মোহাম্মদ সাদিক    |    
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
জেগে উঠতে হবে জাগ্রত থাকতে হবে

স্বাধীনতার এত বছর পরও ১৯৭১ সালের সেই খরতপ্ত দুপুরের কথা মনে পড়ে। ঝাঁঝাল দুপুর, খরচার হাওরের হাহাকার, রক্তি নদীর কান্না, সুরমার সাহসী সময়, তালেব ভাইয়ের রক্ত। মনে পড়ে খসরু ভাই, মতিউর মামা এবং তার সঙ্গীদের যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে পড়ার উপচানো উচ্ছ্বাস, মনে পড়ে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’। বিশ্বম্ভরপুরের সেই ধু-ধু দিগন্ত। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কান পেতে শোনা বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ। রিয়াজ মামার গোটা গোটা হাতে আমার নীল ডায়েরিতে লেখা আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। ত্রিশ লাখ মানুষের জীবনদান। দুই থেকে তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানো।

২.

যুদ্ধ শেষ। বাংলার আকাশে-বাতাসে-মাটিতে, দিগন্তে জয় বাংলা, তারুণ্যের এক অসাধারণ জয়গান, বাংলাদেশ সোনার বাংলা হবে। জয়ের আনন্দে চিরকাল বিজয়ীরা ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু বিজিতরা ঘুমায় না। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে বাঙালি নামধারী কিছু মানুষ। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় যিনি উৎসর্গ করেছিলেন বাংলার জন্য, বাংলার মানুষের জন্য, বাঙালির জন্য- তাকে এবং তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হল। তাহলে মুক্তিযুদ্ধ তখনও শেষ হয়ে যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ ছাড়া আর কেউ জাতির পিতার ওপর গুলি করতে পারে না। তার রক্ত, তার পরিবারের সবার রক্ত, প্রকারান্তরে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের সঙ্গে মিশে যায়। বিভ্রান্ত বাংলাদেশ এক মৃত্যু উপত্যকায় তার ঠিকানা খুঁজতে থাকে। যুদ্ধ শেষ হয় না, মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে।

৩.

জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ সন্তান- অনেক রক্ত, অশ্রু আর তিমির ঝেড়ে বাংলার মানুষের পাশে এসে দাঁড়ালেন। যারা একদিন বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিল, আজ তারা বাংলাদেশকে উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ বলে। যারা একদিন এ দেশকে দারিদ্র্যের উদাহরণ হিসেবে দেখত, তারা এখন এ দেশকে নিন্মমধ্যম আয়ের দেশ বলে চিহ্নিত করে। পৃথিবীব্যাপী যখন অর্থনৈতিক মন্দা চলছে তখন বাংলাদেশ তার মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করে তুলেছে। আজ হাওরের মাঝখানে বসে বাংলাদেশের মায়েরা পৃথিবীর যে কোনো স্থানে তার পুত্র-কন্যার সঙ্গে কথা বলে। পহেলা জানুয়ারিতে কোটি কোটি বই বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে আসছে। একদিন যারা পদ্মা সেতুর টাকা বাংলাদেশ থেকে তুলে নিয়েছিল এবং তারা ভেবেছিল বাংলাদেশ পদ্মা সেতু তৈরি করা দূরে থাক, পদ্মা নদীর ওপর একটি বাঁশের সাঁকোও বানাতে পারবে না, আজ তারা পদ্মা সেতুর দৃশ্যমান অংশ দেখে বিস্মিত হয়। বাংলাদেশকে এখন আর ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বিশ্ববাজারে ভিক্ষা করতে হয় না বরং কবির সে কথাই এখন সত্য : ‘সাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।’

৪.

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এখনও শেষ হয়ে যায়নি। যুদ্ধ চলছে, যুদ্ধ আরও চলবে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ দৃশ্যমান ছিল। শত্রু-মিত্র চেনা যেত। আজকের বাংলাদেশের মধ্যে যে যুদ্ধ চলছে, তাতে শত্রু-মিত্র চেনা কঠিন হয়েছে। তবু একবার যদি, একবার আমরা আমাদের পতাকার দিকে তাকাই, আমরা চিনতে পারব। যদি একবার রক্তমাখা সংবিধানের দিকে তাকাই, অশ্রুসিক্ত আবেগ নিয়ে জাতীয় সঙ্গীত শুনি এবং যদি আমাদের ভালোবাসার ভুবন বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের দিকে তাকাই- তাহলে বুঝতে পারি কে বাংলাদেশের শত্রু, কে বাংলাদেশের বন্ধু। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে যে বা যারা অংশগ্রহণ করার সুয়োগ পাননি বলে দুঃখ এবং অনুতাপ আছে আজকের মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করে তিনি এবং তারা সে দুঃখ দূর করতে পারেন।

৫.

আজ পুনরায় সময় এসেছে- জেগে উঠতে হবে, জাগ্রত থাকতে হবে। তন্দ্রার মধ্যে কিংবা ঘুমের মধ্যে জাতির সর্বনাশ হতে পারে। তাই পুনরায় পাঠ করতে হবে : ‘বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগ সুতীক্ষè করো চিত্ত/ বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।’


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত