সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার    |    
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ | অাপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০১:২৩:২০ প্রিন্ট
শরণার্থী শিবির ও সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন
কূটনীতিকদের কাছে বর্বরতার চিত্র তুলে ধরলেন রোহিঙ্গারা
জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যক্ত * কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন চায় ইইউ
উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে বুধবার বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা -এসএম গোর্কি

বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেছেন বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গারা। কিভাবে তাদের আত্মীয়-পরিজনকে হত্যা, ধর্ষণ আর বাড়িঘরে আগুন দেয়া হয়েছে সেই বর্ণনা দেন তারা। জবাবে কূটনীতিকরা বলেছেন, নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে আসা অসহায় রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশ। যা খুবই প্রশংসনীয়। তবে ক্যাম্পে শরণার্থীদের মানবেতর জীবন অত্যন্ত পীড়াদায়ক। নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে আসা অসহায় রোহিঙ্গারা যাতে দ্রুত স্বদেশে (মিয়ানমার) ফিরতে পারেন সেজন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে নিজ নিজ দেশের সঙ্গে আলাপ করবেন বলেও কূটনীতিকরা জানান। এদিকে, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের বৈঠকে মঙ্গলবার বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেয়া বক্তৃতায় বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছে। সেখানে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর নির্বিচারে হামলা করা হচ্ছে। এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এটা জাতিগত নিধণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। অপরদিকে, হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি সারাহ স্যান্ডার্স এক বিবৃতিতে বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে হত্যা, ধর্ষণসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) উচ্চ প্রতিনিধি মুগিরিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন করতে হবে।

বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তারা এসব কথা জানান। এর আগে উখিয়ার কুতুপালংয়ে পৌঁছায় বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদের বহন করা গাড়ি। সেখানে পৌঁছে তারা কুতুপালং ক্যাম্পে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তাদের কেউ কেউ রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। উখিয়া থেকে বিদেশি কূটনীতিকদের বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি থানার সীমান্তবর্তী অঞ্চল তামব্রু ঘুনধুম এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নোম্যানসল্যান্ডে রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখানো হয়।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিদেশি কূটনীতিকদের রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আগেই ব্রিফ করা হয়েছে। কূটনীতিকদের সঙ্গে যাওয়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বুধবার যুগান্তরকে বলেছেন, এতদিন পর্যন্ত মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টি বিদেশি কূটনীতিকরা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে জেনেছেন। বাংলাদেশ সরকারের ব্রিফিং থেকেও তারা তথ্য জেনেছেন। কিন্তু এবার সরেজমিন ভয়াবহতার মাত্রা অনুধাবন করেছেন তারা। তাদের মধ্যে অন্যরকম এক অনুভূতি হয়েছে। সকালে ভাড়া করা একটি বিমানে কূটনীতিকদের কক্সবাজার নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাদের নেয়া হয় সীমান্ত এলাকায়।

ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, এতদিন পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি জেনেছেন কূটনীতিকরা। কিন্তু আজ (বুধবার) সরেজমিন পরিদর্শনে এসে বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছেন তারা। পলিথিনের ঝুঁপড়িতে বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট কাদা-পানি পরিবেশে রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবন সবাইকে ব্যথিত করেছে। রোহিঙ্গারা যাতে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন সেজন্য পরিদর্শনে আসা বিদেশি কূটনীতিকরা নিজ নিজ দেশের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের দুর্বিষহ জীবন সম্পর্কে অবহিত করবেন বলে জানিয়েছেন।

বুধবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছালে কূটনীতিকদের স্বাগত জানান কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন ও পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেনসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এখান থেকে গাড়িতে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় কুতুপালং ক্যাম্পে। জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের পুরো ক্যাম্প ঘুরিয়ে রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক ক্ষতির বিষয়াদিও তাদের নজরে আনা হয়। নিপীড়িত মানবতার দিকে চেয়ে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ সহায়তা দিতে গেলে আমরা নিজেরাই নিষ্পেষিত হব- এমন সম্ভাবনার কথাও তাদের কাছে তুলে ধরা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন জেলা প্রশাসক।

নিজ দেশে জাতিগত সহিংসতায় নিপীড়নের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসছেন লাখ লাখ রোহিঙ্গা নারী-শিশু ও পুরুষ। জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসাবে এ সংখ্যা ৩ লাখ ৭০ হাজার বলা হলেও রিফিউজি রিলিফ অ্যান্ড রিপেট্রিয়েশন কমিশনের (আরআরসি) মতে এ সংখ্যা চার লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ২৪ আগস্ট আনান কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর ওইদিন রাতে আরকান রাজ্যে পুলিশ পোস্টে হামলার অভিযোগে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে অভিযানে নামে সে দেশের সেনাবাহিনী ও পুলিশ। তারা নিরস্ত্র সাধারণ রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা করছে। ঘটছে ধর্ষণের ঘটনা। বাড়িঘরে আগুন দিয়ে নিঃশেষ করে দিচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। ঘটনার পর থেকে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে এসে জড়ো হন আতঙ্কিত লাখো রোহিঙ্গা নারী-শিশু-পুরুষ। গত ১৯ দিনে ৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করে টেকনাফ-উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ও তাদের ওপর ঘটে যাওয়া পাশবিকতা নিয়ে বিশ্ব মিডিয়া সোচ্চার হওয়ায় বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে তাদের আশ্রয় দিতে বাংলাদেশকে অনুরোধ করছে। তবে আশ্রয় দেয়াই শেষ সমাধান নয়। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে বিশ্ব জনমত গড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এ কারণে বাংলাদেশে অবস্থানরত ৪০টির বেশি দেশের রাষ্ট্রদূত, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত বা প্রতিনিধি এবং জাতিসংঘের কয়েকটি সংস্থার প্রধানকে রোহিঙ্গাদেন মানবেতর জীবনের করুণ চিত্র সরেজমিন দেখাতে নিয়ে আসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। তাদের সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম ও সচিব শহীদুল হকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে বাংলাদেশের বক্তব্য : সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের বৈঠকে মঙ্গলবার বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেয়া বক্তৃতায় বলা হয়, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ২৫ আগস্টের ঘটনাকে দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে একটা শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছে। সেখানে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর নির্বিচারে হামলা করা হচ্ছে। এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এটা জাতিগত নিধন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ হামলা বন্ধ করার জন্যে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসা এ দেশের জন্য বিরাট এক চাপ ও বোঝা। বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের আসতে দিয়েছে। কিন্তু তার মানে এ নয় যে, রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার নির্যাতন অব্যাহত রাখবে।

আনান কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়ন চায় ইইউ : বুধবার ঢাকায় ইইউ দফতরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চ প্রতিনিধি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মুগেরিনি বলেছেন, ‘রাখাইন রাজ্যের নাটকীয় পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশে সীমান্ত অঞ্চল আমরা নিবিড়ভাবে অনুসরণ করছি। ইইউ শুক্রবার মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হল মানবিক সহায়তার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সংকটের মূল সমাধানের লক্ষ্যে কফি আনান কমিশনের রিপোর্টের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা। আমরা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি এবং মানবিক সংস্থার কার্যক্রম জোরদার করছি। এদিকে, রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকটে ইইউ এক কোটি ৫০ লাখ ইউরো সহায়তা দেবে। ইইউর মানবিক সাহায্য ও সংকট ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কমিশনার ক্রিস্টোস স্টাইলিনিডস বলেছেন- ইইউ খাদ্য, পানি ও স্বাস্থ্য সেবা খাতে এ সহায়তা দিচ্ছে। তিনি পূর্ণ মানবিক সুবিধা নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by