গণতান্ত্রিক নির্বাচন: বাংলাদেশ বনাম সুইডেন

  রহমান মৃধা, স্টকহোম (সুইডেন) থেকে ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৫:০১ | অনলাইন সংস্করণ

গণতান্ত্রিক নির্বাচন: বাংলাদেশ বনাম সুইডেন
বাংলাদেশ ও সুইডেনের জাতীয় সংসদ ভবনের রাতের চিত্র। ছবি: যুগান্তর

সুইডেন গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে রাজা দেশের অলংকারিক প্রধান হিসেবে স্বীকৃত। সুইডেনের জাতীয় সংসদের নাম রিক্সদ্যাগ যার আসন সংখ্যা ৩৪৯। এ ছাড়াও রয়েছে স্থানীয় সরকার ল্যান্ডসটিং (সিটি বা বিভাগ) ও কম্মুন (মিউনিসিপালিটি) নির্বাচন।

ইলেকশন ৯ সেপ্টেম্বর। প্রতি চার বছর পর পর এই জাতীয় ইলেকশন হয়ে থাকে। গত ৯ অগাস্ট থেকে ক্যাম্পিং এর কাজ শুরু হয়েছে তাই রাস্তার বিভিন্ন জায়গাতে বিভিন্ন দলের গোলস এবং অবজেক্টিভসসহ যার যার প্রমিজের কথা তুলে ধরেছে, তারা ভোটে জিতলে কী করবে জনগনের জন্য।

এখানে ব্যক্তির চেয়ে পার্টির আইডোলজির উপর বেশি গুরত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। বিভিন্ন মিডিয়াতে আলোচনা, তর্ক, বিতর্কও চলছে। জনগন সব দেখছে ও শুনছে। পরে ঠিক ৯ সেপ্টেম্বর সবাই ভোট দিবে জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের যার যার মনোনীত পার্টি ও তার প্রার্থীকে।

এখানে জন্মগতভাবে সুইডিস নাগরিক ছাড়াও ইমিগ্র্যান্টসরাও ইলেকশন করতে পারে যদি তাঁদের ভোট দেবার অধিকার থাকে (নির্ভর করে বয়স সর্বনিম্ন ১৮ বা নাগরিকত্বের ওপর)।

প্রসঙ্গত স্টকহোমের অদূরের একটি কম্মুন নাম সালেম কম্নুন, এ কম্মুনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে আমাদের বাংলাদেশি সুইডিস ফারজানা খান। তিনি সুইডেনের তৃতীয় বৃহত্তম পার্টির (মর্ডারেট পার্টি) মনোনীত প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করবেন।

পুরোদেশে নিশ্চিত আরও কেউ রয়েছে যে বা যারা বাংলাদেশি অরিজিন। তাদের জন্য শুভ কামনা রইল। একটি দেশের বা জাতির নেতা সাধারণত সেই দেশের জাতির মতই হয়ে থাকে। দু’পক্ষেরই কাজ কর্রমের প্রতিফলন সচারচর এক এবং অভিন্ন হয়ে থাকে।

অন্য ভাবে বলতে হয় একে অপরের প্রতিচ্ছবিই মাত্র। আম গাছের তলে যেমন আম পড়ে ঠিক জামগাছের তলে জামই পড়ে থাকে। তাই মানব জাতির ক্ষেত্রেও এর ব্যাতিক্রম হয় না।

যতটা আমরা পরচর্চা ও পরনিন্দাই উদার ঠিক ততটাই আত্নসমালোচনা ও আত্নশুদ্ধিতে কৃপণ। তবে এটা পরিস্কার যে, নেতারা জাস্ট জনগনের প্রতিফলন বা প্রতিচ্ছবিই মাত্র।

একটি ভালো উদাহরণ দিতে চাই দেখি কি মনে হয়। সারাদেশে কম্প্লেন করা হলো বাংলাদেশের জনগন ট্রাফিক রুলস অমান্য করে। পরে তদন্তে দেখা গেল যারা ক্ষমতায় রয়েছে তারাও ঠিক একই কাজ করছে।

এ ক্ষেত্রে কী দেখতে পেলাম? জাতির প্রতিনিধিরাও ঠিক একই চরিত্রে গড়া। তাই দেখা গেলো সবাই একই ধরনের অন্যায় কাজে জড়িত। যে দেশের জনগন মিথ্যা কথা বলে তাদের নেতারাও মিথ্যা কথা বলেন।

