মিজান মালিক ও তোহুর আহমদ    |    
প্রকাশ : ১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০:০০ | অাপডেট: ১৯ মার্চ, ২০১৭ ০৫:৩১:২৫ প্রিন্ট
সমন্বয়হীন জঙ্গি দমন অভিযান
পরবর্তী টার্গেট কোথায়
রোহিঙ্গাদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা * আত্মঘাতীদের আন্তর্জাতিক লিংক বের করতে হবে * সমন্বিত জঙ্গি দমন সেল দরকার * রাজনৈতিক মতৈক্য জরুরি

একের পর এক আত্মঘাতী জঙ্গি হামলা সর্বত্র আতংক ছড়িয়ে দিচ্ছে। কুমিল্লার পর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, এরপর ঢাকায় ১৬ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি আত্মঘাতীর ঘটনা ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। অথচ পুলিশ বলছে, দেশে জঙ্গি পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও একই কথা বলেছেন। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, নিয়ন্ত্রণে থাকলে এ ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে কিভাবে। আত্মঘাতী স্কোয়াডের পরবর্তী টার্গেট কি? তারা কখন কোথায় হামলা করবে, কে বা কারা এর শিকার হবেন। নিয়ন্ত্রিত জঙ্গিরা এতটা ভয়ংকর হয়ে উঠছে কিভাবে। এরা কোথায় প্রশিক্ষণ নেয়, কোথায় পরিকল্পনা করে, বিদেশী জঙ্গিদের সঙ্গে এদের যোগসাজশ আছে কিনা। জঙ্গিদের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারের কাছে আগাম রিপোর্ট দিচ্ছে কিনা তা নিয়েও বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশ্ন উঠছে। ভার্চুয়াল জগৎ নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে জোর আলোচনা হচ্ছে। আত্মঘাতী জঙ্গি প্রতিরোধে সরকার নতুন করে কি ভাবছে এসব বিষয় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

এদিকে আত্মঘাতী জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক নেতারাও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এ ধরনের হামলা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তরায় হিসেবে কাজ করবে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যেহেতু দেড় বছর পর দেশে জাতীয় নির্বাচন। তাই এই নির্বাচনের জন্য এ ধরনের হামলা অবশ্যই অন্তরায়। এর প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার যুগান্তরকে বলেছেন, গুলশান হামলার পর বেশ কয়েকটি অভিযান শেষে সরকার বলে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে আছে। আবার এখন বলছে জঙ্গিবাদ আগামী নির্বাচনে অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারে। এটা সরকারের স্ববিরোধী বক্তব্য। তিনি মনে করেন, দোষারোপের রাজনীতি বন্ধ করে জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্য করতে হবে।

জঙ্গি ইস্যু নিয়ে কাজ করেন, এমন এক কর্মকর্তা ও এক নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, দেশে জঙ্গি নির্মূলে সমন্বিতভাবে কাজ হচ্ছে না। এক সংস্থার কাজ আরেক সংস্থা জানে না। আবার একই কাজ দু’জনে করছে। এতে করে জঙ্গি দমনের বিষয়টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা বলেন, ঘটনার পর কারাগার, বিমান, নৌ ও স্থলবন্দরে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, এটা একটা ভালো উদ্যোগ। সেই সঙ্গে জঙ্গি দমনে সবগুলো সংস্থার সমন্বয়ে একটা সেল গঠন করাও জরুরি।

দেশের আইএস বা বিদেশী কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই পুলিশের পক্ষ থেকে এমন দাবি করা হলেও শুক্রবার দুপুরে র‌্যাবের প্রস্তাবিত সদর দফতরে আত্মঘাতী হামলার পরপরই আইএস এর দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে। এর আগেও আইএস এ ধরনের বিবৃতি দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো ঘটনার পরই কথিত আইএসের দায় স্বীকারের বিষয়টি উড়িয়ে না দিয়ে জঙ্গিদের আন্তর্জাতিক লিংক বের করা দরকার। জঙ্গিদের ভার্সুয়াল জগতের দিকে নজর দেয়া দরকার। দেশের এমন পরিস্থিতিতে নিজের মনমতো সহজ রাজনৈতিক সমীকরণ বা বিদেশী ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব না দেয়ার অনুরোধ জানান তারা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সংশ্লিষ্টরা সবাইকে দেশের স্বার্থে কাজ করার আহবান জানান।

জঙ্গি হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য এরা ধীরে ধীরে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় জড়ো হচ্ছে। এমনকি তারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরও দলে ভিড়িয়ে হামলায় ব্যবহারের চেষ্টা করছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। সংগঠনের মতাদর্শ অনুযায়ী বড় ভাই বা মুরব্বিদের দ্বারা রোহিঙ্গা রিক্রুট হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সাম্প্রতিক কোনো হামলায় বিদেশী জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

চলমান জঙ্গি হামলা প্রসঙ্গে টেলিফোনে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি এ মুহূর্তে ইস্তাম্বুলে আছি। এখানে ট্রানজিট পার হচ্ছি। তাই কথা বলতে পারছি না।’

ঢাকা মহনগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া শনিবার যুগান্তরকে বলেন, জঙ্গি পরিস্থিতি আমাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত বছরের ১ জুলাই হলি আর্টিজানে হামলার পর থেকে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত আছে। একের পর এক তথ্য নির্ভর অভিযানের কারণে জঙ্গিরা এখন কোণঠাসা। তাদের নেটওর্য়াক দুর্বল হয়ে পড়েছে। এরপর এখনও যারা সক্রিয় তাদের আস্তানায় আমরা হানা দিচ্ছি। তাদের বিষয়ে প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য নেয়া হচ্ছে। এ অবস্থায়ও আত্মঘাতী হামলার ঘটনা কিভাবে ঘটছে এমন প্রশ্নে পুলিশ কমিশনার বলেন, দু-একটি ঘটনা বিছিন্নভাবে ঘটছে। এটি উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। আমরা সবাই সতর্ক আছি। পুলিশের কাজে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের কাজে অবশ্যই সমন্বয় আছে। তবে হামলার তথ্য সব সময় আগাম থাকে না। যেসব ক্ষেত্রে আগাম তথ্য থাকে সেসব ক্ষেত্রে হামলা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

বর্তমান জঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকারভিত্তিতে একটি সমন্বিত জঙ্গি দমন সেল গঠন করা প্রয়োজন। এ প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি যুগান্তরের কাছে তুলে ধরেন র‌্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও বর্তমানে জাতীয় টেলিযোগাযোগ মনিটরিং সেন্টারের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল আহসান। তিনি বলেন, জঙ্গি নির্মূলে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিক্ষিপ্তভাবে কাজ করছে। বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে রিপোর্ট করছে। ফলে কাক্সিক্ষত ফল আসছে না। কেন্দ্রীয় সমন্বিত জঙ্গি দমন সেলের কাজ হবে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় করা। এ সেলটি হবে বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টিং কর্তৃপক্ষ। সেখান থেকে গবেষণা ও বিভিন্ন মটিভেশনাল প্রোগ্রাম চালু করা যেতে পারে। তিনি বলেন, সমন্বিত জঙ্গি দমন সেলে পুলিশ, আনসার, র‌্যাব ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের রাখা যেতে পারে। এ সেলের প্রধান হিসেবে সাবেক সচিব বা পুলিশ প্রধান এমনকি কোনো জেনারেলকেও নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে কাজের অভিজ্ঞতা আছে এমন কাউকে সেখানে নিয়োগ দিলে কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ধরনের সংস্থা রয়েছে। তারা কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডার ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও যুক্ত।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়ার সঙ্গে প্রায় একই মত দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ। তিনি যুগান্তরকে বলেন, সার্বিকভাবে বলা যায়, আমাদের দেশে জঙ্গি দমনে সমন্বয় নেই। এক কাজ দু’জনে করে বাহবা নেয়ার দরকার নেই। এক্ষেত্রে সমন্বিত কৌশল তৈরি করা দরকার। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম কো-অর্ডিনেশন সেন্টার থাকে। আমাদেরও সেটা করতে হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, জঙ্গিরা নিজেদের অস্বিত্ব রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। এখন তারা বিভিন্ন হামলার মধ্য দিয়ে তাদের শক্তিমত্তা জানান দিতে চাইছে। তাই চলমান জঙ্গিবিরোধী অভিযানকে আরও সক্রিয় রাখতে হবে।

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, একাকী সিংহের মতো লড়াই করতে হবে জঙ্গি বড় ভাইদের এমন ভিডিও বার্তা প্রচারিত হয়। এ ভিডিও থেকে দেশীয় জঙ্গিরা আত্মঘাতী হামলায় উদ্বুদ্ধ হচ্ছে বলে আমাদের ধারণা। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আত্মঘাতী হামলায় উদ্বুদ্ধ জঙ্গিদের বিষয়ে নিবিড় গোয়েন্দা অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে মাঠপর্যায়ে র‌্যাবের গোয়েন্দা দল কাজ করছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি দমন অভিযানে অংশ নেন পুলিশের নবগঠিত সিটিটিসি (কাউন্টার টেরোরিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম) ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের প্রধান ছানোয়ার হোসেন। বর্তমান জঙ্গি পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি শনিবার যুগান্তরকে বলেন, এখন যেসব আলোচনা হচ্ছে তা মূলত জঙ্গি দমন অভিযানের বিষয়। কোথাও বড় ধরনের জঙ্গি হামলা হচ্ছে এমন ঘটনা কিন্তু নেই। তিনি বলেন, শুক্রবার র‌্যাব ব্যারাকে আত্মঘাতী হামলার বিষয়ে এখনই মন্তব্য করার সময় আসেনি। তবে বেশ কয়েকজন দেশীয় জঙ্গি পলাতক। তারা মাঠপর্যায়ের জঙ্গিদের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।

জঙ্গিদের ভার্চুয়াল বা ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগের ধরন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পৃথিবীর কোথাও সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট যোগাযোগ বন্ধ করা যায়নি। তবে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আমরা সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। জঙ্গি দমনে পুলিশের সরঞ্জাম ও সক্ষমতা সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আমাদের সর্বাত্মক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যে হেলিকপ্টারসহ আরও বেশকিছু সরঞ্জাম চেয়েছি। সরকার এগুলো সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। এ মুহূর্তে দেশের অভ্যন্তরে কোনো স্থাপনায় হামলার আশংকা আছে কিনা তা জানতে চাইলে অপর এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, কোথায় কখন হামলা হবে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে স্পর্শকাতর ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ঘিরে সর্বাত্মক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশের চেকপোস্ট, তল্লাশি, ভেহিক্যাল স্ক্যানারসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় টহল জোরদার করা হয়েছে।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত