আম্মারের সহিংস কর্মকাণ্ড
তিন তদন্ত কমিটির একটিরও প্রতিবেদন জমা হয়নি দেড় বছরে
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম
সালাহউদ্দিন আম্মার। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের বিরুদ্ধে একের পর এক সহিংস ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলেও এসব ঘটনায় গঠিত তিনটি তদন্ত কমিটির একটিরও প্রতিবেদন জমা হয়নি। কোনো কোনো কমিটিকে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তা জমা না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাবি ক্যাম্পাসে সালাহউদ্দিন আম্মারের সক্রিয়তা বাড়ে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, এরপর ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরে বিভিন্ন সহিংস ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে তার নাম সামনে আসে। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করলেও কোনো কমিটির প্রতিবেদন এখনো কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছায়নি।
এদিকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জুলাই আন্দোলনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ও শিল্প-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নিজের স্বাক্ষরে চিঠি দিয়ে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েও সমালোচনায় পড়েন আম্মার। পরে বিতর্কের মুখে ওই উদ্যোগ থেকে সরে আসেন তিনি।
সর্বশেষ গত ২৭ জুলাই কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে পাঠরত দুই শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগে আবারও আলোচনায় আসেন রাকসু জিএস। এ ঘটনায় তার হাতে বেলচা ছিল এবং তা দিয়ে শিক্ষার্থীদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। পরে হামলার শিকার দুই শিক্ষার্থীকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়।
প্রশাসনিক ভবনে ১৪ ঘণ্টা অবরুদ্ধ
গত বছরের ২ জানুয়ারি রাবিতে পোষ্য কোটা বাতিলের দাবিতে বহিরাগতদের নিয়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রশাসন ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝোলানোর অভিযোগ ওঠে আম্মার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, লাঠি ও লোহার রড হাতে তারা দিনভর ভবনের প্রধান ফটক অবরুদ্ধ করে রাখেন।
এতে রাবির দুই উপাচার্যসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ২৫০ জন ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, বাইরে থেকে খাবার, পানি ও ওষুধও ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে রাত ১১টার দিকে, প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়ার পর তালা খুলে দেওয়া হয়।
ঘটনার পরদিন রাবির তৎকালীন প্রশাসন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলামকে প্রধান করে ১২ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। দুই সপ্তাহের মধ্যে উপাচার্যের দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তবে ঘটনার প্রায় এক বছর আট মাস পেরিয়ে গেলেও প্রতিবেদন জমা হয়নি। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম শনিবার বলেন, আমাদের প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়েছে। কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে আমরা সব পক্ষের বক্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছি। কিছু সুপারিশসহ প্রতিবেদন দ্রুত জমা দেওয়া হবে।
জুবেরি ভবনে হেনস্থার অভিযোগ
গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর পোষ্য কোটা আন্দোলনের জেরে রাবির জুবেরি ভবনে তৎকালীন উপ-উপাচার্য ড. মাঈন উদ্দিনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শারীরিকভাবে হেনস্থা ও মারধরের অভিযোগ ওঠে আম্মার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
ঘটনার পরদিন ২১ সেপ্টেম্বর সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক এম ফখরুল ইসলামকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও প্রায় এক বছরেও তা জমা হয়নি।
কমিটির প্রধান অধ্যাপক এম ফখরুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রতিবেদনও প্রায় চূড়ান্ত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহে উপাচার্যের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
গ্রন্থাগারে দুই শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ
সর্বশেষ গত ২৭ জুলাই কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে পড়াশোনা করা দুই শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে আম্মার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, আম্মার নিজেও বেলচা হাতে তাদের মারধর করেন।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরদিন ২৮ জুলাই প্রাণ রসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজাউল করিমকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, আমি কিছুটা অসুস্থ। তবে কমিটির সদস্যরা তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল হবে।
চলতি মাসেই দুই প্রতিবেদন
তিন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা না হওয়া প্রসঙ্গে রাবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম শনিবার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, গত ১৩ আগস্ট সিন্ডিকেট সভায় তিনটি প্রতিবেদন এখনো কেন জমা হয়নি, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রতিবেদনগুলো দ্রুত জমা দিতে কমিটির প্রধানদের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কমিটির প্রধানরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন, চলতি মাসের মধ্যে অন্তত দুটি প্রতিবেদন জমা হবে। সর্বশেষ ঘটনার তদন্ত কমিটির প্রধান কিছুটা অসুস্থ। তিনি কিছুটা সময় চেয়েছেন। আমরা বলেছি, যৌক্তিক সময়ের মধ্যেই যেন প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
উপ-উপাচার্য আরও বলেন, রাকসু জিএসের দ্বারা সংঘটিত ঘটনাবলির কারণে দেশে-বিদেশে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উচ্চশিক্ষার প্রাচীন প্রতিষ্ঠান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনগুলোর সুপারিশ পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
এদিকে রাকসু জিএসের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের পাশাপাশি সম্প্রতি রাকসু তহবিলের অর্থ ব্যয়ের হিসাব নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ছাত্রদলসহ কয়েকটি ছাত্রসংগঠন তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়ের বিষয়ে তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। ফলে আম্মারের বিরুদ্ধে ওঠা সহিংস কর্মকাণ্ডের তদন্তের পাশাপাশি রাকসুর আর্থিক ব্যবস্থাপনাও এখন বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
