হামিদ বিশ্বাস    |    
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
৭০১ কোটি টাকা ঋণ অনিয়ম
এনআরবি কমার্শিয়ালের এমডিকে অপসারণ
আগামী দুই বছর তিনি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যোগদান করতে পারবেন না * জড়িত সবাইকে বিচারের আওতায় আনার পরামর্শ চেয়ারম্যানের

অবশেষে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের (এনআরবিসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দেওয়ান মুজিবুর রহমানকে অপসারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী দুই বছর তিনি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও যোগদান করতে পারবেন না। ৭০১ কোটি টাকা ঋণ অনিয়ম এবং ব্যাংক পরিচালনায় ব্যর্থতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার তার অপসারণপত্র অনুমোদন করেন গভর্নর ফজলে কবির। তবে ব্যাংকটিতে অপসারণ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয় বুধবার সকালে।

এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা যুগান্তরকে জানান, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬(১) ধারা অনুযায়ী এনআরবিসিবি’র এমডিকে অপসারণ করা হয়।

অপসারণের বিষয়ে দেওয়ান মুজিবুর রহমান বুধবার বিকাল ৫টায় যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি পেয়েছি। কী করব জানি না। এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি।

জানতে চাইলে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার ফরাছত আলী বুধবার সকালে যুগান্তরকে বলেন, বিচার একজনের হলে হবে না। সবার হতে হবে। এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে বিচারের আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় ব্যাংকটির আরও অনেককে বিচারের আওতায় আনা হতে পারে। এছাড়া চলতি মাসেই ফারমার্স ব্যাংকের এমডিকে অপসারণ করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। কারণ ব্যাংক পরিচালনায় তার বিরুদ্ধে আনা ব্যর্থতার অভিযোগের জবাব সন্তোষজনক হয়নি। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেবে না বাংলাদেশ ব্যাংক- এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, বছরের শেষের দিকে আরও কিছু ঘটনা ঘটতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া অধিকাংশ নতুন ব্যাংক টিকবে না। কারণ নতুন ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি খুবই দুর্বল। গত সপ্তাহে ঋণ অনিয়ম আর ব্যাংক চালাতে ব্যর্থতার দায়ে ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরসহ তিনজন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অপসারণের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এনআরবিসিবির এমডি মুজিবুর রহমান ব্যক্তিগত শুনানিতে আগ্রহী কিনা- তা জানতে চেয়ে চিঠি দেয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে গঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের স্থায়ী কমিটি। শুনানিতে অংশ নিয়ে মুজিবুর রহমান যে জবাব দেন, তা সন্তোষজনক হয়নি। এর আগে একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বেসিক ও অগ্রণী ব্যাংকের এমডিকে অপসারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে ২০১৬ সালেই এনআরবিসিবি’র ৭০১ কোটি টাকা ঋণে গুরুতর অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের ২০ মার্চ ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও এমডির কাছে পাঠানো পৃথক নোটিশে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, আমানতকারীদের স্বার্থে ও জনস্বার্থে এনআরবিসি ব্যাংক চালাতে ব্যর্থ হয়েছে ফরাছত আলীর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ। আর এমডি ব্যর্থ হয়েছেন ব্যাংকটিতে যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে। এমনকি তারা গুরুতর প্রতারণা ও জালিয়াতি করেছেন, যা ফৌজদারি আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয়। চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কেন আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে না এবং এমডিকে কেন অপসারণ করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় নোটিশে।

এমডিকে এসব কথা জানিয়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারা অনুযায়ী আরেকটি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ‘রহস্যজনক’ কারণে এই ধারায় চেয়ারম্যানকে পরবর্তীকালে কোনো নোটিশ দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। উল্লেখ্য, ৪৬ ধারা অনুযায়ী ব্যাংকের পরিচালক বা এমডিকে অপসারণ করা যায়।

আমানতকারীর স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে চেয়ারম্যান ও এমডিকে দেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রথম নোটিশে বলা হয়, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান শহীদুল আহসানের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট এজি এগ্রোকে প্রিন্সিপাল শাখা থেকে ১৮৩ কোটি টাকা ও চন্দ্রগঞ্জ শাখা থেকে বেগমগঞ্জ ফিডের নামে ১১৮ কোটি টাকাসহ বিভিন্ন শাখায় ৭০১ কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের সঙ্গে এমডির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এছাড়া বেনামি শেয়ার ধারণ, পরিচালক না হয়েও পর্ষদ সভায় উপস্থিতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য গোপন করা হয়েছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে চিঠি পাওয়ার ১০ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়। তবে জবাব না দিয়ে এর কার্যকারিতা স্থগিতের আবেদন করে ২৯ মার্চ উচ্চ আদালতে যান চেয়ারম্যান ও এমডি। সাময়িকভাবে নোটিশের কার্যকারিতা স্থগিত হলেও কয়েকদিনের মাথায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে রায় দেন আদালত। এরপর ৩ মে নোটিশের জবাব দেন তারা। তবে ওই জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় বিষয়টি পাঠানো হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্থায়ী কমিটির কাছে।

এরপর অজ্ঞাত কারণে প্রক্রিয়াটি থমকে থাকে। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর কাছে ব্যাংকটির একটি পক্ষ অভিযোগ করে জানায়, সব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পরও বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিচারপ্রক্রিয়া আটকে রেখেছেন, এ তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর আবারও নড়েচড়ে বসে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সম্প্রতি স্থায়ী কমিটি সব প্রক্রিয়ায় শেষ করে দেওয়ান মুজিবুর রহমানকে এনআরবিসিবির এমডি পদ থেকে অপসারণের সুপারিশ করে গভর্নরের কাছে পাঠায়। মঙ্গলবার সে অপসারণের সুপারিশ অনুমোদন করেন গভর্নর।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত