ওয়েলসে একরাত দুই রমণীর সঙ্গে

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:২৬ | অনলাইন সংস্করণ

ওয়েলসে একরাত দুই রমণীর সঙ্গে
ছবিতে লেখক, মাইকেল, জেনিফার, জন, ইছাবেলা ও ক্যারাভানের সামনে কেভিন

জুলাই, ১৯৮৮ সাল। বাংলাদেশের পাসপোর্টে সুইডেনের স্টুডেন্ট ভিসা আমার তখনও, তাই সুইডেনের বাইরে যেতে ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করতে হয় যেখানেই যাই না কেন। মাইকেল আমার এক ইংরেজ বন্ধু সেও সুইডেনে গেস্টস্টুডেন্ট হিসেবে কম্পিউটার টেকনোলজির ওপর পড়তে এসেছে।

তার গ্রামের বাড়ি রাইগেট লন্ডনের অদূরে। তার বৃদ্ধ মা সেখানেই থাকেন।মাইকেল ধরেছে ছুটিতে তার সঙ্গে তার দেশে যেতে হবে। ভাবলাম ঠিক আছে বেশ মজাই হবে ইংল্যান্ড ঘুরে দেখা যাবে দুই বন্ধু মিলে।

রওনা দিলাম স্টকহোম থেকে এবং ঘণ্টা দুই পরে হিথ্রো বিমানবন্দর পৌঁছতেই ইমিগ্রেশনে হাজারও প্রশ্ন শুরু হলো। বন্ধু চলে গেল চেকিং ছাড়াই এবং বলে গেল আমি বাইরে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য।

এক প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করছে কেন বেড়াতে এসেছি। যদিও বলেছি আমার বন্ধু মাইকেলের সঙ্গে ঘুরব, তোমাদের দেশ দেখব এই আরকি।নাছোড়বান্দা আমাকে জেরা করেই যাচ্ছে। একপর্যায়ে বলে দিলাম দেখো ২০০ বছর থেকেছে তোমার পূর্বপুরুষরা আমাদের দেশে বিনা দাওয়াতে, আর আজ বন্ধু দাওয়াত করেছে তাই এসেছি, শুনেছি রানীর কি এক মুকুট যা নাকি আমাদের দেশ থেকে আনা তাও নিশ্চিত দেখতে পাব এবারের এই ভ্রমণে, বলে একটু হাসতেই পুলিশ বেশ রেগে গেল।

খাইছে আমারে এখন কী করি! এদিকে এক ঘণ্টা পার হয়েছে মাইকেল একটু চিন্তিত (পরে জেনেছিলাম) সে অন্য পুলিশকে রিপোর্ট করায় দেখি নতুন আরও দুজন পুলিশ এসে হাজির। ভাবছি জেলহাজত হবে না তো? কিছুক্ষণ তিন পুলিশের মধ্যে আলোচনার পর বেকসুর খালাস। ঢুকে গেলাম লন্ডনে।

আমাদেরকে রিসিভ করতে এসেছে মাইকেলের বেস্ট ফ্রেন্ড, সে একজন পেশাদার পাইলট, নাম জন। জন তার বাবার ছোট্ট একটি হেলিকপ্টার নিয়ে বাইরে দেরি করছে। আমরা জনের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় পর্ব শেষ করে উঠে গেলাম তার হেলিকপ্টরে। জন দিব্বি পুরো লন্ডন সিটি ট্যুর দিয়ে মোটামুটিভাবে ঘুরিয়ে আমাদের তাদের বাগানবাড়িতে নিয়ে এল।

আবহাওয়া খুব সুন্দর থাকায় ভ্রমণটা চমৎকার হয়েছিল।বাগানবাড়িতে ল্যান্ড করতেই বিশাল সেলিব্রেসন হলো ইংলিশ রীতিতে। নিজেকে বেশ সম্মানিত মনে হচ্ছিল।মাইকেল এসব কিছুই বলেনি এর আগে, শুধু বলেছে মা একা থাকেন দেশে তবে তোমার ভালো লাগবে ওখানে গেলে। পরে মনে হলো একটু সারপ্রাইজ দিতে এসব কর্মকাণ্ড।

মাইকেলের বন্ধু ও জন ওরা সম্পর্কে মামাতো ভাই, মাইকেলের মামা সাইমন, একজন নামকরা জমিদার। তার সেই বিশাল জমিদারি দেখতে দেখতে ডিনারের সময় শুরু হয়ে গেল। খাবার টেবিলে অনেক আলোচনার সঙ্গে বিমানবন্দরের হ্যারাসমেন্টের বিষয়টি চলে আসে, সবাই সেই অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য লজ্জিত হয়েছিল সেদিন।

তবে বাকি দুই সপ্তাহ ইংল্যান্ড ঘুরে দেখা, সঙ্গে তাদের আতিথেয়তা, মাইকেলের মার সঙ্গে কয়েক দিন সময় কাটনো, সব মিলে জীবনের এক নতুন অভিজ্ঞতা যা আজও ভুলিনি।পুরো দুই সপ্তাহর বর্ণনা নয় একটি বিশেষ ভ্রমণ যা ছিল ভিন্ন ধরনের তাই দিয়ে শেষ করব, তা হলো ক্যারাভানে করে ওয়েলসে যাওয়া।

মাইকেল বা জন কেউ যাবে না শুধু আমি যাব। সঙ্গে যাবে দুই সুন্দরী মেয়ে ইছাবেলা ও জেনিফার এবং আরেক ছেলে নাম কেভিন মোট আমরা চারজন, ওয়েলসে সাইমনের এক বন্ধু সেও বিশাল বড় লোক। তার এক বাগানবাড়িতে রাত কাটাতে হবে সবাই মিলে এই ক্যারাভানে করে।

আমাদের খাওয়া শোয়া সব হবে এই ক্যারাভানে তাও দুই সুন্দরী রমণীর সঙ্গে! শুনে তখন লাগছিল মন্দ না! স্লিপিং ব্যাগ কিনলাম তার ভেতর ঢুকে পড়তে হবে ঘুম এলে, এমনটি প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

পথে কয়েক জায়গাতে থামা নতুন নতুন শহর, গ্রাম,ন্যাচারাল দৃশ্য এবং নতুন বন্ধুদের সঙ্গে পথে পরিচয় সব মিলে সন্ধ্যা শেষে রাতের আঁধার ঘনিয়ে এল। ক্যারাভান চলতে শুরু করল এক পাহাড়ি এলাকাতে এবং রাস্তার দুই ধারে বিশাল জঙ্গলে ভরা, তারপর অন্ধকারে বিদ্যুৎ ছাড়া চলছে ক্যারাভান, রাত কাটাতে হবে জঙ্গলের এই পাহাড়ের ওপর।

এদিকে সারা দিন জার্নির পরে খুবই ক্লান্ত, কখন কীভাবে ঘুমিয়ে পড়েছি কিছুই মনে নেই।ও-মা হঠাৎ ভোররাতে ঘুম ভাঙতেই শুনি হাজারো ভেড়ার ডাক! যেদিকে চোখ যায় শুধু ভেড়া আর ভেড়া, ভয়ে নড়াচড়া বন্ধ।

এলাম দুই সুন্দরী রমণীর সঙ্গে অথচ আমার ডাইনে ভেড়া বামে ভেড়া, শুয়ে আছে চারপাশে শুধু ভেড়া আর ভেড়া।আমি ভয়ে অবশ, কথা তো নেই মুখে চোখও বন্ধ। ভূতের গল্প শুনেছি, চোখে দেখিনি, এদিকে জিন-পরীদের কথাও শুনেছি কিন্তু চোখে দেখিনি। মনে মনে দোয়া দরুদ পড়েছি সঙ্গে ভাবছি মেয়ে দুটি কি তাহলে জিন-পরী ছিল? বন্ধুরাও বা সঙ্গে এল না কেন? আমি নেই, আমি মরে বেঁচে আছি। বয়স কত হবে আমার, ২২! জীবনে যে পরিমাণ আল্লাহকে ডেকেছিলাম সেই সময়টুকুতে মনে হয় না তার সমপরিমাণ আজ অবধি ডেকেছি।

সে মুহূর্তটুকু মনে হয়েছিল একযুগ। সকাল হয়েছে, পরে দেখি ক্যারাভানের পাশে দিব্বি সবাই গভীর নিদ্রায়। ওদের কাছে এটা নতুন বা অজানা কিছু ছিল না। তবে আমাকে বলতে নিষেধ ছিল বিধায় তারা কিছুই বলেনি। অনেক কিছু ছিল এক্সপেরিয়েন্স সেই জার্নিতে এবং তার সব লিখতে গেলে ‘কলামের পরিবর্তে হয়ে যাবে বই লেখা’ তাই শেষ করতে হবে। ফিরে এসে খুব রেগেছিলাম প্রথমে মাইকেলের প্রতি।পরে সে বলেছিল বন্ধু জীবনে কত কিছু ঘটবে আমাদের মধ্যে। হয়তো কেউ কারো সঙ্গে পরে আর দেখা বা যোগাযোগও হবে না।

তাই তোর আর আমার মাঝে একটি দাগ দিয়ে দিলাম। কিছু না হলেও মনে থাকবে ক্যারাভানে করে ওয়েলেস যাওয়া এবং সেই রাতের কথা! স্মৃতির পাতা থেকে কিছু কথা, কিছু ছবি সঙ্গে বন্ধু মাইকেল, তোমাকে ভুলিনি, ভুলিনি ইংল্যান্ডকেও। তাই তো কতবার আসা-যাওয়া সেখানে এখনো।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter