যুগান্তর রিপোর্ট    |    
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বিচারপতি জয়নুলের দুর্নীতি বন্ধে চিঠির বৈধতার রায় ও পর্যবেক্ষণ
সর্বোচ্চ আদালতের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে
চিঠি দেয়ার বিষয়টি সুপ্রিমকোর্টের মতামত নয় * সাত বছরেও দুদকের অনুসন্ধান শেষ না হওয়ায় অসন্তোষ * বিচারকদের বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে
আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান বন্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আপিল বিভাগ প্রশাসনের দেয়া চিঠি কোনোভাবেই সুপ্রিমকোর্টের মতামত নয় বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, এ চিঠি সর্বোচ্চ আদালতের ভাবমূর্তি এবং মর্যাদা নষ্ট করেছে।
গত মার্চে সুপ্রিমকোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রারের পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছিল, বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের কোনোরকম ব্যবস্থা গ্রহণ ‘সমীচীন হবে না।’
বিষয়টি নজরে আনা হলে অক্টোবরে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনের দেয়া ওই চিঠি কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়েছিল রুলে।
মঙ্গলবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ সাতটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে রুল নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, একমাত্র রাষ্ট্রপতি ছাড়া অন্য কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগের তদন্ত চলতে পারে। সুতরাং বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়ে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনের চিঠিতে ভুল বার্তা দেয়া হয়েছে। তবে সাত বছরেও দুদকের ওই অনুসন্ধান শেষ না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে রায়ে বলা হয়েছে, সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে, যাতে তাদের মর্যাদাহানি না হয় বা অকারণে হয়রানির শিকার হতে না হয়। আদালতে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের পক্ষে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, দুদকের পক্ষে অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান এবং সুপ্রিমকোর্টের চিঠি আদালতের নজরে আনা আইনজীবী অ্যাডভোকেট বদিউজ্জামান তরফদার। এছাড়া অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া তিন আইনজীবী সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, অ্যাডভোকেট প্রবীর নিয়োগী ও সমিতির সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট এএম আমিন উদ্দিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
রায়ে আদালতের দেয়া সাতটি পর্যবেক্ষণ হল- (১) আপিল বিভাগের প্রশাসনিক ক্ষমতায় দেয়া আলোচিত চিঠি দেয়া যথাযথ হয়েছে কিনা সে বিষয়ে জারি করা রুলের বিচার চলতে পারে। (২) এ চিঠি দেয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিছু অপ্রাসঙ্গিক ও নিজ এখতিয়ারবহির্ভূত যুক্তি গ্রহণ করেছে, যা কর্তৃপক্ষের মহৎ উদ্দেশ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। (৩) এ চিঠি আপিল বিভাগ তার প্রশাসনিক ক্ষমতায় দিয়েছে। এটা কোনোভাবেই সুপ্রিমকোর্টের মতামত হিসেবে বলার সুযোগ নেই। (৪) এ চিঠি জনগণের কাছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মর্যাদা ও ভাবমূর্তিকে খর্ব করেছে। (৫) ওই চিঠি জনগণের মধ্যে বার্তা দিয়েছে যে, সুপ্রিমকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে দায়মুক্ত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ছাড়া আর কেউ দায়মুক্তি পেতে পারে না। তবে রাষ্ট্রপতি শুধু তার পদে বহাল থাকাস্থায় এ দায়মুক্তি পাবেন। (৬) দুদক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে কালবিলম্ব করেছে। তার বিরুদ্ধে সাত বছর ধরে অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ন্যূনতম কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ নেই। এবং (৭) ভবিষ্যতে সুপ্রিমকোর্টের একজন বিচারকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান বা তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা বা কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই বিশেষ নজর রাখতে হবে। যাতে অকারণে তাদের মর্যাদাহানি না ঘটে বা হয়রানির শিকার না হন। মনে রাখতে হবে এর সঙ্গে বিচার বিভাগের মর্যাদা ও গৌরব জড়িত।
রায়ের পর দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, আদালত বলেছেন, এ চিঠি দেয়া হয়নি। এটাকে কোনোক্রমেই সুপ্রিমকোর্টের চিঠি বলা যাবে না। আমরা বলতে পারি চিঠিটি অবৈধ। বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের আইনজীবী ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেন, হাইকোর্টের এ রায় ইতিবাচক।
৯ অক্টোবর সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের দুর্নীতির অনুসন্ধান বন্ধে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনের দেয়া চিঠি কেন অবৈধ হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও সহিদুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। ১০ দিনের মধ্যে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল, দুদক চেয়ারম্যান, আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার এবং বিচারপতি জয়নুল আবেদীনকে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়।
২৮ মার্চ সুপ্রিমকোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তীর স্বাক্ষরিত চিঠি দুদককে দেয়া হয়। ৯ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মো. বদিউজ্জামান তফাদার ওই চিঠিটি নজরে আনলে আদালত এ রুল জারি করেন। একই সঙ্গে রুল শুনানির জন্য অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, প্রবীর নিয়োগী ও এএম আমিন উদ্দিনকে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯ অক্টোবর শুনানির দিন ধার্য করেন আদালত।
দুদকে জয়নুল আবেদীনের দাখিল করা সম্পদ বিবরণীর সুষ্ঠু যাচাই ও অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করে তার চাকরির (বিচারপতি হিসেবে) মেয়াদ সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র (যোগদানপত্র, অবসর গ্রহণের তারিখ সংবলিত কাগজপত্র) ও চাকরি সূত্রে বিভিন্ন (বেতন, ভাতা, অবসর সুবিধা ইত্যাদি) খাতে গৃহীত অর্থের বিবরণী (অর্থবছর হিসেবে) চেয়ে চলতি বছরের ২ মার্চ সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর চিঠি দেয় দুদক।
এর জবাবে ২৮ মার্চ সুপ্রিমকোর্ট দুদককে একটি চিঠি পাঠায়। সুপ্রিমকোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তী স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, উপর্যুক্ত বিষয় ও সূত্রের পরিপ্রেক্ষিতে নির্দেশিত হয়ে জানানো যাচ্ছে, বিচারপতি জয়নুল আবেদীন দীর্ঘকাল বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এবং আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনকালীন তিনি অনেক মামলার রায় দেন।
চিঠিতে বলা হয়, অনেক ফৌজদারি মামলায় তার প্রদত্ত রায়ে অনেক আসামির ফাঁসিও কার্যকর করা হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মাননীয় বিচারপতি কর্তৃক প্রদত্ত রায় সবার ওপর বাধ্যকর। এহেন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ আদালতের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির বিরুদ্ধে দুদক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তার প্রদত্ত রায়গুলো প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং জনমনে বিভ্রান্তির উদ্রেক ঘটবে। এতে আরও বলা হয়, বর্ণিত অবস্থায়, সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের কোনোরকম ব্যবস্থা গ্রহণ সমীচীন হবে না মর্মে সুপ্রিমকোর্ট মনে করে।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১০ সালের ১৮ জুলাই সম্পদের হিসাব চেয়ে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে নোটিশ দেয় দুদক। ওই নোটিশ চ্যালেঞ্জ করে তিনি ওই বছরের ২৫ জুলাই হাইকোর্টে রিট আবেদন করলেও বিষয়টি উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ হয়ে যায়। পরে ওই বছরের ২৫ অক্টোবর দুদক আবার সম্পদের হিসাব দাখিল করতে নোটিশ দিলেও বিষয়টি থেমে ছিল। সাত বছর পর গত জানুয়ারিতে আবার তাকে নোটিশ দিয়ে আগের সম্পদের হিসাব স্পষ্ট করতে দুদকে হাজির হতে বলা হয়। পাশাপাশি তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে গত ২ মার্চ সুপ্রিমকোর্টকে চিঠি দেয়।
এর জবাবে তদন্ত না করতে গত ২৮ মার্চ দুদককে পাল্টা চিঠি দেয় সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। চিঠি চালাচালির পর সুপ্রিমকোর্ট বিচারপতি জয়নুল আবেদীন সম্পর্কে তথ্য দুদককে দেয়। এ নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মামলা না হলেও দুদক তাকে গ্রেফতার করতে পারে মর্মে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে গত ১০ জুলাই হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নেন অবসরপ্রাপ্ত এই বিচারপতি। পরে জামিনের আদেশ আপিলেও বহাল থাকে।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত