•       কুড়িগ্রামের মোগলবাসায় মৌমাছির কামড়ে ৩৭ জন পিইসি শিক্ষার্থীসহ আহত অর্ধশতাধিক
কক্সবাজার ও উখিয়া প্রতিনিধি    |    
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
মিয়ানমারের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
নির্যাতন বন্ধ করুন : রোহিঙ্গা নাগরিকদের ফিরিয়ে নিন
নিজ দেশে না ফেরা পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের পাশে থাকব * আমরা সৌহার্দ্য চাই, কোনো অন্যায় মেনে নেয়া হবে না * রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করার অধিকার নেই মিয়ানমারের * সাত লাখ রোহিঙ্গাকে খাওয়াতে পারবে বাংলাদেশ
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চলা নির্যাতন বন্ধ এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য দেশটির সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, মিয়ানমার সরকারকে আমি বলব, তারা যেন এই নিরীহ মানুষগুলোর ওপর কোনোরকম নির্যাতন না করে। এগুলো যেন তারা বন্ধ করে প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করে। আর এটি করার জন্য প্রতিবেশী দেশ হিসেবে যা যা সাহায্যের দরকার, আমরা তা করব।
মানবিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ মিয়ানমারের শরণার্থীদের আশ্রয় দিলেও এ দেশের ভূমি ব্যবহার করে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানো হলে তা বরদাশত করা হবে না বলেও হুশিয়ার করেন শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন।
জাতিগত সহিংসতার শিকার হয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দেখতে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এর আগে সকালে বিমানে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে প্রথমে কক্সবাজার এবং সেখান থেকে সড়কপথে উখিয়ায় পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। কুতুপালং ক্যাম্পে পৌঁছে শেখ হাসিনা সেখানে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমারের নারী-পুরুষ ও শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করেন এবং শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন।
রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা তাদের ওপর বর্বর নির্যাতনের বর্ণনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। এ সময় নারী ও শিশুদের কান্নায় পরিবেশ ভারি হয়ে উঠলে চোখ ভিজে ওঠে শেখ হাসিনার। তার সঙ্গে থাকা ছোট বোন শেখ রেহানাকেও চোখ মুছতে দেখা যায়।
পরে সংক্ষিপ্ত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের ঘটনাকে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বাকরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, এ ঘটনা দেখে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। মানুষ মানুষের মতো বাঁচবে। মানুষের কেন এত কষ্ট!
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তি এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। আমরা কোনো ধরনের অন্যায়-অত্যাচার গ্রহণ বা মেনে নিতে পারি না এবং এ ব্যাপারে আমাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের যা করা দরকার তা করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা ১৬ কোটি মানুষের দেশ। সবার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছি। সেখানে আরও দুই, পাঁচ বা সাত লাখ মানুষকেও খেতে দিতে পারব। প্রধানমন্ত্রী স্থানীয়দের উদ্দেশে বলেন, এখন যারা যুবক তারা হয়তো মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। কিন্তু আমরা দেখেছি। তাই রোহিঙ্গাদের যেন কোনো কষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এদের দেখভাল করতে হবে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী নিজ দেশে না ফেরা পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার ঘোষণা দেন।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মিয়ানমার সরকারকে বারবার বলেছি, সেই ’৭৮ সাল থেকে মিয়ানমারে একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে আর মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। এদের ভোটের অধিকার, নাগরিক অধিকার- সব কেড়ে নেয়া হয়েছে। কেন এ অত্যাচার। এরা তো মিয়ানমারেরই লোক। মিয়ানমারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তো নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, রোহিঙ্গারা তাদেরই নাগরিক। তাহলে এখন তারা এ সমস্যা সৃষ্টি করছে কেন?
সরকারপ্রধান বলেন, লাখ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়ে চলে এসেছে। সেখানে (মিয়ানমার) এখনও আগুন জ্বলছে। সেখানে এখনও অনেকে আপনজনের হদিস পাচ্ছে না। নাফ নদীতে ছোট্ট শিশুর লাশ ভেসে বেড়াচ্ছে। মানুষের লাশ ভাসছে, এটা সম্পূর্ণ মানবতাবিরোধী কাজ। শিশু, নারী, পুরুষ তথা সাধারণ মানুষ কী অপরাধ করেছে যে, তাদের ওপর এই জুলুম-অত্যাচার। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আমরা কখনই সমর্থন করতে পারি না। তিনি বলেন, মানবিক কারণে প্রতিবেশী হিসেবে আমরা নির্যাতিতদের আশ্রয় দিয়েছি। ১৯৭১ সালে আমাদের ওপরও এরকম বর্বরতা চালানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অন্য দেশের কোনো নাগরিককে দীর্ঘদিন আশ্রয় দিতে পারব না। চূড়ান্তভাবে মিয়ানমারকে তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ভালো উদ্যোগ নিয়েছে কিন্তু কেউ সে উদ্যোগকে পুঁজি করে নিজের আখের গোছালে তা বরদাশত করা হবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক নেতাদের বলব, তারা যেন মিয়ানমারকে বাধ্য করে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে। একটা দেশের নাগরিকদের ওপর এভাবে নির্যাতন কখনও কাম্য নয়। শেখ হাসিনা বলেন, আশ্রয়ের পাশাপাশি যারা আহত হয়ে এসেছেন তাদের সব ধরনের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সরকারের নিরাপত্তা দিতে হবে। যাতে নিজেদের দেশে তারা নিরাপদে বসবাস করতে পারে। এ বিষয়ে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মিয়ানমারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি।
হুশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যদি ফায়দা লুটার চেষ্টা করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সুতরাং বিচ্ছিন্নভাবে হলেও কেউ যেন এ ধরনের কোনো অপচেষ্টার সঙ্গে লিপ্ত না হয়, সে ব্যাপারেও প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সতর্ক করে দেন।
সরকার বায়মেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে রিলিফ তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা শরণার্থীদের নাম, ঠিকানা, পরিচয় লিপিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যাতে তাদের কোনো সমস্যা হলে আমরা দেখভাল করতে পারি এবং তাদের দেখভাল করাটা আমাদের দায়িত্ব।
পরে প্রধানমন্ত্রী শরণার্থীদের হাতে নিজে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন। এ সময় শরণার্থীরা তাদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীকে পেয়ে মিয়ানমারে তাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের বর্ণনা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী দুর্গত নারী ও শিশুকে কাছে টেনে নেন। সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করে বলেন, যারা আশ্রয়ের জন্য এসেছে, তাদের যেন কোনো কষ্ট না হয়।
বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা ছাড়াও তার পুত্রবধূ আইওএম কর্মকর্তা পেপ্পি সিদ্দিক কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, হুইপ ইকবালুর রহিম, কক্সবাজার-৩ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, আবু রেজা মোহাম্মদ নিজামউদ্দিন নদভী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম, মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উখিয়ায় পৌঁছেন।
এ ছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, কক্সবাজারের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক ও র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদও উখিয়ায় উপস্থিত ছিলেন।
দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশে কুতুপালং এলাকা ত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর। এরপর সার্কিট হাউসে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন প্রধানমন্ত্রী। বিকাল ৪টায় কক্সবাজার ত্যাগ করেন তিনি।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে উখিয়া-টেকনাফ সড়কে মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর ১২টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ থাকে। উখিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কায় কিসলু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে প্রশাসন। তাই সাময়িক অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে স্থানীয়দের।
এ ছাড়া উখিয়া-টেকনাফ ও মেরিন ড্রাইভ সড়কের দু’পাশের দোকানপাটও এ সময় বন্ধ ছিল।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত