কোটা প্রথার সংস্কার ও অর্থের বিনিময়ে চাকরিতে নিয়োগ বন্ধ হোক

  এম ওমর ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর থেকে ০৪ জুলাই ২০১৮, ১৫:০৭ | অনলাইন সংস্করণ

কোটা প্রথার সংস্কার
লেখক সিঙ্গাপুর প্রবাসী এম ওমর ফারুকী শিপন

অনেকেই আমাকে আজকাল জিজ্ঞেস করে গ্রাজুয়েশন করে কামলা দিতে সিঙ্গাপুর এলাম কেন? তাদের প্রশ্নের জবাবে লাজুক একটি হাসি দেয়া ছাড়া কিছুই বলার থাকে না। তাদের প্রশ্ন যথার্থ। তাই পাল্টা প্রশ্নও করতে পারি না।

তাদের কী করে বলি আমার একটা স্বপ্ন ছিল- আমি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে যোগদান করে দেশসেবা করব৷

শুধু আমি না, আমার পরিবারের সবার স্বপ্ন ছিল আমি যেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে যোগাদান করি। পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বিজিবি যে কোনো একটি বাহিনীতে যোগদান করলেই হবে। আমার ভাইবোনদের মধ্যে আমি একটু লম্বা ছিলাম তাই আমার পরিবার এমনটি চেয়েছিলেন৷

আর এই স্বপ্নপূরণে এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট পাওয়ার পরপরই শুরু হয় আমার সংগ্রাম।

প্রথমে সৈনিক পদে সেনাবাহিনীতে ইন্টারভিউ দিই৷ শারীরিক মাপসহ সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই, কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় গিয়ে অযোগ্য বলে ঘোষণা করে আমাকে।

এরপরও থেমে থাকিনি। যে কোনো বাহিনীর নিয়োগ বিজ্ঞাপন পেলেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে আগের ব্যর্থতাকে ভুলে নতুন উদ্যমে ইন্টারভিউ দিতে যাই৷

সব জায়গায় একই শারীরিক যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হই; লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই; কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় আমাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।

আমাকে বারবার ব্যর্থ হতে দেখে এক বন্ধু বলল, তোর পরিবারে কি কোনো মুক্তিযোদ্ধা আছে?

আমি বলি না।

তোর পরিবারে কি কোনো সরকারি চাকরিজীবী আছে?

আমি বলি না।

তোর বাবার কি ১০ লাখ টাকা দেয়ার ক্ষমতা আছে?

আমি বলি না।

আমার বাবা আমাকে পড়ালেখার খরচ বাবদ ১০০ টাকা দিতে পারে না। আবার দেবে ১০ লাখ টাকা! বন্ধু নিরাশ হয়ে বলল, তা হলে বাদ দে সরকারি চাকরির আশা।

এখন সরকারি চাকরি পেতে হলে কোটা থাকতে হবে, নইলে কয়েক লাখ টাকা দেয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে; অথবা চাকরির জন্য সুপারিশ করার মতো কেউ থাকতে হবে।

বন্ধুর কথায় আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। আমার স্বপ্নপূরণ হবে না তা কি করে হয়।

আমাকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখে এক বন্ধু বলল, রেলওয়ে লোক নিয়োগ দেবে।

তুই যদি পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করতে পারিস, তা হলে আমি তোর জন্য কিছু একটা করতে পারব।

আমি বাড়িতে এ কথা জানাই। আমার কথা শুনে মা-বাবা বলেন, ঘুষ দিয়ে চাকরি নিয়ে তুই কি করবি? তুইও ঘুষ খাবি? তা হলে তোর আর ঘুষখরের মধ্যে পার্থক্য রইল কই?

নিজের অন্যায় কাজ করাও লাগবে না আর আমাদের হারাম উপার্জন খাওয়ানোও লাগবে না।

নিজেকে নিয়ে যত না চিন্তিত হয়, তার চেয়ে বেশি চিন্তা হয় নিজের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।

আমার জীবন তো এভাবে কেটে যাবে। কিন্তু আমার পরবর্তী প্রজন্ম তারাও কি কোটাপ্রথার কাছে জিম্মি হয়ে সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হবে?

পৌষ্য কোটা নামে একটা কোটা আছে, সরকারি চাকরিজীবীর সন্তান সরকারি চাকরি পাবে।

তার মানে যে পরিবারে কোনো সরকারি চাকরিজীবী নেই, সে পরিবারে সরকারি চাকরি পেতে অর্থের প্রয়োজন হবে।

আমাকে তাহলে আমার পরবর্তী প্রজন্মের ঘুষের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ রেখে যেতে হবে।

এরপর পড়ালেখায় পুরোদমে মন দিই। এবার জীবনের লক্ষ্য পরিবর্তন করি। কোনো বাহিনীতে নয় কিংবা সরকারি চাকরি নয়; এবার লক্ষ্য স্থির করি একজন আইনজীবী হব।

কিন্তু সেই স্বপ্নও ভেঙে যায় হঠাৎ মা অসুস্থ হয়ে পড়ায়। আমার জন্য চাকরিতে সুপারিশ করার মতো কেউ নেই।

আমার জন্য কোনো কোটা নেই। আমার বাবার অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেয়ার ক্ষমতা নেই। তাই বাধ্য হয়ে প্রবাসের পথে পা বাড়াই।

দেশে কোটাপ্রথা কিংবা অর্থের বিনিময়ে সরকারি নিয়োগ যদি না থাকত, তা হলে আমি হয়তো দেশেই মোটামুটি একটা কিছু করতে পারতাম।

শুধু আমি না, আমার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের হাজার হাজার ছেলেমেয়ে গ্রাজুয়েশন করে প্রবাসে এসে কামলা দিতে হতো না।

আমি যখন প্রবাসে আসি তখন আমার সঙ্গে ৪৫ জন ছেলে আসে, সবাই ডিপ্লোমাধারী কিংবা ডিগ্রীধারী।

সেই ৪৫ জন মেধাবী বিদেশে বিভিন্ন কোম্পানীতে সুনামের সঙ্গে কর্মরত আছেন।

কিছুদিন পর এরা প্রবাসে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেয়ে যাবে। অথচ এরা দেশে থাকলে দেশ উপকৃত হতো।

দেশে মেধাবীদের সৎ ব্যবহার করতে চাইলে এখনই কোটা প্রথা সংস্কার করা জরুরী। তার পাশাপাশি অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ প্রক্রিয়াও বন্ধ করাও জরুরী। অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ না হলে আমার মত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য কোটা সংস্কার কোন কাজে আসবে না।

কোটা প্রথা কিংবা অর্থের বিনিময়ে এভাবে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ অব্যাহত থাকলে একটা সময় দেখা যাবে অযোগ্যরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে আছে।

সুস্থ সুন্দর দেশের জন্য আজই কোটা প্রথার সংস্কার হোক ও পাশাপাশি অর্থের বিনিময়ে চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হোক ।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাসবিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়েলিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনারনামে প্রকাশ করা হবে।]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : কোটাবিরোধী আন্দোলন ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter