মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন আনোয়ার ইব্রাহিম

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২২:০৩ | অনলাইন সংস্করণ

  আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া থেকে

মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন দেশটির ক্ষমতাসীন জোটের নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম। পার্লামেন্টে বসার সুযোগ করে দেয়ার জন্য নিজ দলের একজন এমপি পদত্যাগ করার পর দলের পক্ষ থেকে তার মনোনয়ন ঘোষণা করা হয়।

নিজ দল জয়লাভ ও কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর আনোয়ার ইব্রাহিম গণমাধ্যমকে বলেছিলেন- কয়েক মাস তিনি রাজনীতির বাইরে থাকবেন। কিন্তু নিজ দলের নীতিনির্ধারকদের চাপে শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে সক্রিয় হচ্ছেন আনোয়ার ইব্রাহিম।

অতি সম্প্রতি মালয়েশিয়ার পাহাং রাজ্যের পোহ তং একটি চীনা মন্দির কর্তৃক আয়োজিত হাঙ্গেরি ঘোস্ট ফেস্টিভালে বক্তব্য তিনি বলেছিলেন ‘আমিই আনোয়ার ইব্রাহিম এবং আমি এখনো দৃঢ়চেতা। আমি এখনো সংগ্রাম করতে পারি। ৬১ বছরের পুরনো একটি সরকারকে পরিবর্তন করা এতটা সহজ কাজ নয় কিন্তু আমি এই সংগ্রামে আপনাদের সঙ্গে থাকব।’

পাহাং-এর বালাকাং  সাংসদ এডি নং তিয়েন চি চলতি বছরের ২০ জুলাইতে মৃত্যুবরণ করায় সেখানকার সংসদীয় আসনটি খালি হয়ে পড়ে।

রাজ্যটির উপনির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য উং সো কি কে মালয়েশিয়া চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রার্থী তান চি তেওং এর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। আনোয়ার ইব্রাহিম শনিবার রাজ্যটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে পাকাতান হারপানের প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য ভোটারদের প্রতি ও আহ্বান জানান।

এদিকে চলতি বছরের ৯ মে অনুষ্ঠেয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে মালয়েশিয়ার সাবেক ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বে আনোয়ার ইব্রাহিমের দল জয়লাভ করে।

নির্বাচনে জোট গঠনের প্রধান শর্ত ছিল, বিজয়ী হলে মাহাথির আনোয়ার ইব্রাহিমকে কারাগার থেকে মুক্ত করবেন আর দুই বছর পর তাকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে নিজে অবসর নেবেন। ওই প্রতিশ্রুতির আইনগত বৈধতা দেয়ার জন্য আনোয়ার ইব্রাহিমের পার্লামেন্টের সদস্য পদ দরকার। তাই তাকে উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ করে নিজ দলের একজন এমপি পদত্যাগ করেন।

আনোয়ার মালয়েশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নেগরি সেমবিলান রাজ্যের পোর্ট ডিকসন আসন থেকে নির্বাচন করবেন। তার দল পিপলস জাস্টিস পার্টি-পিকেআর এখন সরকারি জোট পাকাতান হারাপানের নেতৃত্ব দিচ্ছে ও তাকে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার জন্য সব বন্দোবস্ত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।

’৯০ এর দশকে মাহাথির মোহাম্মদের শেষ আমলে সমকামিতা ও দুর্নীতির অভিযোগে আনোয়ারকে কারাগারে পাঠানো হয়। তারপর থেকেই তিনি মালয়েশিয়ার সংস্কারপন্থী রাজনীতি শুরু করেন। আনোয়ার ওই সময় মাহাথিরের প্রধান সহকারী ছিলেন। তবে ১৯৯৭-১৯৯৯ সাল পর্যন্ত চলা অর্থনৈতিক সংকটের সময় দুই নেতার সম্পর্কে ফাটল ধরে।

২০০৪ সালে কারামুক্ত হলেও ২০১৫ সালে সমকামীর অভিযোগে তাকে আবারো কারাগারে পাঠানো হয়। দুই সময়ই তিনি ও তার সমর্থকরা এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।

মে মাসের নির্বাচনে জয়লাভের পর মাহাথির মোহাম্মদ আনোয়ারের রাজকীয় ক্ষমা মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে তার হাতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব হস্তান্তর করার প্রতিশ্রুতিও দেন। এর মাধ্যমে এক সময় বন্ধু থেকে শত্রুতে পরিণত হওয়া দুই নেতা আবারো বন্ধুত্ব গড়েন।

আনোয়ার ইব্রাহিম ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন বা ইউএমএনও এর সদস্য থাকাকালীন সময়ে ১৯৯৩-১৯৯৮ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী এবং ১৯৯১-১৯৯৮ সাল পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রীর দায়িত্বপালন করেন। কিন্তু পরে তিনি প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ কর্তৃক বরখাস্ত হন এবং দুর্নীতি ও সমকামিতার দায়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

আনোয়ার ইব্রাহীম ১৯৪৭ সালে মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় পেনাং রাজ্যের চিরোক তক্কুন গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইব্রাহিম আব্দুল রহমান একজন হাসপাতালের কর্মচারী ছিলেন এবং পরবর্তীকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় সচিবের দায়িত্বপালন করেন। তার মা চে ইয়েন হুসেন একজন গৃহিণী ছিলেন।

আনোয়ার ইব্রাহিম তার শিক্ষাজীবন তার নিজ গ্রামে শুরু করেন। তিনি মালয় কলেজ কুয়ালা কানজার থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। ইউনিভার্সিটি অব মালয় থেকে মালয় স্টাডিজ এ অনার্স এবং ১৯৭৪-৭৫ সালে জেলে থাকা অবস্থায় মাস্টার্স সমাপ্ত করেন।
আনোয়ার ইব্রাহিম তার ছাত্রজীবনে ১৯৬৮-১৯৭১ সাল পর্যন্ত ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মালয়েশিয়ান মুসলিম স্টুডেন্টসের সভাপতি ছিলেন। একই সময়ে তিনি ইউনিভার্সিটি অব মালয়া মালয় ল্যাংগুয়েজ সোসাইটির সভাপতি ছিলেন।

১৯৭১ সালে মুসলিম ইয়ুথ মুভমেন্ট অব মালয়েশিয়া সংগঠিত হলে এর সহযোগী প্রতিষ্ঠাতা ও প্রো-কমিটির সদস্য ছিলেন এবং একই বছর তিনি মালয়েশিয়ান ইয়ুথ কাউন্সিলের দ্বিতীয় সভাপতি নির্বাচিত হন।

আনোয়ার ইব্রাহিম একজন ইসলামপন্থী নেতা (যিনি মুসলিম ইয়ুথ মুভমেন্ট অব মালয়েশিয়ার সহযোগী প্রতিষ্ঠাতা ও দ্বিতীয় সভাপতি) হওয়ার পরেও ১৯৮২ সালে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের উদারপন্থী দল ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অরগনাইজেশন এ যোগ দেন এবং সংস্কৃতিমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। ১৯৮৩ সালে যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী, ১৯৮৪ সালে কৃষিমন্ত্রী এবং ১৯৮৬ সালে শিক্ষামন্ত্রী হন। শিক্ষামন্ত্রীর পদ তার মালয়েশিয়ার ভবিষ্যৎ উপপ্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বার খুলে দেয়।