শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার ও আহমেদ মুসা, সীতাকুণ্ড থেকে ফিরে    |    
প্রকাশ : ১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০:০০ | অাপডেট: ১৭ মার্চ, ২০১৭ ০২:০০:২৩ প্রিন্ট
সীতাকুণ্ডে জঙ্গি আস্তানায় অপারেশন অ্যাসল্ট ১৬
নারী-শিশুসহ ৫ লাশ উদ্ধার
৪ ঘণ্টা ধরে চলে অভিযান * গুলি ও বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে প্রেমতলা * ১৯ ঘণ্টা পর নারী ও শিশুসহ ২১ জনকে উদ্ধার * জঙ্গিদের ফ্ল্যাটে বোমার ছড়াছড়ি * আস্তানাটি ছিল নব্য জেএমবির বোমা বিস্ফোরকের গুদাম * নিহত শিশু জঙ্গি নারীর সন্তান
সীতাকুণ্ডের চৌধুরীপাড়ার প্রেমতলায় জঙ্গি আস্তানা ‘ছায়ানীড়’ ভবনের ফ্লোর থেকে জিম্মি একটি পরিবারকে উদ্ধার করে আনছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার ভোরে তোলা ছবি -যুগান্তর

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গি আস্তানায় ৪ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ও গুলিতে এক নারীসহ চার জঙ্গি নিহত হয়েছে। পরে ৭ বছরের আরও এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, শিশুটি নিহত নারী জঙ্গির সন্তান। অভিযানের সময় আহত হয়েছেন সোয়াতের দুই সদস্য।

বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা থেকে মূল অভিযান ‘অপারেশন অ্যাসল্ট ১৬’ শুরু হয়। ৩৮ মিনিট ধরে বৃষ্টির মতো গুলি ও একের পর এক শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে সীতাকুণ্ডের প্রেমতলা চৌধুরীপাড়া এলাকা। সকাল ১০টায় অভিযান শেষে জঙ্গি আস্তানার বাড়ি থেকে নারী ও শিশুসহ ২১ জনকে উদ্ধার করা হয়। বুধবার বিকাল ৩টা থেকে প্রায় ১৯ ঘণ্টা তারা বাড়িটিতে আটকে ছিলেন। তখন থেকেই বাড়িটি ঘিরে রেখে অভিযানের প্রস্তুতি নেয় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা থেকে গিয়ে অভিযানে অংশ নেন সোয়াত ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যরা।

গুলি ও আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নিহত চার জঙ্গির দেহ প্রায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এক জঙ্গির মাথার খুলি ও হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে উড়ে যায় পাশের ভবন ও জমিতে। এছাড়া নারী জঙ্গির মৃতদেহের সঙ্গে একটি বোমা সক্রিয় অবস্থায় বাঁধা ছিল।

পুলিশের ধারণা, আস্তানাটিকে জঙ্গিরা তাদের বোমা ও বিস্ফোরকের গুদাম হিসেবেই ব্যবহার করছিল। ওই বাড়ির যে ফ্ল্যাটে তারা থাকত, তার প্রতিটি কক্ষেই ছিল বোমা ও গ্রেনেডের মজুদ। বাড়ির ছাদেও শক্তিশালী বোমা ছিল। অভিযানের পর সেখানে ১০-১২টি শক্তিশালী বোমা সক্রিয় অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে বোমাগুলো একে একে নিষ্ক্রিয় করে পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট।

ঘটনাস্থলে থেকে অভিযানের দিকনির্দেশনা দেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম ও জেলা পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা। অভিযান সমাপ্তের পর ডিআইজি শফিকুল ইসলাম বলেন, আস্তানায় থাকা চার জঙ্গি নিহত হলেও সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটেনি। নারী ও শিশুসহ আটকে পড়া ২১ জনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। মিরসরাইয়ে যে অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে, ওই অঞ্চলকে ঘিরেই নাশকতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নব্য জেএমবি সীতাকুণ্ডে ঘাঁটি গেড়েছে এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরকের মজুদ গড়ে তুলেছে বলেও জানান তিনি।

যেভাবে সন্ধান দুই জঙ্গি আস্তানার : ৫ মার্চ জঙ্গি দম্পতি জসিম ও আরজিনা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সীতাকুণ্ডের আমিরাবাদ গ্রামে সাধন কুঠিরে বাসা ভাড়া নেয়। বাড়ির মালিক তাদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি চাইলে তারা দেয়। কিন্তু পরিচয়পত্রটি নিয়ে মালিকের সন্দেহ হয়। তিনি একটি কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে যাচাই করে দেখেন, সেটি ভুয়া। পরে তাদের কাছে ভাড়া দেয়া রুমে ঢুকে দেখেন, বেশকিছু ইলেকট্রুনিক সার্কিট, তার ও বোমাসদৃশ বস্তু। তিনি বিষয়টি সীতাকুণ্ড থানা পুলিশকে জানান। বুধবার দুপুরে পুলিশ সাধন কুঠিরে অভিযান চালিয়ে দুই মাসের শিশুসহ জসিম ও আরজিনাকে আটক করে। তাদের কাছ থেকেই পুলিশ আমিরাবাদ চৌধুরীপাড়া প্রেমতলার ‘ছায়ানীড়’ ভবনের জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায়।

বুধবার বিকাল ৩টা থেকে পুলিশ-র‌্যাবসহ আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ‘ছায়ানীড়’ বাড়িটি ঘিরে ফেলে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে জঙ্গিরা ভেতর থেকে গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে আস্তানাটি ঘিরে রাখার পাশাপাশি শক্তি সঞ্চয়ের কৌশল গ্রহণ করে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। সেখানে পুলিশ, র‌্যাব, ডিবি, বিজিবি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত হন। তারা ভেতরে অভিযান পরিচালনার চেষ্টা করলেও ভেতর থেকে জঙ্গিদের পাল্টা গুলি এবং বাড়িটিতে ৭টি পরিবার আটকে থাকায় অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। অভিযান সফল করতে ঢাকার সোয়াত টিম ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সহায়তা চায় জেলা পুলিশ। সন্ধ্যা ৬টা থেকে থেমে থেমে পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে জঙ্গিরা। পুলিশও পাল্টা গুলি ছুড়ে জবাব দেয়। এ সময় সীতাকুণ্ড থানার ওসি (তদন্ত) মোজাম্মেল হোসেনসহ দুই পুলিশ সদস্য আহত হন।

রাত ১টায় ঘটনাস্থলে পৌঁছায় সোয়াত : বুধবার রাত ১টার দিকে ঢাকা থেকে পুলিশের জঙ্গিবিরোধী বিশেষ বাহিনী সোয়াত টিম ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। দুটি মাইক্রোবাস ও একটি হায়েসে করে তারা চট্টগ্রামে আসেন। কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এডিসি ছানোয়ার হোসেন ও এডিসি আবদুল মান্নান ছিলেন এই দুটি টিমের নেতৃত্বে। এর আগেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত ডিআইজি শাখাওয়াত হোসেন ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনাসহ জেলার শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তারা। সিএমপির সোয়াত টিমের সদস্যরাও উপস্থিত হন।

বিশেষ বাহিনী সোয়াত ও পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যরা রাত ১টায় এলেও অভিযান চালাতে পারেননি। কেননা তখন পুরো এলাকা ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। ভোর ৬টা ৩ মিনিটের দিকে শুরু হয় চূড়ান্ত অভিযান। ভবনের চারদিকে অবস্থান নিয়ে ইউনিটের সদস্যরা বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে শুরু করেন। জবাবে একের পর এক শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। এ সময় গুলি ও আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নারীসহ চার জঙ্গি নিহত হয়।

অভিযান শেষ হওয়ার বেশ কয়েক ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে জঙ্গি আস্তানা থেকে ৭ বছরের এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার হাবিবুর রহমান সন্ধ্যায় ব্রিফিংয়ে জানান, ভবনের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ির মধ্যে ওই শিশুর লাশ পড়েছিল। একই সিঁড়িতে নারী জঙ্গির লাশ পাওয়া যায়। তাই তাদের ধারণা, শিশুটি আত্মঘাতী ওই নারী জঙ্গির সন্তান। তবে এজন্য লাশের ডিএনএ টেস্ট করা হবে।

ছিন্নভিন্ন এক জঙ্গির দেহ দুই ভবনে : অভিযান শুরুর পর ভোর ৬টা ১৭ মিনিটের দিকে ভয়াবহ সুসাইডাল ভেস্ট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেকে উড়িয়ে দেয় এক জঙ্গি। এ সময় ওই জঙ্গির মাথা গিয়ে পড়ে পাশের একটি ভবনের ছাদে। দেহ থেকে হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ৬০০ ফুট দূরে একটি বিলে। ছাদের ওপর আরেক জঙ্গির ছিন্নভিন্ন দেহ পাওয়া যায়। অভিযান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, নিহত চার জঙ্গির মধ্যে দু’জঙ্গি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছে। দু’জন অভিযানকারী দলের গুলিতে নিহত হয়েছে। দুই তলা ভবনের চার ইউনিট করে আট ইউনিয়নের মধ্যে এক ইউনিটে ছিল জঙ্গিরা। অপর ৭ ইউনিটে ছিল বাড়ির মালিকের পরিবার ও ভাড়াটিয়ারা।

সীতাকুণ্ডের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ : সীতাকুণ্ড থানার এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যেই ‘সাধন কুঠির’ ও ‘ছায়ানীড়’ নামে দুটি জঙ্গি আস্তানা পাওয়ার বিষয়টি স্থানীয়দের অবাক করেছে। জঙ্গি আস্তানার সন্ধান ও অভিযানে একপ্রকার যুদ্ধাবস্থা ও আতংক বিরাজ করায় সীতাকুণ্ড পৌরসভার বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল।

জঙ্গিরা শান্ত এলাকা প্রেমতলাকে বেছে নেয় : সীতাকুণ্ড উপজেলার সবচেয়ে শান্তিপ্রিয় এলাকা প্রেমতলা। এটি হিন্দু অধ্যুষিত। এলাকাটিতে নেই কোনো রাজনৈতিক বিশৃংখলা। অনেকটা নিরিবিলি। প্রেমতলা এলাকার বাসিন্দা হরিপদ দেব নাথ বলেন, শান্তিপ্রিয় একটি এলাকায় এভাবে ভয়ংকর জঙ্গিরা এসে আস্তানা গাড়তে পারে তা তারা ভাবতেও পারেনি।

নিহত জঙ্গিদের মধ্যে বোমা বিশেষজ্ঞ ছিল : নিহত জঙ্গিদের মধ্যে দু’জন বোমা বিশেষজ্ঞ ছিল বলে ধারণা করছেন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এডিসি ছানোয়ার হোসেন। উদ্ধার অভিযান শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তাদের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য ছিল। এ কারণে সোয়াত টিম ভবনে প্রবেশ করতে সময় নেয়। তাছাড়া অভিযানের সময় যেভাবে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয় তাতে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তিনি জানান, ভবনের যে ফ্ল্যাটে জঙ্গিরা থাকত এর বিভিন্ন স্থানে শক্তিশালী বিভিন্ন ধরনের বোমা পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ১২ সেট জেল এক্সপ্লোসিভ ও একটি ছোট বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি ব্যাগে পাইপের টুকরা, সুইচ, ব্লাস্টিংস ক্যাপ এবং একটা কার্টনের ভেতরে লিকুইড এক্সপ্লোসিভ পাওয়া গেছে। বিস্ফোরক বোঝাই তিনটি সুইসাইড ভেস্টসহ ১০টি বোমা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সোয়াত টিম ঢোকার সময় সিঁড়ি দিয়ে ছাদের কাছাকাছি জায়গায় তিন থেকে চার কেজি ওজনের বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। ছাদের বিভিন্ন অংশে পোড়া দাগ দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এসব ‘ব্লাস্টিং ইমপ্যাক্ট’। সুইসাইডাল এক্সপ্লোশনের এত বড় ঘটনা দেশে আগে কখনও তারা দেখেননি। বাসায় যেসব সরঞ্জাম পাওয়া গেছে, তা দিয়ে ৪০ থেকে ৫০টি শক্তিশালী বোমা বানানো সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।

বাড়ির মালিককে জিজ্ঞাসাবাদ : সীতাকুণ্ডের ‘ছায়ানীড়’ ভবনের মালিক রেহানা বেগম ছোট ছেলেকে নিয়ে দোতলার পূর্ব পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন। বড় ছেলে মো. মহিউদ্দিন তার পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর আকবর শাহ এলাকায় থাকেন। বৃহস্পতিবার বিকালে বাড়ির মালিক রেহানা বেগম এবং ছেলে মহিউদ্দিনকে সীতাকুণ্ড থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলিশকে জানান, ভবনের যে ফ্ল্যাটটিতে জঙ্গিরা আস্তানা গেড়েছিল, ওই বাসা মাস খানেক আগে ‘শালা-দুলাভাই’ পরিচয়ে ভাড়া নিয়েছিলেন দুই ব্যক্তি। নিচতলার সিঁড়ির সঙ্গে লাগোয়া একটি ফ্ল্যাট মাসিক ৬ হাজার টাকায় জঙ্গিরা ভাড়া নেয়। তাদের একজনের বয়স ৪০ এবং অন্যজনের বয়স ৩০ বছর হবে। কক্সবাজারের রামুতে তাদের রাবারের ব্যবসা রয়েছে বলে বাড়ির মালিককে জানায় তারা।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by