সাদ্দাম হোসেন ইমরান    |    
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ
বড় বাধা জটিল কর ব্যবস্থা
অর্থমন্ত্রীর কাছে এনবিআরের সারসংক্ষেপ
কর ব্যবস্থা ব্যবসাবান্ধব না হওয়ায় দেশে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না- ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এ অভিযোগ জানিয়ে আসছেন। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বরাবরই তা নাকচ করে দিয়েছে। কিন্তু এবার অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক সারসংক্ষেপে এনবিআর স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, অদক্ষ কর প্রশাসন ও জটিল কর ব্যবস্থার কারণে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়নি। এর ফলে ব্যবসার পরিবেশ (ইজ অব ডুয়িং বিজনেস) সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তলানির দিকে, ১৭৬তম। জানা গেছে, সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর কাছে ওই সারসংক্ষেপটি পাঠিয়েছে এনবিআর। ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনের বিধিমালা সংশোধনের অনুমতি চেয়ে সারসংক্ষেপটি পাঠানো হয়। এতে পুরনো ভ্যাট আইন সম্পর্কে ৪টি পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে।
সারসংক্ষেপে এনবিআর বলেছে, ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনটিতে প্রতিবছর সংশোধনী আনায় এটি একটি জটিল আইনে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনিক সংস্কার না করে আবগারি ও বিক্রয় করের জন্য প্রযোজ্য প্রশাসন (লোকবল, অবকাঠামো, লজিস্টিক সাপোর্ট) দিয়ে ভ্যাট ব্যবস্থা পরিচালনা করায় প্রো-ভ্যাট মানসিকতা গড়ে উঠেনি। আর প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে করজাল বাড়েনি। এর প্রমাণ বর্তমানে মাত্র ৩২ হাজার প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দেয়। করজাল বাড়াতে না পারার কারণে গুটিকয়েক করদাতার ওপর প্রতিবছর বর্ধিত করের চাপ পড়ে। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে করদাতারা সহজে করজালে প্রবেশ করতে চান না। এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন কর ব্যবস্থাকে আরও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। আরও সহজ করতে হবে। তা না হলে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে না। তিনি আরও বলেন, একই ব্যক্তির ওপর বারবার করের বোঝা চাপালে অন্যরা করের আওতায় আসতে চাইবে না। তারা মনে করবে, একবার করের আওতায় এলে আর কোনো উপায় নেই। এ অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে হলে এনবিআরে প্রশিক্ষিত জনবল বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এনবিআরকে নামকাওয়াস্তে নয়, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রকৃত যোগাযোগ বাড়াতে হবে। শুধু মিডিয়ার সামনে পার্টনারশিপ দেখালে চলবে না।
সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রী এনবিআরের পাঠানো সারসংক্ষেপ অনুমোদন দিয়েছেন। এখন পুরনো আইনের অধীনে বিধিমালা সংশোধন করে তা অনলাইন সিস্টেমের উপযোগী করে তুলতে কাজ শুরু করেছে এনবিআর। ইতিমধ্যে একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। যেখানে ব্যবসা পরিচালনায় নতুন নতুন ফরম যুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০১২ সালের ৭ জুন জারি করা কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ও কর পরিশোধ বিধিমালাটি বাতিল করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এনবিআরের সারসংক্ষেপে আরও বলা হয়েছে, অনলাইন চালু রাখলে ৬টি সুবিধা পাওয়া যাবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা করা হলে যারা নিবন্ধিত অথচ কর দেন না তাদের সহজেই চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যাবে; নিয়মিত করদাতার সংখ্যা ৩২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখে উন্নীত করা গেলে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে; অনলাইন ব্যবস্থা চালু হলে প্রতি মাসে ১ লাখ রিটার্ন সংগ্রহ কঠিন বিষয় হবে না।
এতে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংক এককভাবে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অর্থ জোগানদাতা। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের চুক্তিটি নতুন আইন বাস্তবায়ন সংক্রান্ত হলেও ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনের আওতায় অনলাইন কার্যক্রম চালু রাখলে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন অব্যাহত রাখবে বলে আশা করা যায়। এতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সম্ভাব্য জটিলতা এড়ানো যাবে।
সূত্র আরও জানায়, মূলত ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পকে কার্যকর রাখতেই বিধিমালায় সংশোধন আনা হচ্ছে। এ জন্য নতুন ফরমও প্রবর্তন করা হবে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে জটিলতা এড়ানোও এ উদ্যোগের লক্ষ্য। কারণ অনলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে আইএমএফ প্রচুর অর্থ খরচ করেছে।
ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি রূপালী চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন করজাল না বাড়ানোয় বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ছে। অনেক পরে হলেও এনবিআর সেটা অনুধাবন করতে পেরেছে। এখন এনবিআরের উচিত নিজেদের প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে করজাল বাড়ানোর দিকে নজর দেয়া। বর্তমানে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এনবিআরের হয়ে উৎসে কর আদায় করে দিচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা খরচ বাড়ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এনবিআর নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে না পারবে ততক্ষণ এ কাজের জন্য কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দেয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, কতগুলো কোম্পানি নিয়মিত কর দেয়, আর কতগুলো কোম্পানি বিভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেয় তা মনিটরিং করলেই বোঝা যাবে, কোন কোন প্রতিষ্ঠান করের বাইরে আছে। এদের করের আওতায় আনার মাধ্যমে করজাল বাড়াতে হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, এনবিআরকে অবশ্যই করজাল বাড়াতে এবং পর্যায়ক্রমে করহার কমানোর দিকে মনোযোগী হতে হবে। করজাল বাড়ানো হলে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি করহার কমালে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফার অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রেও সরকার প্রণোদনা দিতে পারে। যেমন- যেসব প্রতিষ্ঠান মুনাফার অর্থ পুনরায় দেশে বিনিয়োগ করবে তাদের কর রেয়াত সুবিধা দিলে অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে। এতে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার বিদেশি বিনিয়োগকে বেশি উৎসাহ দিচ্ছে। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিন্তু দেশীয় বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ উৎসাহ-আগ্রহ দেখেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। এ ক্ষেত্রে সব বিনিয়োগকারীকেই সমান সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি এনবিআরকে কর আদায় প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে হবে। ইতিমধ্যে পেমেন্ট সিস্টেম আধুনিকায়ন হলেও সেটিকে আরও উন্নত করতে হবে। শুধু ব্যবসায়ীরা নন, সাধারণ মানুষও যাতে কর দেয়াকে হয়রানি মনে না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। গত বছরের ২৬ অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সহজে ব্যবসা করা যায় এমন ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৬তম, যা আগের বছর ছিল ১৭৮তম। দক্ষিণ এশিয়ার আটটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শুধু আফগানিস্তানের ওপরে আছে। ১০টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে ২০০৩ সাল থেকে বিশ্বব্যাংক প্রতিবছর এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। এগুলো হল : ব্যবসা শুরু, অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি, বিদ্যুতের প্রাপ্যতা, সম্পত্তি নিবন্ধন, ঋণের প্রাপ্যতা, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, কর পরিশোধ, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তির বাস্তবায়ন ইত্যাদি।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত