চট্টগ্রাম ব্যুরো    |    
প্রকাশ : ১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০:০০ | অাপডেট: ১৬ মার্চ, ২০১৭ ০৫:৪৬:১৩ প্রিন্ট
সীতাকুণ্ডে তিন পরিবার জিম্মি
জঙ্গি-পুলিশ গোলাগুলি
অভিযানে পুলিশ র‌্যাব ও সোয়াত টিম * জঙ্গিদের ছোড়া গ্রেনেডে ওসি আহত * আরেক আস্তানা থেকে শিশুসহ জঙ্গি দম্পতি আটক : গ্রেনেড উদ্ধার
সীতাকুণ্ডের চৌধুরীপাড়ার প্রেমতলা এলাকার ‘ছায়ানীড়’ নামে জঙ্গি আস্তানা বুধবার ঘিরে রাখে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী -যুগান্তর

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি বাড়িতে তিন পরিবারকে জিম্মি করে রেখেছে জঙ্গিরা। বুধবার বিকাল থেকে রাত দেড়টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই বাড়িতে জিম্মি ছিলেন তারা। সেখানে পুলিশ, র‌্যাব ও সোয়াত টিমের সঙ্গে জঙ্গিদের কয়েক দফা গোলাগুলি হয়। এতে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করে। এর আগে দুপুরে লামারবাজারে আরেক আস্তানা থেকে ২ মাসের শিশুসহ এক জঙ্গি দম্পতিকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
রাত দেড়টা পর্যন্ত জঙ্গিদের সঙ্গে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর থেমে থেমে গোলাগুলি হয়। রাত পৌনে ১টার দিকে ঢাকা থেকে সোয়াত টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে পৌঁছে। সোয়াত টিম চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির সঙ্গে বৈঠক করে কর্মপন্থা ঠিক করে। সেই সঙ্গে আগে থেকে অভিযানে থাকা সোয়াতসহ অন্যান্য আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গেও কথা হয় ঢাকা থেকে যাওয়া সোয়াত টিমের। সর্বশেষ জানা গেছে, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ধরনের প্রাণহানি না ঘটিয়ে কিভাবে জিম্মি পরিবারগুলোকে উদ্ধার করা যায় এবং জঙ্গিদের আটক করা যায় সেই বিষয়ে কর্মকৌশল ঠিক করছে। কর্মকৌশল ঠিক হওয়া মাত্র তারা পুরোদমে অভিযানে নামবে। সেটি গভীর রাতে বা শেষরাতে কিংবা ভোরের আলোতেও হতে পারে।    

জানা গেছে, বুধবার দুপুরে সীতাকুণ্ড পৌরসভার লামারবাজার পশ্চিম আমিরাবাদে সাধন চন্দ্র ধরের মালিকানাধীন সাধন কুঠিরের নিচ তলায় অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় সেখান থেকে ২ মাসের শিশুসহ এক জঙ্গি দম্পতিকে আটক করে পুলিশ। পরে আটক দম্পতির দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পৌরসভার চৌধুরীপাড়ার প্রেমতলায় ‘ছায়ানীড়’ নামে ওই জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযান চালাতে গেলে জঙ্গিরা তিন পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এ সময় ওই বাসায় থাকা জঙ্গিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে তিনটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে সীতাকুণ্ড থানার ওসি (তদন্ত) মোজাম্মেল হক আহত হন। পরে পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এরপর জঙ্গিরা গুলি ছোড়া শুরু করলে পিছু হটে পুলিশ। তবে বাড়িটির চারপাশ ঘিরে রাখে। জঙ্গিরা ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় তিনটি ফ্ল্যাটে থাকা তিন পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে রাখে। ওই পরিবারের সদস্যরা মুঠোফোনে তাদের স্বজনদের জিম্মিদশার কথা জানান। এদিকে বারবার হ্যান্ডমাইকে জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের জন্য আহ্বান জানায় পুলিশ। কিন্তু পুলিশের কথায় সাড়া দেয়নি জঙ্গিরা। পরে র‌্যাব ও সিএমপির সোয়াত টিমকে খবর দেয়া হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাড়তি পুলিশ, সোয়াত টিম ও র‌্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন। ওই বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ আগে থেকেই আইনশৃংখলা বাহিনী বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
জানা গেছে, জঙ্গি আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত ‘ছায়ানীড়’ নামে দোতলা ওই ভবনের মালিক নাছির উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি। ভবনের দ্বিতীয় তলায় চারটি ফ্ল্যাট। এটি এক সময় হাফেজি মাদ্রাসা হিসেবে ভাড়া দেয়া ছিল। জানুয়ারিতে হাফেজি মাদ্রাসাটি অন্যত্র স্থানান্তর হলে ফেব্রুয়ারিতে জঙ্গিরা একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। বাকি তিনটিতে তিন পরিবার ভাড়া থাকে। নিচতলায় ৪টি ফ্ল্যাটও ভাড়া দেয়া। জঙ্গিদের সঙ্গে আইশৃংখলা বাহিনীর গোলাগুলি শুরু হওয়ার পর থেকে নিচতলার লোকজনও আটকা পড়েন। হামলার শিকার হওয়ার ভয়ে তারা বের হতে পারছেন না। আইনশৃংখলা বাহিনীও মাইকিং করে তাদের বের হতে বারণ করে। অভিযান সফল করতে বিকাল ৫টায় ঢাকা থেকে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজমের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের এডিসি সানোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি টিম সীতাকুণ্ডের উদ্দেশে রওনা করে।
গ্রেনেড ছোড়ে জঙ্গিরা : পুলিশ ‘ছায়ানীড়’ ভবনে অভিযানের প্রস্তুতি নিলে অবস্থানকারী জঙ্গিরা ওই বাড়ির তিনটি ভাড়াটিয়া পরিবারকে জিম্মি করে রাখে। পুলিশ তাদের ওপর আক্রমণ করার চেষ্টা করলে ওই তিন পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। রাত দেড়টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ ওই বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারেনি। এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় পুলিশকে লক্ষ্য করে ওই বাড়ি থেকে জঙ্গিরা আরও একটি গ্রেনেড ছুড়ে মারে। তবে ওই গ্রেনেডটি খালি জায়গায় বিস্ফোরিত হয়। এতে কেউ হতাহত হননি।
থমথমে পরিস্থিতি : রাতে অভিযানের সময় ছায়ানীড় ভবনের আশপাশের পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি ছিল। জঙ্গি আস্তানার ভেতরে আটকেপড়া নারী ও শিশুদের স্বজনরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এছাড়া চারদিকে হাজার হাজার উৎসুক জনতাও ভিড় করেন। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম, জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনাসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
ছায়ানীড় ভবনের বাসিন্দা হরিপদ দেবনাথ নামের এক স্কুল শিক্ষক যুগান্তরকে জানান, ‘ছায়ানীড়’ ভবনে প্রায় সময় অপরিচিত লোকজন আসা-যাওয়া করত। স্থানীয়রা মনে করতেন তারা ওই ভবনের ভাড়াটিয়া। ওই ভবনে গত বছর হাফিজিয়া নুরানিয়া নামের একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে স্থানীয় লোকজন সেটি বন্ধ করে দেন।’  
যেভাবে আটক হল জঙ্গি দম্পতি : পুলিশ জানায়, ৫ মার্চ জঙ্গি দম্পতি জসিম ও আরজিনা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সীতাকুণ্ডের সাধন কুঠিরে বাসা ভাড়া নেয়। বাড়ির মালিক তাদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি চাইলে তারা দেয়। পরিচয়পত্রটি নিয়ে মালিকের সন্দেহ হলে তিনি একটি কম্পিউটার দোকানে গিয়ে সেটি চেক করান। এতে দেখা যায় সেটি ভুয়া। তিনি বুধবার সকালে বিষয়টি সীতাকুণ্ড থানা পুলিশকে অবহিত করেন। এরপর বেলা ৩টার দিকে পুলিশ সাধন কুঠিরে অভিযান চালিয়ে ২ মাসের শিশুসহ জসিম ও তার স্ত্রীকে আটক করে। ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় কয়েকটি হ্যান্ড গ্রেনেড।
জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা যুগান্তরকে বলেন, ‘ছায়ানীড়ের ওই বাড়িতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলা-বারুদ মজুদ আছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি।’   
সুইসাইডের প্রস্তুতি নিয়েছিল আটক নারী জঙ্গি : সীতাকুণ্ড থানার ওসি ইফতেখার হাসান যুগান্তরকে বলেন, সাধন কুঠির থেকে আটক আরজিনা ধরা পড়ার আগে আত্মহত্যার প্রস্তুতি নিয়েছিল। কোমরে হাত বোমা লাগানো সুইসাইড বেল্ট বেঁধে নিয়েছিল ওই নারী জঙ্গি। তবে সে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারেনি। এর আগেই পুলিশ তাকে ধরে ফেলে। সন্ধ্যা ৭টায় শিশুসহ ওই দম্পতিকে আস্তানা থেকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by