পাগলা কুকুর আতঙ্কে বিপর্যস্ত পুরান ঢাকাবাসী: বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:৪৪ পিএম
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সন্ধ্যা নামলেই পুরান ঢাকার অলিগলি যেন মানুষের নয়— দলবদ্ধ কুকুরের দখলে চলে যায়। দিনের ব্যস্ততা, দোকানপাট আর মানুষের কোলাহল থেমে গেলে হঠাৎ করেই দৃশ্যপট বদলে যায়। লালবাগ, চকবাজার, হাজারীবাগ, বংশাল, কোতোয়ালি, ওয়ারী, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া থেকে শুরু করে কামরাঙ্গীরচর— প্রায় প্রতিটি এলাকায় রাত হলেই শুরু হয় পাগলা ও অসুস্থ কুকুরের আতঙ্ক। রাস্তা ফাঁকা হলেই কুকুরগুলো সামনে এসে ভয় দেখায়, অনেক সময় একসঙ্গে দৌড়ে তেড়ে আসে। ফলে রাতে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলাচল অনেকের কাছেই কুকুর আতঙ্কে রীতিমতো দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে।
পুরান ঢাকা মূলত আটটি মেট্রোপলিটন থানা এলাকা নিয়ে গঠিত— হাজারীবাগ, চকবাজার, লালবাগ, বংশাল, কোতোয়ালি, ওয়ারী, সূত্রাপুর ও গেন্ডারিয়া। এর দক্ষিণ প্রান্তে যুক্ত রয়েছে কামরাঙ্গীরচর। পুরো অঞ্চলটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত। পশ্চিমে মোহাম্মদপুর, উত্তরে ধানমন্ডি, নিউ মার্কেট, শাহবাগ, রমনা, মতিঝিল ও সবুজবাগ, পূর্বে যাত্রাবাড়ী ও শ্যামপুর এবং দক্ষিণে কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জ উপজেলা ঘেঁষে থাকা এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কুকুর নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অভাবে জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। তুলনামূলকভাবে উত্তরের কিছু এলাকায় সমস্যা কম হলেও পুরান ঢাকার ভেতরের অলিগলিতে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
লালবাগ ও হাজারীবাগ এলাকায় সন্ধ্যার পর হাঁটলেই বাড়তি সতর্কতা দরকার। স্থানীয়রা জানান, এলাকার মানুষ হলে কুকুররা কিছুটা চেনে, কিন্তু বাইরের কেউ এলেই দলবদ্ধভাবে তেড়ে আসে। নবাবগঞ্জ রোড কিংবা হাজারীবাগের ভেতরের সরু গলিগুলোতে একা চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। লালবাগের বাসিন্দা মো. মামুন বলেন, নিজেদের এলাকার মানুষ কিছুটা নিরাপদ থাকলেও অপরিচিত কাউকে দেখলেই কুকুরগুলো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। তার ভাষায়, দিন দিন পাগলা ও শরীরে ঘা হওয়া কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে, অথচ সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর নজরদারি চোখে পড়ে না। তিনি আরও জানান, অনেক কুকুরের শরীরে মারাত্মক ঘা ও সংক্রমণ রয়েছে। এসব ঘায়ে মাছি বসে, আবার সেই মাছি আশপাশের খাবারে বসায় এলাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
পুরান ঢাকার দক্ষিণ প্রান্তের কামরাঙ্গীরচর এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ বলে দাবি স্থানীয়দের। বেড়িবাঁধসংলগ্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও কুকুরের দাপট স্পষ্ট। স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম রাফি জানান, গভীর রাতে কোনো কোনো অলিগলিতে মানুষের চেয়েও বেশি কুকুর দেখা যায়, বিশেষ করে ময়লার ভাগাড়ের আশপাশে। তার ভাষায়, বস্তাবাহী কেউ এসব এলাকা দিয়ে গেলে অনেক সময় দোকান থেকে খাবার কিনে কুকুরদের দিতে হয়, তবেই নিরাপদে পার হওয়া সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, কুকুরের আক্রমণে শিশুদের আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে এমন ঘটনাও রয়েছে। আলিনগর বাজার চৌরাস্তা, নবীনগর মসজিদ ও নুরজাহান কমেডি সেন্টারের আশপাশের অলিগলিগুলোতে এই আতঙ্ক সবচেয়ে বেশি। আরেক বাসিন্দা জানান, কম ভাড়ায় থাকার কারণে এলাকাটি ছাড়তে না পারলেও রাতের বেলা বাড়ি ফেরার সময় কুকুরের আক্রমণের ভয়ে সামনে তাকাতেও সাহস পান না; নিয়ন্ত্রণ বা দেখার মতো কেউ নেই।
চকবাজার ও বংশাল এলাকায় রাতের চিত্র আরও ভয়ংকর। সরু রাস্তা, কম আলো আর ঘনবসতি কুকুরদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রথমে কুকুরগুলো ভয় দেখায়, এরপর সুযোগ বুঝে তেড়ে আসে। কখনো দিনের বেলাতেও অপরিচিত কাউকে দেখলে আক্রমণের ঘটনা ঘটে। চকবাজারের বাসিন্দা রাশেদা বেগম বলেন, দিনে তেমন সমস্যা না থাকলেও রাত হলেই একত্রে অনেক কুকুর ভয়ংকর হয়ে ওঠে। একবার তার ছেলে একা বের হলে কুকুর দৌড়ে এসে ভয় দেখায়। তার অভিযোগ, শরীরে ঘা হওয়া কুকুরের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, কিন্তু তদারকির অভাবে পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।
নাজিমুদ্দিন রোডের শুকু মিয়ার গলির পরিস্থিতি আরও জটিল। গলিটি এতটাই সরু যে রাতের বেলা ব্যাগ হাতে কোনো অপরিচিত মানুষ ঢুকলেই ৮–১০টি কুকুর একসঙ্গে তেড়ে আসে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, রাতের বেলা ওই গলি দিয়ে চলাচল করতে হলে কার্যত দৌড়ে পার হতে হয়। এক দোকানি বলেন, রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরতে গেলে কুকুরেরা ঘিরে ধরে, একা চলাফেরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি স্মরণ করেন, আগে নিয়মিত ভ্যাকসিন দেওয়া ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হতো, কিন্তু এখন সেসবের কোনো চিহ্ন নেই।
কোতোয়ালি ও ওয়ারীর পুরানা আবাসিক এলাকাগুলোতেও গভীর রাতে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয়রা জানান, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুকুরগুলো আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ওভারব্রিজের নিচে ও অলিগলিতে একসঙ্গে ২০ থেকে ৩০টি কুকুর দলবদ্ধভাবে অবস্থান করে। পরিচিত কাউকে দেখলে কিছুটা শান্ত থাকলেও ভয় পেলে বা অপরিচিত কাউকে দেখলেই তেড়ে আসে। ওয়ারীর বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম জানান, এক রাতে ফেরার সময় তিনটি কুকুর একসঙ্গে তেড়ে আসে। প্রথমে বিস্কুট, পরে কেক কিনে দিয়ে কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দেন। শেষ পর্যন্ত একটি কুকুর তার পায়ে কামড় দেওয়ার চেষ্টা করে। তার মতে, খাবার না দিলে হয়তো রক্ষা পাওয়া যেত না।
গেন্ডারিয়া ও সূত্রাপুর এলাকায় অপরিচিত মানুষের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। স্থানীয়দের ভাষ্য, কুকুররা লোক চেনে না বলে একে-অপরকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। সূত্রাপুরের এক বাসিন্দা বলেন, দিনে কিছুটা বের হওয়া গেলেও গভীর রাতে অন্য এলাকা থেকে ফেরার সময় কামড়ের ভয় তাড়া করে বেড়ায়। মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, কুকুরের কামড়ের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো জলাতঙ্ক। নিয়মিত ভ্যাকসিন না দেওয়া কুকুর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অনেক সময় আক্রান্তরা দেরিতে হাসপাতালে আসেন, এতে ঝুঁকি আরও বাড়ে। এক চিকিৎসক বলেন, তারা কামড়ের চিকিৎসা দিলেও মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, কারণ রাস্তার কুকুরগুলোকে ভ্যাকসিন দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। এটি প্রতিদিনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অর্থায়নে এক সময় সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় নিয়মিত ভেটেরিনারি শাখা রাস্তার কুকুরকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ভ্যাকসিন দিত। তবে ২০২১ সালের পর থেকে অর্থায়ন ও ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় এ কার্যক্রম থেমে যায়। ২০১৯ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনার পর কুকুর নিধনও বন্ধ রয়েছে। অথচ বিকল্প হিসেবে বড় পরিসরে কুকুর নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা বা ভ্যাকসিনেশনের কোনো কার্যকর প্রকল্প তখনও নেওয়া হয়নি, এখনও নেওয়া হয়নি। সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, পুরো ঢাকা শহরে এক লাখের কাছাকাছি কুকুর রয়েছে, যার মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় রয়েছে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার কুকুর। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন কুকুরপ্রেমী সংগঠন ও এনজিও বিদেশ থেকে বিপুল অঙ্কের অনুদান আনলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন যুগান্তরকে জানান, ২০২১ সাল থেকে ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় রাস্তার কুকুরদের ভ্যাকসিন দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর নতুন করে ভ্যাকসিনেশনের অর্ডার দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত কার্যক্রম শুরুর আশা করা হচ্ছে। বিস্তারিত জানতে ভেটেরিনারি বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শও দেন তিনি।
কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতাল ঢাকার পরিচালক ডা. মো. আব্দুল আজিজ আল মামুন বলেন, সারা দেশে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ কুকুর রয়েছে। স্ট্রিট ডগের জন্য আলাদা কোনো বড় প্রকল্প বা নির্দেশনা না থাকলেও কেউ নিজ উদ্যোগে কুকুর নিয়ে এলে তারা ভ্যাকসিনেশন ও চিকিৎসা সেবা দেন। বড় পরিসরের প্রকল্প হলে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে তারা প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
লালবাগ থেকে সূত্রাপুর, চকবাজার থেকে কামরাঙ্গীরচর— পুরান ঢাকার মানুষ এখন একটাই দাবি জানাচ্ছেন- নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। নিয়মিত ভ্যাকসিনেশন, কুকুর নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীল নজরদারি ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ নেই। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে পুরান ঢাকার রাতগুলো আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে— এমন আশঙ্কা ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে।