দুর্নীতির ক্ষেত্রে একই অবস্থা। এর আগে আমি লিখেছি আমাদের জানতে হবে আমি কে! কী আমার পরিচয়? জাতি হিসাবে আমরা কেমন? ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে পরিমাণ ভেদাভেদ রয়েছে বিভিন্ন ভাবে আমার মনে হয় পাশ্চাত্যে তা নেই। যেমন আমাদের দেশে রয়েছে প্রথম শ্রেণী, দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণী, যার কারণে সামান্য একটি কাগজ সত্যায়িত করতে হলে বলা হয় যেমন প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড অফিসারের থেকে সত্যায়িত করতে হবে।

কারণ আমরা মনে করি শুধু তাঁরাই দেশের গুরুত্বপূর্ন এবং বিশ্বস্ত। অথচ বড় বড় ক্রিমিন্যাল বা দূর্নীতিতে তাদের নাম আগে এসে থাকে। সাধারণ লোকের স্বাক্ষর বা সিগনেচারের কোন মূল্য আছে কি বাংলাদেশে?

পাশ্চাত্যে যেমন সুইডেনে যে কোন ব্যাক্তি, হোক না সে প্রধানমন্ত্রী, রাজা বা রাস্তার ক্লিনার। এদের সবার স্বাক্ষরের মূল্য এক। এখানে ব্যক্তি হিসাবে যদি কেউ কিছু বলে বা করে এবং তা সত্যায়িত করতে জাস্ট যে কোন সুইডিস নাগরিক হলেই হয়।

এখানে প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণী বলে কিছু নেই। একজন সাধারণ সুইডিস নাগরিকের স্বাক্ষর সর্বত্র গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। সুইডেনে সরকারের সব ধরনের কর্মচারী জনগনের সেবায় নিয়োজিত।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বলা হয়, এরা পাবলিক সারভেন্ট বা বাংলায় বলে জনগনের চাকর। বাংলাদেশেও ঠিক একই, কিন্তু হয়েছে উল্টা। জনগন হয়েছে সার্ভিস হোল্ডারদের চাকর বা জনগনকে সমাজের নিম্ন মানের নাগরিক হিসাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

বহিঃবিশ্বের কাছে দেখানো হচ্ছে গনতন্ত্র অথচ পুরো দেশ চলছে শাসন এবং শোষণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে। সহজ করে বলতে চাই “জোর যার মুল্লুক তার”। কিন্তু সত্যিকারার্থে আমি বলতে চাই এটা শুধুই মানসিক রোগ যা বয়ে চলেছে সমাজে যুগ যুগ ধরে এবং যা মানবতার অবক্ষয় মাত্র।

আমি এর আগে লিখেছি জাতির মাইন্ডসেট পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু সে বিষয়ে পরিস্কার ব্যাখ্যা দিতে চাই। কী বোঝাতে চেয়েছি বা মাইন্ডসেট পরিবর্তন মানে কী?

সরকারের বেতনভুক্ত সকল কর্মচারীদেরকে প্রথম যে কাজটি করতে হবে তা হলো তাদের চিন্তাধারার পরিবর্তন আনা। তাদের জানতে হবে এবং বুঝতে হবে যে তারা কর্মচারী এবং দেশের ও জনগণের সেবায় তারা কর্মে নিয়োজিত।

দেশের সাধারণ মানুষদেরকে সার্ভিস দেয়াই হচ্ছে তাদের চাকরির মূল উদ্যেশ্য। বিশেষ করে গরিব দেশগুলোর মধ্যে খুবই লক্ষণীয়- জনগনকেই দেশের চাকর হিসাবে ব্যবহার করে সরকারী বা বেসরকারী চাকরীজীবিরা!

বাংলাদেশে এটা খুবই সত্য, তাহলে আমার প্রশ্ন কীভাবে ভাবতে পারি গণপ্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ? কেমন হতো যদি হঠাত রুগি ডাক্তারকে বলে কী করতে হবে? বা ডাক্তার যদি না জানে যে রুগির রোগ চিকিৎসা করাই তার কাজ। তাহলে কী হবে সে ডাক্তার দিয়ে!

দেশের সর্বস্তরের সকল কর্মচারীদের একই ভাবে জানতে হবে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য কী? এবং কেন তাদের বেতন দেওয়া হয়? জাতির পিতা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতেন মাঝে মধ্যে। এই জন্যই কি তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল পৃথিবী থেকে?

বা সেই ভয়েই কি কেউ আর এ বিষয়ে আলচনা করে না? জনগনের ভোটে বা জনগনের অর্থে যারা কর্মরত কর্মচারি তাদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য হওয়া উচিত জনগনের সেবা করা। অথচ তারাই উল্টো জনগনকে ব্যবহার করছে।

বলতে হয় বাড়ির কাজের লোক বাড়ির মালিককে বাড়ির চাকর বানিয়েছে বা চাকরের জায়গাতে মালিককে রেখেছে! আমি যেহেতু সুইডেনে আছি স্বাভাবিকভাবেই পার্থক্যটি স্পস্ট দেখতে পারছি।

তাই বলতে চাই সুইডেনের মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের পার্থক্য এটাই যে সুইডেনের জনগন গণতন্ত্রের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে যা বাংলাদেশে হচ্ছে না। তাই অন্যায়, দুর্নীতি, অবিচার, অত্যাচার, খুন সব কিছু বাসা বেঁধেছে পুরোদেশে।

মন্ত্রী, সচিব, পুলিশ এরা জনগনের সবচেয়ে বেশি বিশ্বস্ত ও আশ্বস্ত ব্যক্তিত্ব। এখানে তাইতো তাদেরকে দেখলে জনগন স্বস্তি পায়, নিরাপত্তা পায়। বাংলাদেশে পুরোটাই উল্টো, তাদের দেখলে জনগন পালাতে থাকে বা ঘৃনায় এবং ভয়ে দূরে সরে যায়।

কিন্তু কেন? এটা কি সত্যিকারে ভাবার বিষয় নয়? আমার জীবনের ব্যক্তিগত দুটো ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে শেষ করবো। গত ডিসেম্বরে আমরা টেনিস ট্যুরে ফ্লোরিডাতে গিয়েছিলাম। প্রতিবেশি হঠাত ফোন করে জানালো চোরে আমার বাসার দরজা ভেঙ্গে ঢুকতে চেষ্টা করতে প্রতিবেশির নজরে পড়ায় ব্যর্থ হয়েছে।

তবে নতুন করে চেষ্টা যদি করে তাহলে ভিতরে ঢুকতে সহজ হবে। আমি ফোন করি পুলিশের নম্বরে। তারা আমাকে বললো তুমি তোমার ছুটি কাটাও। তোমার ফিরে আসা পর্যন্ত আমরা তোমার বাসা আমাদের নজরে রাখবো।

আমি যদিও একটু অস্থিরতার মধ্যে ছিলাম। মারিয়া দিব্যি বিষয়টিকে সহজভাবে নিল এবং আমাকে বললো, পুলিশ দেখাশুনো করবে চিন্তার কোন কারণ নেই। বাড়িতে এসে দেখি পুলিশ সত্যিই তাদের হেফাজতে রেখেছে বাড়িটি।

কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধুকে সুইডেনে ঢুকতে ভিসা না দেওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করতে জানা গেলো কিছু নিয়মের অনিশ্চয়তার কারণে তাকে ভিসা দেওয়া হয়নি। আমি সুইডিস নাগরিক হিসাবে এমনটি মেনে নিতে পারিনি।

বিধায় কর্তৃপক্ষকে পুরো সিস্টেম তদন্ত করতে বলি। কর্তৃপক্ষ কেসটি হাইকোর্ট পর্যন্ত নিয়েছে শুধুমাত্র আমাকে নিশ্চয়তা দিতে যে আইনের বা কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত হয়নি এবং সেটাই তারা প্রমাণ করে আমার অধিকারের ওপর গনতন্ত্রের সেরা প্রাকটিস দেখাতে বাধ্য হয়েছে।

বাংলাকে সোনার বাংলা করতে হলে জাতির মাইন্ডসেট পরিবর্তন আনতে হবে সেই সঙ্গে গণতন্ত্র ও শাসনতন্ত্রের ওপর সেরা প্রাকটিস শুরু করতে হবে।

আমি দেশের সবাইকে অনুরোধ করছি, আসুন সাফারিং এন্ড অফারিং বা ত্যাগ ও কুরবানির মধ্য দিয়ে এমন একটি প্রতিজ্ঞায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই যে আমরা অর্থে গরীব হই, স্বার্থে, চরিত্রে বা মানবতার গরীব যেন না হই। সোনার বাংলা গড়তে এ কাজ করা কঠিন নয়; শুধু নিজেকে পরিবর্তন করলেই হবে।

রহমান মৃধা, স্টকহোম, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter