•       রোহিঙ্গা শরণার্থী সব ক্যাম্পে টেলিটকের বুথ থাকবে, সেখান থেকে নাম মাত্র মূল্যে তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন: টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম
কবির হোসেন    |    
প্রকাশ : ১৪ জুন, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগের শেষ নেই
ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে আড়াই লাখ মামলা
সারা দেশের ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাগুলোতে মামলার জট দিন দিন শুধু বাড়ছেই। ট্রাইব্যুনালগুলোতে গত বছর দু’লাখের কাছাকাছি মামলা থাকলেও বর্তমানে তা আড়াই লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বছরের পর বছর ঘুরেও বিচার প্রার্থীরা মামলার রায় না পেয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এছাড়া আইনে ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হলেও দীর্ঘদিনেও তা গঠন করা হয়নি। ফলে আপিল ট্রাইব্যুনাল না থাকায় বিচারপ্রার্থীরা ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের কোনো রায়ে সংক্ষুব্ধ হলে আপিল করতে পারছেন না। আপিলের পরিবর্তে হাইকোর্টে রিট আবেদনের মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে হচ্ছে হাজার হাজার ভুক্তভোগীকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএসআর (বাংলাদেশ সার্ভে-রিভাইজড) জরিপ শুরু হয়েছে ১৯৮৪ সাল থেকে। সারা দেশে এই জরিপ এখনও শেষ হয়নি। যেসব এলাকায় শেষ হয়েছে, সেসব এলাকায় দেখা দিয়েছে নানা ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি। মাঠ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, চরম দায়িত্ব অবহেলা ও অসতর্কতায় ভুলে ভরা ভূমি জরিপের খেসারত গুনতে হচ্ছে জমির মালিকদের। জরিপের পর্চা আর ম্যাপে হাজার হাজার ভুল। কারও জমি পর্চায় আছে তো ম্যাপে নেই। ম্যাপে আছে তো পর্চা নেই। জমির মালিকের নামের ভুল, নামের বানানে ভুল, জমির পরিমাণে ভুল ও গরমিলসহ অসংখ্য ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শত বছর ধরে চৌহদ্দিতে মালিক সম্পত্তি ভোগদখল করে এলেও জরিপে দেখানো হয়েছে অন্যের নাম।
এসব বিষয় লক্ষ্য করে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশের জন্য মাত্র ১২টি ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। কিন্তু চার-পাঁচটি জেলার সমন্বয়ে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করায় দেখা দেয় মহাবিড়াম্বনা। একশ’-দেড়শ’ মাইল দূর থেকে ওইসব ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের বিচারপ্রার্থীদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দেখা দেয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার একই বছরের ২৯ নভেম্বর আরেকটি গেজেটের মাধ্যমে সারা দেশের জন্য ৪২টি ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করেন। এছাড়া ঢাকার জন্য একটি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। এসব ট্রাইব্যুনালের বিচার কাজ পরিচালনা করবেন যুগ্ম জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারক। সম্প্রতি ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও মামলার জট কমছে না।
৩১ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুযায়ী সারা দেশের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালগুলোর মধ্যে কিশোরগঞ্জের ট্রাইব্যুনালে সবচেয়ে বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এই ট্রাইব্যুনালে ৪৪ হাজার ১৫২টি মামলা বিচারাধীন। ময়মনসিংহের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে ৩২ হাজার ৬৭৬টি, জামালপুরের ট্রাইব্যুনালে ১৭ হাজার ৯৫১টি, ঢাকার ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে ৭,৪৩৮টি, সাতক্ষীরায় ৬ হাজার ৯৮৩টি, চাঁদপুরে ৯ হাজার ১২৬টি, নেত্রোকোনায় ২১ হাজার ৮৬৩টি, টাঙ্গাইলে ১০ হাজার ৮০৯টি, শেরপুরের ট্রাইব্যুনালে ৬ হাজার ৪৬৭টি, বরগুনায় ৬ হাজার ২২২টি মামলা বিচারাধীন। এভাবে সারা দেশের ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালগুলোতে হাজার হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
জানা গেছে, ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলার চাপ দেখে ভূমি মন্ত্রণালয় গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর এক পরিপত্র জারি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিভিন্ন জেলায় জরিপের চূড়ান্ত রেকর্ড তথা খতিয়ান প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক হারে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলা হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয় অবহিত হয়েছে, যার সংখ্যা উদ্বেগজনক। তৎপ্রেক্ষিতে চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ড সংশোধনের বিষয়ে তিন ধরনের কর্তৃপক্ষ তিন ধরনের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে আইনত ক্ষমতাবান। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তা বা সহকারি কমিশনার (ভূমি) স্টেট অ্যাকুইজেশন অ্যান্ড টেনান্সি অ্যাক্ট ১৯৫০-এর ১৪৩ ধারামতে এবং প্রজাস্বত্ব বিধিমালা ১৯৫৫-এর বিধি ২৩(৩) অনুযায়ী চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ডের করণিক ভুল (ক্ল্যারিক্যাল মিসটেকস) যেমন- নামের ভুল, অংশ বসানোর হিসাবে ভুল, দাগসূচিতে ভুল, ম্যাপের সঙ্গে রেকর্ডের ভুল ইত্যাদি নিজেই সংশোধন করতে পারেন।
উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, রাজধানীর রামপুরার তাহমিনা ভুঁইয়া ও তার ছোট বোন ২০০৪ সালের ২৯ নভেম্বর বাড্ডা মৌজা থেকে জনৈক জিয়া উদ্দিন ও নজরুল ইসলামের কাছ থেকে জমি ক্রয় করেন। দু’জন দাতার কাছ থেকে তারা যথাক্রমে ০২৪৪ অযুতাংশ করে মোট ০৪৮৮ অযুতাংশ জমি ক্রয়ের পর নামজারি ও খাজনা পরিশোধ করতে গিয়ে দেখেন দুটি ভুল। দাতা নজরুল ইসলামের নাম লেখা হয়েছে নুরুল ইসলাম এবং জমির পরিমাণ ০২৪৪ অযুতাংশের পরিবর্তে লেখা হয়েছে ২.০৪ শতাংশ। এই ভুল সংশোধনের জন্য তারা তেজগাঁও অঞ্চলের সহকারী কমিশনার-ভূমির (এসি ল্যান্ড) অফিসে একাধিকবার গিয়ে অনুরোধ করলেও তিনি মামলা করার পরামর্শ দেন। এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র জারির কথা বললেও এসি ল্যান্ড তাহমিনা ভুঁইয়ার সঙ্গে এক প্রকার দুর্ব্যবহার করেন। সমস্যাটি নিয়ে তাহমিনা ভুঁইয়ার মতো শত শত ভুক্তভোগী এখন বিভিন্ন অফিসে ঘোরাঘুরি করে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এ ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য সুপ্রিমকোর্টের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেয়া হয়। ভূমি সচিব, আইন সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে বৈঠকও করা হয়েছে। কিন্তু আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এই আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের ব্যাপারে জানতে চাইলে ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা অনেকগুলো কাজ হাতে নিয়ে এগোচ্ছি। একটি করে শেষ করছি। ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়ে এখনও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তবে খুব শিগগিরই এই আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের পদক্ষেপ নেয়া হবে।’ ফলে ট্রাইব্যুনালের রায় পাওয়ার পর ওই রায়ে সংক্ষুব্ধ হলেও সরাসরি প্রতিকার চাওয়ার কোনো উপায় নেই বিচারপ্রার্থীদের। আপিল ট্রাইব্যুনাল না থাকায় বিচারপ্রার্থীরা ট্রাইব্যুনালের রায়ে সংক্ষুব্ধ হলেও আপিল দায়েরের সুযোগ পাচ্ছেন না। তখন ট্রাইব্যুনালের আদেশ বা রায়কে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়েরের মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে হচ্ছে।
এ ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম যুগান্তরকে বলেন, বিধিবদ্ধ আইনে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এই আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হওয়ায় অগণিত বিচারপ্রার্থী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অপরদিকে হাইকোর্টে এ বিষয়ে মামলার জট বেড়েই চলেছে। বিষয়টিতে সরকারি উদ্যোগের অভাব দৃশ্যমান যা কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত নয়।
এদিকে আইনে থাকা সত্ত্বেও আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন না করায় ২০১৫ সালের ৩ মার্চ ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল কেন করা হয়নি তা স্বতঃপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) হয়ে জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। আইন সচিব ও ভূমি সচিবকে এ বিষয়ে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিকালে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন। কিন্তু ওই রুলের জবাব এখনও দেয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by