শিপন হাবীব    |    
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০:০০ | অাপডেট: ১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০৬:০৮:৫৯ প্রিন্ট
প্রথম অস্ত্রোপচার সফল
মুক্তামণি ‘প্রত্যাশার চেয়ে ভালো’ আছে
চিকিৎসকদের অভিনন্দন প্রধানমন্ত্রীর * পৌনে ৩ ঘণ্টার অপারেশনে অংশ নেন ৩৫ চিকিৎসক * আরও ৭টি অপারেশন করা হবে * পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়
অস্ত্রোপচারের পর ঢামেক হাসপাতালের আইসিইউতে মুক্তামণি -যুগান্তর

মুক্তামণির ডান হাত অক্ষত রেখেই সেখান থেকে প্রায় তিন কেজি ওজনের টিউমার অপসারণ করা হয়েছে। শনিবার সকাল পৌনে নয়টায় অস্ত্রোপচার শুরু হয়। শেষ হয় ১২টা ৩৫ মিনিটে। দুপুর পৌনে ১২টায় ব্রিফিং করেন চিকিৎসকরা। তারা জানান, প্রাথমিকভাবে অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে। জ্ঞান ফিরেছে মুক্তামণির। প্রত্যাশার চেয়ে ভালো আছে সে। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। অস্ত্রোপচার সফল হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

শনিবার ভোর ৬টার পর ঢামেকের বার্ন ইউনিটে এক এক করে ৩৫ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আসেন। একটি অপারেশনে এত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এর আগে ঢামেকে একত্রিত হননি। মুক্তামণির চিকিৎসায় অপারেশন থিয়েটারে অত্যাধুনিক সরঞ্জামসহ মনিটরও বসানো হয়।

ব্রিফিংয়ে মেডিকেল টিমের ২০ থেকে ২২ জন উপস্থিত ছিলেন। ঢামেকের বার্ন ইউনিটের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবুল কালাম অস্ত্রোপচারের নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি বলেন, ডান হাত অক্ষত রাখা হয়েছে। অস্ত্রোপচার প্রাথমিকভাবে সফল। তবে তাকে ঝুঁকিমুক্ত বলা যাবে না। কারণ তার ফুসফুসের সমস্যাসহ অন্যান্য জটিলতা রয়েছে। টিউমার শরীরের অনেক জায়গায় ছড়িয়েছিল। হাতের অংশটুকু বেশি খারাপ অবস্থায় ছিল। ওটা অপসারণ করা হয়েছে। অপসারিত টিউমারটির ওজন প্রায় তিন কেজি।

জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারির প্রধান সমন্বয়ক প্রফেসর ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে সফল। হাতটি রক্ষা করে ডিজিজড অংশটি কেটে নেয়া হয়েছে।’ হাতের ফুলে যাওয়া সংক্রমিত অংশটি কেটে ফেলে দেয়ার পর হাতটি ‘ভালো’ আছে বলেও জানান তিনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আবুল কালাম বলেন, ‘স্কিন গ্রাফটিংসহ আরও সাতটি অপারেশন লাগতে পারে। প্রতি সপ্তাহে অথবা ১০ দিন অন্তর এ অপারেশনগুলো হবে।

ব্রিফিংয়ে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক ডা. মো. জুলফিকার আলী লেনিন বলেন, ‘মুক্তামণির সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে এ সংবাদটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার খোঁজখবর সর্বদা রাখছেন। সফল অস্ত্রোপচার হওয়ায় তিনি অনেক খুশি হয়েছেন। আমরা মুক্তামণির জন্য প্রয়োজন সবকিছুই করব, এমনটা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নির্দেশনা রয়েছে। মুক্তামণির পরিবারের বিষয়েও আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি।’

মুক্তামণির অস্ত্রোপচারে অংশ নেন ডা. সামন্ত লাল সেন, বার্ন ইউনিটের পরিচালক ও বোর্ড প্রধান প্রফেসর ডা. আবুল কালাম, প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. মো. সাজ্জাদ খোন্দকার, প্রফেসর রায়হানা আউয়াল সুমি, প্রফেসর লুৎফর কাদের লেলিন, নওয়াজেস আলী খান, ৪ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৭ জন সহকারী অধ্যাপক, ঢামেক হাসপাতালের অ্যানেসথেশিয়া বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. মোজ্জাফফর হোসেনসহ ৯ জন সহযোগী অ্যানেসথেশিয়াসহ আরও ৭ জন চিকিৎসক এ অস্ত্রোপচারে অংশ নেয়।

তখন দুপুর ১২টা। আইসিইউতে প্রায় অচেতন মুক্তামণি। দু’চোখের কোনা বেয়ে জল গড়াচ্ছে। বেডের পাশে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল যমজ বোন হীরামণি। মুক্তামণির বাবা-মা ইউনিটের ৬ তলায় সিজদায় পড়ে কাঁদছিলেন। আইসিইউতে শিশু প্রবেশ নিষেধ, কিন্তু কিছুতেই বোনের পাশ থেকে সরতে চাচ্ছিল না হীরামণি। হীরামণি বলছিল, ‘আমি কখনও আপুর (মুক্তামণি) কাছ থেকে দূরে থাকিনি। আপুও না। আপনারা আমাদের আলাদা করবেন না। একসঙ্গে থাকতে দেন।’

অপারেশন শেষে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের পরিচালক ও মুক্তামণির চিকিৎসায় গঠিত বোর্ড প্রধান প্রফেসর ডা. আবুল কালাম যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপে বলেন, আল্লাহর দরবারে লাখ লাখ শোকরিয়া জানাচ্ছি। প্রথম পর্যায়ের অপারেশনটি সফলভাবে করতে পেরেছি। ৩৫ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার অপারেশনে অংশ নেয়। তিনি বলেন, অপারেশন শেষে মুক্তামণি ভালো আছে। আমরা যতটা প্রত্যাশা করেছিলাম মুক্তামণি তার চেয়েও ভালো আছে।

প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৫০ শতাংশ অপারেশন করা হয়েছে জানিয়ে ডা. আবুল কালাম বলেন, মুক্তামণির এ বিরল রোগটি বহু বছরের। শুধু হাত নয়, বুকসহ শরীরের বেশ কয়েকটি অংশে রোগটি ছড়িয়ে আছে। একটি ফুসফুস তেমন কাজ করছে না। পরবর্তীকালে আরও অন্তত ৭টি অপারেশন করা হবে। বাকি অপারেশনগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে মুক্তামণি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে।

বার্ন ইউনিটের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান প্রফেসর মো. সাজ্জাদ খোন্দকার যুগান্তরকে জানান, মুক্তামণির চিকিৎসায় আমরা অনেক গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। এমন একটি অপারেশনের মধ্য দিয়ে আমরা চিকিৎসকরাও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আমরা বীরের জাতি। তার চিকিৎসায় আমরা চ্যালেঞ্জ নিয়েছি। একের পর এক বোর্ড মিটিং করেছি। বার্ন ইউনিটের চিকিৎসা এখন বিশ্বব্যাপী প্রশংসনীয়। বিরল রোগ নিয়ে একটি গবেষণা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব রোগীকে যেন শুরুতেই যথাযথ চিকিৎসা করা যায় সেই বিষয়ে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয়ভাবে তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

প্রফেসর ডা. সামন্ত লাল সেন যুগান্তরকে জানান, প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টায় মুক্তামণির অপারেশন শেষ হয়। সফল অস্ত্রোপচার হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ধন্যবাদসহ অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মুক্তামণির অস্ত্রোপচারের জন্য সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার কথা হয়েছিল। তবে সেখানকার চিকিৎসকরা ভিডিও কনফারেন্স করে ও বিভিন্ন রিপোর্ট দেখে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, তারা মুক্তামণির অস্ত্রোপচার করতে পারবে না। এতে আমরা নিরাশ হইনি বরং আরও মনোবল নিয়ে এগিয়েছি।

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানান, মুক্তামণির হাত থেকে প্রায় ৩ কেজি মাংসপিণ্ড ফেলে দেয়া হয়েছে। এগুলো পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। অপারেশন সফল হয়েছে তা কেবল চিকিৎসকদের একার নয়। এটি একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। বার্ন ইউনিট, ঢামেক হাসপাতাল ও জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের চিকিৎসকরা অপারেশনে অংশ নেন। অস্ত্রোপচারের জন্য ১২ ব্যাগ রক্ত প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। অপারেশন করতে ২ ব্যাগ রক্ত লেগেছে, এটি একটি ভালো লক্ষণ।

এদিকে মুক্তামণির অস্ত্রোপচার সফল হওয়ায় তার বাবা ইব্রাহিম হোসেন যুগান্তরকে বলেন, হীরামণি শুধু কাঁদছে। তাকে কিছুতেই শান্ত করা যাচ্ছে না। আমার ছোট্ট এ শিশুটি ডাক্তারদের বারবার অনুরোধ করেছে, তার বোনকে যেন তারা বাঁচান। অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে জেনে আমি অনেক খুশি। আমার মেয়ে বাঁচবে, সবার দোয়া আছে। দুই মেয়ে একসঙ্গে স্কুলে যাবে। খেলা করবে। মুক্তামণির মা আসমা বেগম বলেন, আমরা গরিব, প্রধানমন্ত্রী যদি মেয়ের চিকিৎসার দায়-দায়িত্ব না নিতেন তাহলে চিকিৎসার কিছুই হতো না। ডাক্তারদের প্রতি আমরা ঋণী। তার বোন সুস্থ হবে এমন আনন্দের সংবাদে হীরামণি কাঁদছে।

সাতক্ষীরায় জন্মের দেড় বছর বয়স থেকে মুক্তামণির ডান হাতে সমস্যা শুরু হয়। প্রথমে হাতে টিউমারের মতো হয়। ছয় বছর বয়স পর্যন্ত টিউমারটি তেমন বড় হয়নি। কিন্তু পরে তার ডান হাতটি ফুলে অনেকটা কোলবালিশের মতো হয়ে যায়। সে বিছানাবন্দি হয়ে পড়ে। মুক্তামণির রোগ নিয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। ১১ জুলাই মুক্তামণিকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। এতদিন মুক্তামণির রোগটিকে বিরল রোগ বলা হলেও গত সপ্তাহে তার বায়োপসি করার পর জানা গেছে মুক্তামণির রক্তনালিতে টিউমার হয়েছে যেটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে হেমানজিওমা বলা হয়।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত