তোহুর আহমদ    |    
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
এহসান সোসাইটির থাবায় যাদের সব শেষ
শুধু যশোরেই মারা গেছে ১১ জন, ঘর ভেঙেছে অনেকের * পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে জেল খেটেছেন অনেকে * মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী এখন ভিখারি
নাম এহসান (দয়া অনুগ্রহ) সোসাইটি। কিন্তু কাজ সম্পূর্ণ বিপরীত। এহসান বলতে কিছুই নেই। আছে জলুমু আর প্রতারণা। সহজ-সরল মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে সমবায়ের নামে সারা দেশ থেকে অন্তত আড়াই হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে একেবারে লাপাত্তা। নাম উঠেছে হায় হায় কোম্পানির তালিকায়। পুরো টাকা ভাগবাটোয়ারা করে পালিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা। শেষ সম্বল হারিয়ে পথে বসেছেন হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। কিন্তু কেউ টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে উল্টো অনেককে সন্ত্রাসী হামলাসহ মিথ্যা মামলা ও পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। কেউ কেউ জেলও খেটেছেন। ব্যক্তিস্বার্থে এসব হীন কাজে প্রতারকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সমাজের বেশ কিছু প্রভাবশালী লোকজন। যারা রাজনৈতিকভাবে খুবই ক্ষমতাবান।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অনেকে মানসিক চাপ সামলাতে না পেরে স্ট্রোক করে মৃত্যুর মুখোমুখি কিংবা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ আবার হৃদরোগে আক্রান্ত। অনেকে টাকার শোকে অকালে মারা গেছেন। আবার সংসার ভেঙেছে অনেকের। এহসান সোসাইটির বিপুলসংখ্যক প্রতারিত গ্রাহকের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা জানার জন্য টেস্ট কেস হিসেবে যশোর শহরে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালায় যুগান্তরের অনুসন্ধান টিম। এতে প্রতারিত গ্রাহকদের মানবেতর জীবনের যে খণ্ডচিত্র বেরিয়ে আসে তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য!
সূত্র বলছে, দেশজুড়ে এহসান সোসাইটির গ্রাহক ছিল অন্তত আড়াই লাখ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক সংগ্রহ করা হয় যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও তার আশপাশের এলাকা থেকে। অনুসন্ধানের সূত্র ধরে যশোর শহরেই খোঁজ মেলে এহসান সোসাইটির প্রতারণার শিকার গ্রাহক অসহায় রহিমা খাতুনের। তিনি এখন শহরময় ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করেন।
জানা গেল যশোর ঝুমঝুমপুর মুক্তিযোদ্ধা পল্লী এলাকার বাসিন্দা রহিমা খাতুন। তার স্বামী আবদুস সামাদ ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। পৈতৃক সম্পত্তি আর মুক্তিযোদ্ধা ভাতায় তার সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু ২০১২ সালে তিনি এহসানের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারান। কয়েকটি গয়না এবং সংসারের মূল্যবান জিনিস বিক্রি করে ১৩ লাখ পঁচিশ হাজার টাকা রাখেন এহসান সোসাইটিতে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকিংয়ের কথা বলা ধার্মিক মানুষগুলো তার টাকা আত্মসাৎ করতে পারেন- এটা তিনি কখনও কল্পনাও করেননি। কিন্তু এহসান সোসাইটির আসল চেহারা বেরিয়ে আসে ২০১৪ সালে। প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে জানার পর পাগলের মতো বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি শুরু করেন রহিমা। কিন্তু টাকা উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন তিনি। একপর্যায়ে যশোর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। কিন্তু এ মামলা তার জন্য আরেক দফা বিপদ ডেকে আনে। মামলা করায় ক্ষিপ্ত হয়ে রহিমা খাতুনের ছেলে সেলিম হোসেনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির সাজানো মামলা করে এহসান সোসাইটির স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এ জন্য তারা মামলার বাদী হিসেবে যশোর শাখার মাঠকর্মী মোহাম্মদ আলীকে ম্যানেজ করেন। থানা পুলিশকেও খুশি করার ব্যবস্থা করা হয়। অগত্যা সেলিম হোসেনকে গ্রেফতারে শুরু হয় অভিযান। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে সে এখন ফেরারি। থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলা যায় পিবিআইয়ের (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) কাছে।
সূত্র জানায়, পিবিআইয়ের ইন্সপেক্টর এমদাদুল হকের সঙ্গে এহসান সোসাইটির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তিনি সেলিম হোসেনের বিরুদ্ধে মিথ্যা চার্জশিট দেন। ইতিমধ্যে মামলার খরচ চালাতে সর্বস্বান্ত রহিমা খাতুনের পরিবারটি। অভাবের সংসারে ছেলেদের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়ান বৃদ্ধ রহিমা। একপর্যায়ে তাকে বাড়ি থেকেও বের করে দেয়া হয়। তারপর তার নতুন জীবনের নাম ভিক্ষাবৃত্তি। দিনে শহরময় ঘুরে ভিক্ষা করেন। রাত কাটান রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে।
তবে শুধু রহিমা খাতুন একা নন। এমন হাজারো গ্রাহকের মানবেতর জীবন আর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার খবর বেরিয়ে আসে যুগান্তরের অনুসন্ধানে। যশোর বাসস্ট্যান্ডে তার সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। একদমে এসব ফেলে আসা কস্টগুলো বলে ফেলেন আঞ্চলিক ভাষায়। তারপর চোখের লোনাজল গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। আক্ষেপ করে বলেন, ‘এসব লিখে আর কী হবেনে, আমার টাকা কি কেউ ফেরত দিবিনি?’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, আমাকে যারা রাস্তায় নামিয়েছে তাদের আমি ফাঁসি চাই।
এবার শোনা যাক এ শহরের বৃদ্ধ শের আলীর কথা। সদর উপজেলার রূপদিয়া বাজারের বাসিন্দা তিনি। কিন্তু এখন নেই। একবুক কষ্ট আর ক্ষোভ নিয়ে তিনি স্ট্রোক করে মারা গেছেন। কারণ একটাই। এহসান সোসাইটির প্রতারণা। স্থানীয়রা যুগান্তরকে জানান, এহসান সোসাইটিতে টাকা রেখে তিনিও সর্বস্বান্ত হন। মেয়েদের বিয়ের খরচের জন্য টাকা জমিয়ে রেখেছিলেন এহসান সোসাইটিতে। চার মেয়ের বিয়ের জন্য তিনি জমা রাখেন ৫৩ রাখ টাকা। কিন্তু ২০১৪ সালের শেষদিকে এহসান সোসাইটি বন্ধের খবরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন বৃদ্ধ শের আলী। বাকশক্তি হারিয়ে অসুস্থ অবস্থায় দীর্ঘদিন বিছানায় থাকার পর ২০১৫ সালে নভেম্বরে মারা যান। শেষ জীবনে চিকিৎসা খরচও তার ছিল না। চার মেয়ের বিয়েও দিয়ে যেতে পারেননি তিনি। শের আলীর মতো শহরের পূর্ব বারান্দিপাড়ার বাসিন্দা কাওসার আলীও এহসান সোসাইটিতে পেনশনের ৬ লাখ টাকা রেখেছিলেন। পুলিশে চাকরি করতেন তিনি। এহসান সোসাইটির কর্মকর্তারা পালিয়ে যাওয়ার পর জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু বেহাত হয়ে যাওয়ার খবরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মারা যান।
এহসান সোসাইটিতে ৫ লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন শহরের মিল রোডের বাসিন্দা জাফর আলী। টাকার শোকে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে সব সময় বিড়বিড় করে কি যেন বলতেন। উদভ্রান্তের মতো শহরময় ঘুরে বেড়াতেন। একদিন ঢাকা রোড এলাকায় ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে নির্মম মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। পূর্ব রায়পাড়া গ্রামের ইস্রাফিল শেখও টাকার শোক সইতে না পেরে মারা যান। তিনি এহসান সোসাইটিতে জমা রাখেন ৬ লাখ টাকা। মৃত্যুর আগে পাগলের প্রলাপের মতো বলে বেড়াতেন ‘শেষ জমানা এসে গেছে’।
শহরের ডালমিল পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা মোসলেম আলীও মারা যান টাকার শোকে। স্কুল শিক্ষক মোসলেম আলী পেনশনের টাকা জমা রেখেছিলেন। মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যদের খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটছে। পূর্ব রায়পাড়া গ্রামের গৃহবধূ নূরজাহান বেগম ৮ লাখ টাকা খোয়ান। সর্বস্ব হারিয়ে তার পরিবার পথে বসেছে। ভেকুটিয়া বাজারের সেলিম ৪ লাখ টাকা রেখেছিলেন। এহসান সোসাইটি বন্ধ হওয়ার পর তিনি বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পাগলের মতো আচরণ করতেন। একপর্যায়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ভেকুটিয়া গ্রামের বজলুর রহমানও ভাগ্য বিড়ম্বিত। ছেলেকে ডাক্তারি পড়ানোর স্বপ্ন বুনছিলেন তিনি। পেনশনের টাকার লভাংশ দিয়ে ছেলেকে ডাক্তার বানাবেন। এ জন্য নিরাপদ সঞ্চয় ভেবে এহসান সোসাইটিতে ৮ লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন। কিন্তু তার সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থ আত্মসাৎ হয়ে গেল ২০১৫ সালে। এ শোকে তিনি মারা যান। ভেকুটিয়া বাজারের হতদরিদ্র কৃষক মইনুদ্দীন রেখেছিলেন ৩ লাখ টাকা। মেয়ের বিয়ের খরচ জোগানোর জন্য তিনি এ টাকা জমা করেন। কিন্তু টাকা আত্মসাৎ হয়েছে জানার পর তিনি হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে রোগেশোকে তিনিও মারা যান। স্থানীয়রা জানান, ২০১৫ সালেই মারা যান ৯ জন গ্রাহক। এরপর ’১৬ ও ’১৭ সালে মারা গেছেন আরও অন্তত ৫০ জন। অবাক করা এমন তথ্য জানিয়েছেন প্রতারিত গ্রাহক সমিতির অন্যতম সংগঠক মফিজুল ইসলাম ইমন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি যুগান্তরকে বলেন, যশোরে এহসান সোসাইটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার খবর পেয়ে অনেকে তাৎক্ষণিক স্ট্রোক করেন। কেউ কেউ স্থায়ীভাবে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। বর্তমানে শহরের আশপাশের এলাকায় এহসানের বেশ কয়েকজন গ্রাহক পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় অনেকটা মৃত্যুপথযাত্রী। এ ছাড়া দাম্পত্যজীবন ভেঙেছে অনেকের। এর মধ্যে স্বামীর অগোচরে টাকা রেখেছিলেন এমন স্ত্রীকে স্বামী তালাক দেন। এ ছাড়া এহসান সোসাইটিতে টাকা রাখায় স্বামী স্ত্রীর দ্বন্দ্বে অনেকের সংসার ভেঙে যায়।
মাঠপর্যায়ে প্রতারিত গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যশোর থেকে এহসান সোসাটির সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ ৩শ’ কোটি টাকা। তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে যথাক্রমে এহসান ইসলামী ফাইন্যান্স অ্যান্ড কমার্স, এহসান ইসলামী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও এহসান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের নামে আমানত সংগ্রহ করা হয়। শুধু যশোরেই এই তিন প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক সংখ্যা ১৬ হাজার।
দ্বিগুণ লাভ ও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নামে আমানত সংগ্রহের ফাঁদ পাতে এহসান সোসাইটি। এর ফলে স্বল্পসময়ে বিপুল পরিমাণ গ্রাহককে প্রলুব্ধ করতে সক্ষম হয় তারা। অনেকে সুদবিহীন বেশি লাভের আশায় স্বর্ণালংকার, হালের গরু এমনকি সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করে টাকা জমা রাখেন। কিন্তু ২০১৪ সালের শেষদিকে যখন একের পর এক এহসান সোসাইটির বিভিন্ন শাখা বন্ধ হতে শুরু করে তখন হতবিহ্বল হয়ে পড়েন হাজার হাজার গ্রাহক। ততদিনে সব শেষ।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত