লাখো আদর্শ শিক্ষক দেখতে চাই সারা বাংলাদেশে

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৮ আগস্ট ২০১৮, ২২:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

লাখো আদর্শ শিক্ষক দেখতে চাই সারা বাংলাদেশে
লেখক রহমান মৃধা সুইডেন থেকে।

কথা হবে আজ এমন একজন বন্ধুকে নিয়ে, যে স্টোরি জীবনের পাতা থেকে নেওয়া। আমি দীর্ঘদিন দেশ ছেড়ে প্রবাসে আছি। ১৯৮৫ থেক সুইডেনে উচ্চ মাধ্যমিক পরবর্তী পড়াশুনা সম্পন্ন করে এখানেই চাকরি, বিয়ে-সাদী, ছেলে-মেয়ে নিয়ে বসবাস করছি।

বাংলাদেশের অনেক বন্ধুরা যাদের সঙ্গে ছোটবেলার দিনগুলো কেটেছে তারা অন্তরে থাকলেও বহুকাল তাদের সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। তবে ফেসবুকের কল্যাণে বহু পুরাতন মানুষ ও বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে এখন যোগাযোগ পুনঃস্থাপন হচ্ছে যা অত্যন্ত আনন্দের বিষয় বটে।

আমি আমার এক বন্ধুর সঙ্গে নবম ও দশম শ্রেণীতে মাত্র দু’বছর স্কুলে পড়েছি। সেই গঙ্গারামপুর (মাগুরা জেলা) স্কুলের বিজ্ঞান ভবন, শ্রেণীকক্ষ, একের পর এক প্রিয় শিক্ষকদের আগমন ও আকর্ষণীয় লেকচার, সেই সব প্রিয় বন্ধু, বিশাল স্কুল মাঠ, নবগঙ্গা নদী, খেয়াঘাট, বাজার আমাদের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে।

তবে এতদিন পরে এত দূরের দু'টি ভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতিতে বসবাস করে আমাদের দু’জনের চিন্তা চেতনার মধ্যে ব্যাপক ব্যাবধান হয়ে যাওয়ার কথা। আমি কর্মের সুবাদে বহু দেশ ভ্রমণ করে বহু সমাজ ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসেছি।

আর আমার বন্ধু সুজলা, সুফলা, শষ্য, শ্যামলা বাংলাদেশের জল, হাওয়ায় নিত্য পুষ্ট হচ্ছে। আমি বাংলাদেশের অন্ন এখন খাই না কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ, প্রকৃতি নিয়ে সত্যি আমার ভাবনার অন্ত নেই।

আমার বড় ভাই প্রফেসর ড. মান্নান মৃধা সুইডেনের কেটিএইচ রয়েল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একজন নামকরা শিক্ষক। আমরা স্বাবলম্বী মানুষ।

প্রবাসী হলেও আমরা নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছি বাংলাদেশের মানুষের জন্য কিছু করতে। আমাদের সুইডেনে কী সমস্যা আছে তা বাংলাদেশের মানুষের জানা নেই, তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে আমরা সচেতন।

বাংলাদেশে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগের পর বাংলাদেশের নানা সমস্যা নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমি আলোচনা করি। তার মধ্যে অন্যতম একটা বিষয় হলো, তাঁর ও আমার উভয়ের একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কৃষ্ণ গোপাল ভট্টাচার্য্য অত্যন্ত দিনহীনভাবে জীবন যাপন করছিলেন যা আমাকে মারাত্মকভাবে মর্মাহত করেছিল।

আশি বছর বয়সী সেই শিক্ষকের জীর্ণ ঘরবাড়ী সংস্কার ও তাঁর জন্য একটি মাসিক খরচের টাকা প্রদানের জন্য আমি বর্তমানে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সেই কাজের জন্য যে আমাকে সব চেয়ে বেশি উৎসাহ ও সাহায্য করেছিল তাঁর নাম জুলফিকার আলী। সে আমাদের এক ছোট ভাই, তাঁকে নিয়ে নতুন করে স্টোরি বলবো অন্য আরেক দিন।

জুলফিকারের মাধ্যমে ঐ শিক্ষকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপন করি এবং তাঁর খোঁজ খবর নিতে শুরু করি। আমি চেয়েছিলাম নিবেদিতপ্রাণ বাংলাদেশের গরীব শিক্ষকবৃন্দের জন্য রাষ্ট্র, সমাজ ও তাঁদের প্রাক্তন ছাত্ররা যেন স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে কিছু পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসেন।

আশ্চর্যের বিষয় এই যে অনেকেই একই জায়গাতে বাস করেও এতদিন একজন অবসরপ্রাপ্ত দরিদ্র শিক্ষকের দিনহীন অবস্থার কথা কেন উপলব্ধিতে আনতে পারে নাই! তাঁদের আশে পাশেই তো এমন অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রয়েছেন যাঁরা ৩০/৩৫ বছর এই মহান শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত থেকে হাজার হাজার আলোকিত মানুষ তৈরি করে শূণ্য হাতে বা অতি সামান্য অর্থ পেয়ে অবসরে গিয়েছেন।

এখন তাঁরা সন্তান, সংসার বা সমাজের গলগ্রহ হয়ে ধুকে ধুকে মরছেন। আবার অনেক শিক্ষক তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর প্রাপ্যটাও পাননি। এই সর্বংসহা প্রকৃতি কি কারো মানব চেতনাকে একেবারে অবশ করে রেখেছে? না, দারিদ্রক্লিষ্ট হাজার সমস্যার এই দেশে এটাকে কেউ কোন সমস্যায় মনে করে না?

পারিপার্শিকতা ও আবহাওয়া কি সবাইকে অনেক বেশি অমানবিক করে তুলেছে? যাইহোক আমার থেকে অন্যের এই বিরাট পার্থক্যের কারণ তাহলে কী? কারণ একটাই তাহলো হাজারো সমস্যা তাদেরকে বাধ্য করেছে মনের দুয়ার বন্ধ করে রাখতে।

যাইহোক বন্ধুর সঙ্গে প্রতিদিন কথা হয় এবং আমরা শেষে গঙ্গারামপুরের সকল ছাত্র-ছাত্রী মিলে আমাদের সেই প্রক্তন শিক্ষকের ঘর থেকে শুরু করে যা প্রয়োজন সব করে দিতে পেরেছি। সবাই আবার যার যার কাজে জড়িত হয়েছে।

ফেসবুকের মাধ্যমে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে কম বেশি, তবে আমার এই বন্ধু লতার মত জড়িয়ে পড়েছে মনের মাঝে। সে বাংলাদেশে থাকে অথচ যে বিষয়ই আলোচনা করি না কেন সে শুধু জানে না তা নয়, তাঁর যথেষ্ঠ জ্ঞান রয়েছে বিষয়গুলোর ওপর।

আমি অবাক হতে শুরু করি পরে মনের জানালা খুলে দেখতে শুরু করলাম। কেন এত পরিবর্তন তার মাঝে অন্যদের থেকে? প্রথমত সে প্রথম থেকেই একজন ভালছাত্র ছিল। তার এসএসসি, এইচএসসি, বিএসসি, এমএসসি সব কিছুতে ভাল রেজাল্টসহ স্ট্যাটিস্টিক্সের ওপর পড়াশুনো করা ছাত্র।

যা নিঃসন্দেহে যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের বা বাইরে ভালো কিছু করার মত কোয়ালিটি এবং ক্যাপাবিলিটি থাকা সত্বেও বা ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার বা অন্য কোন পেশা গ্রহণ না করে সে বেছে নিয়েছে শিক্ষকতা। তাও কলেজে! ভাবতে অবাকই লাগে কারণ বাংলাদেশে তো রাজনীতি ও শিক্ষকতা করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যখন অন্য কোন গতি না থাকে, বিশেষ করে বর্তমান যুগে।

বন্ধু এমনও নয় যে সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় বা খুব নামকরা কলেজের একজন শিক্ষক, সে একটি সাধারণ কলেজের শিক্ষক মাত্র। প্রশ্ন করতে সে উত্তর দিয়েছিল- কলেজেও নয় শখ প্রাইমারিতে পড়ানো। কারণ শুরু থেকে প্রশিক্ষণ দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু সমাজের কাছে সারাজীবন অবহেলিত হয়ে থাকতে হত আর শুনতে হোত “কোন কিছুই করতে পারল না বেচারা শেষে শিক্ষক হয়েছে তাও প্রাইমারিতে”!

যতটুকু তাঁকে নেড়েচেড়ে দেখেছি তাতে মনে হয়, সে এই শিক্ষকতাকে মন প্রাণ দিয়ে ভালবাসে এবং সে জানতে হলে শিখতে হবে এই কনসেপ্টে বিশ্বাসী। বাংলাদেশর ওপর আমার সব লেখালেখিতে আমি তাকে সবসময় জড়িত রেখেছি।

কারণ আমার এত বছর বাইরে থাকার কারণে অনেক তথ্য বা ভাষাগত ত্রুটি সংশোধন করতে তাকে আমি একজন শিক্ষক হিসাবেও কাজে লাগিয়ে থাকি। আমার সেই লার্নিং ফরম লার্নার কনসেপ্টের মধ্য দিয়ে।

একজন ভালো শিক্ষক হতে হলে (জানিনা সব সময় সঠিক কিনা তবে এটা প্রমাণিত হয়েছে আমার অভিজ্ঞতা থেকে) একজন ভালো ছাত্র হওয়া প্রয়োজন। কারণ এমন দু’জন ব্যাক্তিদের আমি চিনি তারাই তার প্রমাণ এবং এনারা বেছে নিয়েছেন শিক্ষকতাকে তাদের নিজেদের থেকে।

আমার বড় ভাই প্রফেসর ড. মান্নান মৃধা এবং সেই স্কুল বন্ধু যাকে আমি নতুন করে খুঁজে পেয়েছি ৩৬ বছর পরে রতন ভট্টাচার্য। রতন তাঁর শিক্ষাকতার পাশাপাশি কবিতাও লেখে, সদ্য প্রকাশিত “আমাদের ধুলোমাটি খেলা” উল্লেখ্য।

আমি আমার বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের জন্য যে সব কোয়ালিটি পূর্ণ শিক্ষকদের কথা মনের মাঝে ধরে রেখেছি তাদের মধ্যে আমার বড় ভাই পরে রতনকে নিঃসন্দেহে রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করি যখনই শিক্ষা প্রশিক্ষণ নিয়ে লেখালেখি করি।

ভাল মানুষ, ভাল বন্ধু এবং ভাল শিক্ষক তিনটি গুণের সমন্বয়ে বন্ধু রতনকে দেখে মনের মাঝে দোলা দিয়েছে সেই শুরুতেই। যে বাংলাতেই রতনের মত সোনার মানুষ রয়েছে তবে কেনো সম্ভব হবে না বাংলাকে সোনার বাংলা করা বা স্বপ্নকে বাস্তব করা?

তাই তো মনের মাঝে দোলা দিয়েছে- সুশিক্ষাই করতে পারবে বাংলাকেই সোনার বাংলা।রতন ভট্টাচার্যের মত লাখো লাখো আদর্শ শিক্ষক দেখতে চাই সারা বাংলাদেশে, এমনটি প্রত্যাশায় আমি রহমান মৃধা সুইডেন থেকে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter