মতিন আব্দুল্লাহ    |    
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
দখলের রামরাজত্ব আমিন মোহাম্মদ সিটির
অনুমোদনহীন প্রকল্পে প্লট বিক্রির ফাঁদ
সাইনবোর্ড অপসারণ ও প্লট বিক্রি বন্ধে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চিঠি * প্রশাসন নীরব, আছে লাঠিয়াল বাহিনী * জমি হারিয়ে কাঁদছে অসহায় কৃষক
শুধু ঢাকার ‘গ্রীন মডেল টাউন’ নয়, আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের প্রতিটি প্রকল্পেরই একই অবস্থা। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে প্রস্তাবিত ‘আমিন মোহাম্মদ সিটি’ প্রকল্পেও জলাধার, কৃষিজমি ভরাটের পাশাপাশি অন্যের জমি দখলের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। এক খণ্ড জমি কিনে জোর করে ভরাট ও দখল করছে কমপক্ষে একশ’ খণ্ড। এ কাজে সক্রিয় আছে দখলদার ভাড়াটে ক্যাডার বাহিনী। রীতিমতো দখলের এক রামরাজত্ব। ওদিকে জমির ন্যায্য পাওনাও পরিশোধ করছে না আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। তাই জমি হারিয়ে শুধু কৃষকের পুঁজি এখন চোখের পানি।
বেআইনি কর্মকাণ্ডের এখানেই শেষ নয়, যে প্রকল্পের নামে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে প্লট বিক্রি করা হচ্ছে সেই আমিন মোহাম্মদ সিটির কোনো অনুমোদনই মেলেনি। অথচ বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সাইনবোর্ড টানিয়েছে। অভিযোগ পেয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ তাদেরকে অবিলম্বে সাইনবোর্ড খুলে ফেলাসহ প্লট বিক্রি বন্ধ করতে চিঠিও দিয়েছে। কিন্তু চিঠির জবাব দেয়া তো দূরের কথা আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ সেদিকে কোনো কর্ণপাত করেনি।
সিরাজদিখানে এ প্রকল্প অনুমোদনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (এনএইচএ) চেয়ারম্যান খন্দকার আখতারুজ্জমান মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমিন মোহাম্মদ সিটি প্রকল্পের অবৈধ বিজ্ঞাপন, সাইনবোর্ড ও প্লট বিক্রির তথ্য আমাদের কাছে এসেছে। ইতিমধ্যে আমরা আমিন মোহাম্মদ গ্রুপকে সাইনবোর্ড অপসারণ ও প্লট বিক্রি বন্ধ করতে চিঠি দিয়েছি। তবে তারা এখনও জবাব দেয়নি। এ ক্ষেত্রে তারা নিয়ম মেনে পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর এটা আমরা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জনসাধারণকে জানিয়ে দেব।’
প্রসঙ্গত, ঢাকা-মাওয়া রোড সংলগ্ন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় ২০০৭ সালে আমিন মোহাম্মদ সিটি প্রকল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করে বিতর্কিত গ্রুপটি। প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১১৫ একর জমিতে দেড় হাজার প্লট করার ঘোষণা দিয়েছে তারা। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের আকার বাড়িয়ে প্লট সংখ্যা বাড়ানো হবে বলে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। কিন্তু আমিন মোহাম্মদ সিটি প্রকল্পের প্রথম পর্বের পরিবেশ ও ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র পেলেও প্রকল্প অনুমোদন পায়নি। আইন মোতাবেক প্রকল্প অনুমোদনের আগে সাইনবোর্ড প্রদর্শন বা প্লট বিক্রি করা অবৈধ। আর সে অবৈধ কাজটি তারা করে যাচ্ছে অবলীলায়।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন রোববার যুগান্তরকে বলেন, আবাসন কোম্পানিগুলো ঢাকাসহ আশপাশের জলাধার, খাল, ডোবা-নালা ও নদ-নদী ভরাট করে ফেলছে। তবে এ বিষয়ে সরকার শক্ত অবস্থানে রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেলে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গত সপ্তাহে দু’দফায় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এলাকা ঘুরে জানা যায়, থোক থোক কিছু জায়গা কিনে জোরপূর্বক অন্যের জমি দখল করা হচ্ছে। যার সহজ উপায় হিসেবে বালু ফেলা হচ্ছে। আর দালালদের মাধ্যমে চারদিক ঘিরে এমনভাবে জমি কেনা হয়েছে যেন অন্যদের জমি না ছেড়ে দিয়ে উপায় নেই। ঢাকা-মাওয়া সড়কসংলগ্ন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার কুচিয়া মোড়া, বড় সিকদারপুর, মধুপুর ও সৈয়দপুর ঘিরে ৭ কিলোমিটার এলাকার বিশাল বিলজুড়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের টার্গেট করা হয়েছে। এলাকাবাসীর বক্তব্য অনুযায়ী টার্গেটকৃত জমির ১০ ভাগও এখন পর্যন্ত কিনতে পারেনি আমিন মোহাম্মদ। কিন্তু পুরো এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে ‘আমিন মোহাম্মদ সিটি’র শতাধিক সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। এসব সাইনবোর্ড দেখলে যে কারও মনে হতে পারে, এই পুরো জমির মালিক আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
সরেজমিন আরও দেখা গেছে, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক সংলগ্ন সরকারি খাল ভরাট করে প্রকল্পের সাইট অফিসে চলাচলের সড়ক তৈরি করেছে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। খাল ভরাটের ক্ষেত্রে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার কোনো অনুমোদন নেয়া হয়নি। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো মাথাব্যথ্যা নেই।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত গ্রুপটি আমিন মোহাম্মদ সিটি প্রকল্পের জন্য এ পর্যন্ত জমি কিনতে পেরেছে প্রায় ১শ’ বিঘা। আর ব্যক্তির জমি ছাড়াও আল-মুসলিম গ্রুপ নামে অপর একটি আবাসন কোম্পানির ১শ’ বিঘার মতো জমি দখল করে নিয়েছে। কিন্তু আমিন মোহাম্মদ সিটির প্রস্তাবিত প্রকল্প নকশায় জমির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১১৫ একর।
আল-মুসলিম গ্রুপের ল্যান্ডবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম কাইউম যুগান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা-মাওয়া সড়ক সংলগ্ন কুচিয়াপাড়া ও আশপাশের এলাকার আল-মুসলিম গ্রুপের প্রায় ১০০ বিঘা জমি অবৈধভাবে দখলে নিয়েছে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। সরকারদলীয় ক্যাডার ভাড়া করে তারা আমাদের কোম্পানির জমি জোরপূর্বক ভরাটও শুরু করেছে। এলাকাবাসীর কাছে বিষয়টি পরিষ্কার। কিন্তু সরকারদলীয়দের সমর্থন থাকায় কিছু করা যাচ্ছে না।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন যুগান্তরকে জানান, জোরপূর্বক সাধারণ মানুষের জমি দখল করে নিচ্ছে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। অবৈধভাবে অন্যের কৃষিজমি ভরাট করার অপরাধে পরিবেশ অধিদফতর দু’দফা আমিন মোহাম্মদ গ্রুপকে ১৫ লাখ টাকা জরিমানাও করেছে। কিন্তু তাদের জবরদখল বন্ধ হয়নি। জমি দখলকে কেন্দ্র করে একাধিক মামলাও চলমান রয়েছে। এলাকার বিক্ষুব্ধ মানুষ আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, মানববন্ধন করেও ফল পায়নি। কারণ প্রভাবশালী মহলসহ প্রশাসনকে তারা বশীকরণ করতে পেরেছে। আর সাধারণ মানুষকে শায়েস্তা করতে আছে ৩৫০ সদস্যের বিশাল ক্যাডার বাহিনী। মাসিক বেতন দিয়ে স্থানীয় কিছু লোকজনকে তারা বেআইনি এ কাজে সম্পৃক্ত করেছে। যারা সার্বক্ষণিক পালা করে করে প্রকল্প এলাকায় টহল দেয়। যে কারণে তাদের ভয়ে বহিরাগত কেউ প্রকল্প এলাকায় প্রবেশের সাহস পায় না।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আমিন মোহাম্মদ সিটির এ প্রকল্প এলাকার বেশিরভাগ পড়েছে শিকারপুর, কেয়াইন ও বড়ভর্তা এলাকায়। দালালদের সহায়তায় এখানকার জমি কেনা হয়েছে নামমাত্র মূল্যে। অনেকে আবার ঠিকমতো টাকাও বুঝে পাননি। এমন অভিযোগ অহরহ। এ ছাড়া প্রকল্প এলাকার শিকারপুর গ্রামের গোবিন্দ পোন্দার ভেন্ডারের সহযোগিতায় জাল কাগজপত্র তৈরি করে আরএস ৩০১৪, ২৫১২ ও ৩০৩০ দাগের সরকারি জমি দখল করে নিয়েছে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। শিকারপুর গ্রামের ফজর আলী জানান, বাপ-দাদার কৃষিজমি বহু বছর ধরে চাষাবাদ করে জীবন চালালেও এখন তারা নিঃস্ব। স্থানীয় দালাল ও ভাড়াটিয়া মাস্তান দিয়ে জমির মূল্য হিসেবে অল্প কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে ২০ বিঘা জমি দখল করে নিয়েছে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। একই অভিযোগ বড়ভর্তা গ্রামের নাসির, মিলন, আখতার শেখ, নজরুল শেখসহ শত শত নিরীহ মানুষের। কুচিয়া মোড়া গ্রামের সিরাজুল ইসলাম বলেন, তিন বিঘা জমির টাকার জন্য ৩০-৪০ বার গিয়েছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও কোনো টাকা পাইনি। ধান ফলানো জমি আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ জোর করে ভরাট করে ফেলায় পরিবার-পরিজন নিয়ে খুবই বিপদে আছি।
কেয়াইন গ্রামের বৃদ্ধা জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘জন্মের পর থেকে আমরা এসব কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদন করে জীবন নির্বাহ করছি। কিন্তু আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ জোরপূর্বক জমি দখল করে নেয়ায় এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে অনাধারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছি।’
বৃহস্পতিবার মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে আমিন মোহাম্মদ সিটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ভরাট কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। প্রকল্পের বিভিন্ন স্থানে আমিন মোহাম্মদ সিটির সাইনবোর্ড। এ সময় প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে এগিয়ে আসেন এক যুবক। পরিচয় জানার পর সাফ জানিয়ে দেন, ‘এখানে ঘোরাঘুরি করা যাবে না। উপরের অনুমতি না পেলে কোনো সাংবাদিককে অবস্থান করতে দেয়াও নিষেধ।’ বোঝা গেল, তিনি আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের ভাড়াটিয়া ক্যাডার। এ সময় ছবি তোলার চেষ্টা করলে তিনি ক্ষেপে গিয়ে সদলবলে বাধা দেন।
বড় শিকদারপুরের বাসিন্দা ইমরান হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ এ এলাকায় আসার পর এলাকার শান্তি চলে গেছে। কৃষকরা ধান চাষ করে আর বিল থেকে মাঝ ধরে খেয়ে-পরে শান্তিতে ছিল। কিন্তু আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ কৃষকের এসব সম্বল কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। ন্যায্য পাওনাও পরিশোধ করছে না।’
এ প্রসঙ্গে কেয়াইন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী যুগান্তরকে বলেন, ‘আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের আবাসন প্রকল্পে জলাধার, নিচু জমি, কৃষিজমি ভরাট করা হচ্ছে। এটা তো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আবাসন কোম্পানিগুলো তো এভাবেই তাদের প্রকল্প গড়ে তোলে। এটা দেখার দায়িত্ব সরকারি সংস্থাগুলোর। কিন্তু তারা নির্বিকার কেন, সেটা আমারও প্রশ্ন।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তারা (আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ) কী পরিমাণ জমির অনুমোদন পেয়েছে সে বিষয়ে তার দফতরে কোনো চিঠিপত্র আসেনি।
এ প্রসঙ্গে আমিন মোহাম্মদ সিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফয়সাল এম রানা যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রকল্পের প্রাথমিক আকার ৪০০-৪৫০ একর। আর যেসব প্লট আমরা বিক্রি করছি তার সবকিছুই সঠিক আছে।’ তিনি দাবি করেন, আমিন মোহাম্মদ সিটি প্রকল্পে কোনো গ্রাহকের জমি জোরপূর্বক নেয়া হয়নি। যদি এমন কেউ অভিযোগ করে থাকে, সেটা মিথ্যা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আল-মুসলিম গ্রুপের জমির বিষয়ে সঠিক কোনো তথ্য আমার জানা নেই।’



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত