অকটেন-পেট্রোলে লাভে আছে বিপিসি
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাধারণত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ে মানুষের জীবনের প্রতিটি ধাপে। দৈনন্দিন জীবন আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। বাড়ে মূল্যস্ফীতি। লিটারে তেলের দাম ২০ টাকা বৃদ্ধি নিয়ে তাই জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সরকারের হাতে কোনো বিকল্প ছিল কি না। প্রতিলিটার জ্বালানি তেলে এনবিআর প্রায় ৪০ টাকা করে শুল্ক নিচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) তাই বিকল্প হিসাবে জ্বালানি তেলে শুল্ক কমানোর প্রস্তাবও দিয়েছিল। কিন্তু সরকার সেদিকে না হেঁটে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে প্রতিলিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের অবস্থান হচ্ছে, তাদের হাতে কোনো বিকল্প ছিল না। আর এতেই শোরগোল শুরু হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই মুহূর্তে তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বেশ স্পর্শকাতর। কারণ সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর গেজেট প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যে এক লাফে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর বড় চাপ তৈরি হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম সোমবার যুগান্তরকে বলেছেন, এই সময়ে তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার অন্যায় কাজ করেছে। কারণ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসির পর্যালোচনা এবং জনগণের কাছ থেকে শুনানি ছাড়া এই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া যায় না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন যুগান্তরকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে সাময়িক সময়ের জন্য তেলের দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার সাশ্রয়, বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তাদের। তাদের তেলের চাহিদার ২০ শতাংশ কমিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকেও সাশ্রয়ী হতে হবে। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা এই মুহূর্তে বাড়ানো জনগণ ভালোভাবে মেনে নেবে না। তেলের দাম বাড়ানোর পর সোমবার সচিবালয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অনেক বেড়েছে। ফলে দাম বাড়াতে সরকার বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, ডিজেলে প্রতিলিটার ২০ টাকা করে দাম বৃদ্ধির পরও সরকারকে এখনো প্রতিলিটারে ৭০ টাকা লোকসান দিতে হবে। বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম এদিন দুপুরে সাংবাদিকদের বলেছেন, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত তেল আমদানি ঠিক রাখতে বিপিসির ১৯ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। এই টাকা এখন তাদের হাতে নেই। তেলের বাড়তি দাম এবং ভর্তুকি ছাড়া তেলের সরবরাহ ঠিক রাখা কঠিন হতো। রোববার রাতে সরকার ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল এবং কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এর ফলে প্রতিলিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কলকাতায় প্রতিলিটার ডিজেল ১৩৪ দশমিক ৭৬ টাকা, শ্রীলংকায় ১৭৯ দশমিক ৪২ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ দশমিক ৭১ টাকা এবং পাকিস্তানে ১৮৫ দশমিক ৪৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশে কম দামে বিক্রি হলে তেল পাচার হতে পারে।
বিপিসি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছিল : বিপিসির চেয়ারম্যান গত ৯ সেপ্টেম্বর জ্বালানি বিভাগকে একটি চিঠি দেয়। সেখানে গত ৬ মাসে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসানের হিসাব দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়েছে, লোকসানের অর্থ জোগান দেওয়া হয়েছে বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে। আর এই লোকসানের অন্যতম কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিসহ এনবিআরের শুল্ক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুনের আগে এনবিআর ট্যারিফ ভ্যালুতে প্রতিলিটারে আমদানি শুল্ক নিত ১৬ দশমিক ৭৬ টাকা। এখন নেওয়া হচ্ছে ইনভয়েস ভ্যালুর ওপর অর্থাৎ দাম বাড়লে এনবিআর বেশি করে শুল্ক পাবে। এই হিসাবে যুদ্ধের আগে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রতিলিটার তেলে এনবিআর শুল্ক নিয়েছে ১৮ দশমিক ৩৬ টাকা (এর মধ্যে শুল্ক ৬ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শত্যাংশ, এটি ২ শতাংশ, এআইটি ২ শতাংশ)। যুদ্ধের পর গত মার্চে আমদানি শুল্ক নেওয়া হয় প্রতিলিটারে ৩৮ দশমিক ৬৪ টাকা, এপ্রিলে ৩৮ দশমিক ৯০ টাকা, জুলাইতে ২৯ দশমিক ৭৪ টাকা (ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার পর) এবং আগস্টে ৩২ দশমিক ৪৪ টাকা। চলতি মাসে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতিব্যারেল ১০০ ডলারের বেশি। তাই এখন প্রতিলিটার তেলের শুল্ক দিতে হবে ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। বিপিসির চেয়ারম্যানের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ডিজেলের এখন ব্যাপক ঘাটতি হচ্ছে। এই ঘাটতি মেটাতে তেলের দাম বৃদ্ধি বা ২২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান অথবা ইরান যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তেলের আমদানি শুল্ক কমানো। সরকার এখানে শুল্কে হাত না দিয়ে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
অকটেন এবং পেট্রোলে বড় লাভ বিপিসির : সূত্র বলছে, অকটেন এবং পেট্রোল স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ। স্থানীয় সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলো এই তেল উৎপাদন করে সরকারের কাছে নির্ধারিত দামে বিক্রি করছে। চলতি সেপ্টেম্বরের জন্য নির্ধারিত প্রতিলিটার অকটেন ১১২ টাকা, পেট্রোল ১০৮ টাকা ও ডিজেল ১৩৪ টাকায় সরকার ক্রয় করছে। স্থানীয়ভাবে ডিজেল উৎপাদিত হয় সামান্যই। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে অকটেন ব্যবহার হয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৬৫৩ টন এবং পেট্রোল ৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টন। দেশে কোনো পেট্রোল আমদানি হয় না। তবে ২০২৪-২০২৫ সালে অকটেন আমদানি হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫৮২ টন। এই অকটেন দেশীয় অকটেনের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা হয়। আমদানি করা অকটেনের মূল্য প্রতিলিটার ১৭০ টাকার বেশি। দেশে প্রতিবছর ৭০ লাখ টন তেলের ব্যবহার হয়। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশই ডিজেল। সেই ডিজেলের ৯৫ শতাংশই আবার আমদানি করতে হয় বিপিসিকে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর ব্রিফিং : প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী ২০৫ টাকা দরের ডিজেল ১৩৫ টাকা লিটার নির্ধারণ করেও ভর্তুকি দিতে হবে আরও ৭০ টাকা। দাম বাড়ানোর পরও ডিজেলে বছরে লোকসান হতে পারে ৪০ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য জ্বালানি তেলে ভর্তুকি বাড়বে ১০ হাজার কোটি টাকা।’ তিনি বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও বিদেশে তেল পাচার রক্ষার স্বার্থে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে।’ তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বাধ্য হয়েই সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ যুগান্তরকে বলেছেন, তেলের দাম বাড়ানোর বিকল্প কিছু ছিল বলে মনে হয় না। তিনি বলেন, তবে তেলের দাম বাড়ানোর ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে।