সংসদ রিপোর্টার    |    
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
সংসদে প্রধানমন্ত্রী
৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির ইতিহাস ও অস্তিত্ব
“পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা ’৭৫-পরবর্তী সময়ে এ ভাষণ নিষিদ্ধ করেছিল” * বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ায় সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব পাস * দিনটিকে জাতীয় দিবস ঘোষণার দাবি এমপিদের

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির ইতিহাস ও অস্তিত্ব। এ ভাষণের প্রতিটি বাক্য এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস ছিল। ভাষণটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণ হয়েছে যে, এটি শুধু একটি ভাষণই না, এটি বাঙালি জাতিসহ সারা বিশ্বের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের দর্শন। বিশ্বের সব নিপীড়িত মানুষের অবলম্বন এবং অনুপ্রেরণা। অথচ ’৭৫-পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। তারা ৭ মার্চের ভাষণকে নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু ইউনেস্কোর স্বীকৃতির মাধ্যমে এটাই আজ প্রমাণ হয়েছে- ইতিহাস সত্যকে তুলে ধরে।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে মঙ্গলবার রাতে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ বিধিতে আনীত একটি ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে সংস্থাটির ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে অন্তর্র্ভুক্ত হওয়ায় ইউনেস্কোসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাতে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। প্রস্তাবের ওপর প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদসহ সরকার ও বিরোধী দলের ৫৭ জন সংসদ সদস্য বক্তব্য রাখেন। আলোচনা শেষে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতক্রমে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের সঙ্গে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জড়িত। এই ভাষণের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য উজ্জীবিত হয়েছিল। বাঙালি জাতির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আত্মার যে গভীর একাত্মতা ছিল এই ভাষণে মর্মে মর্মে সেটি ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন। মাতৃভাষার অধিকার সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ছিল চরম মুহূর্ত। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীনতারই ঘোষণা দেননি, বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের কথাও বলেছিলেন। একটা জাতিকে কীভাবে গড়ে তোলা হবে, তার সবকিছুই বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঐতিহাসিক এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু একদিকে যেমন বাঙালি জাতির শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে অসহযোগ আন্দোলন এবং দেশকে শত্রুমুক্ত করতে কী কী করতে হবে সে নির্দেশনাও দিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন, পাকিস্তানের শাসকরা তাকে হয়তো আর কথা বলতে নাও দিতে পারে, সেজন্যই বলেছিলেন আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমাদের যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো। বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রতিটি বাক্য এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস ছিল। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, অর্থনৈতিক মুক্তির পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী তা হতে দেয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানি শাসকরা বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ বন্ধ করতে পারেনি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতা দখলকারীরা ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো বন্ধ করে দিয়েছিল। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীরা ওই সময় স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। মনে হচ্ছিল পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা এসে দেশ চালাচ্ছিল। বঙ্গবন্ধুর নাম, নিশানা মুছে ফেলতে চেয়েছিল, ভাষণ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারেনি। ইতিহাস সত্যকে তুলে ধরবে- আজকে এটিই প্রমাণ হয়েছে।
সংসদ নেতা বলেন, পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যে, সে দেশে একটি ভাষণ ৪৬ বছর ধরেই মানুষ শুনে যাচ্ছেন। যা এখনও এতটুকু পুরনো হয়নি, আবেদন হারায়নি। বরং মানুষ এই ভাষণ শুনে নতুন করে অনুপ্রেরণা পাচ্ছে। সারা দেশে এখনও সমান মহিমা নিয়ে ভাষণটি বেজে চলেছে। কত হাজার বার বেজেছে সেই হিসাব করাও কঠিন। তিনি বলেন, আড়াই হাজার বছর ধরে যে ভাষণগুলো জাতিকে উজ্জীবিত করেছে, পৃথিবীর তেমন একশ’টি ভাষণের মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ স্থান পেয়েছে।
ইউনেস্কোকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী এই ভাষণটিই ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য স্থান পেয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদেরকেও ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন বাজানো হতো এই ভাষণ।
ঐতিহাসিক ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী বক্তব্যের পেছনে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ দেয়ার আগে বঙ্গবন্ধুকে অনেক নেতা অনেক কথা বলেছেন। অনেকে অনেক কিছু লিখেও দিয়েছেন। জনসভায় যাওয়ার আগে আমার মা (বেগম মুজিব) বাবাকে (বঙ্গবন্ধু) ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন কিছু সময় রেস্ট নাও, তোমার সামনে অনেক দায়িত্ব। অনেকে অনেক কথা বলবে। এ দেশের মানুষের কিসে ভালো হবে তোমার থেকে কেউ বেশি জানে না। জনগণের হাতে বাঁশের লাঠি, আর হানাদারদের হাতে বন্দুকের নল। লাখো মানুষের জীবন তোমার হাতে। তাই কারোর কথা শোনার দরকার নেই। তোমার মনে যা আসবে সেটিই তুমি বলবে। ৭ মার্চের ভাষণের সময় বঙ্গবন্ধুর কাছে কোনো লিখিত বা পয়েন্ট ছিল না। তিনি অলিখিত এই কালজয়ী ভাষণ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আবেদন যুব সমাজের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পেয়েছিল। প্রতি বছর ৭ মার্চের ভাষণ উপলক্ষে একটি স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করা হচ্ছে। ওইসব বক্তব্য দিয়ে বই প্রকাশ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক এই ভাষণের মূল্য অনেকেই বুঝতে পারবে না। যারা বুঝতে চায় না তারা তো ভাষণটি মুছে ফেলারই চেষ্টা করেছিল।
তিনি বলেন, ভাষণটি আজ ১২ ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি বাঙালি জাতির গর্ব, সারা বিশ্বে আজ সমাদৃত। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলব। বাঙালি জাতিকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।
প্রথমে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং পরে ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এইচএম মাহমুদ আলী, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরিফ ডিলু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, প্রাথমিক ও গণশিক্ষ বিষয়কমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, সরকারি দলের শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. আবদুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু, ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, অধ্যাপক আলী আশরাফ, হুইপ শহীদুজ্জামান সরকার, অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, বিএম মোজাম্মেল হক, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম, ডা. এনামুর রহমান, মনিরুল ইসলাম, তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস, সাগুফতা ইয়াসমীন এমিলি, সানজিদা খানম, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, উম্মে রাজিয়া কাজল, এনামুল হক, সাবিনা আখতার তুহিন, পংকজ দেবনাথ, বেগম আখতার জাহান, ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি, শামসুল হক টুকু, ইসরাফিল আলম, এটিএম আবদুল ওয়াহহাব, তাজুল ইসলাম, কাজী নাবিল আহমেদ, মোসলেম উদ্দিন, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল, বিএনএফের এসএম আবুল কালাম আজাদ, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজী, তাহজীব আলম সিদ্দিকী এবং বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, ফখরুল ইমাম, পীর ফজলুর রহমান প্রমুখ। দীর্ঘ প্রায় ৫ ঘণ্টার আলোচনা শেষে প্রস্তাবটি ভোটে দিলে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতভাবে তা গৃহীত হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের এমপিরা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ ও রাজনীতির মহাকাব্য’ উল্লেখ করার পাশাপাশি দিনটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান।
সংসদ সদস্যরা বলেন, বঙ্গবন্ধুর দৃপ্তকণ্ঠের কালজয়ী এ ভাষণ শুধু বাঙালি জাতিকে আলোড়িত করেনি, বিশ্ববিবেককেও নাড়া দিয়েছে। ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি তারই প্রমাণ। তবে ভয় হয়, ইতিহাসের খলনায়ক দানবের দল (বিএনপি-জামায়াত) যদি কোনোদিন ক্ষমতায় আসে, তবে আবারও বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী এ ভাষণ নিষিদ্ধ করবে, বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ বন্ধ করে দেবে। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্রকারী ওই দানবের দলকে আবারও পরাজিত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার সুফল জনগণের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিতে হবে।
৭ মার্চের ভাষণ ঐতিহাসিক দলিল -রওশন এরশাদ : প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনে বাঙালি জাতি জেগে ওঠে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল। এ ভাষণ ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতি পাওয়ায় গোটা বাঙালি জাতির সঙ্গে আমরাও গর্বিত, আনন্দিত। ৭ মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর এ কালজয়ী ভাষণের মূল মর্মার্থই ছিল স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ শুধু ভাষণ ছিল না, স্বাধীনতা যুদ্ধের রণকৌশলের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ। একটি অনন্য ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু রাজনীতির মহাকবি হয়েছিলেন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু জন্ম নিয়েছিলেন বলেই একটি স্বাধীন দেশ, মানচিত্র, পতাকা পেয়েছি। ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি বঙ্গবন্ধু সারা পৃৃথিবীর সামনে বাঙালি জাতিকে আরও একবার গর্বিত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। ৭ মার্চের ভাষণে সিংহের মতো গর্জন করে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। বাঙালি জাতি তার ভাষণ বুকে ধারণ করে যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত করেছিলেন স্বাধীনতা।
বিরোধী দলের নেতা আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুকে আমরা এখনও জাতির জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। বঙ্গবন্ধুকে আপনারা (আওয়ামী লীগ) কুক্ষিগত করে রাখবেন না। জনগণের মাঝে উনাকে ছড়িয়ে দেন। বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের জাতির জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশই একটি মাত্র দেশ, যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সংগ্রাম এবং ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণে ২৬টি বাক্যের মাধ্যমে গোটা জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছেন। এই কালজয়ী ভাষণ শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা বিশ্বের বাঙালির অহংকার ও গর্বের।’
সংসদে উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়, ‘সংসদের অভিমত এই যে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দেশ ও জাতির সঙ্গে আমরা গর্বিত এবং এ জন্য ইউনেস্কোসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জাতীয় সংসদ ধন্যবাদ জানাচ্ছে।’ আলোচনা শেষে প্রস্তাবটি ভোটে দিলে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতভাবে তা গৃহীত হয়। প্রস্তাবটি উত্থাপন করে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণ- আজ তা প্রমাণিত। ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি ছিল অত্যন্ত প্রত্যাশিত। বঙ্গবন্ধুর অলিখিত ১৮ মিনিটের এ ভাষণ বাঙালি জাতিকে জাতীয় মুক্তির মোহনায় দাঁড় করিয়েছিল। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। তিনি বলেন, পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষণ এতবার উচ্চারিত হয়নি। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- বঙ্গবন্ধুর দৃপ্তকণ্ঠের এ ঘোষণা শুধু বাঙালি জাতিকে আলোড়িত করেনি, বিশ্ববিবেককেও নাড়া দিয়েছে। ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি তারই প্রমাণ। এতে দেশ ও জাতির সঙ্গে আমরাও গর্বিত। তিনি বলেন, স্বাধীনতার চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর দুটি স্বপ্ন ছিল- এক. বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অন্যটি বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি। প্রথমটা বঙ্গবন্ধু দিয়ে গেছেন। আর দ্বিতীয় স্বপ্ন অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে তারই কন্যা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ। ৭ মার্চের ভাষণের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে উঠে এসেছে বাঙালি জাতির ইতিহাস, শোষণ-বঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাজনীতির কবি। ধর্ম-বর্ণ ও জাতির নামে বাঙালি জাতি ছিল বঞ্চিত। হাজার বছরের ইতিহাসে একমাত্র বঙ্গবন্ধুই বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনেছেন। নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে একটিমাত্র ভাষণে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছেন। খলনায়করা ক্ষমতায় এসে বারবার বঙ্গবন্ধুকে ছোট করার চেষ্টা করেছে। এ ভাষণকে তারা নিষিদ্ধ করেছিল। যুগে যুগে যত সংগ্রাম হবে, বিশ্ববাসী স্মরণ করবে এ ঐতিহাসিক ভাষণ। ভয় হয়, ওই দানবের দল কোনোদিন যদি ক্ষমতায় আসে, তবে আবারও নিষিদ্ধ হয়ে যাবে ঐতিহাসিক এ ভাষণ, বন্ধ করে দেবে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ। তাই ওই দানবের দলকে অবশ্যই পরাজিত করতে হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। একটি ভাষণেই তিনি হাজার বছরের বাঙালি জাতির শোষণ-বঞ্চনা তুলে ধরার পাশাপাশি তাদের মুক্তি ও স্বাধীনতার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাঙালি জাতি সশস্ত্র যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে। সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের জন্য চিরদিন এ ভাষণ অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ৭ মার্চের ভাষণের প্রতিটি বাক্য নিয়ে একেকটি প্রবন্ধ লেখা যায়। ওই ভাষণ বাংলার সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল। ভাষণের মাধ্যমে শেখ মুজিব সারা বিশ্বে রাজনীতির কবি হিসেবে পরিচিতি পান।
জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু জাদুর বাঁশি বাজিয়ে সাড়ে ৭ কোটি বাঙালিকে রেসকোর্সে ডেকে আনলেন। সেদিন তার সিংহের মতো গর্জন পাকিস্তানের ভিত কাঁপিয়ে দিল। সেদিনের ভাষণ শুনে আমরা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিলাম। তিনি যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন। এরপর থেকে আমরা অস্ত্র সংগ্রহ শুরু করলাম। এরপর মরণপণ যুদ্ধ শুরু হল। আমরা বিজয়ী হলাম।’
ফখরুল ইমাম বলেন, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ একটি কালজয়ী ভাষণ, রাজনীতির মহাকাব্য। বিএনএফের চেয়ারম্যান এসএম আবুল কালাম আজাদ ৭ মার্চকে জাতীয় দিবস ঘোষণার দাবি জানিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু একটি মাত্র ভাষণে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু অমর ও কালজয়ী এ ভাষণ সংরক্ষণে আমরা ৪৬ বছরেও কিছু করতে পারিনি। তাই ৭ মার্চকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। স্বতন্ত্র এমপি রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, পৃথিবীতে অনেক বড় নেতার ভাষণ রয়েছে, কিন্তু তাদের কারও ভাষণ ইউনেস্কো গ্রহণ করেনি, করেছে একটি মাত্র ভাষণ। সেটি হল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। কারণ মাত্র ১৮ মিনিটের কালজয়ী ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা উপহার দিয়েছেন তিনি।
 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত