া আর কী?

ততক্ষণে আমি এলেন এভিনিউতে পৌঁছে গেছি। খানিকটা এগিয়ে বরডেন স্ট্রিট ধরে এবার বা দিকে টার্ন নিলাম। সামনে ভাংকুভার স্ট্রিট। আমার খুব অদ্ভুত লাগে এখানের রাস্তার নামগুলো দেখে। রাস্তাগুলো বড় বড় শহরের নামে নামকরণ করা হয়েছে। ভাংকুভার স্ট্রিটে উঠতেই দেখি একজন তার ফ্রন্ট ইয়ার্ডের ঘাস কাটছে। আমাকে দেখে এক গাল হেসে, হাত উঁচু করে বলল, ‘Hi, have a good day’. আমিও বললাম, ‘you too’.

আমার মনে হলো আমার মতো এই লোকটাও নিশ্চয়ই এতক্ষণ মনে মনে কোনো মানুষ খুঁজছিল। এতোটা সময় হাঁটলাম, রাস্তায় কোনো মানুষ নেই। এতো বড় দেশ, কিন্তু মানুষ কতো কম। এই লোক আমার নাম, পরিচয় কিছুই জানে না। তারপরেও গ্রিটিংস বিনিময় করতে, হাসি বিনিময় করতে দ্বিধা করেনি। আমাদের দেশে অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলাকে ব্যক্তিত্বহীনতা মনে করা হয়। কিন্তু এখানে এটা একটা সাধারণ ভদ্রতা।

ভাংকুভার স্ট্রিট পার হয়ে ক্যালগেরি স্ট্রিটে পৌঁছাতেই চোখে পড়লো বড় একটা ম্যাগনোলিয়া ফুলের গাছ। এটা বৃক্ষ জাতীয় গাছ, সারা গাছে বেবি পিংক কালারের ফুল শোভা পাচ্ছে। গাছে একটি পাতাও নেই, কেবল ফুল আর ফুল, ঠিক যেন গোলাপি রঙের শিমুল গাছ দাঁড়িয়ে আছে একটা। আমার নানাবাড়িতে একটা বড় শিমুল গাছ ছিল। শীতের শেষে লাল রঙের শিমুল ফুলে গাছ ছেয়ে থাকতো। এখন অবশ্য শিমুল খুব একটা চোখে পড়ে না। আমাদের দেশের মানুষ এখন আর বাড়ির সামনে বাগান করে না। যে জায়গায় বাগান করবে, সেই জায়গায় বাড়ি তৈরি করে ভাড়া দিলে একটা বিনা পরিশ্রমে উপার্জনের ব্যবস্থা হয়। বাগান করে জায়গার অপচয় করার মতো বিলাসিতা এখন আর মানুষের মধ্যে দেখা যায় না।

আমি হাঁটছি। আরও দিগুণ গতিতে হাঁটছি। আমার ডানদিকে হাঁটুর নিচে সারি সারি হলুদ আর লালা রঙের টিউলিপ, মাথার কাছটা ঘেঁষে একটু পর পর দেখা যাচ্ছে ইস্টার্ন রেডবাডের ম্যাজেন্ডা রং। এতো সুন্দর এ পৃথিবী! সৃষ্টিকর্তা কত অকৃত্রিমভাবে আমাদেরকে এত রং, সৌন্দর্য আর গন্ধ উপহার দিয়েছেন। আমার কাছে মনে হয় আমাদের জীবনও যেন প্রকৃতির মতোই নানারঙে সাজানো। কখনো এ জীবন মহানিমের মতো চারদিকে মাদকতা ছড়ায়, সেই মাদকতায় কেউ কেউ মুগ্ধ হয়, ক্ষণিকের জন্য নিজেকে হারিয়ে ফেলে। আবার কেউ গ্রাহ্যই করে না। এই জীবন কখনো ডান্ডেলিওনের মতো হাসে, আবার কেউ তাকে মাড়িয়ে দিয়ে যায়, কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকে অতি যত্নে ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখা বন্য মহানিমের মতোই আদরে দিনযাপন করে, আবার অনেকে শিমুল কিংবা মাগনোলিয়ার মতো শুধু কারো বাড়ির শোভাই বৃদ্ধি করে, ফুলদানিতে কোনোদিন জায়গা পায় না।

আমি হাঁটছি এডমন্টন স্ট্রিট ধরে। দূর থেকে ভেসে আসছে সাই সাই করে ছুটে চলা গাড়ির শব্দ। সবার গন্তব্যে পৌঁছাবার তাড়া। আমার আজ শুধু মনে হচ্ছে আমি কয়েক ঘণ্টার জন্য গন্তব্যহীন। আমি হাঁটছি... গন্তব্যহীন গন্তব্যে।

অন্টারিও, কানাডা
২০ মে, ২০২২

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

গন্তব্যহীন এক বিকাল

প্রবাস ডায়েরি-১
 নাসরীন সুলতানা 
২৩ নভেম্বর ২০২২, ০৬:৪৭ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

স্প্রিংয়ে অন্টারিওর প্রকৃতি খুব সুন্দর। যেদিকে তাকাই কেবল রং আর রং। রংধনুর সব রং দিয়ে যেন প্রকৃতি আপন হাতে সেজেছে।

বরফের চাদর থেকে বের হয়ে একেবারে মেলে ধরেছে নিজেকে। আজ মনটাও এক অজানা কারণে খুব ভালো।

জগারস, কেডস, আর হুডি পরে অজানার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। শরীর আর মন যতক্ষণ সাহায্য করে হাঁটব। আমার বাসা থেকে বের হতেই স্প্রুস স্ট্রিট। এটা ডান্ডাস স্ট্রিট থেকে সোজা নিনিতের স্কুলে গিয়ে থেমেছে। এর দুইপাশে লাইন ধরে পরপর একতলা বাড়ি। বাড়িগুলো দেখতে আমাদের দেশের টিনের চার চালা ঘরের মতো। সামনে এবং পেছনে রয়েছে ইয়ার্ড।
প্রতিটা বাড়ির ফ্রন্ট ইয়ার্ডে সোভা পাচ্ছে নানা রংয়ের বসন্তের ফুল। আমি অবশ্য সব ফুলের নাম জানি না, কিন্তু দেখতে খুব ভালো লাগে। ফুল মানেই এক ধরনের পবিত্র কিছু মনে হয়, যার নিজের উদ্দেশ্যই যেন কেবল অপরকে আনন্দ দেওয়া। আমি ভাবি মানুষ যদি এমন হতো! আমরা সবাই যদি নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে অন্যের জন্য কাজ করতাম জগতটা অন্য রকম হতো।

কিন্তু না, সেটা তো হবার নয়। মানুষ মাত্রই পৃথিবীর সবচেয়ে স্বার্থপর প্রাণী। এই পৃথিবীর আলো বাতাসে বেঁচে আছে, নিজেদের ইচ্ছেমতো পৃথিবীকে ব্যবহার করছে, আবার সেটাকে নিজের হাতেই বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বড় বড় জমি, বাড়ি কিংবা ব্যাংকভর্তি সঞ্চয় রেখে যাচ্ছে কিন্তু তাদের বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে জরুরি যেটা সেই সুন্দর প্রকৃতি, বিশুদ্ধ অক্সিজেন, সেটার দিকে কোনো মনোযোগ নেই।

আমি ডান দিকে হাঁটা শুরু করলাম, ঠিক নিনিতের স্কুল বরাবর। একটু আগাতেই নাকে ভেসে এলো কোনো এক অজানা ফুলের তীব্র গন্ধ। গন্ধটায় এক ধরনের মাদকতা আছে, ঠিক যেন মহানিমের গন্ধ পাচ্ছি আমি। এ মহানিম ফুল নিয়ে আমার খুব সুন্দর কিছু স্মৃতি আছে। আমি তখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। নিনিতের বাবার সঙ্গে নতুন নতুন পরিচয় হয়েছে। সে শুনেছে মহানিম ফুল আমার খুব প্রিয়। পৃথিবীতে এতো ফুল থাকতে এ ধরনের বৃক্ষজাতীয় ফুলের প্রতি আকর্ষণ শুনে সে তখন একটু অবাক হয়েছিল। এরপর প্রতিদিন নিম গাছের ডাল ভেঙে আমাকে উপহার দিতো। আমিও সেগুলো আমার টেবিলে ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখতাম। সারা ঘর এক ধরনের মাদকতায় ছেয়ে থাকতো। আর দুইদিন পরে টেবিলের উপড়ে ছোট ছোট ফুল ঝরে এক ধরনের সাদা আর বেগুনি রঙের আলপনা তৈরি করতো। আমি মাঝে মাঝে মুগ্ধ হয়ে সেই দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এক ঝলকের জন্য আমি যেন আমার সেই চির চেনা রং আর গন্ধের আস্বাদন পেলাম। কিন্তু শুধু স্মৃতি রোমন্থন করলেই তো হবে না। আমাকে তো খুঁজে বের করতে হবে কোত্থেকে এ গন্ধ আসছে।

হাতের ডান দিকে দেখি অনেকগুলো রঙের ফুল ফুটে আছে। কিছু ফুল অফ হোয়াইট রঙের, অনেকটা নলের মতো সামনের দিকে বেঁকে গেছে। পুরো নলের চারদিকে ছোট ছোট হাসনাহেনা ফুলের মতো ফুল। গাছগুলো গুল্ম জাতীয়। এর ঠিক পাশেই দেখা যাচ্ছে ল্যাভেন্ডার কালারের থোকা থোকা ফুল। এর গাছও গুল জাতীয়। আমি একটু কাছে গেলাম। না, এটা সাদা ফুলের ঘ্রাণ নয়, এটা এ ল্যাভেন্ডার বেগুনি ফুল থেকে আসছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমি যেন আমার দেশের সেই মহানিম পেয়ে গেছি। কি সুন্দর, কি এক মাদকতা এ ঘ্রাণে।

বুক ভরে অনেকটা জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে আমি হাঁটতে থাকলাম। সরু হাঁটার পথ। দুই পাশে সবুজ দুর্বা ঘাস। তার ফাঁকে ফাঁকে উকি দিচ্ছে হলুদ রঙের ডান্ডেলিওন। এখানে ডান্ডেলিওন কেউ রোপন করে না মনে হয়। কিন্তু আগাছার মতো দুর্বা ঘাসের মধ্যে মিশে থাকে। দেখতে অনেকটা সূর্যমুখীর মতো। আর এটি সূর্যের হাসির প্রতীকও বটে। দূর থেকে তাকালে মনে হয় এক সবুজ মাঠে হাজারো হাসিমুখ। অনেকটা ইমোজির মতো।

আমি ইচ্ছে করে একটু ঘাসের মধ্যে পাটা মাড়িয়ে দিলাম যাতে করে আমার পায়ে ডান্ডেলিওনের কিছু রেণু লেগে থাকে, আমার শরীরে সূর্যের হাসি লেগে থাকে। আমি মনে মনে হেসে ফেললাম। কী সব আবোল তাবোল চিন্তা করছি। এগুলো নিছক পাগলামি ছাড়া আর কী?

ততক্ষণে আমি এলেন এভিনিউতে পৌঁছে গেছি। খানিকটা এগিয়ে বরডেন স্ট্রিট ধরে এবার বা দিকে টার্ন নিলাম। সামনে ভাংকুভার স্ট্রিট। আমার খুব অদ্ভুত লাগে এখানের রাস্তার নামগুলো দেখে। রাস্তাগুলো বড় বড় শহরের নামে নামকরণ করা হয়েছে। ভাংকুভার স্ট্রিটে উঠতেই দেখি একজন তার ফ্রন্ট ইয়ার্ডের ঘাস কাটছে। আমাকে দেখে এক গাল হেসে, হাত উঁচু করে বলল, ‘Hi, have a good day’. আমিও বললাম, ‘you too’.

আমার মনে হলো আমার মতো এই লোকটাও নিশ্চয়ই এতক্ষণ মনে মনে কোনো মানুষ খুঁজছিল। এতোটা সময় হাঁটলাম, রাস্তায় কোনো মানুষ নেই। এতো বড় দেশ, কিন্তু মানুষ কতো কম। এই লোক আমার নাম, পরিচয় কিছুই জানে না। তারপরেও গ্রিটিংস বিনিময় করতে, হাসি বিনিময় করতে দ্বিধা করেনি। আমাদের দেশে অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলাকে ব্যক্তিত্বহীনতা মনে করা হয়। কিন্তু এখানে এটা একটা সাধারণ ভদ্রতা।

ভাংকুভার স্ট্রিট পার হয়ে ক্যালগেরি স্ট্রিটে পৌঁছাতেই চোখে পড়লো বড় একটা ম্যাগনোলিয়া ফুলের গাছ। এটা বৃক্ষ জাতীয় গাছ, সারা গাছে বেবি পিংক কালারের ফুল শোভা পাচ্ছে। গাছে একটি পাতাও নেই, কেবল ফুল আর ফুল, ঠিক যেন গোলাপি রঙের শিমুল গাছ দাঁড়িয়ে আছে একটা। আমার নানাবাড়িতে একটা বড় শিমুল গাছ ছিল। শীতের শেষে লাল রঙের শিমুল ফুলে গাছ ছেয়ে থাকতো। এখন অবশ্য শিমুল খুব একটা চোখে পড়ে না। আমাদের দেশের মানুষ এখন আর বাড়ির সামনে বাগান করে না। যে জায়গায় বাগান করবে, সেই জায়গায় বাড়ি তৈরি করে ভাড়া দিলে একটা বিনা পরিশ্রমে উপার্জনের ব্যবস্থা হয়। বাগান করে জায়গার অপচয় করার মতো বিলাসিতা এখন আর মানুষের মধ্যে দেখা যায় না।

আমি হাঁটছি। আরও দিগুণ গতিতে হাঁটছি। আমার ডানদিকে হাঁটুর নিচে সারি সারি হলুদ আর লালা রঙের টিউলিপ, মাথার কাছটা ঘেঁষে একটু পর পর দেখা যাচ্ছে ইস্টার্ন রেডবাডের ম্যাজেন্ডা রং। এতো সুন্দর এ পৃথিবী! সৃষ্টিকর্তা কত অকৃত্রিমভাবে আমাদেরকে এত রং, সৌন্দর্য আর গন্ধ উপহার দিয়েছেন। আমার কাছে মনে হয় আমাদের জীবনও যেন প্রকৃতির মতোই নানারঙে সাজানো। কখনো এ জীবন মহানিমের মতো চারদিকে মাদকতা ছড়ায়, সেই মাদকতায় কেউ কেউ মুগ্ধ হয়, ক্ষণিকের জন্য নিজেকে হারিয়ে ফেলে। আবার কেউ গ্রাহ্যই করে না। এই জীবন কখনো ডান্ডেলিওনের মতো হাসে, আবার কেউ তাকে মাড়িয়ে দিয়ে যায়, কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকে অতি যত্নে ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখা বন্য মহানিমের মতোই আদরে দিনযাপন করে, আবার অনেকে শিমুল কিংবা মাগনোলিয়ার মতো শুধু কারো বাড়ির শোভাই বৃদ্ধি করে, ফুলদানিতে কোনোদিন জায়গা পায় না।

আমি হাঁটছি এডমন্টন স্ট্রিট ধরে। দূর থেকে ভেসে আসছে সাই সাই করে ছুটে চলা গাড়ির শব্দ। সবার গন্তব্যে পৌঁছাবার তাড়া। আমার আজ শুধু মনে হচ্ছে আমি কয়েক ঘণ্টার জন্য গন্তব্যহীন। আমি হাঁটছি... গন্তব্যহীন গন্তব্যে।

অন্টারিও, কানাডা
২০ মে, ২০২২

 

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন jugantorporobash@gmail.com এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন